জীবিত অবস্থায় বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন- ‘এই দেশেই আমার জন্মস্থান, এই দেশেই আমার মৃত্যু হবে, এই দেশের মানুষের মাঝেই আমি বাঁচতে চাই’। দেশ, দেশের মানুষের জন্য যিনি তাঁর সারাটা জীবন উৎসর্গ করেছেন, সুযোগ থাকার পরও পা দেননি কোন প্রলোভনে, নিজের জন্য বেছে নেননি সুন্দর-নিরাপদ ও প্রাচুর্য্যরে জীবন। দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থে কখনোই করেননি কোন আপোষ, বরং সহ্য করেছেন নির্মম নির্যাতন, বার বার করেছেন কারাবরণ। চিকিৎসাবঞ্চিত হয়ে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লেও অটুট ছিল তাঁর অনমনীয়, আপোষহীন মনোভাব। দেশ, দেশের মানুষ, দেশের গণতন্ত্র অক্ষুণœ রাখতে যে নেত্রীর এতো ত্যাগ-তিতিক্ষা, সেই নেত্রীকেও দেশের মানুষ যেন বিদায় বেলায় উপহার দিলেন হৃদয় নিঙড়ানো শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা। রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউতে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হলেও যেদিকে চোখ যায়, শুধু মানুষ আর মানুষ। যাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে গ্রেফতার হয়েছেন, জেল খেটেছেন; সেই কোটি কোটি মানুষের চোখের পানি, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় চিরবিদায় নিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
কোটি মানুষের অংশগ্রহণে এই জানাজার চারদিক ছিল শোকে স্তব্ধ। এতোই লোকসমাগম হয়েছিল যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা ঠেকাতে পারেনি। যেন একটি কফিনের পাশে পুরো বাংলাদেশ। ইতিহাসের সাক্ষী হলো দেশের মানুষ। দলমত-নির্বিশেষে শোকার্ত মানুষের এই ঢল প্রমাণ করল, রাজনীতির ‘আপোষহীন নেত্রী’ বেগম খালেদা জিয়া মানুষের হৃদয়ের কতটা গভীরে স্থান করে নিয়েছিলেন। গত মঙ্গলবার সকালে তার মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই শোকে ছেয়ে যায় গোটা দেশ। শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে গোটা জাতি। আর গতকাল তাঁর জানাজায় অংশ নিতে ছুটে আসেন সারাদেশের কোটি মানুষ। তিনি বিএনপির নেত্রী হলেও অসাধারণ নেতৃত্বগুণ, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, অমায়িক আচার-আচরণ, কথা-বার্তা-বাচনভঙ্গি, দূরদৃষ্টির কারণে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের নেত্রীতে। তাই তার মৃত্যু ছুঁয়ে গেছে সব বয়সী, সব দল, নির্দলীয়, সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে। তাইতো তাঁর জানাজায় ছুটে আসেন শিশু-কিশোর, যুবক-বৃদ্ধসহ সব বয়সী নারী-পুরুষ। ছিলেন দেশের হক্কানী আলেম-ওলামা, মুফতী, পীর-মাশায়েখ, ইসলামী স্কলার, ডান-বাম-ইসলামীসহ সব ধারার রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, রিকশা চালক, কৃষক-শ্রমিক, দোকানদার-ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সব শ্রেণি পেশার কোটি মানুষ। জানাজায় অংশ নেয়া কোটি মানুষের মহাসমুদ্রের কারণে সংসদ ভবনের দক্ষিণপ্লাজায় কফিন রেখে জানাজা শুরু হলেও এটি কেন্দ্র করে মানিকমিয়া এভিনিউ হয়ে একদিকে আগারগাঁও, বিজয় সরণী, জাহাঙ্গীর গেট, তিব্বত, আরেকদিকে ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর, অন্যদিকে মিরপুর সড়কের একদিকে শ্যামলি অন্যদিকে আড়ং মোড় হয়ে ধানম-ির কলাবাগান সড়ক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেয়া মানুষের বিস্তৃতি। কোটি মানুষের অংশগ্রহণে এমন জানাজা শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের ইতিহাসে স্মরণকালের সর্ববৃহৎ। রাজধানী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী গতকাল বুধবার বেলা ২টায় জানাজা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা অনুষ্ঠিত হয় বিকেল ৩টা ৩ মিনিটে। তবে সকাল থেকেই জানাজায় অংশগ্রহণের জন্য মানিক মিয়া এভিনিউতে জড়ো হতে থাকেন সারাদেশ থেকে আসা হাজার হাজার মানুষ। সকাল ১০টার আগেই মানিক মিয়া এভিনিউ হয়ে উঠে লোকে লোকারণ্য। আর ১১টা বাজার আগেই জানাজার জনস্রোত ছড়িয়ে পড়ে মিরপুর সড়ক, খামারবাড়ি, বিজয় সরণী, ফার্মগেট ছাড়িয়ে আশপাশের এলাকায় উপচে পড়ে ভিড়। তবে এরপর সময় যতই গড়িয়েছে ততই বিস্তৃত হয়েছে জানাজার দীর্ঘ। বেড়েছে জানাজায় অংশ নেয়া মানুষের সংখ্যা। কোটি মানুষের ঢলে কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণী, আগারগাঁও, মিরপুর সড়কে বন্ধ হয়ে যায় যান চলাচল। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে পায়ে হেঁটেই মানুষ অংশ নিতে আসেন জানাজায়। ঢাকামুখী মানুষের এই স্রোত চলতে থাকে জানাজার নামাজ শুরুর আগ পর্যন্ত। রাজধানীর বিভিন্ন বাস টার্মিনাল, কমলাপুর, বিমানবন্দর, তেজগাঁও রেল স্টেশন, সদর ঘাটে দেখা যায় দলে দলে মানুষ আসছেন জানাজায় অংশগ্রহণ করতে। অনেকেই আবার বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস, মাইক্রোবাস ভাড়া করে আসেন জানাজায় অংশ নিতে। আর দিনভর মেট্রোরেলে কয়েক লাখ মানুষ আসেন মানিক মিয়া এভিনিউয়ে।
সকাল ৮টার দিকে মানিক মিয়া এভিনিউতে দেখা যায়, হাজার হাজার মানুষ সেখানে অবস্থান করছেন। আর আগারগাঁও, বিজয় সরণী, ফার্মগেট, বিভিন্ন এলাকা হয়ে মানুষ হেঁটে ছুটছেন সেদিকে। ময়মনসিংহ থেকে আসা মজিবর রহমান নামের একজন বলেন, প্রিয় নেত্রীর মৃত্যুর খবর শুনে ঢাকায় এসেছি। শেষ বিদায়ে থাকবো না তা কী করে হয়। তিনি রাত যাপন করেছেন কমলাপুরে। সেখান থেকে ভোরেই রওনা হয়েছেন মানিক মিয়া এভিনিউয়ের দিকে। নোয়াখালী থেকে আসা কমল বলেন, ভোর ৪টায় ফার্মগেট পৌঁছেছি। তখন আর কোথায় উঠবো। এক দোকানের সামনে সময় কাটিয়েছি। জানাজায় অংশ নিয়ে তারপর ফিরব। নাটোর থেকে আসা মহসিন নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, রাতে আমরা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছি। আমাদের সঙ্গে আরও অনেকেই আসছেন আশপাশের এলাকা থেকে। এখনো অনেকেই পথে রয়েছেন। সবাই দেশনেত্রীর জানাজায় থাকবো।
কোটি মানুষের মহাসমুদ্র : বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় ইতিহাসের সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ অংশ নেয়। তাই জানাজাস্থল সংসদ ভবন এলাকা-মানিকমিয়া এভিনিউকে কেন্দ্র করে লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকা। আশে পাশের সড়কে ছিল মানুষের স্রোত। এ যেন এক মহাসমুদ্র। মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে আড়ং হয়ে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত, আসাদগেট থেকে শিশু মেলা হয়ে শ্যামলী স্কয়ার পর্যন্ত, ওদিকে আড়ং এলাকা থেকে ধানমন্ডি-২৭ নম্বর বাংলাদেশ চক্ষু হাসপাতাল পর্যন্ত এলাকায় জনসাধারণ রাস্তায় দু’পাশে দাঁড়িয়ে বেগম জিয়ার জানাজায় অংশ নেন। এছাড়াও আড়ংয়ের পিছনে সাইডে লালমাটিয়ার ওলি-গলিতে হাজার হাজার মানুষ অংশ নেন জানাজায়। শুধু তাই নয়, উড়ালসড়কও বন্ধ হয়েছে জনস্রোতে। অন্যদিকে কাওরান বাজার, পান্থপথ, বাংলা মোটর, ফার্মগেট, তেজগাঁও, বিজয় সরণী, তিব্বত, মহাখালী, আগারগাঁওসহ বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছিল কোটি মানুষের ঢল। সবার একটাই উদ্দেশ্য- নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে শেষ বিদায় জানানো। আবেগ আর শোকের মিছিল।
সরেজমিনে দেখা যায়, বুকে কারো বা কালো ব্যাচ। কেউ বা দোয়া পড়তে পড়তে যাচ্ছেন। আশপাশের আবাসিক এলাকার ভেতরের অলিগলি থেকেও আসছিলেন দলে দলে মানুষ। সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছিল না তিল ধারণের ঠাঁই। তাই সড়ক-ফুটপাথ ছাড়িয়ে অলিতে-গলিতে যে যেখানে সুযোগ পেয়েছেন সেখানেই দাঁড়িয়ে যান জানাজায়। তারা সকলেই ভালোবাসা জানাতে আসেন আপোষহীন নেত্রীকে। অনেকেই বলছেন, জানাজায় এতো মানুষ হতে পারে তা কখনো দেখিনি।
জানাজায় অংশ নিতে আসা পুরান ঢাকার সত্তরোর্ধ্ব ব্যবসায়ী হাজী আবদুল লতিফ বলেন, ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জানাজা দেখেছিলাম। ভেবেছিলাম, বাংলাদেশে আর হয়তো এমন দৃশ্য দেখব না। আজ ৪৪ বছর পর তাঁর স্ত্রীর জানাজায় এসে মনে হচ্ছে, ইতিহাস আবার ফিরে এসেছে। এমন ভালোবাসা জোর করে আদায় করা যায় ন। এটা আল্লাহ প্রদত্ত বিষয়। তিনি যাকে সম্মান দেন, কেউ তাকে অসম্মান করতে পারে না।
শুধু দলীয় নেতাকর্মী নন, জানাজায় অংশ নিয়েছেন সাধারণ চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, রিকশাচালক থেকে শুরু করে দেশের সর্বস্তরের মানুষ। ভিড়ের চাপে সংসদ ভবনের আশপাশের গাছ, ফুটপাত, এমনকি নিকটস্থ ভবনগুলোর ছাদও ছিল লোকে লোকারণ্য। জানাজার ঠিক আগমুহূর্তে খালেদা জিয়াকে নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের কান্নাবিজড়িত বক্তৃতার পর যখন তারেক রহমান তাঁর মায়ের জন্য দোয়া চাইলেন, পিনপতন নীরবতায় তখন পুরো এলাকা যেন দেশনেত্রীর বিরহ-বেদনায় ভার হয়ে ওঠে।
বেগম জিয়ার জানাজায় নারীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। জানাজাস্থলের মূল অংশে নারীদের প্রবেশাধিকার সীমিত থাকলেও আশপাশের নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে হাজারো নারী অশ্রুসজল চোখে বিদায় জানিয়েছেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীকে। তাঁদের অনেকের হাতে ছিল কালো ব্যাজ, মুখে ছিল শোকের ছায়া। বিশ্লেষকদের মতে, বেগম খালেদা জিয়ার এই জানাজা কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অন্যতম বড় ঘটনা। দীর্ঘ রোগভোগ, কারাবাস আর নানা চড়াই-উৎরাইয়ের পর তাঁর এই বিদায় প্রমাণ করে, ক্ষমতার বাইরে থেকেও একজন নেতা কীভাবে গণমানুষের মনে বেঁচে থাকতে পারেন।
বেলা ৩ টা ৩ মিনিটে খালেদা জিয়ার জানাজার নামাজ শুরু হয়। জানাজার নামাজ পড়ান জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক। এর আগে বেলা পৌনে তিনটার দিকে জানাজা কার্যক্রম সঞ্চালনা শুরু করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। তিনি খালেদা জিয়ার জীবন, রাজনৈতিক সংগ্রাম, সাফল্য ও নিগ্রহের শিকার হওয়ার ঘটনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দল-মতনির্বিশেষে সবার শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সম্মান নিয়ে খালেদা জিয়া বিদায় নিলেন। তিনি রেখে গেলেন অনন্য উদাহরণ।
জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বাম পাশে দাঁড়ান তারেক রহমান। তারপর এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার। এছাড়াও জানাজায় সামনের সারিতে অংশ নেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনীপ্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, আদিলুর রহমান, ফাওজুল কবির খান, আ ফ ম খালিদ হোসেন, আলী ইমাম মজুমদার, সি আর আবরার, এম সাখাওয়াত হোসেন, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
বিএনপি নেতাদের মধ্যে মহাসচিব ছাড়াও স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, এজেডএম জাহিদ হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, কেন্দ্রীয় নেতা লুৎফুজ্জামান বাবর, অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, আব্দুস সালাম আজাদ, ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, ড. মোর্শেদ হাসান খান, নজরুল ইসলাম আজাদ, শায়রুল কবির খানসহ বিএনপির সর্বস্তরের নেতারকর্মীরা জানাজায় শরিক হোন। জানাজায় দেখা গেছে কবি ফরহাদ মজহারকেও।
রাজনীতিকদের মধ্যে গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, এনসিপির হাসনাত আবদুল্লাহ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মামুনুল হক, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের জুলফিকার বুলবুল চৌধুরী, লেবার পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান ইরান ও গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের আহমাদুল্লাহও জানাজায় অংশ নেন।
বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাবিক, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডি এন ধুঙ্গেল, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টের উচ্চ শিক্ষা, শ্রম ও দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রী আলি হায়দার আহমেদ, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা, শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিজিতা হেরাথ। চীন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন মিশনের প্রধানরাও তাদের দেশের পক্ষে খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা জানাতে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ৩২টি দেশের কূটনীতিক ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বিদেশি কূটনীতিকদের জন্য নির্ধারিত স্থানে দাঁড়িয়ে তাঁরা এ সময় প্রত্যক্ষ করেন বাংলাদেশের মানুষের এই আবেগঘন বিদায় মুহূর্ত।
লাল-সবুজে মোড়ানো গাড়িতে কফিন : গত মঙ্গলবার রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেগম খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করার পর সেখানেই রাখা হয় তার লাশ। গতকাল সকাল ৯ টা ১৭ মিনিটে লাল-সবুজের পতাকার রঙে মোড়ানো গাড়িতে করে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কফিন প্রথমে নেয়া হয় গুলশানে খালেদা জিয়ার দীর্ঘদিনের বাসভবন ফিরোজার পাশে তারেক রহামনের গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাসায়। সেখানে বেগম খালেদা জিয়ার জানাজার আগে পরিবারের সদস্যরা এবং আত্মীয়স্বজনরা তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। এছাড়াও দলের চেয়ারপারসনকে শেষবারের মতো এক নজর দেখেন স্বজন ও দলের শীর্ষ নেতারা। এক আবেগঘন পরিবেশের অবতারণা হয়। এসময় ছেলে তারেক রহমানসহ স্বজনরা মরহুমার রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া-দরুদ এবং অজিফা পাঠ করেন।
গুলশান থেকে সংসদ ভবন
গুলশানের বাড়ি থেকে সকাল ১১ টা ৫ মিনিটে মরহুমা মা বেগম খালেদা জিয়ার লাশ নিয়ে বড় ছেলে তারেক রহমান নামাজে জানাজার স্থল শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার উদ্দেশে রওয়ানা দেন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যবৃন্দ, সিনিয়র নেতৃবৃন্দ এবং মরহুমার পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজন সঙ্গে ছিলেন। বাংলাদেশের লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা মোড়ানো লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স গতকাল বুধবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে সংসদ ভবনের সামনে পৌঁছায়। বিকেল পৌনে তিনটার দিকে গাড়িবহরে পৃথক দুইটি বাস ও বুলেটপ্রুফ জিপে করে জানাজাস্থলে পৌঁছান তারেক রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্য এবং দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।
জানাজার আগে পরিবারের তরফে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান মায়ের জন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করেন। তিনি বলেন, আমি মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার বড় সন্তান তারেক রহমান। আমি উপস্থিত সকল ভাইয়েরা এবং বোনেরা-যারা উপস্থিত আছেন, মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া জীবিত থাকাকালীন অবস্থায় যদি আপনাদের কারো কাছ থেকে কোনো ঋণ নিয়ে থাকেন, দয়া করে আমার সাথে যোগাযোগ করবেন। আমি সেটি পরিশোধের ব্যবস্থা করবো ইনশাআল্লাহ। একইসঙ্গে উনি জীবিত থাকাকালীন অবস্থায় উনার কোনো ব্যবহারে, উনার কোনো কথায় যদি কেউ আঘাত পেয়ে থাকেন, তাহলে মরহুমার পক্ষ থেকে আমি আপনাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থী। দোয়া করবেন। আল্লাহ তায়ালা যাতে উনাকে বেহেশত দান করেন।
জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সেই গাড়িতে করেই তাঁর লাশ নেয়া হয় জিয়া উদ্যানে দাফনের জন্য। সংসদ ভবনের উত্তর প্রান্তে জিয়া উদ্যোনের প্রবেশ পথে লাশবাহী গাড়ি পৌঁছানোর পর গাড়ি থেকে লাশ নামিয়ে সশস্ত্র বাহিনীর হাতে তুলে দেন ছেলে তারেক রহমান। সেখান থেকে ফুলে সজ্জিত একটি বাহনে তুলে পার করা হয় প্রবেশ পথের ব্রিজ। এরপর সেখান থেকে তুলে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা কাঁধে তুলে নিয়ে যান কবরের কাছে। পরে সেখানে বেগম জিয়ার স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের বাম পাশে দাফন করা হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর লাশ।
স্বামীর কবরের পাশে দাফন : পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গতকাল বুধবার বিকেল ৪টা ৫০ মিনিটের দিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দাফন সম্পন্ন হয়। তাঁকে জাতীয় সংসদ ভবন সংলগ্ন জিয়া উদ্যানে তাঁর স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে দাফন করা হয়। বেগম খালেদা জিয়ার কবরে সবার আগে নামেন বড় ছেলে ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নিজ হাতে তিনি তাঁর মাকে কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত করে মাটি দেন। বেগম খালেদা জিয়ার দাফনের পর সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। এর আগে সমাধির কাছাকাছি নেয়ার পর খালেদা জিয়ার কফিন কাঁধে নিয়ে যান সেনা ও নৌবাহিনীর সদস্যরা। দাফনের প্রক্রিয়া চলার সময় তারেক রহমান, স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, ছোটভাই আরাফাত রহমানের স্ত্রী শামিলা রহমান, তাঁর দুই মেয়ে জাহিয়া রহমান ও জাফিরা রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা এবং বিএনপির নেতাকর্মী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা দাঁড়িয়ে শোক ও শ্রদ্ধা জানান। সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে তারেক রহমান তার বাসায় পৌঁছান। পরে রাত ৮ টার দিকে তারেক রহমান গুলশান কার্যালয়ে যান এবং সেখানে শ্রীলংকার পররাষ্ট্র মন্ত্রী বিজিথা হেরাথ ও বাংলাদেশে নিযুক্ত শ্রীলঙ্কার হাইকমিশনার ধর্মপাল বিরাক্কোডির সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন।
সংসদ ভবন ও জিয়া উদ্যান এলাকায় কড়া নিরাপত্তা : বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা ও দাফন কার্যক্রমকে ঘিরে মঙ্গলবার রাত থেকেই কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বুধবারও রাজধানীর সংসদ ভবন ও জিয়া উদ্যানে ছিল কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা।


