ads
ঢাকামঙ্গলবার , ২৯ অক্টোবর ২০২৪
  1. কৃষি ও পরিবেশ
  2. খেলা
  3. জাতীয়
  4. ধর্ম
  5. বিনোদন
  6. বিশ্ব
  7. ভ্রমণ
  8. মতামত
  9. রাজনীতি
  10. শিক্ষাঙ্গন
  11. সাক্ষাৎকার
  12. সারাদেশ
  13. সাহিত্য
আজকের সর্বশেষ খবর

জলে ভাসা পদ্ম আমি : এম. এ. মোমেন

সাহিত্য বিভাগ
অক্টোবর ২৯, ২০২৪ ১১:৫৭ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

এম. এ. মোমেন: আমার জীবনের ঘটে যাওয়া বা চলমান কিছু ঘটনা থেকে সঞ্চিত অনাপ্রেত অভিজ্ঞতা পাঠকদের শেয়ার করার ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র। আমার নাম ময়না (রূপক নাম) হলেও আদর করে সকলে আমাকে ময়না পাখি বলে ডাকতেন। আমাদের পরিবারে আমার পর্যায়ক্রমে বলার কারণ হলো আমাদের সকল ভাই-বোন একসাথে অল্প সময়ের জন্য হলেও একসাথে জীবিত ছিলাম না। আমাদের পরিবারে পর পর ৫ বোন আর ৫ ভাই মিলে মোট ১০ জন জন্ম গ্রহণ করি। অর্থাৎ স্বল্প সময়ের জন্য হলেও ১০ ভাই-বোন ছিলাম সমানে সমান। আমরা সকলে দীর্ঘ দিনের হায়আত পাননি বা দীর্ঘদিন বেঁচে থাকেনি। ১০ ভাই বোনের মাঝে আমি ছিলাম দ্বিতীয়।

আমার জন্মের পূর্বে আরও এক বোনের জন্ম হয়েছিল কিন্তু প্রাপ্ত বয়স্কা হওয়ার পূর্বেই সে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে আমাদের কাঁদিয়ে না-ফেরার দেশে পারি জমায়। বলে রাখা ভাল আমাদের পরিবার তখনকার সময়ে সামাজিক বা আর্থিক যেভাবেই বিবেচনা করেন না কেনো মধ্যবিত্ত্ব পরিবার ছিল। আমার পূর্বে জন্ম নেয়া বড় বোন মারা যাওয়ার পূর্বে একে অন্যের ভাল বন্ধু বা খেলার সাথী ছিলাম। আমরা দু’জনই মেয়ে সন্তান হিসেবে মা-বাবার ভালোবাসাও সমানভাবে পেতাম। মা-বাবার নয়নের মনি হিসেবে আদর ভালোবাসায় কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর হঠাৎ করে আমার বড় বোন খেলার সাথী কি যেন অজানা ব্যধিতে আক্রান্ত হয়ে আমাকে একা রেখে অকালে প্রাণ হারায়। তার মৃত্যুজনিত কারণে আমি একা হয়ে পরি এবং বোন হারানোর ব্যথায় আমি প্রায় চুপ হয়ে যাই।

সেসময় আমি পরিবারে একমাত্র সন্তান হিসেবে আমাদের মা-বাবা আমাকে আকরে ধরে বড় মেয়ের বিয়োগ ব্যথা ভুলতে চেষ্টা করে যার ফলশ্রুতিতে পরিবারে আমার আদর ভালোবাসার মাত্রাটা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং একমাত্র সন্তান হিসেবে আমি মা-বাবার ভালোবাসার একক অধিকারি ছিলাম। তাছাড়া আমাদের আশে-পাশের সকলের ভালোবাসায় বোনের বিয়োগ ব্যথা অল্প দিনের মধ্যেই ভুলে যাই। বেশ কিছু দিন মা-বাবার সাম্রাজ্যে একমাত্র আমিই সম্রাগী ছিলাম। তা বেশি দিন বিস্তৃতি লাভ করেনি ৪/৫ বছরের ব্যবধানে আমাদের পরিবারে ১ বোন আর ২ ভাইয়ের আগমন ঘটে এবং আমরা ৪ ভাই বোন মিলে-মিশে আনন্দের সাথে জীবন যাপন করিতে থাকি।

বলে রাখা ভালো ইতোমধ্যে পরিবারের ব্যয় মিটানোর জন্য আমাদের বাবা নিম্ন বেতনভূক্ত একজন কর্মচারী হিসেবে সরকারি চাকুরিতে যোগদান করেছেন। উনার কর্মস্থল হিল এরিয়া বা পার্বত্য চট্টগ্রামের আওতাভুক্ত হওয়ার কারণে, তিনি বিভিন্ন পাহাড়ী এলাকায় কর্মরত থাকার কারণে মাকে নিয়ে আমরা সকলে নিজ গ্রামের বাড়ীতে বসবাস করতাম। কয়েক বছরের ব্যবধানে আমাদের ছোট দুই ভাই পর পর কয়েক দিনের ব্যবধানে মৃত্যুবরণ করার কারণে আমাদের পরিবারে আমরা মাত্র দু’বোন থাকি। এই দিকে বাবা-মা পুত্র শোকে পাগল হয়ে যাওয়ার উপক্রম। এরই মধ্যে আমাদের আর একজন বোনের জন্ম হয়। অর্থাৎ এই বোনের জন্মের পর পরিবারে আমরা মাত্র তিন বোন কিন্তু কোন ভাই নাই। ভাই না থাকার কারণে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় আমাদের প্রতি মা-বাবার আদর ভালোবাসায় কিছুটা কমতি দেখা দেয়।

আমাদের পরিবারে ছেলে সন্তান না থাকার কারণে মা-বাবার মধ্যে পারিবারিক অশান্তি শুরু হয়ে যায়। এক দিকে মা পুত্র সন্তান লাভের আশায় বিভিন্ন হুজুর, কবিরাজ বৈদ্যের স্মরণাপন্য হয়ে থাকে আর অন্যদিকে আমাদের কাকা-কাকি এবং আশে-পাশের লোকজন বাবা-কে কুমন্ত্রণা বা প্রস্তাব দেয়াসহ তাদের স্বার্থ হাসিলের অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। তাদের হাসিলের মানষে সুপরিকল্পিতভাবে আমাদের এক বিধবা কাকির সাথে জড়িয়ে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে আমাদের অর্থ-সম্পদ লুটে নেয়ার ফলে আমাদের পরিবার আর্থিক সংকটে পতিত হয়।

অন্য বোনেরা ছোট ছিল বিধায় তারা বিষয়টি বুঝতে না পারলেও আমি বুঝতে পারতাম কিন্তু তখন আমার তেমন কিছুই করার উপায় ছিল না। সেই সময় থেকেই আমাদের পরিবারে চরম দু:খের সময় শুরু হয়। পরিবারের দারিদ্রতা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আমরা তিন বোন লেখা-পড়া ছেড়ে দিয়ে সাধ্যমত ন্যায় পথে থেকে অর্থ উপার্জনের কাজে লেগে পরি। বাবার পাঠানো টাকা আর আমাদের সামান্যতম উপার্জন দ্বারা কোন প্রকারে দুই বেলা দু’মোটো ভাত খেয়ে কোনো প্রকারে আমাদের সংসার চলতে থাকে। বাবা মাঝে মাঝে সামান্য টাকা পাঠালেও মনের দুঃখে পরিবারের তেমন খবর রাখেন না।

পরিবারে আমি বড় মেয়ে হিসেবে পূর্বে যে আমার প্রতি বাবার টান ছিল তাতেও ভাটা পরে যায়। তার বছর খানেক পর মহান আল্লাহ্ র অশেষ কৃপায় আমাদের পরিবারে সুখের বার্তা নিয়ে আসে আমাদের আদরের এক ভাই। ইতোমধ্যে অনেক জল গড়িয়ে গেছে, কাকা/কাকীদের কুমন্ত্রণায় বাবা মায়ের মধ্যে দূরত্বতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং উভয়ের মনে বিশ্বাস এর ঘাটতি দেখা দেয়। ভাই জন্মের পর পরিবারে পুত্র সন্তানের অভাব দূর হলেও পর্যায়ক্রমে আর্থিক সংকট তিব্রতর হয়ে উঠে। ক্রমান্বয়ে আমাদের পরিবারে বা আমাদের জীবনে নেমে আসে করুণ দুঃখের সময়। সেই সময় আমাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছিল মা-বাবা, তিন বোন ও ১ ভাইসহ মোট ৬ জন।

ইতোমধ্যে আমার বয়স হয়ে যায় ১৮/২০ বছর এবং আমার ইমিডিয়েট ছোট বোনের বয়স ছিল আমার চেয়ে ৪ বছর কম। আমি ভাই বোনদের মধ্যে বড় হওয়ায় আমার চেয়ে আনুমানিক ১০/১২ বছরের বড় হবে হয়তো আমাদেরই পাশের গ্রামের এক যুবকের সাথে পারিবারিকভাবে বিবাহ হয়ে যায়। বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরিণতিতে মূল থেকে ছিটকে পড়ে আমি হয়ে যাই জলে ভাসা পদ্ম (পদ্ম বলার কারণ হলো আমি ছিলাম মোটামোটি সুন্দরী)। তখন কার সময়ে আমাদের বা আমাদের গ্রামের চেয়ে ঐগ্রামটি সমাজে অসামাজিক গ্রাম হিসেবে নানান কারণে পরিচিত ছিল। আমার বিয়ের কিছুদিন পরই আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় ৮/১০ মাইল পূর্বের একগ্রামে বসবাসকারী আমাদের সম্মানীত ফুফাতো ভাইয়ের প্রচেষ্টায় তারই গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে আমার দ্বিতীয় বোনের বিয়ে হয় এবং তার স্বামী ঢাকায় শ্রীপুরের নিকটবর্তী এক কোম্পানীতে চাকুরি করত। শ্রীপুরে চাকুরি করার সুবাধে সে তার স্বামীর সাথে শ্রীপুরেই থাকতো।

তার বিয়ের পর প্রায় ৬ বছরের মধ্যে আমাদের পরিবারে আরও ১ বোন ও ২ ভাইয়ের জন্ম হওয়ার ফলে পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ জনে। এক দিকে  আমাদের পরিবারে সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে তার সাথে পাল্লা দিয়ে অভাবও বাড়তে থাকে। আমার স্বামী অসামাজিক গ্রামে জন্ম নেয়ায় সঙ্গত কারণে সামাজিক প্রভাবের ফলে তার আচার আচরণে সামাজিকতার বেশ ঘাটতি ছিল। আমি বিয়ের প্রথম দিকে বুঝতে না পারলেও বিয়ের পর হতে আমার এবং আমাদের পরিবারের সাথে করা অভদ্রতা, অশালীন ব্যবহার থেকে তার অসামাজিক আচরণ ক্রমান্বয়ে সামনে আসতে থাকে। আমাদের পরিবার আর্থিকভাবে গরীব হলেও তার কথা-বার্তা, আচার-আচরণ এমন আকার ধারণ করতে থাকে আমি বা আমার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও ক্রমান্বয়ে হজম করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

আমি আমাদের গ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান হওয়ায় পরিবারের দারিদ্রতা এবং সামাজিক মর্যাদার কথা চিন্তা করে এতো কিছুর পরও আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলাম সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য যার ফলশ্রুতিতে তার শত অত্যাচার সহ্য করেও হাসি মুখে সংসার করার চেষ্টা অব্যাহত রাখি। অত:পর আমাদের দু’জনার (স্বামী-স্ত্রী) ভালোবাসার ফসল হিসেবে আমার কুলে একটি পুত্র সন্তান মহান আল্লাহ্ দান করেন। একদিকে শ্বশুর বাড়ীর অত্যাচার অন্য দিকে বাপের বাড়ীতেও দিন দিন অভাব বাড়তেই থাকে। তাই আমি নানান অত্যাচার সহ্য করে শ্বশুর বাড়ীতে রয়ে গেলাম এই ভেবে যে, অত্যন্ত ছেলের মুখের দিকে চেয়ে আমার স্বামী আমাকে ভালোবাসবে এবং অত্যাচার থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করবে।

সন্তান জন্মের পরও কিছুদিন পরে বুঝতে পারলাম আমার আশায় গুঁড়ে বালি, মহান আল্লাহ্ যদি কাউকে ভালো করতে না চান তবে সে কখনও ভালো হয় না। যেমন কয়লা শতবার ধুলেও তার ময়লা যাবে না। আমাদের প্রথম সন্তান ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে অত্যাচারের মাত্রা কমার চেয়ে অনেক গুণ বেড়ে যায়, মনে হয় আমি সন্তান জন্ম দিয়ে বড় ধরণের অপরাধ করে ফেলেছি বা আমাকে ত্যাগ করার পথ বন্ধ করে ফেলেছি। একটি কথা বলে রাখা ভালো যখন মানুষের খুব প্রিয় কেউ তাকে অপছন্দ, অবহেলা কিংবা ঘৃণা করে তখন প্রথম প্রথম মানুষ খুব কষ্ট পায় এবং চায় যে সব ঠিক হয়ে যাক। কিছুদিন পর সে সেই প্রিয় ব্যক্তিকে ছাড়া থাকতে শিখে যায়। আর অনেকদিন পরে সে আগের চেয়েও অনেকবেশী খুশি থাকে যখন সে বুঝতে পারে যে কারো ভালবাসায় জীবনে অনেক কিছুই আসে যায় কিন্তু কারো অবহেলায় সত্যিই কিছু আসে যায় না।

অগত্যা কোনো উপায় না পেয়ে মূল্যহীন বা ঠিকানাহীনভাবে ভাসতে ভাসতে জলে ভাসা পদ্মের মত দারিদ্রতার কষাঘাতে জড়জরিত বাপের বাড়ীতে ফিরে আসলাম। একতো বাবার পরিবারে অভাব তার মধ্যে আমি আমার ছেলে-কে নিয়ে চলে আসলাম তাই পরিবারের অভাব দূর করার জন্য আমাদের দ্বিতীয় বোন শ্বশুর বাড়ীতে থাকায় জীবিত তৃতীয় বোন-কে নিয়ে অর্থ উপার্জনের মানসে তাঁতের সুতার তানা বানানোর কাজে করতে লেগে যাই।

স্বামীর সাথে ঢাকার অদূরে শ্রীপুরে বসবাসকারী আমাদের দ্বিতীয় বোন ইতোমধ্যে সন্তান সম্ভবা হওয়ায় তার মাতৃকালীন সময়ে সেবা দেয়ার জন্য আমাদের মা বয়স্ক হওয়ায় জলে ভাসা পদ্মের মত স্নেহের স্রোতে ভাসতে ভাসতে আমি আমার ছেলেকে নিয়ে তার বাসায় যাই। একটি কথা বলে রাখা ভালো কারো প্রয়োজনে যদি বাসার কাজের জন্য মেয়ে/বেটি রাখার প্রয়োজন হয় তবে কিন্তু ছোট বাচ্চার মাকে রাখতে চান না। আমার বেলায়ও তার ব্যতিক্রম ছিল না, প্রথম প্রথম কিছুদিন ভালোভাবে কাটলেও তা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। বিভিন্নভাবে আমার ছেলেকে নিয়ে কটু কথা শুনতে হয়েছে।

মরার উপরে খারার ঘা ইতোমধ্যে আমাদের নীতিবান পিতা তার বসের নির্দেশনা অনুযায়ী নিরীহ কলিগের বিরুদ্ধে মিথ্যা স্বাক্ষী না দেয়ার খেসারত হিসেবে তাকে (বাবাকে) চাকুরি থেকে শোকজ করার ফলে অফিস থেকে যে টাকা তিনি পাইতেন তাদ্বারা নিজের খাবার খরচ হতো না তাই তিনি আর বাড়ীতে কোন টাকা পাঠাতে পারতেন না। ছোট বোন আর মা এর যতসামান্য আয় দ্বারা সংসার চলছিল না। এই অবস্থায় কোনো উপায় না পেয়ে আমাদের অতি আদরের অষ্টম শ্রেণীতে পড়ুয়া ভাই প্রায় লেখা-পড়া ছেড়ে সংসারের অভাব ঘোচানোর জন্য লঞ্চে লঞ্চে বাদাম বিক্রির কাজে লেগে যায়। ছোট ছোট ভাই-বোনদের যতসামান্য আয় দিয়ে পরিবারের ব্যয় মিটাতে আমাদের মার খুব কষ্ট করতে হচ্ছে তাই শত মনকষ্ট বা অপমান সহ্য করেও বোনের প্রয়োজনের সময় তাকে ছেড়ে বিবেকের বাধায় চলে যেতে পারিনি।

অত:পর যথাসময়ে বোনের একটি কন্যা সন্তান জন্ম হয়। এদিকে আমার ছেলের বয়স প্রায় ৫ বছরে পরে যায়। বোনের কন্যা সন্তান হওয়ার পর তার পরিবারে আমার প্রয়োজন বেড়ে যাওয়ায় আচরণে কিছুটা পরিবর্তন চলে আসে। ক্রমান্বয়ে সন্তান বড় হচ্ছে এবং বোনের বাসায় আমার প্রয়োজনও কমতে শুরু করেছে। বোনের স্বামী সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে অত্যন্ত ভদ্র মানুষ এবং স্ত্রীর বড় বোন হিসেবে আমাকে যথাসাধ্য সম্মান করতেন তাতেও বোনের আপত্তি পরিলক্ষিত হলেও বাবার পরিবারের অভাবের সময় মা-ছেলের মুখে দু’বেলা দু’মোটো ভাত জুটতো বলে কোন প্রতিবাদ করতাম না। তাছাড়া বাবার পরিবারে ঠিকানাবিহীন ভাসমান পদ্ম হিসেবে কোন প্রকার প্রতিবাদ করার সাহস করতাম না পাছে মা-ছেলেকে তাড়িয়ে না দেয়। তাড়িয়ে দিলে মা-ছেলে খাবো কি! থাকবো কোথায়?

নিরুপায় হয়ে নানাহ অপমান সহ্য করে দিনাতিপাত করতে থাকি ইতোমধ্যে বোনের কন্যার বয়স প্রায় ১ বছর হতে চলেছে এবং তার পরিবারের আমার প্রয়োজনও প্রায় শূন্যের কোটায়। সন্তান বড় হওয়ার পাশাপাশি আমার প্রয়োজন প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং বোনের আচার আচারণ ক্রমান্বয়ে আমার সহ্যের সীমার শেষ পর্যায়ে চলে আসায় তার মেয়ের জন্মের প্রায় এক বছর পর আমি আমার ছেলেকে নিয়ে বোনের শ্রীপুরের বাসা ছেড়ে ভালো-মন্দ চিন্তা না করে কুলহীন দুঃখের সাগরে ঝাপ দেই। মা-ছেলে মিলে নানান প্রতিঘাত সহ্য করে ভাসতে ভাসতে আবার বাবার গ্রামের বাড়ীতে চলে আসি।

আমাদের মা বেশ রাগী এবং অভাবের তাড়নায় প্রায় সময়ই খিটখিটে আচরণ করতেন বিধায় বাবার পরিবারে ছোট ছোট ভাই-বোনের একমাত্র আমিই ছিলাম শান্তির আশ্রয়স্থল। আমার ছেলে এবং ছোট ভাই প্রায় সমবয়সী হওয়ায় তারা বন্ধুর মত মিলেমিশে বড় হতে থাকে। আমিও ছোট ছোট ভাই-বোনদের যথাসাধ্য আদর ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখি। এই অবস্থা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি হঠাৎ করেই দেশে কলেরা মহামারি হিসেবে দেখা দেয়। জীবনের শেষ বেলায় ৮০ বছর বয়সে এসেও সেই ভয়াভহ দিনটির স্মৃতি আমার মনে সারা দেয়, সেই স্মৃতি মনে হলে আজও আমি শোকে দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়ে পরি। সেকি কষ্ট আজও আমার শরীর শিহরে উঠে মনের অজান্তেই চোখের পানি গাল বেয়ে গড়িয়ে পরে।

সেই সময় প্রায় প্রতি পরিবারের কেউ না কেউ রাত ১২:০০ টার সময় কলেরায় আক্রান্ত হতো এবং ভোর হওয়ার পূর্বেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে না-ফেরার দেশের উদ্দেশ্যে পারি জমাতো, তবে যাদের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল তারা হয়তো বেশি টাকা দিয়ে ডাক্তার বাড়ীতে নিয়ে আসতে পেরে তার পরিবারের আক্রান্ত ব্যক্তিকে রোগ মুক্ত করে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিল। একেতো আমাদের পরিবারে নুন আনতে পান্তা ফোরায় অবস্থা তার উপর হঠাৎ করে আমার অত্যন্ত আদরের এবং সুন্দরী (সুন্দরী বলার পিছনে কারণ হলো জীবনের শেষ বেলায় এসেও কোন দিন আমার এই বোনের মত কাউকে দেখার সুযোগ হয়নি) ছোট বোনটি রাত আনুমানিক ১২:০০ ঘটিকায় কলেরায় আক্রান্ত হয়ে পরে। তাকে সারিয়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করার পরও অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে ভোর হওয়ার পূর্বেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে আমাদের ছেড়ে না-ফেরার দেশে চলে যাওয়ায় পরিবারে শোকের ছায়া নেমে আসে। এইভাবে নানান ধরণের দুঃখ কষ্টের মধ্যে চলতে থাকে আমার এবং আমাদের পরিবারের অন্য সদস্যদের জীবন।

সুবিধাভোগী কর্মকর্তার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের পক্ষে মিথ্যা স্বাক্ষ্য না দেয়ার কারণে বাবাকে বিভাগীয় মামলায় তার তখনকার কর্তৃপক্ষ নানানভাবে চেষ্টা করেও বাবাকে ফাঁসাতে পারেনি। অত:পর বাবার বিরুদ্ধে তার অফিস থেকে জারীকৃত শোকজ প্রত্যাহার করায় তিনি আমার দুই ভাইকে তার কর্মস্থলের বাসায় নিয়ে যান। ইতোমধ্যে আমাদের দেশে মু্ক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায় এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমার ছোট দুই ভাই (যারা বাবার বাসায় বেড়াতে গিয়েছিল) তারা নদী পথে বিভিন্ন জেলা বা অঞ্চল ঘুরে অবশেষে বাবার বাসা হতে রওনা হওয়ার প্রায় ৫ দিন পর গ্রামের বাড়ীতে আসে। বাবার বাসা হতে রওনা হওয়ার পর হতে ৫ দিন তাদের খবর আমাদের কাছে ছিল না।

আমাদের গ্রামের বাড়ী কুমিল্লা জেলার উপর দিয়ে বহমান তিতাস নদীর পারে অবস্থিত। বলে রাখা ভালো তখন আমাদের দেশে পূর্ণ বর্ষাকাল চলছিল। আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীপথে প্রায়ই পশ্চিম পাকিস্তানী শত্রুবাহিনী লঞ্চ বা বোট নিয়ে যাতায়াত করত। পশ্চিমা বাহিনী নদীপথে যাতায়াত করার সময় বিনা বিচারে গুলি ছোড়ার কারণে জীবন রক্ষার তাগিদে আমাদের গ্রামের প্রায় সকল নারী পুরুষ তাদের সন্তানদের নিয়ে গ্রাম ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়। আমাদের পরিবারের বেলায়ও তার ব্যতিক্রম হয়নি মাকে নিয়ে প্রাণ ভয়ে ভরা বর্ষার পানিতে জলে ভাসা পদ্মের মতো কলা গাছের ভেলায় করে যতসামান্য খাবার নিয়ে আমাদের গ্রাম থেকে অনতি দূরের নানার বাড়ীতে চলে যাই।

পরিবারের সকলের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নানার বাড়িতে আশ্রয় নেয়ার পর আমার জীবনে নতুন করে আরও একটি দুঃখের স্মৃতি চলে আসে। দেশে ভরা বর্ষার মৌসুম চলছিল বিধায় নানার বাড়ীর চারপাশে থৈ থৈ পানি, রাস্তা-ঘাট প্রায় স্থানেই পানি ছিল। তাছাড়া নানার বাড়িতে থাকার সময় সকল পথ-ঘাট না চিনার কারণে চলাচলে নানা ধরনের ধরণে অসুবিধার সৃষ্টি হয়। নানার বাড়ীতে যাওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই হঠাৎ করে আমাদের অসাবধানতার কারণে আমার একমাত্র ৭/৮ বছরের ছেলে পানিতে পরে যায়। তাকে পানি হতে উঠিয়ে শত চেষ্টা করার পরও বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। পরিনামে আমার প্রথম স্বামীর আমানত সন্তান এবং স্মৃতি আমার জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে যায়, আমি হয়ে পরি নিঃস্ব একা হয়ে পরি।

আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে গ্রামের অন্যান্য জনগণের আয়ের উৎস সীমিত হওয়ার কারণে খাদ্য কষ্টে জীবন যাপন করা একান্ত কষ্টসাধ্য হলেও আমাদের পরিবারের বেলায় ছিল ভিন্ন চিত্র। বাবা সরকারি চাকুরীজীবি হওয়ার কারণে তখন আমরা তেমন কোন আর্থিক বা খাদ্যের কষ্টে ছিলাম না। মুক্তিযোদ্ধ চলাকালীন জনসাধারণের সে কি দুর্বিসহ জীবন তা নিজ চোখে না দেখলে কেউ আচ করতে পারবে না বা কারো পক্ষে সম্ভব না। দেশের সকল জনগণেরই অর্থকষ্ট, খাদ্য নিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাব এরই মাঝে পশ্চিমা শত্রু বাহিনীর নির্বিচারে গণহত্যা নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে যায় আমাদের এই ভূখন্ডে।

আমাদের পরিবার পুরা নয় মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযূদ্ধ চলাকালীন সময়ে নানার বাড়ী নিজ গ্রামের বাড়ীতে বসবাস করলেও দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পর দেশে অভাব দেখা দেওয়ায় বাবার সামান্যতম আয়ে বাবার নিকট থেকে বিছিন্ন থেকে পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করা কষ্টসাধ্য বিষয় ছিল। পারিবারিক ব্যয়ে কৃচ্ছুতা আনায়ন করার জন্য একমাত্র লেখা-পড়ার প্রতি আগ্রহী আমাদের ছোট ভাই (দ্বিতীয়) কে একা গ্রামের বাড়ীতে রেখে স্বপরিবারে বাবার তখনকার কর্মস্থল বনরূপায় চলে যাই। আমাদের বাসার পাশেই বাবার অফিসে কর্মরত আরও অনেকে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করত। পরিবারের কর্তাব্যক্তিগণ একই দপ্তরে বা অফিসে চাকুরী করার সুবাদে প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সখ্যতা গড়ে উঠে তাতে মন হতো একে অন্যকে বহুদিন যাবৎ চিনেন বা একে অন্যের খুবেই পরিচিত।

একই এলাকায় বা ক্যাম্পাসে পাশাপাশি বাসায় থাকার কারণে প্রায় প্রত্যেক পরিবারের সন্তানরা প্রতিটি বাসায় অবাধে যাতায়াত ছিল কিন্তু আমি ছিলাম তাদের মধ্যে একটু ভিন্ন কারণ আমার বয়স ছিল তখন প্রায় ২৫-২৬ বছর বিধায় কারো বাসায় অবাধে বিচরণ আমার পক্ষে শুভনীয় ছিল না। তাছাড়া স্বামী পরিত্যাক্তা আর একমাত্র সন্তান হারা স্ত্রী/মা হওয়ার কারণে আমি সবসময় নিজেকে লুকিয়ে রাখার জন্য পর্দার মধ্যে থেকে চলা-ফেরা করতাম। যার ফলে আমাদের বাসার অদুরে বসবাসকারী এক ভদ্রলোক আমার চাল-চলনে আকৃষ্ট হন এবং খুব পছন্দ করে ফেলেন। তিনি তাঁর ছোট ভাইয়ের সাথে বিয়ে দেয়ার জন্য আমার বাবার নিকট প্রস্তাব পাঠান। তাঁর ছোট ভাই পূর্ব থেকেই উনার বাসায় বসবাস করার ফলে মাঝে মধ্যে আমি তাকে স্বশরীরে দেখলেও কোন দিন কথা হয়নি, তার গায়ের রং কালো হলেও দৈহিক কাঠামো ছিল খুবই সুন্দর। এই দিকে আমিও দীর্ঘদিন যাবৎ স্বামী সন্তান হারা ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে দিনাতিপাত করতে বেঁচে থাকার মায়া ত্যাগ করতে বসেছি প্রায় এবং পুরুষ মানুষের প্রতি বিশ্বাস ভালোবাসা মন থেকে মুছে ফেলেছিলাম। তার মধ্যে এই প্রস্তাবে নতুন করে বাঁচার আশা জাগায় তাই মনে মনে স্থির করে নিয়েছি যদি আমার মতামত জানতে চাওয়া হয় তবে একবাক্যে হ্যাঁ সূচক জবাব দিব।

দুই পরিবারের অভিভাবক পর্যায়ে আলাপ আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে, আমি অতি গোপনে তার (পাত্রের) আচার আচরণ বিষয়ে কিছুটা খবর সংগ্রহ করে নিয়েছি কারণ নতুন করে যাতে পূর্বের মত বিপদে পরতে না হয়। বলে রাখা ভালো কোনো নারীর সংসার যদি স্বামীর অত্যাচার, অবহেলা বা খারাপ আচরণের জন্য নষ্ট বা ভেঙ্গে যায় তবে স্বামী পরিত্যক্তা সেই নারী নতুন করে যে সংসারে প্রবেশ করে সেই সংসার টিকিয়ে রাখা, স্বামী বা স্বামীর পরিবারের অন্য সদস্যদের মন পাওয়ার জন্য তার জীবন উৎসর্গ করতেও কোনো প্রকার দ্বিধা করে না। আমার বেলায়ও সেই বিষয়টি আমার আচার আচরণে প্রতিফলন ঘটাতে স্বামীর মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি, এখনও করে যাচ্ছি এবং যতদিন বেঁচে থাকব করে যাব।

আমি আমার ভুলে বা স্বামীর অবহেলায় দীর্ঘদিন স্বামী পরিত্যক্তা হয়ে বাবার পরিবারে একান্ত অবহেলার পাত্রী হয়ে জলে ভাসা পদ্ম হিসেবে পানির ঢেউ এর মতো প্রতিকুল পরিবেশে কখনও ছোট বোনের সংসারে কখনও বাবার পরিবারে অবস্থান করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পরি, এই অবস্থান থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার আশায় পুন:রায় নতুন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নবরূপে বাঁচার আশায় অচেনা পরিবেশে; অচেনা পরিবারে এবং অচেনা ব্যক্তির সাথে গাঁটছড়া বাঁধার জন্য মনস্থির করি। বলে রাখা ভালো আমাদের এতদ: অঞ্চলে অর্থাৎ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি পূর্ব-পাকিস্তান হালে বাংলাদেশে নারীদের কোনো স্থায়ী ঠিকানা বা আবাসনের অস্তিত্বত্য আজ অবদি খুঁজে পাওয়া ভার। নারী জন্মের পর হতে বাবার বর্তমানে বিবাহের পূর্ব পর্যন্ত বাবার পরিবারে অথবা বাবার অবর্তমানে ভাইয়ের পরিবারে; বিবাহের পর স্বামীর বর্তমানে স্বামী বা শ্বশুরের পরিবারে; স্বামীর অবর্তমানে ছেলে বা মেয়ের পরিবারে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ের অবর্তমানে নাতি, নাতনির পরিবারেও চূড়ান্ত পরিনতি বা মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত অবস্থান বা বসবাস করতে হয়।

নারীদের জীবনে দুঃখ কষ্ট থাকলেও স্বামীর পরিবারে স্বামীর সাথে বসবাস করার মধ্যে যে পরিমাণ সম্মান থাকে তা অন্য কোথাও পাওয়ার আশা কল্পনা মাত্র, বাস্তবে তার নজির দৃষ্টিগোচর হয় না। অত:পর উভয়ের পরিবারের সম্মতিতে এবং আমাদের দু’জনের (আমার এবং স্বামীর) ইচ্ছা থাকার পরিপ্রেক্ষিতে বিগত ১৯৭২ সালের প্রথম দিকের কোনো একদিনে যথাযোগ্য মর্যাদায় আমাদের বিবাহের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়ে যায়। যদিও এই বিবাহ আমার ছিল দ্বিতীয় বিয়ে কিন্তু আমার পরম শ্রদ্ধেয় স্বামীর ছিল ১ম বিয়ে তারপরও উভয়ের ভালোবাসায় তেমন কোনো পার্থক্য ছিল না। তাছাড়া আগেই উল্লেখ করেছি যে স্বামীর দোষে সংসার ত্যাগি নারীরা দ্বিতীয় স্বামীকে পূর্বের চেয়ে আরও অনেক গুণ বেশি করে মন-প্রাণ উজাড় করে দিয়ে সেবা ও ভালোবাসা দিতে থাকে আমার বেলায়ও তার কোনো ব্যতীক্রম ছিল না।

বিবাহের সময় আমার স্বামী বেকার ছিল বিধায় তাঁর বড় ভাইয়ের বাসায় থাকতে হয়েছে কিন্তু কিছুদিন যাওয়ার পরই ঢাকায় একটি ডিপার্টমেন্টাল দোকানে চাকুরী হওয়ার সুবাদে বড় ভাইয়ের বাসা ছেড়ে বাবার বাসা/বাড়ী থেকে আমাকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন এবং একটি ছোট বাসা ভাড়া নিয়ে স্বামীর সাথে ঢাকায় বসবাস করতে থাকি। তখনকার সময়ে আমার স্বামীর আয় কম হলেও বাবা আমার বাসায় আসলে তাঁর যথাসাধ্য বাজার করে দিয়ে যেতেন, তাছাড়া আমার ছোট বোনও মাঝে মধ্যে বিভিন্ন ধরনের দ্রব্যাদি পাঠাতো। তাতে করে দু’জনার (স্বামী স্ত্রীর) সংসার মোটামোটি ভালভাবেই চলছিল। অত:পর আমাদের নতুন সংসার জীবন এক বছর পার হতেই ঘর/বাসা আলো করে আমাদের পরিবারে নতুন অতিথি আগমন অর্থাৎ আমাদের বড় সন্তান (ছেলে) এর জন্ম হয়। তখন আমাদের উভয়ের (স্বামী স্ত্রীর) মনে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়, তাকে সেবা, ভালোবাসা আদর নিয়ে গড়ে তোলার প্রত্যাশায় আমাদের গ্রামের বাড়ীতে অবস্থানকারী ছোট ভাইকে ঢাকায় নিয়ে এসে স্কুলে ভর্তি করে দেই যাতে করে তারও লেখা-পড়া হয় এবং পাশাপাশি আমার ছেলেরও দেখা-শুনা করার জন্য সঙ্গী হয়।

আমার ছোট ভাই তখন দ্বিতীয়/তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ত হয়তো এবং সেও খুব ছোট ছিল বিধায় তারও বিভিন্ন খেলনা, খাবার-দাবারের প্রতি লোভ থাকাটা স্বাভাবিক কিন্তু সন্তানের ভালোবাসায় এতোটা অন্ধ ছিলাম আমি তা তখন সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারি নাই। বর্তমানে তা বুঝতে পারলেও কালে কালে বেলা অনেক দূর চলে গেছে আর ফিরে দেখার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের সন্তান জন্মের পর নাতিকে দেখাসহ ছোট ভাইকে দেখার জন্য বাড়ী থেকে হাতে বানানো বেশ কিছু মোখরোচক খাবার নিয়ে আম্মা আমাদের ঢাকার বাসায় আসে। মা আসার পর নাতিকে দেখে তিনি অনেক খুশি হন আমরাও তাঁর আগমনে বেশ খুশি হয়েছিলাম উনার সাথে কৌশল বিনিময় করে নাতিকে (আমার সন্তান) মার কোলে দিয়ে আমি রান্না ঘরে চলে যাই।

অল্প সময় পর রান্নার প্রয়োজনে কিছু একটা নেয়ার জন্য রান্না ঘর থেকে ফিরে এসে দেখি তিনি (মা) আমার ছোট ভাইকে কিছু একটা খেতে দিয়েছে তাতে আমার রাগ হয় কারণ আমি মনে করেছিলাম হয়তো আমার ছোট ভাই মার কাছে তাকে ঠিকমত খেতে দেই না বলে অভিযোগ করেছে। তাৎক্ষনিক নিজেকে সামলাতে না পেরে একান্ত রাগের মাথায় মাকে বেশ কিছু কটু কথা বলে ফেলি তাতে মা আমার উপর রাগ করে ছোট ভাইকে নিয়ে না খেয়েই আমাদের বাসা থেকে প্রথমে ছোট বোনের বাসায় এবং পরে গ্রামের বাড়ীতে চলে যান। তখন বিষয়টি না বুঝতে পারলেও জীবনের পরন্ত বিকালে এসে ঠিকই বুঝতে পারছি আমার সন্তান যেমন আমার নিকট আদরের তেমন তাঁর (মার) সন্তান আমার ছোট ভাইও তাঁর নিকট তেমনি আদরের ছিল।

সন্তান জন্ম নেয়ায় পরিবারের পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে ব্যয় বৃদ্ধি পায় ফলে দোকানে সামান্য বেতনে চাকুরী করে সংসার চালানো তার পক্ষে খুবই কঠিন হয়ে পরে। আমাদের বাসা থেকে বেশ কিছু দূরে (৮/১০ মাইল) আমার ফুফাতো বোনের বাসা ছিল। তখনকার সময় আমার ফুফাতো বোনের স্বামী উচ্চ বেতনের উচ্চ পদস্ত সরকারি কর্মকর্তা এবং অত্যন্ত ভালো মনের মানুষ ছিলেন। আমার ফুফাতো বোনের বেশ কয়জন সন্তান ছিল এবং তার পরিবার ছিল অনেক বড় একা সামলাতে তাকে বেশ বেগ পেতে হয়। তাকে সহযোগিতা করাসহ কিছুটা আর্থিক সহায়তা পাওয়ার মানসে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে স্বামী স্ত্রী মিলে সন্তানকে নিয়ে তার বাসায় যেতাম এবং সারা দিন থেকে রাত্রের খাবার খেয়ে বাসায় চলে আসতাম কিন্তু অনেক দিন গত হয়ে গেলেও ভয়ে বা লজ্জায় আমাদের সমস্যার কথাটি দুলাভাইকে (ফুফাতো বোনের স্বামীকে) বলতে পারতাম না।

আমার ফুফাতো বোনের স্বামী মানে আমাদের দুলভাই বেশ বিচক্ষণ ব্যক্তি ছিলেন। তাই বেশ কিছু দিন আমাদের যাতায়াত করা দেখে নিজে থেকেই আমাদের সমস্যা আচ করতে পেরে সমস্যা সমাধানের জন্য ধানমন্ডিতে এক সরকারি অফিসে আমার স্বামীকে চাকুরি দিয়ে দেন। চাকুরি পাওয়ার পর থেকে আমাদের পরিবারে সচ্ছলতা দেখা দেয় এবং আমার সন্তানসহ বেশ শান্তিতেই দিন যাপন করতে থাকি এরই মধ্যে পর পর দুইটি সন্তান (একটি মেয়ে ও একটি ছেলে) আমাদের সংসারে আসার পর পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৫ জন হয়ে যায়। সরকারি নিয়ম মোতাবেক বেতন বৃদ্ধির ফলে স্বামীর আয়ও বৃদ্ধি পাওয়ায় সংসারে তেমন কোনো অভাব দেখা দেয়নি। প্রথম দুই ছেলে-মেয়ে স্কুলের গন্ডি পার হয়ে কলেজে লেখাপড়া করে এবং ছোট ছেলে স্কুলে পড়ে, তাদের খাওয়া-দাওয়া, দেখা-শুনা, স্বামীর সেবা করতে করতে কখন যে সময় পার হয়ে যায় তা টের পাইনা। নানান ব্যবস্থতার কারণে অতীতকে ভুলে গিয়ে নিজেকে বর্তমান সম্রাজ্ঞী মনে হতে থাকে।

আমার স্বামী কর্মরত থাকাবস্থায় নানান প্রতিকুলতার মাঝেও আমাদের (স্বামী স্ত্রীর) উভয়ের ভালোবাসা বা আনন্দের ফসল হিসেবে জন্ম নেয়া ৩ সন্তানকে মধ্যম মানের শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারলেও উপযুক্ত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলতে অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছি। তথাপি আমার স্বামী সরকারি চাকুরীতে থাকাবস্থায় ছোট/বড় যার যার যোগ্যতা অনুযায়ী কাজে/কর্মে ৩ সন্তানই যোগদান করেছিল। প্রথম প্রথম তারা যার যার কর্মক্ষেত্রে আশানুরূপ সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হতে পারলেও পর্যায়ক্রমে তাদের সাফল্য ধরে রাখতে পারেনি বরং তাদের বয়স কম এবং পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে অর্জিত সফলতায় অল্প সময়ের ব্যবধানে নিন্মমূখী গতি শুরু হয়ে যায়। তাদের ধৈর্য্যহীনতার কারণে টাকার লোভ সহ্য করতে না পারায় তাদের সাফল্য বেশী দিন স্থায়ী বা সাফল্য সাসটেইন করেনি। তাছাড়া প্রবাসে থাকা আমাদের ছোট ছেলেও প্রবাসের পাঠ চুকিয়ে দেশে ফিরে আসার কারণে পুরাপুরি বেকার হয়ে পরে। ইতোমধ্যে আমার স্বামীও তার কর্মজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে অবসর গ্রহণ করেন।

আমার স্বামী চাকুরীতে থাকাবস্থায় সন্তানরা প্রত্যেকেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল এবং তাদের প্রত্যেকেরই দুই/একজন সন্তান ছিল এবং বিশেষ জ্ঞান সম্পন্ন আমার আদরের ছোট (২য়) ভাইয়ের প্রবল আপত্তি থাকা সত্বেও ছেলে-মেয়েসহ তাদের পরিবার (স্বামী, স্ত্রী, সন্তান) নিয়ে সকলে মিলে-মিশে একসাথে একই বাসায় বসবাস করতে থাকি। সেই সুবাদে তখন আমাদের পরিবারে সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ছোট/বড় মিলে ১৩ জন এবং প্রায় প্রতিদিনই কারো কারো শ্বশুর বাড়ী থেকে মেহমানের আগমন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যপার, যার ফলশ্রুতিতে প্রতি বেলায় কমপক্ষে ১৫/১৬ জনের খাবার আয়োজন করতে হতো। অবসর গ্রহণ জনিত কারণে আমার স্বামী তাঁর অফিস কর্তৃক দেয় অর্থের সিংহভাগ অর্থই আমাদের মেয়ের ব্যবসায় লগ্নি করেন যাতে করে তার ব্যবসার পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি আয়-রোজগারও বৃদ্ধি পায়। আমার স্বামীর অর্থ লগ্নির পর মেয়ের ব্যবসা উন্নতি হওয়ার পরিবর্তে অবনতির দিকে ধাবিত হতে থাকে। এক দিকে আয়-রোজগারে ভাটা পরছে অপর দিকে পরিবারের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ক্রমান্বয়ে পরিবারে আর্থিক অনটন দেখা দেয়। অত:পর আমাদের ছেলে-মেয়ে এবং তাদের স্ত্রী ও স্বামীর মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয় এবং শান্তির সংসারে অশান্তির আগমন ঘটে। যার ফলে সকলে মিলেমিশে একই বাসায় এক সাথে বসবাস করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পরে। পর্যায়ক্রমে এই অশান্তি চরম আকার ধারণ করার ফলে আমাদের বড় সন্তান তার স্ত্রীসহ ছেলে-মেয়েকে নিয়ে আমাদের পরিবার ছেড়ে অন্যত্র বাসা ভাড়া নিয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়।

ফলশ্রুতিতে দীর্ঘদিনের যৌথ পরিবার ভেঙ্গে যায় কিন্তু আমার স্বামীর আয়-রোজগার নাই তাছাড়া একদিকে আমাদের ছোট সন্তান বেকার অন্যদিকে মেয়ে এবং তার স্বামী দাপ্তরিক প্রয়োজনে ছোট বাচ্চা রেখে অফিসে চলে যাওয়ায় তাদের দেখা-শুনা করার আর কেউ নাই বিধায় একান্ত লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে ছোট সন্তানের পরিবারসহ পরগাছার মত মেয়ের বাসায় বাস করতে থাকি। যার ফলে মেয়ের পরিবারে একান্ত অপ্রয়োজনীয় ছোট ছেলের স্ত্রী সন্তান মিলে ৩ জনসহ আমরা স্বামী স্ত্রী দুইজন মোট ৫ জনের মুখে খাবার তোলে দেয়া মেয়ের পক্ষে কষ্টসাধ্য হয়ে পরে। আমার স্বামী কর্মরত থাকাবস্থায় মেয়ে এবং তার স্বামীর কাছ থেকে সম্মান শ্রদ্ধা পেতাম তা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে পেতে কিছুদিনের মধ্যেই এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যায় তখন আর জামাই শাশুড়ী এবং শ্বশুর জামাই সম্পর্কের পর্যায় থাকে না। তাদের আচার আচরণে প্রতীয়মান হয় যে, আমি শাশুড়ী থেকে কাজের বুয়া বা আয়া আর আমার স্বামী শ্বশুর থেকে মেয়ের পরিবারের কেয়ার টেকার বা ভূত্ত্ব হিসেবে পরিচিতি লাভ করি।

আমাদের মেয়ের স্বামী প্রথমে ছোট সন্তানের গৃহ শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হলেও পরবর্তীতে ঢাকায় তার কোন থাকার জায়গা না থাকায় আন্তরিকতার সুযোগ নিয়ে আমাদের পরিবারে প্রবেশ করে। একসাথে দীর্ঘদিন থাকার ফলে ক্রমান্বয়ে সে আমাদের পরিবারের একজন সদস্য হিসেবেই অন্যান্যদের মত সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা পাওয়াসহ পরিবারের টুক-টাক কাজ কর্মেও নিজের ইচ্ছায় অংশগ্রহণ করতে থাকে। অত:পর আমাদের আদর আপ্যায়ন এবং দুর্বলতার সুযোগে আমাদের একমাত্র মেয়েকে তার প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে পরস্পরের মাঝে সখ্যতা গড়ে তোলে। তাদের পরস্পরের মধ্যে গড়ে উঠা সখ্যতা এক পর্যায়ে এসে পরিণয়ের মাধ্যমে তরা পরিসমাপ্তি ঘটে।

বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর আমাদের একমাত্র মেয়ের স্বামী হিসেবে যে আদর আপ্যায়ন পায় তা হয়তো পূর্বে আমাদের অসচেনতা বা তার প্রতি রাগ এর কারণে অনেকাংশে কিছুটা কম পেত। তাছাড়া গৃহ শিক্ষক এর কাছের বা দূরের আত্মীয় অথবা নিজের সন্তানের সাথে পিতা-মাতা বা পরিবারের প্রধান হিসেবে যে  আচার আচরণ করা হয় মেয়ের স্বামীর ক্ষেত্রে তার কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্যনীয় বা হতে পারে এটাই সকল পরিবারের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক। আমাদের ক্ষেত্রেও তার ব্যতীক্রম হয়নি কিন্তু তা বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর আমাদের একমাত্র মেয়ের স্বামী সহজভাবে গ্রহণ করতে বা হজম করতে পারেনি। বিয়ের পর তার আচার-আচরণে আমল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। তার আচরণে এও প্রতীয়মান হয় যে আমাদের মেয়েকে বিয়ে করার মাধ্যমে তার উপরে অসচেতনতা বশত: ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিচার করা। তার আচার আচরণে বিষয়টি সহজেই প্রতীয়মান হয়। আমার স্বামী অবসর গ্রহণের মাধ্যমে আয়-উপার্জনের উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পুরাপুরি বুঝতে পারি।

অর্থাৎ এক দিকে আমার স্বামীর রোজগার বন্ধ অন্যদিকে মেয়ে এবং তার স্বামীর আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় আমাদের প্রতি তাদের আচার-আচরণ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যা আমাদের পক্ষে মেনে নেয়া বা হজম করা খুবই কষ্টসাধ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তাদের অত্যাচার অবহেলা সহ্য করতে না পেরে আমাদের বড় সন্তান তার স্ত্রী এবং সন্তানদের নিয়ে বেশ কিছুদিন পূর্বে আমাদেরকে রেখে বাসা ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। আমাদের ছেড়ে তার এ চলে যাওয়ায় আমাদের থাকার আর কোনো বিকল্প উপায় বা আশ্রয়স্থল না থাকার কারণে নিজেদের মান-সম্মান বিসর্জন দিয়ে ছোট ছেলের পরিবারসহ মেয়ের বাসায় থাকতে বাধ্য হই। আমরা দু’জন (স্বামী স্ত্রী) এর সাথে ছোট ছেলের পরিবার যেন মেয়ের এবং তার স্বামীর গুদের উপর বিষফোড়া। আমাদের পরিবারে আমার স্বামী বয়সের কারণে বা কাগজে কলমে প্রধান হলেও বাস্তবে পরিবারের কর্তৃত্ব চলে যায় মেয়ে এবং তার স্বামীর হাতে। মেয়ে এবং মেয়ের স্বামীর ইচ্ছাই আসল কথা তাদের ইচ্ছা ও মর্জির প্রাধান্য দিয়ে চলে পরিবারের সকল কার্যক্রম।

এক পর্যায়ে মেয়ের পারিবারিক ব্যয় সংকোচনের জন্য আমাদের ছোট সন্তান তার পরিবারকে আলাদা করার জন্য মেয়ে এবং তার স্বামী পরিকল্পনা করে ছোট সন্তানের পরিবার-কে রেখে আমাদের সরকারি বাসা ছেড়ে মেয়ে স্বামীকে নিয়ে তাদের সন্তানসহ অন্যত্র বাসা ভাড়া নিয়ে চলে যায়। আমার স্বামী বেকার তার ‍উপর দীর্ঘদিন যাবৎ অসুস্থ এবং ছোট ছেলেরও তেমন কোনো আয়-রোজগার নাই। অত:পর ছোট ছেলের পরিবারকে একান্ত অসহায়ভাবে রেখে একান্ত নিরুপায় হয়ে আত্ম-সম্মান বিসর্জন দিয়ে লজ্জা-সরমের মাথা খেয়ে অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে স্বার্থপরের মত মেয়ের সাথে তার ভাড়া বাসায় চলে যাই। যাওয়ার সময় ছোট ছেলের সন্তান আমাদের নাতি একবার আমার কাছে আবার তার দাদার কাছে দৌঁড়ে যায় আর আমাদের সাথে যাওয়ার জন্য কান্না-কাটি করতে থাকে কিন্তু তার কান্না থামানো সান্তনা দেয়ার মত আমাদের তখন কোনো শক্তি বা সামর্থ্য ছিল না। বড় ছেলে বাসা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর একমাত্র এই নাতি ছিল আমাদের আদর স্নেহ এবং ভালোবাসার অংশীদার।

আমরা তাকে আকড়ে ধরে বড় নাতির অভাব ভুলে থাকতাম নিয়তির বিরুপ প্রতিক্রিয়ায় আজ তাকেও ছেড়ে যেতে হচ্ছে তাই নিজের অজান্তেই চোখে পানি চলে আসে সেই চোখের পানি নিরবে আচলে মুছে মেয়ের সাথে চলে যেতে হয়েছে।সেই সময়কার দুঃখের স্মৃতি ক্ষণে ক্ষণে আজও মনে পরে এবং চোখে পানি আসে কিন্তু দুঃখ করা ছাড়া আমাদের তেমন কিছুই করার উপায় ছিল না। তারপর থেকে মান-সম্মান বিসর্জন দিয়ে মেয়ের বাসায় বসবাস করতে থাকি। আমার জীবনে ঘটে যাওয়া নানান ঘাত-প্রতিঘাতের ফলে জর্জিত জীবনের পরন্ত বিকেলে এসে একান্ত আপনজন কর্তৃক দেয় অত্যাচার বা অসম্মান হজম করার আমার অভ্যাস থাকলেও আমার অসুস্থ স্বামীর পক্ষে হজম করা খুবই কঠিন ছিল। এরই মাঝে সারা বিশ্বে করোনা ভাইরাস মহামারি হিসেবে আরির্ভূত হওয়ায় মানুষের জীবন নাকাল অবস্থার মধ্যে পরে। ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশেও করোনার আক্রমণ দেখা দেয় এবং প্রতিদিনই করোনায় আক্রান্ত অনেকে মৃত্যুবরণ করছে এবং দেশের ব্যবসা বাণিজ্যে অফিস আদালতে কাজ স্থবির হয়ে পরে।

করোনার আক্রমণ হতে রক্ষা করার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ঢাকাসহ সকল বিভাগীয় শহরে লকডাউন ঘোষণা করা হয় এবং মুখে মাক্স পড়া ছাড়া জনগণের অবাধ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। বলে রাখা ভালো আমাদের বড় ছেলে এবং মেয়ের ব্যবস্থা ছিল কলেজ/ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র/ছাত্রীদের কম্পিউটার এবং ইন্টানেট বিষয়ক প্রশিক্ষণ ওরিয়েন্টেড। দেশে করোনার প্রভাবের কারণে জনগণের জন্য অবাধ চলাচল সীমিত হয়ে যাওয়ায় আমাদের ছেলে-মেয়ের ব্যবসা কার্যত বন্ধ হয়ে যায় এবং আর্থিক সংকট দেখা দেয়। এইরূপ পরিস্থিতিতে মেয়ের স্বামী, সন্তান, কাজের মেয়েসহ আমাদেরকে নিয়ে মোট ৯/১০ জনের ব্যয় মিটানো মেয়ের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পরে এরই মধ্যে বাজারে প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতির কারণে দেশের জনগণের নাভিশ্বাস ‍উঠার উপক্রম হয়ে যায়, আমাদের মেয়ের বেলায়ও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে প্রায় ১ বছর চলার পর করোনার প্রভাব ক্রমান্বয়ে কমতে থাকলেও ছেলে-মেয়ের ব্যবস্থায় তেমন পরিবর্তন আসেনি এবং তাদের আয়-রোজগারের পথও তেমনটা উম্মুক্ত হয়নি। আমার স্বামী পূর্ব থেকেই অসুস্থ ছিলেন আমিও বয়সের ভারে দুর্বল হয়ে পরেছি কিন্তু অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং ঔষধ ক্রয় করতে খুব কষ্ট হচ্ছে। এরই মধ্যে পরিবারের অভাবের সময় একটু সহযোগিতা করার মানসে আমার স্বামী সকলের অজান্তে গোপনে গোপনে বিভিন্ন স্থানে চাকুরী খুঁজতে যেতেন এবং যাওয়া আসার পথে একদিন হঠাৎ করে একটি গাড়ী চাপা দিয়ে চলে যায়। গাড়ীর চাপায় পায়ে আঘাত প্রাপ্ত হয়ে বেশ কিছুদিন অবহেলায় অনাদরে বিছনায় গড়াগড়ি দেয়ার পর ভালো হলেও শাররীকভাবে দুর্বল থেকে যাওয়ার কারণে একা একা চলতে কষ্ট হতো। তারপরও আমি নিজে দুর্বল থাকার কারণে তাঁকে তেমন কোনো সহযোগিতা করতে পারতাম না। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার কারণে হয়তো তাঁর মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় যার ফলে সামান্য কথায়ই মাঝে মধ্যে রাগ হয়ে যায়। অতপর: কিছুদিন পর তাঁর শাররীক দুর্বলতা কিছুটা কমলে নিজে নিজে মসজিদে নামাজ পড়তে যেতেন এবং একদিন বাসা থেকে নেমে বাজার করতে গিয়েছিলেন। বাজার করতে গিয়ে দোকানদারের অশোভন আচরণে ক্ষুদ্ধ হয়ে অত্যাধিক রাগ করার ফলে দোকানের সামনে ঢলিয়ে পরেন এবং বেশ কিছু হাসপাতালে থেকে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে মৃত্যুর কাছে হেরে গিয়ে আমাকে নতুন করে দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে না-ফেরার দেশে চলে যান।

মনের মধ্যে প্রচন্ড ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শাররীক দুর্বলতা এবং পরিবারে পূর্ণ কর্তৃত্ব না থাকার কারণে জীবনের শেষ বেলায় এসে আমার প্রিয় স্বামীকে সাধ্যমত খাওয়া-দাওয়া দেয়া, প্রয়োজনীয় সেবা দিতে পারিনি বলে তাঁর (স্বামীর) অবর্তমানে তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করি এবং নিজেকে অনেকাংশে অপরাধী মনে করি এই ভেবে যে তাঁকে যদি আমি ঠিকমত সেবা করতে পারতাম হয়তো তিনি আমাকে একা ছেড়ে অভিমান নিয়ে চলে যেতেন না। উনি চলে যাওয়ার ফলে আমি কার্যত্ব একা হয়ে গেলাম এবং আমার সুবিধা-অসুবিধা, ভালো-মন্দ, বিপদে-আপদে সহযোগিতা, শান্তনা বা পরামর্শ করার মতো আর কেউ অবশিষ্ট রইল না। পরিণামে জীবনের পরন্ত বিকালে এসে একান্ত মূল্যহীন মূল হতে বিছিন্ন হয়ে জলে ভাসা পদ্মের মতো অনাদরে অবহেলায় কখনও ছেলের বাসায় কখনও মেয়ের বাসায় আবার কখনও ভাইয়ের বাসায় অবস্থান করি। আবার একান্ত নিরুপায় হয়ে ঘুরপাক খেয়ে আবার মেয়ের বাসায় ফিরে আসি।

আগের মতো কাজ করতে পারি না, তাছাড়া দীর্ঘদিনের স্মৃতি সামনে চলে আসায় একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও তুলনামূলক ভাবে একটু বেশী কথা বলতে থাকি। বর্তমান কর্মব্যস্ত শহরে আমার স্মৃতির মূল্যহীন কথা শুনার মত সময় বা ধৈর্য্য কারো নেই তাই সকলেই বিরক্তি বোধ করে। তাদের এই বিরক্তিতে বুঝে হউক আর না বুঝে হউক আমি কিছুটা অপমানবোধ করি। তাদের আচরণে মনে হয় আমি একজন তাদের পরিবারের জন্য একজন অতিরিক্ত জনবল হিসেবে চেপে আছি আমি চলে গেলেই তারা মুক্ত।

আমার উপর ঘটে যাওয়া নানান প্রকার অবহেলা, অপমান সহ্য করে মেয়ের বাসায় ফিরে আসি তাতেও আমার তেমন কোনো কষ্ট হয় না কিন্তু জন্মের পর থেকে যাদেরকে কুলে-পিঠে করে মানুষ করেছি তারা যখন অপমানজনক কথা বলে তা সহ্য করা আমার পক্ষে খুবই কষ্টের বিষয়। তারপরও আমার মনে তেমন কোনো আক্ষেপ নেই এই ভেবে অবহেলা হউক অমর্যাদা হউক তারাতো আমারই সন্তান, মহান আল্লাহ্ আমাকে সন্তান দান করেছেন বিধায় ভাল হউক মন্দ হউক আমার আশ্রয়স্থল আছে। আর যাদের সন্তান নাই তাদেরতো কোন আশ্রয়স্থল নাই। তারা আমার বয়সে এসে হয়তো আমার চেয়ে আরও বেশী কষ্টে আছে বা জীবন ধারণ করছে কেউ কেউ হয়তো বৃদ্ধাশ্রমে অবহেলায় অনাদরে জীবন যাপন করছে আর মৃত্যুর প্রহর গুনছে। সেই তুলনায় মহান আল্লাহ্ আমাকে অনেক ভালোই রেখেছেন।

আমার জীবনের শেষ বেলায় স্বামী না থাকলেও আমার ভাই, বোন আছে, ছেলে আছে, মেয়ে আছে, নাতি-পুতি আছে মানুষের একজনমে সব আশা পূরণ হয়তো হয় না। মহান রাব্বুল আলামিনের নিকট অনেক কৃতজ্ঞতা জানাই কিছুটা দুঃখ কষ্ট, না পাওয়ার বেদনা থাকলেও অনেকের চেয়ে আমাকে ভালো রাখার জন্য। পাশাপাশি মহান আল্লাহর কাছে করজোড়ে আবেদন জানাই জীবনের অবশিষ্ট যে কয়টা দিন বেঁচে থাকি সেই দিনগুলি যেন বর্তমানের চেয়ে কষ্টে বা খারাপ না হয়। আমার স্বামীকে তাঁর সকল ছোট বড় পাপ মুক্ত করে জান্নাত বাসী করেন। আমার এবং আমার স্বামীর ভালোবাসার ফসল সন্তানদেরকে ভালো রাখেন তাদের মা হিসেবে সেই দোয়াই করি আমিন। একটি উক্তি দিয়ে আমার লেখা জীবন যুদ্ধে পরাজিত মায়ের “জলে ভাসা পদ্ম” নামক জীবন কাহিনী শেষ করব।

“বাবা মা এর দায়িত্ব ছেলে মেয়ে যতদিন না সমান ভাবে বহন করতে শিখবে ততদিন হয়তো সমাজে নিজেদের ছেলে- মেয়ের প্রতি বাবা মা এর ধারণা জীবনের শেষ বেলায় ছেলে স্ত্রী বা মেয়ের স্বামী কর্তৃক অত্যাচারিত অবহেলিত বাবা মা এর মতই থাকবে”।

www.sangbadlive24.com এ প্রকাশিত সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও সবকিছুই আমাদের নিজস্ব। বিনা অনুমতিতে এই নিউজ পোর্টালের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি। যে কোন বিষয়ে নিউজ/ফিচার/ছবি/ভিডিও পাঠান news.sangbadlive24@gmail.com এই ইমেইলে।