রায়হান রাহেল: বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনই নতুন বাস্তবতা ও নতুন সমীকরণ তৈরি করে। তবে আগামীর ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, তা হলো ভোটের মাঠে সরাসরি প্রচারণা শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমানের উপস্থিতি এবং এর ফলে সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে দৃশ্যমান পরিবর্তন। বিশেষ করে দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা বিপুল সংখ্যক নিরপেক্ষ ভোটারের মনোভাব বদলের ইঙ্গিত এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত বাস্তবতা।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় অংশের মানুষ কোনো নির্দিষ্ট দল বা মতাদর্শের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখেননি। এই ‘নিরপেক্ষ’ বা ‘অনির্ধারিত’ ভোটাররাই প্রায়শই সরকার গঠনের ক্ষেত্রে নির্ধারক ভূমিকা পালন করে থাকেন। আগামীর নির্বাচনে এই শ্রেণির ভোটারদের আস্থা অর্জন করাই বড় রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় ভোটব্যাংক ধরে রাখার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনই হবে দূরদর্শী রাজনীতির প্রকৃত পরীক্ষা।
এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি তুলনামূলকভাবে এগিয়ে রয়েছে বলেই মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক। এর প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসছে তারেক রহমানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ভূমিকা ও ব্যক্তিগত ইমেজ। দেশে প্রত্যাবর্তনের পর থেকেই তিনি অতিরঞ্জিত বক্তব্য ও সংঘাতমুখী রাজনীতি পরিহার করে একটি সংযত, বাস্তববাদী ও পরিবর্তনের বার্তাবাহী রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরছেন। ঐতিহাসিক সংবর্ধনার মধ্য দিয়ে দেশে ফেরার পর তার প্রতিটি রাজনৈতিক কার্যক্রমে পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যেখানে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো অধিকাংশ সময় বিএনপির সমালোচনায় ব্যস্ত, সেখানে তারেক রহমান নিজেকে উপস্থাপন করছেন কর্মসূচি, সংলাপ ও মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগের মাধ্যমে। তার বক্তব্যে যেমন ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার ইঙ্গিত রয়েছে, তেমনি রয়েছে সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা বোঝার চেষ্টা। এই ভিন্নধর্মী কৌশলই জনমনে নতুন আস্থা তৈরি করছে বলে রাজনৈতিক মহলের অভিমত।
আন্তর্জাতিক পরিসরেও তারেক রহমানের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। দেশে ফেরার পর বিভিন্ন বিদেশি দেশের প্রতিনিধিদের তার সঙ্গে আলোচনার আগ্রহ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে দেশের ভেতরেও তিনি নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করছেন। কখনো রিকশাচালকদের সঙ্গে মতবিনিময়, কখনো কাকরাইল বস্তিতে গিয়ে সাধারণ মানুষের কথা শোনা, কখনো সামাজিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ—এসব কর্মকাণ্ড তার রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও মানবিক ও গ্রহণযোগ্য করে তুলছে।
এছাড়াও দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বার্তা দিচ্ছেন তিনি। বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন। এমনকি কিছুদিন আগে আন্দোলনে থাকা কারিগরি ও শিক্ষক সমাজের সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলার ঘটনাও রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। সর্বশেষ দেখা গেছে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সাথে দেশ গড়ার পরিকল্পনা নিয়ে মুখোমুখি হয়েছে শিক্ষার্থীদের সাথে। দেশের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার এই প্রচেষ্টা তারেক রহমানের রাজনৈতিক অবস্থানকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও দৃঢ় করেছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এরই ধারাবাহিকতায় সারাদেশব্যাপী নির্বাচনী সমাবেশে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ভোটের মাঠে নতুন গতি সঞ্চার করেছেন তারেক রহমান।গত ২২ জানুয়ারি সিলেটে দলের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বিএনপির দেশব্যাপী প্রচার কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সমাবেশের মাধ্যমেই রাজধানীর বাইরে থাকা মানুষের মধ্যে নতুন ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে। তারেক রহমান যেখানেই যাচ্ছেন, সেখানেই জনসমাগম ও আগ্রহ বাড়ছে যা তার জনপ্রিয়তার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতারই ইঙ্গিত।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এতদিন যারা কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি দৃঢ় অবস্থান নেননি, সেই সাধারণ মানুষদের সিদ্ধান্ত এখন ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। মাঠপর্যায়ের আলোচনায় উঠে আসছে তারেক রহমানের সরাসরি প্রচারণা ও মানুষের সঙ্গে সংযোগ নিরপেক্ষ ভোটারদের একটি বড় অংশকে বিএনপির দিকে আকৃষ্ট করছে। এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে প্রচারণার শুরুর দিন থেকেই।
এবারের নির্বাচনে বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে ধরা হচ্ছিল কিছু এলাকায় বিদ্রোহী প্রার্থীর সম্ভাবনা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা ধারণা করছিলেন, এই বিদ্রোহই বিএনপির জন্য বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়াবে। তবে পরিস্থিতি ক্রমেই বদলাচ্ছে। তারেক রহমান সারাদেশে নির্বাচনী প্রচারণার পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করছেন। দেশ গঠনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি দলীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এর ফলশ্রুতিতে রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন উঠেছে হাতে গোনা কিছু আসন ছাড়া প্রায় সব এলাকাতেই বিদ্রোহী প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন। এতে করে বিএনপির একক প্রার্থীর পক্ষে জনসমর্থন আরও সুসংহত হবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। এই ঐক্যই ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তারেক রহমানের সিলেট বিভাগ দিয়ে শুরু হয়ে চট্টগ্রাম হয়ে উত্তরবঙ্গ অভিমুখে প্রচারণা চালানোর মধ্য দিয়ে সারাদেশেই এক ধরনের রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছাচ্ছে। এই ধারাবাহিক প্রচারণা ভোটারদের মধ্যে দীর্ঘদিনের সিদ্ধান্তহীনতার অবসান ঘটাতে পারে। বিশেষ করে নিরপেক্ষ ভোটারদের ক্ষেত্রে ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে সমর্থন গড়ে ওঠার সম্ভাবনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ভোটের মাঠে তারেক রহমানের সক্রিয় উপস্থিতি শুধু বিএনপির প্রচারণায় গতি আনেনি, বরং দেশের রাজনীতিতে নতুন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিয়েছে। আগামীর ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে নিরপেক্ষ ভোটারদের মন জয়ের লড়াইয়ে মাঠের রাজনীতি এবং মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগই হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় নির্ধারক।
লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক, ডুয়েট ছাত্রদল।


