স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং বিদ্যমান গবেষণাগার উন্নয়ন (এলএসটিডি) প্রকল্প এর আওতায় খুলনার প্রযুক্তি গ্রামে বোরো মওসুমের ব্রি হাইব্রিড ধান৮ জাতের উপর বায়োকোটেড ইউরিয়ার প্রভাব মূল্যায়ন বিষয়ক ফসল কর্তন ও মাঠ দিবস অনুষ্ঠিত হয়। আজ ৩০ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) সকালে এলএসটিডি প্রকল্পের অর্থায়নে পরিচালিত ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন খুলনা এর প্রযুক্তি গ্রামে (বয়ারভাঙ্গা, বটিয়াঘাটা) ব্রি হাইব্রিড ধান৮ এর ফসল কর্তন শুরু হয়। ফসল কর্তন শেষে স্থানীয় কৃষকরা তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন এবং প্রকল্পের বিভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবহারের সুফলসমুহ আলোচনায় উঠে আসে। আধুনিক ধানের জাত ও টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহারে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে কৃষকের মাঠে বাস্তবায়িত ধান চাষে বায়োকোটেড ইউরিয়ার গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন খুলনা এর বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বিল্লাল হোসাইনের সঞ্চালনায় শতাধিক কৃষকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বায়োকোটেড ইউরিয়ার উদ্ভাবক এবং ব্রি আঞ্চলিক কার্যালয়, গোপালগঞ্জের চীফ সায়েন্টিফিক অফিসার (সিএসও) ড. উম্মে আমিনুন নাহার। তিনি তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, কেবলমাত্র আধুনিক জাতের ধান চাষ করলেই কাঙ্ক্ষিত ফলন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, যদি না সারের সঠিক ও সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রয়োগকৃত ইউরিয়া সারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন প্রক্রিয়ার (যেমন: লিচিং, ভোলাটিলাইজেশন, ডিনাইট্রিফিকেশন) মাধ্যমে অপচয় হয়ে থাকে, ফলে এর ব্যবহার দক্ষতা কম থাকে এবং পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। এ প্রেক্ষিতে বায়োকোটেড ইউরিয়া একটি সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচিত। এতে সাধারণ ইউরিয়া দানার উপর উপকারী অণুজীব প্রলেপ দেওয়া হয়। এই অণুজীবগুলো মাটিতে সক্রিয় থেকে উদ্ভিদের শিকড়ের আশেপাশে বসবাস করে এবং জৈবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলীয় নাইট্রোজেনকে উদ্ভিদের গ্রহণযোগ্য রূপে রূপান্তরে সহায়তা করে। ফলে নাইট্রোজেনের ধীরে ধীরে মুক্তি নিশ্চিত হয়, ইউরিয়ার অপচয় কমে (প্রায় ৩০–৪০% পর্যন্ত), এবং গাছ দীর্ঘ সময় ধরে প্রয়োজন অনুযায়ী নাইট্রোজেন গ্রহণ করতে পারে। কৃষকরা লাভবান হলে এই প্রযুক্তি আরও বড় পরিসরে প্রয়োগ করা হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বটিয়াঘাটা উপজেলার কৃষি অফিসার আবু বকর সিদ্দিক বলেন, পরিবেশবান্ধব এই প্রযুক্তি কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে যেমন স্বাবলম্বী করবে, তেমনি মাটির উর্বরতা রক্ষায়ও এটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে। আমরা চাই বটিয়াঘাটার প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে এই সাশ্রয়ী প্রযুক্তি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ুক।
ব্রি আঞ্চলিক কার্যালয়, গোপালগঞ্জের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (এসএসও) ড. মোঃ হুমায়ুন কবির বায়োকোটেড ইউরিয়া প্রযুক্তিকে যুগান্তকারী উদ্ভাবন হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি অনুষ্ঠানের শেষে কৃষকদের অংশগ্রহণে একটি প্রশ্নোত্তর পর্ব পরিচালনা করে চাষাবাদ সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান ও পরামর্শ প্রদান করেন।
ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন খুলনার বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বিল্লাল হোসাইন জানান, বায়োকোটেড ইউরিয়া প্রয়োগে ধানের গুরুত্বপূর্ণ ফলন উপাদানসমূহ যেমন কার্যকর কুশির সংখ্যা, প্রতি শীষে পুষ্ট দানার সংখ্যা এবং পাতার আকারগত বৈশিষ্ট্য (দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ) উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। তিনি উল্লেখ করেন, এ ধরনের শারীরবৃত্তীয় ও কৃষিতাত্ত্বিক উন্নতির সম্মিলিত প্রভাবে প্রচলিত ইউরিয়ার তুলনায় গড়ে প্রায় ০.৮–১.০ টন/হেক্টর পর্যন্ত ফলন বৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন এলএসটিডি প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়া সারের মূল্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে এই প্রযুক্তি জনপ্রিয়করণের মাধ্যমে যদি ৩০-৪০% ইউরিয়া সাশ্রয় করা সম্ভব হয়, তবে সেটি জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় বয়ে আনবে”। তিনি আরও বলেন, এলএসটিডি প্রকল্পের অর্থায়নে সারাদেশে ১৫টি প্রযুক্তি গ্রাম স্থাপন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে এধরনের স্থানভিত্তিক টেকসই কৃষি প্রযুক্তি দ্রুত কৃষকের মাঠে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এসব কার্যক্রমের আওতায় নিয়মিত কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে, যা কৃষকের উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধি এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মাঠ দিবসে স্থানীয় কৃষকরাও বায়োকোটেড ইউরিয়া ও আধুনিক জাত ব্যবহারের ইতিবাচক প্রভাব তুলে ধরেন। বয়ারভাঙ্গা প্রযুক্তি গ্রামের কৃষক সুবির বিশ্বাস জানান, পূর্বে স্থানীয় জাতের ধান চাষ করলেও এবার এলএসটিডি প্রকল্পের সহায়তায় ০২ একর জমিতে ব্রি হাইব্রিড ধান৮ চাষ করে তুলনামূলক বেশি ফলন অর্জন করেছেন এবং বেশি লাভের প্রত্যাশা করছেন।
উপস্থিত অন্যান্য কৃষকরাও ব্রি উদ্ভাবিত আধুনিক জাত ও প্রযুক্তির কার্যকারিতা সম্পর্কে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং এসব প্রযুক্তি গ্রহণে আগ্রহ দেখান। তারা প্রকল্পের মাধ্যমে প্রাপ্ত কারিগরি সহায়তা ও দিকনির্দেশনার জন্য প্রকল্প পরিচালক্সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।
বার্তা প্রেরক:
মো: বিল্লাল হোসাইন
বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিউট
স্যাটেলাইট স্টেশন, খুলনা।
মোবাইল: 01647025480


