ডাঃ এম, এ, মোমেন: ক্ষুধার কষ্ট হয়তো এক মুঠো শুকনো মুড়ি, শুধু ভাত বা এক টুকরো রুটি মুখে গুঁজে দিয়ে কোনোমতে সহ্য করা যায়; কিন্তু আপন মানুষের অবহেলা, অশোভন আচরণ, কর্কশ দৃষ্টি আর নীরবতা সহ্য করা বড় কঠিন। যেমন—স্বর্ণ লোহাকে বলছে, “ভাই, আমাকেও স্বর্ণকার হাতুড়ি দিয়ে পিটায়, তোমাকেও তো কামার হাতুড়ি দিয়ে পিটায়; আমি তো এত আওয়াজ করি না, কিন্তু তুমি এত আওয়াজ করো কেন? এত চিৎকার করো কেন?” তখন লোহা বলে, “ভাই শোনো, তুমি স্বর্ণ, তোমাকে যে হাতুড়ি দিয়ে পিটানো হয় সেটি লোহার। আর আমি লোহা, আমাকে যে হাতুড়ি দিয়ে পিটানো হয় সেটিও লোহার। সুতরাং, নিজের আপনজন যখন আঘাত দেয়, তখন কষ্টটা অনেক বেশি হয়; একারণেই বুক ফেটে আপনা-আপনি চিৎকার বের হয়।” এক সময় যারা পুরো সংসার আগলে রাখতেন, বয়সের ভারে আজ তারা নিজেরাই যেন নিজের ঘরে পরবাসী—এক কোণে পড়ে থাকা কোনো পুরোনো, অকেজো ও ধুলাবালি জমা আসবাবপত্র! যা শুধু ঘরের জায়গা দখল করে আছে দীর্ঘদিন যাবৎ, কিন্তু কোনো কাজে আসে না। শুধু শুধু পরিবার তাদের ভার বহে বেড়ায় এবং ভাবে যে, তাদের পেছনে অপ্রয়োজনে অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই হচ্ছে না। তাদের দেহ আজ জ্বর, কাল ডায়াবেটিস, আবার শ্বাসকষ্ট, ব্লাড প্রেশার ওঠানামা ইত্যাদি নানা ব্যাধির আঁতুড়ঘর।
ছবি কথা বলে; তাই এই ছবিটির দিকে তাকালে বুকটা কেঁপে ওঠে। যে মা নিজের জীবনের সবটুকু সুখ বিলিয়ে দিয়ে, নিজে না খেয়ে, না পরে অকাতর স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে সন্তানদের বড় করেছেন—আজ জীবনের শেষ বেলায়, পরন্ত বিকেলে এসে তাকেই সামান্য আলুভর্তা আর ভাতের প্লেট সামনে নিয়ে নিঃসঙ্গ ফ্লোরে বসে থাকতে হচ্ছে! অপরদিকে, তার অতি যত্নে বড় করা সন্তান নিজের আদরের ছেলে-মেয়ে নিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে নানান প্রকার মুখরোচক খাবার আহ্লাদের সাথে খাচ্ছে। অথচ, মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে যখন ছেলের বউ অবহেলা বা উদাসীনতার সুরে বলে— “মা, ঘরে কোনো তরকারি নেই; যা রান্না করা হয়েছিল তা আপনার ছেলে আর নাতি-নাতনিরা খেয়ে ফেলেছে। তাই আলুভর্তা আর পানি দিয়ে এ বেলার খাবারটা সেরে নিন, সামনের বেলায় অন্য কিছু ব্যবস্থা করা হবে।”—তখন ক্ষুধার কষ্টের চেয়েও আপনজনের এই অবহেলা বুকে তীরের মতো বেশি বিঁধবে। আজ আমাদের সমাজটা কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে! আমরা নিজেদের পরিবার, সন্তান আর রঙিন দুনিয়া নিয়ে এতটাই ব্যস্ত যে, যে মা-বাবা আমাদের আঙুল ধরে হাঁটতে শিখিয়েছেন, আজ তাদের চোখের জল দেখার সময়টুকুও আমাদের নেই।
এই ছবিটির দিকে তাকালে এবং অনাগত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করলে নিমেষেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। বাবা সামান্য বেতনের সরকারি কর্মচারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে বর্তমানে অবসরে আছেন। নিম্ন বেতনভোগী কর্মচারী হওয়ায় সচরাচর সংসারে অভাব লেগেই থাকত। সংসারের সেই অভাব দূর করার জন্য চাকরির নির্ধারিত সময়ের পরও তাকে অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করতে হতো। যার ফলশ্রুতিতে, চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পূর্বেই অতিরিক্ত শ্রমের কারণে শরীরে নানা ব্যাধি বাসা বেঁধে নেয়। চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ হওয়া, শারীরিক দুর্বলতা, বাত-ব্যথায় আক্রান্ত হয়ে চলাচলে বিঘ্ন ঘটা ইত্যাদি নানা উপসর্গ দেখা দিলেও—পরিবারের চাহিদা মেটাতে কাজ থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত নিস্তার পাওয়া অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না। কখনও ছোট ছোট নাতি-নাতনিদের স্কুলে নিয়ে যাওয়া, আবার কখনও তার করা বাজার বউমার পছন্দ না হলেও অন্য কোনো উপায় না থাকায়, স্বাভাবিকভাবে চলতে না পেরেও অচল দেহ নিয়ে মাঝে মাঝে তাকে বাজার করতে হয়।
চাকরির শেষ সময়ে এসে অফিস থেকে পাওয়া জীবনের শেষ সম্বল, অবসর ভাতার (বেনিফিট) সমস্ত অর্থ ব্যয় করে ছেলেকে বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে এনেছিলেন বাবা। আজ ছেলে বড় চাকরি করে মোটা অঙ্কের বেতন পাচ্ছে। অথচ সেই বৃদ্ধ বাবাকে ওষুধের খালি বোতল সামনে নিয়ে, ভাঙা চশমাটি হাতে ধরে তা মেরামত করার জন্য ছেলের কাছে সামান্য কিছু টাকা চাইতে হয়! টাকা দেওয়া তো দূরের কথা, ছেলে উল্টো তাচ্ছিল্যের সাথে বাবার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। নিজের লাখ টাকার আইফোন টিপতে টিপতে তুচ্ছতাচ্ছিল্যের সুরে বলে— “তুমি তো বুড়ো হয়ে গেছ, সারাদিন ঘরেই বসে থাকো, তেমন কোনো কাজ তো করো না! অযথা টাকা অপচয় করে তোমার আবার চশমা ঠিক করার কী দরকার?” এমন নির্মম মুহূর্তে একজন জন্মদাতার মনে হয়, এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুকে আহ্বান করা ছাড়া আর কি-ই বা করার আছে!
এই সুন্দর ধরণীতে জন্ম যখন হয়েছে, তখন প্রত্যেককেই একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে নিশ্চয়; তবুও মানুষ বেঁচে থাকার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। কিন্তু জীবনের শেষ বেলায় এসে যখন আপন মানুষের অবহেলার শিকার হতে হয়, তখন বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছাটিও মানুষের কাছে ম্লান হয়ে যায়। যারা ভুক্তভোগী, কেবল তারাই বলতে পারেন—অতিপ্রিয় এবং আপন মানুষের অবহেলা, অসম্মান ও অত্যাচার সহ্য করে বেঁচে থাকা কতটা কঠিন, কতটা কষ্টের এবং মানসিক যন্ত্রণাদায়ক!
এদিকে ঘরের এক কোণে, ছেলে-মেয়েদের মানুষের মতো মানুষ করার জন্য অকাতরে সবকিছু বিলিয়ে দিয়ে নিঃস্ব ও অসহায় বাবা সামনের টেবিলে অতি প্রয়োজনীয় ওষুধের খালি বোতল হাতে ভাঙা চশমাটি নাড়াচ্ছেন; টাকার অভাবে সেটি ঠিক করতে পারছেন না। অথচ ঘরের অন্য কোণে হয়তো চলছে জীবনের স্বাভাবিক কোলাহল! কিন্তু এই প্রবীণ মানুষটির দিকে ভুলেও কেউ দৃষ্টি দিচ্ছে না। সবকিছু বিলিয়ে দিয়ে তার জগৎটা আজ বড় একা, বড় অন্ধকার।
আমরা কি সত্যিই আমাদের মা-বাবাকে সেই সম্মান আর ভালোবাসা দিতে পারছি, যা তাদের প্রাপ্য? নাকি দৈনন্দিনের ব্যস্ততা আর টাকা অপচয়ের অজুহাতে তাদেরকে এক চরম মানসিক কষ্টের দিকে ঠেলে দিচ্ছি? অভাব হয়তো আমাদের সমাজে আছে, কিন্তু সেই অভাবের চেয়েও বড় অভাব আজ আমাদের মানসিকতার, আমাদের কৃতজ্ঞতাবোধের! আমরা ভুলে যাই, আমরাও একদিন আমাদের মা-বাবার মতো বৃদ্ধ হবো; সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য নিজের সব সম্বল শেষ করে নিঃস্ব ও অসহায় হবো। আজ আমরা যাদের অবহেলা করছি, আগামীকাল আমাদের সন্তানরাও আমাদের সাথে ঠিক এই আচরণটুকুই ফিরিয়ে দেবে। কৃতকর্মের ফল বহুলাংশে নাইট্রোজেন চক্রের মতো এই পৃথিবীতেই ঘুরে আসে।
যান্ত্রিক যুগে এসে টাকার পেছনে ছুটতে ছুটতে বুঝে বা না বুঝে আমরাও অনেক ভুল করে ফেলেছি। আমরাও যে একদিন মা-বাবার মতো বৃদ্ধ হবো—তা যেন আমাদের মনেই ছিল না! তাই ভুলকে ভুল হিসেবে গ্রহণ করে আসুন, সময় থাকতে আমাদের চারপাশের প্রবীণদের, আমাদের মা-বাবাকে পরম মমতায় আগলে রাখি। ক্ষুধার অন্ন হয়তো জোগাড় করা যায়, কিন্তু অবহেলায় হারিয়ে যাওয়া মানসিক শান্তি আর কখনো ফিরিয়ে আনা যায় না। মনে রাখবেন, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর সেবা দিয়ে মা-বাবার মুখের হাসি অম্লান রাখা কোনো দয়া নয়; এটা আমাদের সকলের পবিত্র দায়িত্ব।
আমাদের ঘুণে ধরা সমাজে প্রচলিত আছে, ধর্মীয় অনুশাসনের নামে বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় মা-বাবা মারা যাওয়ার ৪ বা ৪০ দিন পর ঘটা করে লোকদেখানো গরু জবাই করা হয়। জবাই করা গরুর গোস্ত পাক করে নিকট বা দূরের আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, মসজিদের হুজুর এবং এতিমখানা-মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রীদের ভুরিভোজ করাতে হয়। লোকজন জড়ো করে মা-বাবার প্রতি আন্তরিকতা দেখানোর ছলে তাদের সমাধি বা কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। যাদের-কে জীবিত অবস্থায় শ্রদ্ধা-ভক্তি, সম্মান, ভালোবাসা কিংবা আদর-স্নেহ করা হয়নি—মৃত্যুর পরে তাদের কবরে ফুল দিয়ে কান্নারত মুখে মোনাজাত করে লাভ কী? কিংবা এই লোকদেখানো শ্রদ্ধা-ভক্তিই বা তাদের কী উপকারে আসবে? আমাদের সকলেরই মনে রাখা উচিত, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির টিপসহিতে যেমন দলিল রেজিস্ট্রি হয় না, ঠিক তেমনই মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির কবরে বা সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানালে বা কান্নাকাটি করলে তা মৃত ব্যক্তির আত্মার শান্তি বা অন্য কোনো উপকারে আসে না। তাই সকলের উদ্দেশ্যে বলি—জীবিত থাকতেই মা-বাবাকে তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দেওয়া সবচেয়ে বেশি জরুরি।


