আবুল বাশার মিরাজ: পৃথিবীতে প্রায় ২ শতাধিক স্বাধীন দেশের পতাকা রয়েছে। আমার খুব করেই মনে হয়, এত পতাকার মধ্যে সেরা পতাকাটি অবশ্যই আমাদের। কারণ, লাল সবুজের এই পতাকাটি অর্জন করতে আমাদের অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদ ও ২ লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ। পৃথিবীর খুব কম দেশই আছে, যারা আমাদের মতো এতো রক্ত ঝড়িয়েছে। আর এ কারণে জাতি হিসাবে বিশ্বের কাছেও অনেক বেশি গর্বিত।
তবে স্বাধীনতা অর্জনের পরও গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে ছাত্র জনতার আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল দেশের বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান এবং সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসনামলে এসব আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে।
বলতে গেলে, বাংলাদেশে ছাত্র জনতার আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ। এদেশের ছাত্রদের সব আন্দোলই সফল হয়েছে, ছাত্রদের দাবি পূরণ হয়েছে। এদের মধ্যে ভাষা আন্দোলন (১৯৫২) – বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন (১৯৬২) – শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ১১ দফা আন্দোলন (১৯৬৯) – পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ (১৯৭১) – স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন (১৯৮২-১৯৯০) – এই সময়ের ছাত্র আন্দোলন স্বৈরাচারী শাসনের পতন, কোটা সংস্কার আন্দোলন (২০১৮) – সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলন এবং সর্বশেষ শেখ হাসিনার পদত্যাগ (২০২৪)- বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন উল্লেখযোগ্য।
এছাড়াও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছাত্রদের বিভিন্ন দাবী নিয়ে আন্দোলনগুলো নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। সড়ক নিরাপত্তা, কোটা সংস্কার, এবং শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন সহ বিভিন্ন ইস্যুতে ছাত্ররা রাস্তায় নেমেছে। তাদের এ আন্দোলনগুলো জনমনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
২০১৮ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর সারা দেশে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে লাখ লাখ ছাত্র রাস্তায় নেমে আসে। এই আন্দোলন সরকারকে বাধ্য করে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন আইন প্রণয়ন করতে। তবে আন্দোলনের সময় পুলিশের নির্যাতন এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর হামলা আন্দোলনকারীদের আরও ক্ষুব্ধ করে তোলে।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০১৮ সালে বড় ধরনের আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনে ছাত্রদের সঙ্গে সাধারণ জনগণও যুক্ত হয়। সরকার প্রাথমিকভাবে এই দাবী মানতে রাজি হলেও পরে বিভিন্ন দিক থেকে চাপে পড়ে অবস্থান পরিবর্তন করে। ফলে আন্দোলনকারীরা ক্ষুব্ধ হয় এবং আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়।
২০২৪ সালে বাংলাদেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে নতুন ইতিহাস রচনা করলো। এই আন্দোলন প্রধানত কোটা সংস্কার নিয়ে শুরু হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে প্রতিষ্ঠিত কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহাল করার উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের ফলে এই প্রতিবাদ পুনরায় শুরু হয়। আন্দোলনটি জুলাই মাসের শুরুতে শুরু হয় এবং এটি দ্রুত সহিংসতায় রূপান্তরিত হয়। ছাত্ররা ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে রাস্তায় নেমে আসে, এবং রাস্তা অবরোধ করে। শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের “রাজাকার” বলে উল্লেখ করেন, যা ছাত্রদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ায়। তার বক্তব্যে প্রভাবিত হয়ে ছাত্ররা সহিংস আন্দোলনে যুক্ত হয় এবং পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
আন্দোলনের প্রধান দাবি ছিল কোটা ব্যবস্থার সংস্কার এবং মেধার ভিত্তিতে সরকারি চাকরি প্রদান। তবে, আন্দোলনের সময় পুলিশ ও সরকার দলীয় সমর্থকদের দ্বারা ব্যাপক দমন-পীড়ন চালানো হয়। এতে অনেক ছাত্র আহত হয় এবং নিহত হয়। আন্দোলনের কারণে সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকার বিরোধী ব্যাপক জনমত সৃষ্টি হয় এবং বিরোধী দলগুলোও ছাত্রদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে।
সরকার পরিস্থিতি শান্ত করতে আন্দোলনকারীদের সাথে আলোচনা করতে রাজি হয় এবং উচ্চ আদালত কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য একটি নতুন রায় প্রদান করে। তবে আন্দোলনের সময় ঘটে যাওয়া সহিংসতা ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে প্রতিবাদকারীদের ১ দফা দাবি হয়ে উঠে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ। বিশেষ করে বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের অভিযোগে বর্তমান সরকারকে বিদায়ের দাবিতে আন্দোলন আরও তীব্র হয় ও শেষপর্যন্ত শেখ হাসিনা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
ছাত্র জনতার আন্দোলন শুধু একটি সরকারের বিদায়ের দাবিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবির প্রতিফলন। দেশের যুবসমাজের এই জাগরণ দেশকে একটি নতুন পথে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে স্বচ্ছতা, গণতন্ত্র এবং সামাজিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা হবে। এক কথা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এখন নিজেদের অধিকার এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক বেশি সচেতন ও সক্রিয়। এই সচেতনতা এবং সক্রিয়তা দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
তবে খেয়াল রাখতে হবে, এই সুযোগে কোন সুযোগ সন্ধ্যানী কোন সম্পদায়, গোষ্ঠী কিংবা কোন দুঃস্কৃতিকারী মানুষ সরকারি, বেসরকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা, লুটতরাজ না করে। আমাদের মনে রাখতে হবে, দিনশেষে আমরা সবাই মানুষ, আমরা সবাই এদেশের স্বাধীন জনগণ। নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে আইনের মাধ্যমে সব ঘটনার বিচার করা সম্ভব। আসুন নতুন করে শপথ করি, লাল সবুজের এই বাংলাদেশ আমার, আপনার সকলের। আর এই দেশের মঙ্গল কামনায় হউক আমার, আপনার সবার দৃঢ় অঙ্গিকার।
লেখক: কৃষিবিদ ও সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি, ময়মনসিংহ
www.sangbadlive24.com এ প্রকাশিত সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও সবকিছুই আমাদের নিজস্ব। বিনা অনুমতিতে এই নিউজ পোর্টালের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি। যে কোন বিষয়ে নিউজ/ফিচার/ছবি/ভিডিও পাঠান news.sangbadlive24@gmail.com এই ইমেইলে।


