ড. কে এম বদরুল হক: বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি নিশ্চিতকরণ, গ্রামীণ অর্থনীতির উন্ননয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃষির বিকল্প নেই। তবে বর্তমানে কৃষি আর শুধু লাঙ্গল-গরুর প্রথাগত চাষাবাদে সীমাবদ্ধ নয়। আধুনিক কৃষিতে যুক্ত হয়েছে স্মার্ট সেচ ব্যবস্থা, ড্রোন প্রযুক্তি, উচ্চফলনশীল ও জলবায়ু-সহনশীল জাত, ডিজিটাল কৃষি পরামর্শ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাপনা।
এই আধুনিক প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে কৃষকের দ্বারে পৌঁছে দিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন ডিপ্লোমা কৃষিবিদরা।
কেন কৃষি ডিপ্লোমা আজ সময়ের দাবি?
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষি উৎপাদন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে। লবণাক্ততা, খরা, বন্যা ও অনিয়মিত আবহাওয়ার কারণে কৃষকদের প্রতিনিয়ত নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এসব সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি এবং প্রশিক্ষিত জনবল।
ডিপ্লোমা কৃষিবিদরা মাঠপর্যায়ে কৃষকদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি এবং উৎপাদন বৃদ্ধির কৌশল সম্পর্কে প্রত্যক্ষ পরামর্শ দিয়ে থাকেন। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, ফসলের অপচয় কমানো, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং কৃষিপণ্যের বাণিজ্যিকীকরণেও তাদের ভূমিকা অনন্য।

চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতার চিত্র ও ব্যাপক সম্ভাবনা
অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের ধারণা, কৃষি ডিপ্লোমা সম্পন্ন করার পর চাকরির সুযোগ সীমিত। বাস্তবে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, আখ গবেষণা ইনস্টিটিউট, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, রেশম উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে কৃষি ডিপ্লোমাধারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে।
শুধু সরকারি খাতেই নয়, বেসরকারি বীজ কোম্পানি, সার ও বালাইনাশক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, এগ্রো-ভিত্তিক শিল্প, ফুড প্রসেসিং কোম্পানি, এনজিও, উন্নয়ন সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক কৃষি প্রকল্পগুলোতেও কৃষি ডিপ্লোমা গ্র্যাজুয়েটদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্যে দেখা যায় অতি সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ১০ম গ্রেডের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা (SAAO) পদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ২,৩৬০ টি শূন্যপদের বিপরীতে আবেদনকারী ছিল মাত্র ১৯ হাজার। যেখানে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাত্র ৩১২টি ইউনিয়ন সমাজকর্মী পদের বিপরীতে আবেদন পড়েছিল ১২ লাখ। দেশের অন্যান্য সরকারি চাকরির তুলনায় কৃষি ডিপ্লোমাধারীদের জন্য চাকরির সুযোগ ও সাফল্যের হার অনেক বেশি।

উচ্চশিক্ষা ও উদ্যোক্তা হওয়ার উন্মুক্ত পথ
কৃষি ডিপ্লোমা করলে উচ্চশিক্ষার পথ বন্ধ হয়ে যায়, এটি একটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।
উচ্চশিক্ষা: ‘ডিপ্লোমা-ইন-এগ্রিকালচার’ সম্পন্ন করার পর দেশে ও বিদেশে ক্রেডিট ট্রান্সফারের সুযোগ রয়েছে। বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্নাতক পর্যায়ে অধ্যয়নের সুযোগ ক্রমশ সম্প্রসারিত হচ্ছে।
কৃষি-উদ্যোক্তা (Agri-Entrepreneur): একজন গ্র্যাজুয়েট কেবল চাকরি না খুঁজে নিজেই হতে পারেন সফল উদ্যোক্তা। আধুনিক নার্সারি, অর্গানিক ফার্ম, টিস্যু কালচার ল্যাব, এগ্রো-ইনপুট ব্যবসা, ভার্টিক্যাল ফার্মিং, মৎস্য-পোল্ট্রি খামার কিংবা কৃষিভিত্তিক স্টার্টআপ গড়ে তোলার ব্যাপক ক্ষেত্র রয়েছে।
আধুনিক ও যুগোপযোগী কারিকুলাম
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড প্রবিধান-২০২২ অনুযায়ী কারিকুলাম হালনাগাদ করেছে। নতুন এই কারিকুলাম Outcome-Based Education (OBE) পদ্ধতিতে প্রণীত, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক জ্ঞানের চেয়ে বাস্তব কাজের সক্ষমতা অর্জন করে। এতে যুক্ত করা হয়েছে:
-জৈব কৃষি ও উত্তম কৃষি চর্চা (GAP), ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের উপযোগী আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি
চাহিদার বিপরীতে সংকটে ভর্তি: খালি থাকছে হাজারো আসন
জনবহুল বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ জনবলের চাহিদা ক্রমাগত বাড়লেও কৃষি ডিপ্লোমা শিক্ষায় শিক্ষার্থী ভর্তির হার উদ্বেগজনকভাবে কম। ফলে একদিকে চাকরির বাজারে দক্ষ কৃষি ডিপ্লোমা গ্র্যাজুয়েটের চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে সেই চাহিদা পূরণে প্রয়োজনীয় জনবল তৈরি হচ্ছে না।
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সাম্প্রতিক এক কর্মশালার তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৮টি সরকারি ও ১৬৫টি বেসরকারি কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (ATI) রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট আসন সংখ্যা প্রায় ১৪ হাজার। অথচ প্রতিবছর এসএসসি পাস করে লাখ লাখ শিক্ষার্থী বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভর্তি হলেও কৃষি ডিপ্লোমার বহু আসন ফাঁকা থেকে যাচ্ছে।

শিক্ষার্থী কম ভর্তির মূল কারণ ও করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি ডিপ্লোমা সম্পর্কে প্রচার-প্রচারণার অভাব, উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিয়ে ভুল ধারণা এবং কারিগরি শিক্ষাকে সামাজিকভাবে কম গুরুত্ব দেওয়ার মানসিকতার কারণে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী এ খাতে আসছে না।
দেশের কৃষি যখন ‘স্মার্ট কৃষির’ দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন প্রয়োজন দক্ষ ও প্রযুক্তিবান্ধব কৃষিবিদ। এসএসসি পাসের পর শুধু প্রচলিত সাধারণ ধারার পেছনে না ছুটে কৃষি ডিপ্লোমাকে প্রথম সারির পছন্দ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কারণ কৃষির উন্নয়ন মানেই বাংলাদেশের উন্নয়ন, আর সেই পরিবর্তনের অগ্রযাত্রায় নেতৃত্ব দেবে আজকের তরুণ কৃষি ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীরাই।
লেখক: প্রকল্প পরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর,খামারবাড়ি, ঢাকা।


