বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং টেকসই আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা জোরদারের লক্ষ্যে কৃষি কৌশল বিভাগ, প্রকৌশলী প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ (আইইবি) আয়োজিত “বাংলাদেশে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ও সেচ ব্যবস্থাপনা: সম্ভাবনা ও প্রতিবন্ধকতা” শীর্ষক সেমিনারটি আজ ১৪ মে ২০২৬, বৃহস্পতিবার রাজধানীর রমনাস্থ শহীদ প্রকৌশলী ভবন, আইইবি সদর দফতরের কাউন্সিল হলে অনুষ্ঠিত হয়। দেশের কৃষি খাতের আধুনিকায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা, টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ কৃষি নীতি প্রণয়নে এ সেমিনারকে একটি সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মীর শাহে আলম, প্রতিমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও বাংলাদেশ এখনো প্রত্যাশিত উন্নয়ন ও সুশাসনের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পুরোপুরি পৌঁছাতে পারেনি। বিশেষ করে কৃষি খাতে সমন্বয়হীনতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। বর্তমানে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অনেক কার্যক্রম অন্য মন্ত্রণালয় বা সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নে সমন্বয়ের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। কৃষি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় নিয়ে এসে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ন্যায় কৃষি প্রকৌশল সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর গঠন এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশের কৃষিবিদগণ দেশের কৃষি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও টেকসই করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। কৃষির উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটি বাস্তবতা হলো—কারিগরি পদে অকারিগরি জনবল নিয়োগের কারণে অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা ও কার্যকারিতা অর্জিত হচ্ছে না। প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট কারিগরি পদে দক্ষ ও যোগ্য কারিগরি জনবল নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, সঠিক স্থানে সঠিক জনবল নিয়োগের মাধ্যমেই উন্নয়ন কার্যক্রমকে গতিশীল ও টেকসই করা সম্ভব। দক্ষ মানবসম্পদ ছাড়া আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও কৃষির কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন সম্ভব নয়।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রকৌশলী শাহ্রিন ইসলাম তুহিন, আহ্বায়ক, প্রকৌশলীবিদ সমিতি বাংলাদেশ (এ্যাব)। তিনি বলেন, সমন্বিত উদ্যোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই দেশের কৃষি খাতকে আরও আধুনিক, টেকসই ও কার্যকর পর্যায়ে উন্নীত করা সম্ভব। আমরা যেসব উন্নত দেশের কৃষি ব্যবস্থাপনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করছি, তারা প্রায় ৯৭ শতাংশ যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে কৃষি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃষিযন্ত্রের ব্যবহারের ফলে সেখানে উৎপাদন বৃদ্ধি, সময় সাশ্রয় এবং ব্যয় হ্রাস সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশেও কৃষির টেকসই উন্নয়নের জন্য যান্ত্রিকীকরণ ও প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থাকে আরও সম্প্রসারণ করতে হবে। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলে প্রতিবছর বন্যার কারণে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হন। তাই আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই পানিকে সম্পদে রূপান্তর করতে হবে। বন্যার পানি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি পানি থেকে শক্তি উৎপাদনের উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে তা দেশের জ্বালানি ও কৃষি খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। এছাড়া বর্তমান সময়ে কারিগরি সেক্টরে দক্ষ কারিগরি জনবল নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট খাতে যোগ্য ও প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, দক্ষ মানবসম্পদই পারে দেশের উন্নয়নকে আরও গতিশীল ও টেকসই ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. রফিকুল ই মোহামেদ, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রকৌশল খাত দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। অবকাঠামো উন্নয়ন, কৃষি আধুনিকায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্র গঠনে প্রকৌশল খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রতিটি খাতে দক্ষ, যোগ্য ও প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সঠিক স্থানে দক্ষ জনবল নিয়োগের মাধ্যমেই উন্নয়ন কার্যক্রমকে আরও গতিশীল, কার্যকর ও টেকসই করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিবছর আকস্মিক বন্যার কারণে কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হন। তাই হাওরের বোরো ধান ১৫ এপ্রিলের পূর্বেই উত্তোলনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে আগাম বন্যার কারণে ফসল নষ্ট না হয়। এ লক্ষ্যে আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি, দ্রুত ধান কাটার ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় শ্রম ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বন্যা পূর্বাভাস ও পানি ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর ও সমন্বিত করতে হবে, যাতে কৃষকের কষ্টার্জিত ফসল সুরক্ষিত থাকে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
বিশেষ অতিথি কৃষিবিদ মোঃ আব্দুর রহিম, মহাপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তাঁর বক্তব্যে বলেন, কৃষি হলো বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের অর্থনীতিতে কৃষি খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, প্রায় ৪৬ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার আধুনিকায়নের ফলে বাংলাদেশ আজ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে, যা জাতির জন্য এক গৌরবময় অর্জন। এই অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করতে কৃষি ক্ষেত্রে নতুন নতুন উদ্ভাবন ও গবেষণার ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলে প্রায় ৯ লক্ষ হেক্টর জমিতে বোরো ধান উৎপাদিত হয়। অতীতে এই ধান কাটতে প্রায় ৪২ দিন সময় লাগলেও আধুনিক কৃষিযন্ত্র ও প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে বর্তমানে মাত্র ২৩ দিনেই ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে যেমন সময় সাশ্রয় হচ্ছে, তেমনি উৎপাদন ব্যবস্থাও আরও কার্যকর ও লাভজনক হয়ে উঠছে। এছাড়া সেচ ব্যবস্থাপনায় সৌরশক্তির ব্যবহার কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারের ফলে উৎপাদন ব্যয় কমছে এবং উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থাও নিশ্চিত হচ্ছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে কৃষিতে টেকসই ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। প্রযুক্তিনির্ভর, পরিবেশসম্মত ও আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাই পারে বাংলাদেশের কৃষিকে আরও সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে।
শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. সাব্বির মোস্তফা খান, সম্মানী সাধারণ সম্পাদক, আইইবি। তিনি বলেন, আজকের সেমিনারের বিষয়বস্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সময়োপযোগী। বাংলাদেশের কৃষি খাতকে আধুনিক ও টেকসই পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্যে আমাদের কৃষিবিদগণ নিরলস গবেষণা ও উদ্ভাবনী কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছেন। কৃষিতে যদি নোবেল পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকত, তবে বাংলাদেশের কৃষিবিদরাই সেই সম্মানের অন্যতম দাবিদার হতেন। বর্তমান সময়ে কৃষির অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। তাই কৃষিতে পানি ও সেচ ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। ফসল উৎপাদনে পানির অপচয় রোধ করে সঠিক ও দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। কৃষিতে পানির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে, অন্যদিকে ফসলের উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এর মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি কৃষকের আর্থ-সামাজিক অবস্থারও উন্নয়ন ঘটবে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মুহাম্মদ আশিক-ই-রব্বানী, কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের কৃষি শক্তি ও যন্ত্রপাতি বিভাগ। তাঁর উপস্থাপনায় বাংলাদেশের কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, আধুনিক সেচ প্রযুক্তি, কৃষি অবকাঠামো, ডিজিটাল কৃষি ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং কৃষি প্রকৌশল খাতের বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনার বাস্তবভিত্তিক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে কৃষিকে টেকসই, লাভজনক ও প্রযুক্তিনির্ভর খাতে রূপান্তর করতে হলে কৃষি প্রকৌশল খাতকে জাতীয় উন্নয়ন নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে কৃষিযন্ত্র ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার, স্মার্ট পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সময়ের দাবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এ লক্ষ্যে দেশের সকল কৃষিযন্ত্রের ডিজিটাল নিবন্ধন, অবস্থান শনাক্তকরণ, সচল-অচল অবস্থা, ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণের জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
অন্যান্য বক্তাদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন প্রকৌশলী শাহাদত হোসেন বিপ্লব, সদস্য সচিব, কৃষিবিদ সমিতি বাংলাদেশ (এ্যাব)।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রকৌশলী গোলাম মাওলা, চেয়ারম্যান, কৃষি কৌশল বিভাগ, আইইবি এবং অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রকৌশলী মোঃ বেলাল সিদ্দিকী, সম্পাদক, কৃষি কৌশল বিভাগ, আইইবি।
সেমিনারে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কৃষি প্রকৌশলী, সরকারি কর্মকর্তা, গবেষক, উন্নয়নকর্মী, নীতিনির্ধারক ও পেশাজীবীদের অংশগ্রহণে কৃষির আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর রূপান্তর বিষয়ে একটি ফলপ্রসূ ও যুগোপযোগী মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, সেমিনারে উত্থাপিত সুপারিশসমূহ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের কৃষি খাত আরও আধুনিক, দক্ষ, টেকসই ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন খাতে পরিণত হবে।
সংবাদ লাইভ/কৃষি


