খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) ছাত্রীদের হল বিজয় ’২৪ হল সংক্রান্ত সমালোচনা এবং জরুরি সেবা ঘাটতির বিষয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া ও প্রশাসনের অনুমতি ব্যতীত অপর এক হলের অসুস্থ ছাত্রীকে নিয়ে আসার অভিযোগে দুই ছাত্রীকে পৃথক কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে হল প্রশাসন।
নোটিশে তাদের কর্মকাণ্ডকে “হলের প্রচলিত আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও নাশকতামূলক” বলা হয়েছে।
কারণ দর্শানোর নোটিশ পাওয়া দুই শিক্ষার্থী হলেন পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের তৃতীয় বর্ষের রেজুয়ানা খন্দকার এবং তাসনিম বুশরা। নোটিশে তাদের সিট বাতিলের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়। বিভিন্ন মাধ্যমে ভুক্তভুগীদের সাথে যোগাযোগ করা হলেও বিষয়টি নিয়ে তারা কথা বলতে রাজি হয়নি। ভুক্তভুগীদের সহপাঠী ও ওই হলের আরও ছাত্রীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা অনেক ভয় পেয়েছে যার ফলে এ সম্পর্কিত বিষয় কারো সাথে কথা বলতে রাজি হয়নি।
জানা গেছে, গত ৩১ অক্টোবর রাতে অপরাজিতা হলের শিক্ষার্থী নন্দিনী মণ্ডল অনুমতি ছাড়া রাত ৯টা ৫০ মিনিটে বিজয় ’২৪ হলে প্রবেশ করেন। হলের করিডোরে অসুস্থ হয়ে পড়লে বিজয় হলের প্রায় সাত-আটজন ছাত্রী তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যান। এ সময় নিচে স্ট্রেচারের প্রয়োজন পড়লেও তা পাওয়া যায়নি বলে শিক্ষার্থীরা জানান। চিকিৎসা শেষে ওই ছাত্রীকে বিজয় হলেই রেজুয়ানাদের রুমে রাখা হয়।
এ ঘটনার পর রাতে তাসনিম বুশরা একটি ফেসবুক গ্রুপে হল প্রশাসনের সমালোচনা করে লিখেন, “একটি হলে যেখানে ট্রেডমিল, সবজি বাগান, ইয়োগা রুম ইত্যাদি দিয়ে বাহবা দেয়া প্রদান করা হয়, সেখানে অসুস্থ ছাত্রীকে বহন করার মতো স্ট্রেচার পর্যন্ত নেই; ব্লাড প্রেশার মাপার ব্যবস্থাও নেই।”
তবে বিজয় ২৪ হলের হলের অন্তত পাঁচজন ছাত্রী জানিয়েছেন ২ নভেম্বর তাসনিমের পোস্টকে কেন্দ্র করে পোস্টদাতা ও মন্তব্যকারীদের সবাইকে প্রভোস্ট অফিসে ডেকে মোবাইল বাইরে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ সময় সিট বাতিলসহ বিভিন্ন হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। ভয়ে ভুক্তভুগী ছাত্রীরা বিষয়টি প্রকাশ করেন নি।
এরপর ৪ নভেম্বর রেজুয়ানা খন্দকার ও তাসনিম বুশরাকে পৃথক দুটি শোকজ নোটিশ প্রদান করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নন্দিনী মণ্ডলকে মিথ্যা পরিচয়ে হলে প্রবেশ করানো, প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া হলে নিয়ে আসা এবং পরে অনলাইনে উসকানিমূলক মন্তব্য করা। অন্যদিকে তাসনিম বুশরার বিরুদ্ধে অভিযোগ হলের সেবা ঘাটতি ও স্ট্রেচার-সংক্রান্ত সমালোচনামূলক পোস্ট দিয়ে প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা। নোটিশে তাদের কর্মকাণ্ডকে “হল আইন পরিপন্থী এবং নাশকতামূলক” বলে উল্লেখ করা হয়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত ২২ ব্যাচের এক ছাত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন অসুস্থ ছাত্রীটির নিজের হলের রুমমেটদের সঙ্গে একটু সমস্যা ছিল, তাই বাধ্য হয়ে আমাদের হলে আসে।
তিনি বলেন, ম্যাডামকে আগে বলা হয়নি এটাই মূল ক্ষোভের কারণ। কিন্তু প্রয়োজনীয় সেবার ঘাটতির কথা বলা শৃঙ্খলাভঙ্গ বা নাশকতা হতে পারে না। শৃঙ্খলা বিধির বাড়তি ক্ষমতাই এমন সিদ্ধান্তের পথ খুলে দিয়েছে।
৫ নভেম্বর রেজুয়ানা খন্দকারের শোকজ নোটিশের লিখিত জবাবকে ‘অসন্তোষজনক’ উল্লেখ করে ৯ নভেম্বর তাকে তদন্ত কমিটির সামনে আত্মপক্ষ সমর্থনের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এদিকে গতকাল দুপুরে (১৫ নভেম্বর) তাসনিম বুশরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অনুশোচনামূলক বিবৃতি প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি নিজের পূর্বের সমালোচনামূলক পোস্টকে “ভিত্তিহীন” উল্লেখ করে হল প্রভোস্ট ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। জানা যায়, বিষয়টি নিয়ে হল প্রভোস্ট তাকে ক্ষমা চেয়ে একটি পোস্ট দিতে এবং সেই পোস্টের স্ক্রিনশট প্রশাসনের কাছে জমা দিতে বলেছিলেন।
সংবাদ লাইভের প্রতিনিধি বিজয় ২৪ হলের হলের অন্তত ১০ শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছেন।তাদের ভাষ্য হল সংক্রান্ত সমালোচনা বহুদিন ধরেই দমন করা হচ্ছে। এর আগেও গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিনের এক ছাত্রীর হলের আইডিকার্ড নিয়ে পোস্ট দেওয়ায় ওই ডিসিপ্লিনের সকল ছাত্রীকে ডেকে সিটবাতিল সহ নান হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এবং ওই ছাত্রীর থেকে এমন কাজ আর করবে না মর্মে লিখিত নিয়েছিল।
এই বিষয়ে বিজয় ’২৪ হলের প্রভোস্ট প্রফেসর ড. সাঈদা রেহানা আজ বিকেলে কালের কণ্ঠ-এর সঙ্গে কথা বলেন। তিনি সমালোচনা করলে সিট বাতিলের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
প্রভোস্ট বলেন, তারা যে পরিস্থিতি তৈরি করেছে, সে ধরনের কাজকে নাশকতা বলা হয়েছে, কারণ শৃঙ্খলা বিধিতে এভাবেই সংজ্ঞায়িত আছে। হলের প্রবেশ সময় রাত ৯টা, কিন্তু তারা ৯টা ৩০ মিনিটে অসুস্থতা অনুভব করে বাইরে যেতে চেয়েছে চা খেতে। অন্য হলের ছাত্রীও এই হলের পরিচয় লিখে প্রবেশ করেছে, অসুস্থ হওয়ার পরে তাকে মেডিকেল সেন্টারে নিবে তা না করে রুমের মধ্যে নিয়ে গেছে।
ফেসবুকে করা সমালোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারা গঠনমূলক সমালোচনা না করে আক্রোশের জায়গা থেকে সমালোচনা করেছে। আমি হলে প্রতিটি শিক্ষার্থীর ভালো চাই বলেই সবসময় তাদের দাবির প্রতি সাড়া দিই। কথায় কথায় সিট বাতিলের হুমকি আমি দিই না।
মোবাইল জমা দিতে বলা হয়েছিল কেন—এ বিষয়ে তিনি বলেন, অনেকে মিটিং চলাকালে মোবাইল ব্যবহার করে, সেজন্যই টেবিলে রাখতে বলা হয়েছিল, বাহিরে রেখে যেতে বলা হয়নি।
তিনি আরও জানান, ওই ছাত্রীকে পুনরায় ক্ষমা চেয়ে পোস্ট দিতে বলা হয়েছিল, তবে এত বিস্তারিত লিখতে বলা হয়নি। সামান্য কয়েকটি বাক্য লিখলেই যথেষ্ট হতো,” মন্তব্য করেন প্রভোস্ট।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালক প্রফেসর ড. নাজমুস সাদাত জানান, এ বিষয়টি নাশকতা মূলক হয়েছে বা শৃঙ্খলা বিধিতে এটাকে নাশকতামূলক বলা হয়েছে কিনা তা আমার কাছে মনে হয়না। ফেসবুকে একজন পোস্ট দিতেই পারে এর সমাধান হলো ভুলবশত এমন করলে তাকে হল কর্তৃপক্ষ ডেকে প্রোপার কাউন্সিলিং করতে পারেন তবে তারপরও যদি সমাধান না হয় তখন এটার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।


