ডা.মো.শিহানুল ইসলাম: চলমান ৪৮তম বিশেষ বিসিএস (স্বাস্থ্য) নিয়োগ ফলাফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি দেখা দিয়েছে। চিকিৎসক সংকটে ভেঙে পড়া দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য এই বিসিএসকে তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে দেখা হলেও ফলাফলের ন্যায্যতা নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন উঠছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বর্তমানে সারা দেশে প্রায় ১২ হাজার ৯৮০ টি চিকিৎসকের পদ শূন্য। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে শুরু করে জেলা ও বিভাগীয় হাসপাতালগুলো জনবল সংকটে কার্যত অচল। এই অবস্থায় বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে তিন হাজার চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নেয় সরকার। কিন্তু চূড়ান্ত মনোনয়ন ফলাফলে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক প্রার্থী।
ফলাফলে দেখা যায়, বিএমডিসির মূল সনদ যারা ভাইভা বোর্ডে দাখিল করতে পেরেছেন, তাদের মধ্যে ২ হাজার ৬১৮ জন সহকারী সার্জন ও ২৭৪ জন সহকারী ডেন্টাল সার্জন সাময়িকভাবে মনোনীত হয়েছেন। অন্যদিকে, যারা ইন্টার্নশিপরত কিংবা ‘এপিয়ার্ড’ প্রার্থী ছিলেন এবং বিএমডিসি সনদ জমা দিতে পারেননি, তাদের ২২৭ জনের ফলাফল আলাদাভাবে উল্লেখ করে মনোনয়ন আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।
কিন্তু এখানেই শুরু হয়েছে বিতর্ক। জানা গেছে, ২০১৮-১৯ সেশনের একজন এপিয়ার্ড প্রার্থী (রেজিস্ট্রেশন নম্বর 48109332) সনদ দাখিল করতে না পারলেও তাকে স্থগিত তালিকায় না রেখে মূল মেধাক্রমের তালিকায় সাময়িকভাবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের অসঙ্গতি আরও বহু প্রার্থীর ক্ষেত্রে ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
একজন অংশগ্রহণকারী চিকিৎসক বলেন, “আমরা সবাই সমানভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম, নিয়ম মেনে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছি। অথচ মৌখিক পরীক্ষায় এপিয়ার্ড বা ইন্টার্ন যেকোনো উত্তীর্ণ প্রার্থীর ফলাফল যেখানে রেজাল্টশিটের স্থগিত তালিকায় থাকার কথা সেখানে তার ফলাফল মেধাক্রমের ভিত্তিতে সাজানো সাময়িক মনোনয়ন তালিকায় থাকলে সেই ফলাফলে কীভাবে মেধাক্রম রক্ষিত হয়—বিসিএসের মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মনোনয়ন ফলাফলে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি যা একটি প্রশ্নবিদ্ধ ত্রুটি হিসাবে বিবেচনা করা যায়।” অনেকের মতে, এই ধরনের অসঙ্গতি শুধু যোগ্য প্রার্থীদের প্রতি অবিচারই নয়, বরং জনমনে সন্দেহেরও উদ্রেককারী।
চিকিৎসক সংকটের কারণে প্রান্তিক পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে এখন স্বাস্থ্যসেবার অবস্থা করুণ আকার ধারণ করেছে । অনেক জায়গায় ভবন আছে, ওয়ার্ড আছে, কিন্তু ডাক্তার নেই। অসুস্থ মানুষেরা চিকিৎসা না পেয়ে নিকটস্থ শহরে ছুটে যান, যা অনেক সময় জীবনহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায় সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরুর অভাবে। অথচ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হাজারো এমবিবিএস ডাক্তার চাকরির অপেক্ষায় আছেন।চিকিৎসক সংকট মোকাবেলার জন্য সরকার সম্প্রতি স্পেশাল বিসিএসের আয়োজন করেছে এবং সম্প্রতি ৩১২০ জনের সাময়িকভাবে মনোনয়নের তালিকা প্রকাশ করেছে।অথচ এই বিসিএসে অংশগ্রহণকারী মনোনয়ন প্রত্যাশী চিকিৎসকদের স্মারকলিপি থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে অচিরেই সেখানে আবারও শূণ্যতা তৈরি হবে।
কারণ একই সাথে ৪ টি বিসিএস চলমান থাকায় কেউ কেউ একাধিক বিসিএসে নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন।৪৪,৪৫ এবং ৪৬ তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের একটি বড় অংশ ৪৮ তম বিসিএসে মনোনীত হয়েছেন।অন্যদিকে ৪৭ তম বিসিএস এর কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।স্বাভাবিকভাবেই ভবিষ্যতে ৪৫, ৪৬, ৪৭ এর (সর্বমোট ৩৪৯৩টি পদ) চূড়ান্ত ফলাফল ও গেজেট প্রকাশিত হলে সেই সিংহভাগ প্রার্থী যারা ৪৮ এ নিয়োগ পাবেন তারা পদন্নোতি, সিনিয়রিটি সহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধার কারণে পূর্ববর্তী বিসিএসগুলোতে যোগদান করবেন। এতে করে ৪৮ তম স্পেশাল বিসিএসের পদগুলো পুণরায় ফাঁকা হয়ে যাবে এবং চিকিৎসক সংকট নিরসন হবে না— যা জনপ্রশাসন, পিএসসি এবং রাষ্ট্রের সময়, অর্থ ও শ্রমের অপূরণীয় ক্ষতি।একই সাথে বর্তমানে চিকিৎসক সংকট মোকাবিলায় আয়োজিত বিশেষ বিসিএসের উদ্দেশ্য ব্যহত হবে
এবং চিকিৎসক সংকট থেকেই যাবে।
৪৮ তম বিশেষ বিসিএসের(স্বাস্থ্য) মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহনকারী একজন তরুণ চিকিৎসক আক্ষেপ করে বলেন,”পূর্ববর্তী বিসিএসগুলোর মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হলেও দুঃখজনকভাবে ৪৮ তম বিশেষ বিসিএসের ক্ষেত্রে মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।৪৮ তম বিশেষ বিসিএসের নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং চূড়ান্ত গেজেট হবার আগেই সংবাদ মাধ্যমে মাননীয় স্বাস্থ্য উপদেষ্টা মহোদয়ের দেয়া তথ্য মতে আরও ৩০০০ শূণ্যপদে চিকিৎসক নিয়োগের জন্য চাহিদাপত্র স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে স্বাক্ষরিত হয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।যেহেতু, ৪৮ তম বিশেষ বিসিএসের বিজ্ঞপ্তির বিশেষ নির্দেশনায় বলা আছে নতুন পদ সৃষ্টি, পদ বিলুপ্তি, পদোন্নতি, অবসরগ্রহণ, মৃত্যু, পদত্যাগ অথবা অপসারণ ইত্যাদি কারণে বিজ্ঞাপিত শূন্য পদের সংখ্যা পরিবর্তন হতে পারে,তাই আমাদের দাবি, অবিলম্বে ৪৮ তম বিশেষ বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হোক এবং মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মেধাক্রমের ভিত্তিতে শূণ্যপদে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করে চিকিৎসক সংকট কিছুটা হলেও লাঘব করা হোক।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্বাস্থ্য খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য দ্রুত ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া অপরিহার্য। একই সঙ্গে ‘রিপিট ক্যাডার’ সমস্যা সমাধান এবং শূন্যপদ পূরণে চিকিৎসকদের জন্য চলমান ৪৮ তম বিশেষ বিসিএসে পদ বাড়ানোও জরুরি। তা না হলে বিশেষ বিসিএসের মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যাবে।
ফলাফলের এই প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থা নিয়ে চিকিৎসক সমাজ ইতোমধ্যেই সোচ্চার হয়েছেন। তাদের দাবি, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে দ্রুত সংশোধিত ফলাফল প্রকাশ করতে হবে। কারণ এখানে শুধু প্রার্থীদের ভবিষ্যৎ নয়, কোটি কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অধিকারও জড়িত। যদি এখনই সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে এর খেসারত দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই।
লেখক: বাংলাদেশের একজন সচেতন নাগরিক ও চিকিৎসক
সংবাদ লাইভ/মতামত


