মতিউর রহমান সুমন: গ্রামের প্রধান সড়কের পাশে সারিবদ্ধ মাটির ঘর। দুই তিনটি ঘর এমন নয় প্রায় অর্ধ কিলোমিটার রাস্তারধারে চোখে পড়ে মাটির ঘরগুলো। এ যেন মাটির ঘরের গ্রাম। শহর থেকে গ্রাম সবখানেই যখন ইট পাথরের বাসস্থানের আয়োজন এবং এক সময় যাদের ছিল মাটির ঘর তারাও তা ভেঙে করেছে বড় বড় দালানকোঠা সেখানে ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার সতেরবাড়ি নামক এই গ্রামটিতে যেন ভিন্ন দৃশ্যে চোখে পড়ে। সারি সারি মাটির ঘর নজর কেড়ে নেয় যে কোনো ভ্রমণকারী পথিকের।
কথা হয় একটি মাটির ঘরের গৃহকর্তা বিদেশ ফেরত প্রভাষক আবুল মুনসুর মিলন এর সাথে। জানালেন মাটির ঘরগুলোর ইতিহাস। আবুল মুনসুর মিলনের পূর্বপুরুষরা- বড়দাদার দাদার আমল থেকে ঘরগুলো নির্মিত। সময়ের বিচারে তা প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো। সবাই যখন ইট পাথরে বাসস্থান নির্মাণ করছে সেখানে এই মাটির ঘরগুলো নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী জানতে চাইলে এই গৃহকর্তা বলেন-‘বিল্ডিং বাসা বাড়ি করেছি অন্যত্র, ঐ ভিতরের দিকেও আছে, মাটির এই ঘরগুলো ঐতিহ্য হিসেবে রেখে দিতে চাই এবং কারুকার্য শোভিত করে নতুন করে কিছু কাজ করাবো’। তিনি মাটির ঘরের বসবাসের কথা বলতে গিয়ে আরও বলেন-‘ মাটির ঘর প্রাকৃতিক এসির কাজ করে, শীত কি গ্রীস্ম সব সময় থাকার জন্য আরামদায়ক’। আলাপচারিতায় জানা হলো মাটির ঘরের আরও অনেক কথা।
এক সময় যার মাটির ঘর ছিল বুঝে নেওয়া হতো সে বিত্তবান। দোতালা মাটির ঘরও ছিল, এখানেও এক দুটি আছে। জানালেন- মুঘল আমলে সতেরজন সতেরটি মাটির ঘর নির্মাণ করেছিলেন এখানে বসবাসের লক্ষ্যে সে থেকেই এ গ্রামের নাম হয়েছে সতেরবাড়ি। আবুল মুনসুর মিলন বাংলাদেশ দূতাবাসের তত্ত্বাবধানে আরব আমিরাতে একটি স্কুল এন্ড কলেজে গণিতের প্রভাষক হিসেবে চাকরি করেছেন, দুবছর গত হলো গেছেন অবসরে। সামনের দিকে ইশারা করে বললেন, এই যে বিল্ডিং ঘরগুলো দেখছেন এগুলোও কিছুদিন আগে মাটির ঘর ছিল। আমাদের পাশের গুলো ভেঙে বিল্ডিং করতে চাচ্ছে আমি না করেছি, ওদেরগুলো যদি ভেঙেও ফেলে আমাদেরগুলো থাকবে। মনে পড়ে আমার শৈশবের কথা। মাটির ঘরের আলাপচারিতায় আমি যেন অনেকটা আবেগতাড়িত হয়ে গেলাম। কেননা আমাদেরও ছিল একটি মাটির ঘর। আমার শিশুকাল কেটেছে দাদার নির্মিত সেই মাটির ঘরটিতে। সময়ের পরিক্রমায় আমাদের সে ঘরটি এখন নেই ইট পাথরের বিল্ডিংয়ে হারিয়ে গেছে। মাটির ঘর যেন এখন প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহাসিক নির্দেশনে পরিণত হয়েছে। তা হয়েও যদি থাকে কিছু মাটির তৈরি ঘর তবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানবে আমাদের পূর্ব প্রজন্মের বাসস্থান সম্পর্কে।
লেখক: কৃষিবিদ


