বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) নিকটবর্তী দপদপিয়া সেতু টোল প্লাজায় পরিচয় যাচাই ও ভিডিও করাকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় হামলা, মারামারির ঘটনা ঘটেছে। গত ২৫ মে (সোমবার) সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে। ঘটনার একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত হয়ে ‘সমাধানের’ চেষ্টা করলেও, তাদের উপস্থিতিতেই উল্টো পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং দ্বিতীয় দফায় হাতাহাতির রূপ নেয় বলে অভিযোগ উঠেছে। পরবর্তীতে দুই পক্ষ বসে বিষয়টি ‘আপাতত সমাধান’ করেছে বলে দাবি তাদের।
ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন সকালে একটি মোটরসাইকেলে করে দুজন আরোহী দপদপিয়া টোল প্লাজায় আসেন। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য টোল মওকুফ থাকার সুযোগ নিয়ে ওই দুই আরোহীও টোল না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরিচয় দেন।
টোল প্লাজার দায়িত্বরত কর্মচারী সীমান্ত ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানান, “দুইটি ছেলে প্রথমে বাইক নিয়ে আসে, তারপর আমি টোল আদায়ের জন্য বাইকটি থামাই। তারা পরিচয় দেয় তারা ভার্সিটির। আমার সন্দেহ হওয়ায় তাদেরকে বলি— ভাই ভার্সিটি তো বন্ধ, আপনারা কার্ড দেখান। এর পর তারা আমাকে বলে, ‘তোকে আমি কার্ড দেখাবো কেন? তুই কেডা।’ তখন আমি বললাম ভাই এইডা কোনো কথা না, আপনি ভার্সিটির হলে কার্ড দেখান। তখন বলে ভার্সিটির ওই জায়গায় আমার বাসা। আমি তখন বললাম ভাই ভার্সিটির ওখানে বাসা আর ভার্সিটিতে পড়া এক না। তখন আমাকে তারা বলে, ‘শালার পোরে একটা চোপাড় (থাপ্পড়) দিতে হয় না!’ তখন আমি ভিডিও অন করি। ভিডিও করার জন্য তখন সে আমাকে একটা চোপাড় দিছে। তারপর আমিও তাদেরকে মারি। এই হলো ঘটনার শুরু।”
তবে মোটরসাইকেল আরোহীদের পক্ষে ঘটনাস্থলে আসা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯ম ব্যাচের শিক্ষার্থী ও ছাত্রশিবির রাজনীতির সাথে সরাসরি জড়িত নাসিম বিল্লাহ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, “আমার ছোট ভাই এবং বড় ভাই বাড়ি যাচ্ছিলো। তখন জিজ্ঞেস করছে কোথায় স্টুডেন্ট, বলেছে বিএম কলেজের। তারপর টোল দিয়ে দিয়েছে। টোল দিয়ে দেওয়ার পর টোলওয়ালারা উচ্চবাচ্য (উদ্ধত) ভাবে কথা বলেছে। টোল ওয়ালাদের আচরণে আমার বড় ভাই বলেন— এমন ভাবে কথা বলছেন কেন আপনারা? এরপরই টোল ওয়ালারা আমার ভাইদের উপর তিন দফায় হামলা করে। তারপর আমি সেখানে গিয়েছি। যাওয়ার পর আমরা সেখানে সিসি ক্যামেরা ফুটেজ চেয়েছি। ওই সিসি ক্যামেরা ফুটেজ এখনও দেয়নি, দিলে বোঝা যাবে তারা কি করেছে।”
নিজে গায়ে হাত তুলেছেন কিনা এমন প্রশ্নে নাসিম বিল্লাহ বলেন, “না, যে মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়েছিলো তার সাথে কথা বলা হয়েছে, আপনি জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন।”
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনার প্রথম দফায় হাতাহাতির পর টোল কর্মচারীর পক্ষে তার খালাতো ভাই এবং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ইব্রাহিম খান তামিম সেখানে উপস্থিত হন। নাসিম বিল্লাহ ও ইব্রাহিম খানের মধ্যে কথা বলার একপর্যায়ে নাসিম বিল্লাহর পক্ষে কিছু লোক সেখানে এসে চড়াও হয়। তারা টোল কর্মচারী এবং আইন বিভাগের ওই শিক্ষার্থীর ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। পরবর্তীতে টোল কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে আসে।
অভিযোগ রয়েছে, এরপর বিষয়টি ‘মীমাংসা’ করার উদ্দেশ্যে তারা দপদপিয়া টোল প্লাজায় উপস্থিত হন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি আমিনুল ইসলাম এবং সাধারণ সম্পাদক। তারা উভয়পক্ষকে নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করলেও তাদের উপস্থিতি থাকাকালীন আকস্মিকভাবে আবার দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে প্রচণ্ড মারামারি ও হট্টগোল শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে শিবির নেতৃবৃন্দ একটি পক্ষটিকে সরিয়ে নিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান করেন।
এই ঘটনার পর ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ইব্রাহিম খান তামিম বলেন, “আমরা শিবির ভাইদের সাথে এই ঘটনা নিয়ে বসেছি। বিষয়টি আপাতত সমাধান করা হয়েছে, এজন্য এই বিষয়টি নিয়ে আমি কিছু বলতে চাচ্ছিনা।”
এদিকে ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সভাপতি মনিরুল ইসলামের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
সার্বিক বিষয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মেহেদী হাসানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, “এমন ঘটনা আমাদের নজরে আসে নাই। যদি আমাদের কাছে লিখিত অভিযোগ আসে, আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিবো।”
টোল প্লাজায় এমন হট্টগোল এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।


