ads
ঢাকাসোমবার , ১ এপ্রিল ২০২৪
  1. কৃষি ও পরিবেশ
  2. খেলা
  3. জাতীয়
  4. ধর্ম
  5. বিনোদন
  6. বিশ্ব
  7. ভ্রমণ
  8. মতামত
  9. রাজনীতি
  10. শিক্ষাঙ্গন
  11. সাক্ষাৎকার
  12. সারাদেশ
  13. সাহিত্য
আজকের সর্বশেষ খবর

ছাত্র রাজনীতির সেকাল-একাল

মতামত বিভাগ
এপ্রিল ১, ২০২৪ ৯:২৯ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

ইঞ্জিনিয়ার মো. রহমতুল্লাহ্: ১৯৬২ খ্রি. হতে আমি দেশের ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হই। তখন আমি ঘিওর দুর্গা নারায়ণ হাই স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র হিসেবে সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। ঐ সময়ে স্কুলের বার্ষিক মিলাদ উপলক্ষে জ্ঞানতাপস ড. মো. শহীদুল্লাহকে আমাদের স্কুলে নিয়ে এসেছিলাম। ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে মানিকগঞ্জ মহকুমা ছাত্রলীগের উদ্যোগে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল। উক্ত সভায় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের তদনীন্তন সভাপতি কে. এম. ওবায়দুর রহমান ও ডাকসুর তৎকালীন ভিপি এনায়েতুর রহমানের অগ্নিঝরা বক্তৃতা শুনে আমি ছাত্রলীগের প্রতি আকৃষ্ট হই। উক্ত বছরেই আমি ময়মনসিংহস্থ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রকৌশল ও কারিগরি অনুষদে ভর্তি হই। তখন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি প্রকৌশল ও কারিগরি অনুষদ এবং ভেটেরিনারি (ডিভিএম) অনুষদে এসএসসি পাশের পর ৬ বছরের কোর্স ছিল। অন্যান্য অনুষদে এসএসসি পাশের পর ৫ বছরের কোর্স ছিল। আর কোন ছাত্রীকে তখন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হত না। উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে দেখি সেখানে ছাত্রলীগ কিংবা ছাত্র ইউনিয়ন নামের কোন সংগঠন নেই। অগ্রদূত, প্রভাতী ও সংগ্রামী নামে এই তিনটি অরাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন ছিল। আমি অগ্রদূতে যোগদান করি এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ গঠন করার চেষ্টা করি। তখন ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন এডভোকেট সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া। তাঁদের সঙ্গে আমি যোগাযোগ করি ও পরিচিত হই। ছাত্র রাজনীতির পাশাপাশি আমরা জাতীয় রাজনীতি নিয়েও চিন্তা করতে থাকি। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ৬ দফা ঘোষণা করেন। অচিরেই এই ৬ দফা বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে মানুষের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে। তখন আমাকে ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। ৬-দফা আন্দোলন অতিদ্রুত মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। এই আন্দোলনকে দমন করার জন্য পাকিস্তানি সরকার অস্ত্রের ভাষা ব্যবহার করতে থাকে এবং আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার দেখিয়ে তাঁকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে অবরুদ্ধ করা হয়। বঙ্গবন্ধুসহ উক্ত মামলায় আসামী ছিলেন সর্বমোট ৩৫ জন।

উক্ত মামলার খরচ মেটানোর জন্য তদানীন্তন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ এডভোকেট ময়েজ উদ্দিনের স্বাক্ষরে গঠিত হয় “মুজিব তহবিল”। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের থেকে ৫/১০ টাকা করে চাঁদা উঠিয়ে আমি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রফিক উদ্দিন ভূঁইয়ার কাছে (দুই হাজার টাকা) জমা দিয়েছিলাম। উল্লেখ্য যে, টাকার রশিদে বঙ্গবন্ধুর ছবি থাকায় অনেক ছাত্র ৫/১০ টাকা করে চাঁদা দিলেও রশিদ রাখতে চাইত না। এই ছিল তখনকার বাস্তবতা। ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের উদ্যোগে ৬-দফার পক্ষে জনমত গঠনের লক্ষ্যে বিপিন পার্কে একটি ছাত্র জনসভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আমার জীবনে প্রথম আমি ঐ ছাত্র জনতার সভায় বক্তৃতা দেই। ১৯৬৭ খ্রি. আমরা কয়েকজন ছাত্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের শাখা গঠন করি। আমি এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই ও সভাপতি নির্বাচিত হন মেসের উদ্দিন আহমেদ। পরের বছর আমি আবারো সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হই এবং সভাপতি নির্বাচিত হন আবুল ফয়েজ কুতুবী। অন্যদিকে নূর মোহাম্মদ তালুকদারের নেতৃত্বে গঠিত হয় ছাত্র ইউনিয়নের শাখা। আর ফারুকুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত হয় ইসলামী ছাত্র সংঘের শাখা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন স্থানে কিংবা কোন হলে সভা করা তখন নিষিদ্ধ ছিল। আমরা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরের বাইরে টিনের চালা ও বাঁশের বেড়া দিয়ে ছাত্রলীগের একটি অফিস তৈরী করি। উক্ত অফিস উদ্বোধন করেছিলেন এডভোকেট সৈয়দ নজরুল ইসলাম। উক্ত সভায় রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া, এডভোকেট আবদুল হাকিম, এডভোকেট আনিসুর রহমান খান, শামসুল হক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। অনেক ছাত্র আমাদের সাথে যোগাযোগ করতেন এবং ছাত্রলীগের সদস্য হওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করতেন। কিন্তু আমাদের সাথে সম্পর্ক থাকলে কিংবা ছাত্রলীগের সদস্য হলে তখন সরকারি চাকরি না পাওয়ার একটা ভয়ও ছিল। এরই মধ্যে ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও ময়মনসিংহের সন্তান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম কনভোকেশন করতে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন। তাঁর আগমনের দুইদিন পূর্বেই আমাকেসহ ছয় জন ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর ত্যাগ করার জন্য প্রশাসনিক নির্দেশনা জারি করা হয়।

এর ফলে আমাদের সঙ্গে ছাত্রদের যোগাযোগ অনেকটা কমে যায়। এখানে একজন শিক্ষকের কথা বলতেই হচ্ছে এবং তিনি হলেন প্রকৌশল ও কারিগরী অনুষদের তদানীন্তন ডিন প্রফেসর নাজমুল হক। তিনি আমাকে বলেছিলেন, “হলে কোন সমস্যা হলে তুমি আমার বাসায় চলে এসো”। আমরা হলেই ছিলাম। কিন্তু আমার প্রাতঃস্মরণীয় ঐ শিক্ষকের কথা সবসময় মনে হয়। তখন সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্র ফেডারেশন (এন.এস.এফ) ছিল। তবে সাধারণ ছাত্রদের তাদের প্রতি খুব একটা সমর্থন ছিল না। এই ঘটনার ফলে সাধারণ ছাত্ররা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ অনেকটা কমিয়ে দেয়।

এরই মধ্যে ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে ১১-দফা আন্দোলন শুরু হয়ে যায় এবং আমরা সক্রিয়ভাবে ঐ আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। অবস্থা দেখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও কিছুটা বাস্তববাদী হয় এবং সকল প্রকার বিধিনিষেধ উঠে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরেই আমরা প্রকাশ্যভাবে ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড শুরু করে দেই। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ জানুয়ারি ময়মনসিংহ শহরে পুলিশের গুলিতে আলমগীর মিন্টু নামক একজন ছাত্র নিহত হওয়ার সংবাদ পেয়ে আমরা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রতিবাদ মিছিল নিয়ে ময়মনসিংহ শহরের দিকে রওনা হলে কেওয়াটখালী নামক স্থানে পুলিশ ও ইপিআর বাহিনী আমাদের উপর বেপরোয়া লাঠিচার্জ করে আমাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং আমরা গ্রামের দিক দিয়ে হলে ফিরে আসি। আবার ২৮ জানুয়ারি অমরা প্রতিবাদ মিছিল নিয়ে ময়মনসিংহ শহরের দিকে রওনা হলে একই স্থানে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও ইপিআর বাহিনী আমাদের মিছিলের উপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে আমাদের কয়েকজনকে গ্রেফতার করে ওয়াপদা গেস্ট হাউজে নিয়ে যায়। অপর দিকে পুলিশ ও ইপিআর এর হামলায় বহু ছাত্রকে গ্রেফতার করে ময়মনসিংহ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। বিকেলের দিকে আমাদেরকেও উক্ত থানায় নিয়ে যাওয়া হলে আমরা দেখতে পাই যে, প্রায় ৫০জনের মত ছাত্রকে গ্রেফতার করে থানা হাজতে রাখা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষক আমাদেরকে ছাড়ানোর জন্য থানায় আসেন। তাঁদের তদবিরে ও জিম্মায় সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হলেও আমাদের ৫জনকে ময়মনসিংহ জেলা কারাগারে প্রেরণ করা হয়। আমি ছাড়াও গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ছিলেন ফজলে রাব্বি চৌধুরী, আবিদুর রেজা, মাহমুদ হোসেন, ফারুকুল ইসলাম ও মাসুদুল কাদের। অগ্নি সংযোগ, সরকারি সম্পত্তি ভাংচুর ও দেশদ্রোহিতার অভিযোগ এনে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়। মুনসেফ কোর্টে জামিন না হওয়ায় ঢাকা হতে এডভোকেট সৈয়দ নজরুল ইসলাম এসে জেলা জজ আদালতে আমাদের জামিন মঞ্জুরের ব্যবস্থা করেন। ১৮ দিন ময়মনসিংহ জেলা কারাগারে আটক থাকার পর আমরা জামিনে মুক্তি পাই এবং আমরা এখনো জামিনেই রয়েছি। আমরা সাধারণ ছাত্রদের অকুণ্ঠ সমর্থন পাই। আমরা কখনো কোন ব্যবসায়ী কিংবা কোন ঠিকাদারের নিকট থেকে কোন টাকা পয়সা নিতাম না। কোন অনুষ্ঠান করতে হলে ছাত্রদের নিকট হতেই আমরা ৫/১০ টাকা করে চাঁদা নিতাম। নাস্তা কম করে টাকা সঞ্চয় করতাম ও রিক্সায় না উঠে বাসে চলাফেরা করতাম। নীতির প্রশ্নে ছিলাম আমরা আপোষহীন। সাধারণ পোষাক আমরা পরতাম। বিলাসী জীবন যাপনের আমাদের কোন নেশা ছিল না। ছাত্র নেতা হতে হলে সাধারণ ছাত্রদের সাথে ভালো ব্যবহার করতে হবে এবং উন্নত চরিত্রের অধিকারী হতে হবে এটাই ছিল আমাদের সময়ের বৈশিষ্ট্য। ঢাকা কিংবা অন্য কোথাও যেতে হলে আমরা বাসে কিংবা ট্রেনের তৃতীয় শ্রেণির কামরায় যেতাম। এখনকার এক শ্রেণির ছাত্র নেতার মত টাকার প্রতিও আমাদের কোন মোহ ছিল না। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ছিল অকল্পনীয়। আমাদের এক বছরের সিনিয়র হলেই তাঁকে দেখে আমরা চেয়ার ছেড়ে দাঁড়াতাম ও বড় ভাই বলে সম্বোধন করতাম। অনুরূপ সম্মান আবার অমরা আমাদের এক বছরের জুনিয়রদের নিকট হতে পেতাম। এখন আর পারস্পরিক সম্মান বোধ নেই। কার/জিপ কিংবা উন্নত কোন গাড়ির কথা আমরা ভাবতাম না। আমাদের সময় সকল বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং জেলার নেতারাও অনুরূপ ছিলেন। ঢাকা থেকে কেন্দ্রীয় নেতারা আমাদের এখানে আসলে তারাও অনুরূপভাবে যাতায়াত করতেন। ছাত্র নেতা তোফায়েল আহমেদ, আ.স.ম আব্দুর রব, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ, আব্দুল কুদ্দুস মাখন প্রমুখ কেন্দ্রীয় ছাত্র নেতারাও একই ভাবে চলাচল করতেন। কারো কোন ব্যক্তিগত গাড়ি ছিল না। ছাত্র রাজনীতি ছাড়াও আমরা জাতীয় রাজনীতি নিয়েও চিন্তা করতাম।

আমরা যখন ছাত্র তখন কৃষি গ্র্যাজুয়েটদের চাকরিতে কোন পদমর্যাদা ও ভাল বেতন স্কেল ছিল না। এ নিয়ে ছাত্ররা বহু আন্দোলন করতেন। একবার একটানা ১৭২ দিন ছাত্ররা ধর্মঘট করেও কোন ফল পাননি। আমরা চিন্তা করতাম কৃষি নির্ভর এই দেশকে বাঁচাতে হলে ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ারদের সমান পদমর্যাদা ও বেতন কৃষি গ্র্যাজুয়েটদেরও দিতে হবে। সেই সঙ্গে আমরা এটাও ভাবতাম যে, ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ারদের সমান পদ মর্যাদা পেতে হলে কৃষি গ্র্যাজুয়েটদেরও তাদের মত হতে হবে। এই চিন্তা থেকে আমরা দাবি তুলি যে, এইচ.এস.সি পাশ করা ছাত্রদেরকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করতে হবে এবং সকল অনুষদেই ৪ বছরের কোর্স চালু করতে হবে। মেয়েদেরকেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করতে হবে। ছাত্রদের এই দাবির প্রেক্ষিতেই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল অনুষদে এইচ.এস.সি. পাশের পর ৪ বছরের কোর্স চালু করা হয় এবং মেয়েদেরকেও ভর্তির ব্যবস্থা করা হয়।

এই সব ব্যাপারে সরকারের সঙ্গেও আমাদের ঘনিষ্ট সম্পর্ক রাখতে হয়েছে। স্বাধীনতার পর দেশের শিক্ষানীতি প্রণয়নের জন্য বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়। উক্ত শিক্ষা কমিশনের সঙ্গেও আমরা যোগযোগ রক্ষা করে চলি। দেশের কৃষি শিক্ষানীতি কেমন হওয়া উচিত সে ব্যাপারেও আমরা একটি সুপারিশ নামা প্রস্তুত করি। ১৯৭২ খ্রি. এর মাঝামাঝির দিকে উক্ত শিক্ষা কমিশন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে। এর মধ্যেই আমরা ছাত্রলীগের পক্ষ হতে প্রস্তাবিত কৃষি শিক্ষা নীতির উপর একটি প্রস্তাবনা প্রস্তুত করি এবং তা উক্ত শিক্ষা কমিশনের নিকট আমরা হস্তান্তর করি।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি ভবনে অনুষ্ঠিত কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কুদরত-ই- খুদার নিকট প্রস্তাবিত কৃষি শিক্ষা নীতিমালার একটি কপি হস্তান্তর করতে সংযোজিত ছবিতে আমাকে দেখা যাচ্ছে। আমি তখন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলাম।
এই সব ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গেও আমাদের ঘনিষ্ঠ যোগযোগ ছিল। তাঁকেও বিষয়টি আমরা অবগত করেছিলাম। তিনিও বুঝেছিলেন যে, কৃষির উন্নতি করতে হলে কৃষি শিক্ষা ও কৃষি গবেষণার উপর গুরুত্ব দিতে হবে। এরই মধ্যে ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ৩১ডিসেম্বর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারিত হয়। তখন দেশের প্রেসিডেন্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ছিলেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। উক্ত অনুষ্ঠানে আমরা বঙ্গবন্ধুকে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তখন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন প্রফেসর ড. ফজলুর রহিম সাহেব। তিনি আমাদের সঙ্গে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করলেন এবং উক্ত অনুষ্ঠানে আনার জন্য তাঁকে আমরা অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু তিনি বলেছিলেন যে, “আমি খুব সত্বর ওখানে যাবো সমাবর্তন অনুষ্ঠানের পর”। পরে গণভবন হতে বের হয়ে উপাচার্য মহোদয় আমাদেরকে দায়িত্ব দিলেন বঙ্গবন্ধুকে রাজি করানোর জন্যে। ছাত্রদের মধ্যে তখন আমি ছাড়াও সম্ভবত নজিবুর রহমান, ড. আব্দুর রাজ্জাক ও মো. রফিকুল ইসলাম মিয়া ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে রাজী করানোর জন্য আমরা শেখ ফজলুল হক মনি ও তোফায়েল আহমদের শরণাপন্ন হই। পরে শেখ মনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপ করে আমাদেরকে পরের দিনই জানালেন যে, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তিনি গেলে তা রাজনৈতিক রূপ নেয় বিধায় তিনি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যাবেন না। কিন্তু তিনি শেখ মনিকে জানিয়েছিলেন যে, খুব শীঘ্রই তিনি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমন করবেন এবং কৃষির ব্যাপারে নীতি নির্ধারণী কিছু কথা বলবেন। অবশেষে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ খ্রি. ১৩ ফেব্রুয়ারি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর আগমনের কথা জানালেন এবং তদনুযায়ী ১২ই ফেব্রুয়ারি তিনি ময়মনসিংহ সার্কিট হাউজে রাত্রি যাপনের জন্য সন্ধ্যের দিকে সেখানে পৌঁছালেন। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, এ ব্যাপারে ময়মনসিংহের কৃতি সন্তান মুজিব নগর সরকারের অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের বড় একটি ভূমিকা ছিল। ঐদিন রাতেই উপরে বর্ণিত ছাত্ররা সার্কিট হাউজে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া প্রমুখের উপস্থিতিতেই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমরা দেখা করি। বঙ্গবন্ধু আমাদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে যা বলবেন ও করবেন সে বিষয়ে আলাপ করেন। ১৩ ই ফেব্রুয়ারি সকালেই যথারীতি বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে সমাবর্তন মণ্ডপে ভাষণ দিলেন এবং তিনি ঘোষণা করলেন যে, ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ারদের সমান বেতন ও পদ মর্যাদা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটগণও পাবে। তদনুযায়ী ১৩ই ফেব্রুয়ারিকে “কৃষিবিদ দিবস” হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। এভাবেই দেশের জন্য ছাত্রজীবন হতেই আমরা চিন্তা করতাম।

আর একটি কথা এখানে উল্লেখ করতে চাই যে, ছাত্ররাই তাদের নেতা নির্বাচিত করতো। প্রতি শিক্ষা বর্ষেই সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন নেতা নির্বাচিত হতো এবং প্রতি শিক্ষা বর্ষেই বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ও হল সংসদে নির্বাচন করা হতো। ছাত্ররাই ভোটের মাধ্যমে তাদের নেতা নির্বাচন করতো। প্রতি বছরই কেন্দ্রীয় কমিটি, হল কমিটি, বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটি, জেলা কমিটি, মহকুমা কমিটি ও কলেজ কমিটি আলোচনা কিংবা ভোটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচন করতেন। কখনো নেতৃত্ব উপর হতে চাপিয়ে দেওয়া হতো না। এখানে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ার কথা আমি উল্লেখ করছি। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) এর দোতলায় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবজেক্ট কমিটির একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সাবজেক্ট কমিটিতে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের ৩৭জন সদস্য, প্রতি জেলা ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সমন্বয়ে উক্ত সাবজেক্ট কমিটি গঠিত হতো। যথারীতি সাবজেক্ট কমিটির সভা শুরু হয়। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমি উক্ত সভায় উপস্থিত ছিলাম। সভা যথারীতি শুরু হয় ছাত্রলীগের তদানীন্তন সভাপতি আবদুর রউফের সভাপতিত্বে। উক্ত সভাটি পরিচালনা করেন সাধারণ সম্পাদক খালেদ মোহাম্মদ আলী। মোট তিনটি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। তোফায়েল আহমেদ ও আ.স.ম. আব্দুর রবের নেতৃত্বে একটি প্যানেল, নূরে আলম সিদ্দিকী ও আনেয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বে একটি প্যানেল এবং আল-মুজাহিদী ও মান্নান খানের নেতৃত্বে আর একটি প্যানেল নির্বাচনে অংশগ্রহণের অভিপ্রায় ঘোষণা করেন। এর মধ্যে আল-মুজাহিদী ও মান্নান খান সভায় অনুপস্থিত থাকেন। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু একটি বক্তব্য রেখে তাঁর প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। ফলে আ.স.ম রব বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হয়ে যান। তোফায়েল আহমেদ ও জনাব নূরে আলম সিদ্দিকীর মধ্যে সভাপতি পদে ব্যালটে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। তোফায়েল আহমেদ ভোট বেশি পাওয়ায় তিনি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। প্রথানুযায়ী নব নির্বাচিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং বিদায়ী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক একত্রে বসে পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করেন। এটাই ছিল কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কমিটি গঠন প্রক্রিয়া। একই প্রক্রিয়ায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়, হল শাখা কমিটি, জেলা কমিটি, মহকুমা কমিটি ও কলেজ কমিটি গঠিত হতো। কলেজের নিচে ছাত্রলীগের কোন কমিটি গঠিত হতো না। এখন প্রতিটি থানায়, ওয়ার্ডে ও ইউনিয়নেও নাকি ছাত্রলীগের কমিটি গঠিত হয়। ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলসহ অন্যান্য ছাত্র সংগঠনেও বর্তমানে রাজনৈতিক মুরুব্বীরা কমিটি গঠন করে দিয়ে থাকেন। অনেক অছাত্ররাও কমিটির সদস্য হয়ে থাকেন। ফলে ছাত্র নেতাদের সঙ্গে সাধারণ ছাত্রদের কোন সম্পর্ক থাকে না। ছাত্র নেতারা রাজনৈতিক নেতাদের লেজুরবৃত্তি করে থাকে এবং এটা মোটেও শুভ লক্ষণ নয়।

ছাত্রলীগ ছিল বঙ্গবন্ধুর তথা আওয়ামী লীগের প্রাণশক্তি। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি। ঐ সময়ে সারা দেশে শ্লোগান উঠেছিল ‘ভোটের বাক্সে লাথি মারো পূর্বপাকিস্তান স্বাধীন করো, নির্বাচনে যাবে যারা আইয়ুব এর দালাল তারা ইত্যাদি।’ এমনি অবস্থায় নিউ মার্কেটের বিপরীতে অবস্থিত বলাকা সিনেমা হলের তিন তলায় ছাত্রলীগের একটি বর্ধিত সভা হয়। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সমগ্র দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা ও মহকুমা হতে ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ ঐ সভায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। তখন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমি উক্ত বর্ধিত সভায় যোগদান করেছিলাম। তাছাড়া তখন আমি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগেরও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। রাত ৮টায় সভা শুরু হয়। সভার শুরুতেই নির্বাচন বর্জন করে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলার পক্ষে বক্তাগণের বিরাট একটি অংশ জ্বালাময়ী ভাষায় বক্তৃতা শুরু করেন। সভার সভাপতি ছিলেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী এবং সভা পরিচালনা করেন দলের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ। সভার বেশির ভাগ বক্তাই আসন্ন জাতীয় নির্বাচন বর্জন করে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলার পক্ষে বক্তব্য রাখলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ বক্তার বক্তৃতায় ছিল দেশের জাতীয় নির্বাচন বর্জনের ডাক। বক্তৃতা চলে ভোর প্রায় ৪টা পর্যন্ত।

বঙ্গবন্ধু তাঁর বাসায় থেকেই ছাত্রলীগের সভার বক্তাদের বক্তব্যের খবর রাখছিলেন। অবস্থার প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগের ঐ সভা মুলতুবি ঘোষণার পরামর্শ দেন এবং তদনুযায়ী সভার সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী সভাটি মুলতুবি ঘোষণা করেন। এতে তাঁকে উপস্থিত বেশির ভাগ সদস্যের গালিগালাজ শুনতে হয়। ঐ দিন যদি ছাত্রলীগ দেশের জাতীয় নির্বাচন বর্জনের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিত তাহলে আওয়ামীলীগের পক্ষে নির্বাচন করা সম্ভব হতো না। আওয়ামীলীগ যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করতো তা হলে বাঙালি জাতি একচেটিয়া ভোট দিয়ে আওয়ামীলীগকে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯ আসনের ১৬৭ টি আসনে নির্বাচিত করতে পারতো না। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, ময়মনসিংহের নান্দাইল হতে জনাব নূরুল আমিন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে রাজা ত্রিদিব রায় নির্বাচিত হতে পেরেছিলেন। সে সময়ে মানুষের মধ্যে আওয়ামী লীগ তথা বঙ্গবন্ধুর পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। আমি ঐ বছরই ভোটার হই ও আওয়ামী লীগকে ভোট দেই এবং ময়নমনসিংহ সদরে সৈয়দ আব্দুস সুলতান ও জনাব ইমান আলীর পক্ষে জনমত গঠনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ।

www.sangbadlive24.com এ প্রকাশিত সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও সবকিছুই আমাদের নিজস্ব। বিনা অনুমতিতে এই নিউজ পোর্টালের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি। যে কোন বিষয়ে নিউজ/ফিচার/ছবি/ভিডিও পাঠান news.sangbadlive24@gmail.com এই ইমেইলে।