দেশে ফসল-পরবর্তী ক্ষতি কমিয়ে কৃষিকে আরও টেকসই ও আধুনিক করার লক্ষ্যে একটি উদ্ভাবনী প্রযুক্তি সামনে এসেছে। সংরক্ষিত ধানকে পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে স্মার্ট আল্ট্রাসনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আউয়াল।
এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা ও কার্যকারিতা তুলে ধরা হয় “ফসল-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা রূপান্তরের কৌশলগত পথরেখা: সংরক্ষিত ধানের ক্ষতি কমাতে বাজার-উপযোগী স্মার্ট আল্ট্রাসনিক সমাধান এবং এসডিজি ২ ও ১২ অর্জন” শীর্ষক এক সেমিনারে। রবিবার (১৯ এপ্রিল ২০২৬) ঢাকার ফার্মগেটে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) মিলনায়তনে এ আয়োজন করে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা ও উদ্ভাবন কেন্দ্র (বাউ-রিক)।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সালিম খান বলেন, দেশে ফসল-পরবর্তী ক্ষতি এখনো কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া এই ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, আল্ট্রাসনিক প্রযুক্তির মতো উদ্ভাবন এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষ অতিথি হিসেবে আইসিটি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আনোয়ার উদ্দিন প্রযুক্তির প্রসারে ডিজিটাল উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, কৃষিখাতে প্রযুক্তির সংযোজন শুধু উৎপাদন বাড়ায় না, বরং কৃষকের আয় ও খাদ্যনিরাপত্তাও নিশ্চিত করে।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ডিজিটাল বিশেষজ্ঞ ও টাস্ক টিম লিডার সুপার্না রায় মাঠপর্যায়ে সহজে ব্যবহারযোগ্য এবং বাজার-উপযোগী প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, গবেষণাগারভিত্তিক উদ্ভাবন দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে হবে, তবেই এর প্রকৃত সুফল পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. আব্দুস সালাম গবেষক, নীতিনির্ধারক এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এ ধরনের প্রযুক্তির দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব।
বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিত্ব করে এসিআই মোটরস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুব্রত রঞ্জন দাস প্রযুক্তিটির বাণিজ্যিকীকরণে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, কৃষকের দোরগোড়ায় প্রযুক্তি পৌঁছে দিতে শিল্পখাত সবসময় প্রস্তুত।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন উদ্ভাবক অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আউয়াল। তিনি জানান, স্মার্ট আল্ট্রাসনিক প্রযুক্তি কোনো ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার ছাড়াই সংরক্ষিত ধানকে পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিতে সক্ষম। ফলে এটি পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ এবং দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর একটি সমাধান।
গবেষণায় উদ্ভাবিত ‘গ্রেইন গার্ড’ একটি আধুনিক আল্ট্রাসনিক ডিভাইস, যা মানুষের কানে অশ্রাব্য উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ তরঙ্গ সৃষ্টি করে। এই তরঙ্গ ধানের ক্ষতিকর পোকা ‘রাইস উইভিল’-এর স্নায়ুতন্ত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলে, ফলে তাদের চলাচল, খাদ্য গ্রহণ এবং প্রজনন ব্যাহত হয়। এতে পোকাগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে শস্য থেকে সরে যায় এবং কোনো রাসায়নিক ব্যবহার ছাড়াই শস্য সুরক্ষা নিশ্চিত হয়।

অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন আইসিটি বিভাগের ইডিজিই প্রকল্পের কম্পোনেন্ট লিড ফারুক আহমেদ জুয়েল। সভাপতির বক্তব্যে বাউ-রিকের আরএলসি কমিটির চেয়ারম্যান ও সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. কে. এম. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এ ধরনের উদ্ভাবন জাতীয় অগ্রাধিকার এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি দ্রুত এ প্রযুক্তির মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
সেমিনারে অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই প্রযুক্তির সফল বাস্তবায়ন হলে দেশে সংরক্ষিত ধানের ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং কৃষিখাতে টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে সংরক্ষণকালীন সময়ে মোট ধানের প্রায় ৭ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হয়, যার প্রধান কারণ পোকামাকড়ের আক্রমণ। দেশের উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া এ ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়িয়ে তোলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মোট উৎপাদনের মাত্র ৫ শতাংশ ক্ষতি রোধ করা গেলে বছরে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব। পাশাপাশি ধানের বীজের অঙ্কুরোদগম হার অন্তত ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন বীজ সাশ্রয় হবে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
গবেষণা সূত্রে জানা যায়, ‘ডেভেলপমেন্ট অব স্মার্ট আল্ট্রাসনিক পেস্ট কন্ট্রোল সিস্টেম ফর পোস্ট-হারভেস্ট লস রিডাকশন ইন স্টোরড প্যাডি’ প্রকল্পের আওতায় প্রায় পাঁচ বছর আগে এ গবেষণার ধারণা শুরু হয়। পরবর্তীতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন সেন্টার (বাউ-রিক)-এর অধীনে এজ (ইডিজিই) সাব-প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় দেড় বছর মেয়াদি অর্থায়নে এটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আউয়ালের নেতৃত্বে এবং সহযোগী গবেষক অধ্যাপক ড. এহসানুল কবিরের অংশগ্রহণে একটি গবেষক দল ‘গ্রেইন গার্ড’ যন্ত্রটির উন্নয়ন, নকশা, পরীক্ষামূলক বিশ্লেষণ এবং মাঠপর্যায়ে যাচাই কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করেছে।
সংবাদ লাইভ/কৃষি


