আইনাল হোসেন: আমাদের সময়ে শৈশবের যে সোনালি অধ্যায় ছিলো, বর্তমান সময়ে সেটা হারাতে বসেছে। এই তো সেদিনের কথা, বড়জোর ১৫/১৬ বছর আগে হবে হয় তো, আজও স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি শৈশবের সেসব কথা মনে করে। আহ! কী এক সময় ছিলো আমাদের। সকালে ভাত খেয়ে স্কুলের পথে হাঁটা ধরতাম। স্কুলে সবাই মিলে পাতা কুড়াতাম, তারপর অ্যাসেম্বিলিতে দাঁড়িয়ে শরীরচর্চা, জাতীয় সংগীত এবং শপথবাক্য পাঠ করতাম। মাঝেমধ্যে সমবেত কন্ঠে আমাদের সহপাঠীরা গাইতো, “ধন ধান্য পুষ্প ভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা” অথবা অন্য কোনো দেশাত্মবোধক গান। স্কুলে যত সময় থাকতাম, ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে গোল্লাছুট অথবা বরফ-পানি( গা ছুঁয়ে বরফ বললে নড়াচড়া করা বন্ধ) খেলতাম। দুপুরে খাওয়ার জন্য বাটিতে ভাত তরকারি নিয়ে যেতাম, টিফিন টাইমে সবাই একসাথে বেঞ্চে বসে খেতাম। কেউ কেউ বাড়িতে চলে যেতো খাওয়ার জন্য। স্কুল থেকে ফিরে বইপত্র রেখে ছুটতাম খেলার মাঠে। সন্ধ্যা পর্যন্ত খেলাধূলা করে হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বসতাম। লোডশেডিং বেশি হতো বলে বেশিরভাগ সময় কুপির আলোয় পড়তে হতো। মাঝেমধ্যে লোডশেডিংয়ের সময় বাইরে এসে চাঁদের আলোয় খেলা করতাম, কখনো বউছি, কখনো কানামাছি।
আমাদের সময়ে এক ধরনের প্লাস্টিকের মোবাইল পাওয়া যেতো, বোতাম চাপলেই আওয়াজ বের হতো। সেই মোবাইল নিয়ে বন্ধুদের বাজনা শোনাতাম। কাদামাটি দিয়ে খেলনা তৈরি করতাম। বৃষ্টি হলে দলবেঁধে ভিজতাম। ক্যানেলের পানিতে কলা গাছের ভেলা বানিয়ে সকলে মিলে খেলা করতাম। শৈশব পেরিয়ে যখন কৈশরে আসলাম, প্রতিদিন বিকেলে ক্রিকেট, ফুটবল খেলতাম। ফেসবুক, টিকটক, ইনস্ট্রাগ্রাম ছাড়া কী সুন্দর এক সোনালি সময় ছিলো আমাদের। যদিও ফেসবুক নামক জিনিসটার সাথে পরিচয় হয়েছিলো পরে, কিন্তু এতে আসক্ত ছিলাম না। আরেকটা জিনিস কখনো করতে ভুলিনি, তা হলো বড়দের সম্মান দেওয়া।
বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের বড় একটা অংশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আসক্তির কারণে। তথ্য-প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং অভিভাবকদের অসচেতনতা এর প্রধান কারণ বলে প্রতীয়মাণ হয়। আজকাল তেমন কেউ মাঠে যাওয়ার প্রয়োজনবোধ করে না। হাতে একটা স্মার্টফোন এবং তাতে ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিচ্ছে নির্দ্বিধায়! ফেসবুক, টিকটকই যেন এদের ধ্যান-জ্ঞান। পড়াশোনার ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন দেখা যায় বেশিরভাগ ছেলেমেয়েদের। কিশোর গ্যাং, এলাকা কেন্দ্রিক প্রভাব বিস্তারেও ব্যস্ত দেখা যায় অনেক তরুণদের। এখন কেউ ফড়িংয়ের পিছে ছোটে না, কেউ বড়শি দিয়ে পুঁটিমাছ ধরে আনন্দ পায় না, কেউ কাগজের নৌকা বানিয়ে পানিতে ভাসায় না। রাত জেগে জেগে রঙিন এক দুনিয়ায় ব্যস্ত থাকে অধিকাংশ তরুণ প্রজন্ম!
গত মে মাসের ১৫ তারিখ কুমিল্লার দাউদকান্দিতে আইফোন কিনে না দেওয়ায় মোঃ মৃদুল নামে এক কিশোর আত্মহত্যা করেছে( সূত্র: কালবেলা)। কত ঠুনকো একটা জীবন, একটা আইফোনের থেকে জীবনের মূল্য কম! সামান্য কারণেও ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।
২০০৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সারাবিশ্বে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩০০ কোটি ছাড়িয়েছ। বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটির উপরে(বিটিআরসির তথ্যমতে), যার অধিকাংশই অল্পবয়সী। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির কল্যাণে আমাদের জীবন অনেক সহজ হয়েছে। দূর-দূরান্তে মুহূর্তের মধ্যেই একজন আরেকজনের সাথে যোগাযোগ করতে পারছি। অফিসের কাজও করা যাচ্ছে ঘরে বসে। উদ্ভাবন হচ্ছে আধুনিক সব যন্ত্রপাতি যা আমাদের কাজকে সহজ করে দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার না করে বরং অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করছে। ফলে, তারা যেমন একদিকে নিজেদের ক্ষতি করছে, তেমনি ভবিষ্যতে দেশের হাল ধরার মতো জনশক্তি তৈরি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশ্বাস করি, এখনো সময় ফুরিয়ে যায়নি। তরুণ প্রজন্মকে সম্পর্ক গড়তে হবে প্রকৃতির সাথে। অজানাকে জানার আগ্রহ থাকতে হবে। নতুন নতুন উদ্ভাবনের নেশা থাকতে হবে। তবেই তো গড়ে উঠবে স্বপ্নের “সোনার বাংলা।” অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের খেয়াল রাখা, কী করছে, কার সাথে মিশছে সেদিকে নজর রাখা। সন্তান ভুল করলে তাকে বুঝিয়ে ঠিক পথে ফেরত আনা। বিশেষ করে সন্তানের মানসিক যত্ন নেওয়া অভিভাবকের প্রধান কর্তব্য। বর্তমান তরুণ প্রজন্মের শৈশব-কৈশোর আমাদের মতো প্রকৃতির সাথে বেড়ে না উঠলেও, অন্তত ইট-পাথরের চাকচিক্যে নষ্ট যেন না হয়।
লেখক: প্রভাষক, সরকারি বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ হামিদুর রহমান ডিগ্রি কলেজ।


