বদরুল শাওন: শিকার প্রাণীর সহজাত প্রবৃত্তি। যার মাধ্যমে শিকারি প্রানীরা খাদ্য সংগ্রহ করে। বিশেষ করে মাংসাশী ও সর্বভুক প্রানীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কোয়ালিটি শিকার করতে জানা। মানুষের জন্যও তাই। মানব ইতিহাসে মাছ শিকার করা অন্যতম আদিম পেশা ও কলা হিসেবে বিবেচিত। যা এখনো টিকে আছে। জীববিজ্ঞানের একটি শাখা Ethology আলোচনা করে প্রাণীর আচরণ নিয়ে। কিভাবে বিভিন্ন প্রানী পারস্পরিক যোগাযোগ করে, খাবার খোঁজে কিংবা শিকারি প্রাণীদের এড়িয়ে জীবন বাঁচায়! ধরা যাক সামুদ্রিক মাছ টুনা শিকার করবো আমরা। প্রচলিত ছিপ-টোটা নিয়ে সমুদ্রে নেমে গেলে কাজ হবে? হবে হয়তো কিছু ক্ষেত্রে। কিন্তু টুনা মাছের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে যদি এদের চলাচলের প্যাটার্ন, রাস্তা ট্র্যাক করা যায়! তাহলে সুক্ষ ও কার্যকর ভাবে শিকার করা সম্ভব হবে! যাতে Ethology কাজে আসবে।
আবার একদম নির্বংশ করে দিলে টুনা মাছ খেতে পারবো না, পরিবেশেরও প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হবে। এসবের প্রভাব আলোচনা করে Ecology.
কি পরিমাণ টুনা মাছ, কোন সময়ে ধরা থেকে বিরত থাকলে বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হবে না জানার জন্য দরকার Physiology-র ধারণা!বাংলাদেশের পলিসি লেভেলে এর একটা বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায় ইলিশ মাছ আহরণের ক্ষেত্রে। নাহ, আমি টনকে টন ইলিশ মাছ ধরে ভারতে গিফট পাঠানোর কথা বলছি না। বলছি প্রতি বছর ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত জায়গাগুলোতে ১৫-২৪ অক্টোবর ( ১-১০ আশ্বিন ) ডিমওয়ালা ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা, জাটকা ধরায় নিষেধাজ্ঞা প্রভৃতি রেগুলেশনের কথা।
এ তো গেলো অতীত ও বর্তমানের কথা। ভবিষ্যতের বাংলাদেশে জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার পড়াশোনা কি কি কাজে আসবে?বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের শাসনামলে ২০১২ সালের ১৪ই মার্চ সমুদ্র আইন বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালে বাংলাদেশ- মিয়ানমার সমুদ্র বিরোধ সংক্রান্ত রায়ে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে ১.১১.৬৩১ বর্গ কিমি. এলাকা প্রাপ্ত হয়। ২০১৪ সালের ৭ জুলাই স্থায়ী সালিশী আদালতে বাংলাদেশ-ভারতের সমুদ্র বিরোধ সংক্রান্ত রায়ে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে ১৯,৪৬৭ বর্গ কিমি, এলাকা প্রাপ্ত হয়। এইসব বিজয়ের ফলে নতুন সমুদ্র সীমানায় বিশাল সম্ভাবনাময় ব্লু ইকোনোমিক ডেভেলপমেন্টের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সেই সমুদ্রে সামুদ্রিক মাৎস্য সম্পদ আহরণের জন্য বিদেশী সহায়তাও চেয়েছে সরকার। কারণ আমাদের সেসব প্রযুক্তি সক্ষমতা, বিজনেস সেটাপ নেই এখনো। সমুদ্র সীমা বিজয়ের এক যুগ পেরোলেও দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি নেই সমুদ্র সম্পদ আহরণে।
কিন্তু অবাক করা বিষয় হচ্ছে আমাদের দেশে আছে লাখ লাখ বেকার। যারা ঘুষ দিয়ে চাকরি নেয়ার জন্য জমি বিক্রির টাকা হাতে রেখেছে অথবা লোন নিবে বলে ঠিক করে রেখেছে। শুধু তাই নয়। আমাদের আছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান। যেখানে আছে মাৎস্যবিজ্ঞানে উচ্চতর জ্ঞান আহরণের জন্য ডেডিকেটেড “মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ”। এই বিশ্ববিদ্যালয়েই আছে মাৎস্য সম্পদের মতো কৃষিতে ব্যবহৃত ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার জন্য ডেডিকেটেড “কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদ”! তাহলে সমস্যা কোথায়? কেন এতো বছর পর এখন আমরা বিদেশীদের দিকেই চেয়ে আছি?একাধিক কারণ আছে। এর মধ্যে থট প্রসেসের একটা প্রবলেম হচ্ছে আমাদেরকে বোঝানো হয়েছে, “কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হলে বিসিএসে কোটা পাওয়া যায়। একবার বিসিএস লেগে গেলেই লাইফ সেট।” এর ফলে এমন স্পেসিফিক্যালি টার্গেটেড জ্ঞানভান্ডার থেকে বেরিয়েও উদ্যোগী স্পৃহা নেই বললেই চলে!
আবার Agri. Engg. সিলেবাসে (২০১৬-১৭ সেশেন আমি যেটা পেয়েছি সেটার কথা বলছি) ফিশারিজ টেকনোলজি নিয়ে তেমন কিছু পাইনি। বেশিরভাগই মাঠফসল কেন্দ্রিক। আরেকটা গুরুতর কারণ সিস্টেমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব। যার দরুণ গভমেন্টের সুপারভিশনে থাকা ইনস্টিটিউশন কিংবা ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্সটিটিউশন গুলোকে এখন আর পয়সা দিয়ে বিশ্বাস করতে পারিনা আমরা! বিভিন্ন সেক্টরের বড় বড় কর্পোরেটদের ডিঙ্গিয়ে ডেভেলপিং সেক্টর গড়ার কাজে নতুন বিনিয়োগ করার স্কোপটাও করা কঠিন দৃশ্যমান হয়েছে।
কি করা যেতে পারে? বাস্তবসম্মত যৌক্তিক পলিসি তো আমার একার পক্ষে দেয়া সম্ভব না। তবুও
-সোশ্যাল এক্সপেকটেশন ও সিস্টেমের এপ্রোচে পরিবর্তন আনা দরকার। যাতে করে বিসিএস কিংবা সরকারি চাকরি কেন্দ্রিক চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে শিক্ষার্থীরা।
-কৃষি খাতে প্র্যাক্টিকেল প্রবলেম গুলো সল্ভ করে পাওয়া প্রযুক্তি গুলো নিয়ে “প্রযুক্তি পণ্য ও সেবা কোম্পানি” দাঁড়াতে সহায়তা করা উচিৎ সরকারের। যেগুলোর সক্ষমতায় থাকবে দেশ ছাড়িয়ে “বিদেশে প্রযুক্তি রপ্তানি” করতে পারা।
-বাংলাদেশ রাইস রিসার্চ ইন্সটিটিউটের নিজস্ব “অত্যাধুনিক কৃষি যন্ত্র ম্যানুফ্যাকচারিং ফ্যাসিলিটি” আছে। এমনিভাবে মাৎস্য সম্পদ কেন্দ্রিক “ম্যানুফ্যাকচারিং ফ্যাসিলিটি” করা উচিৎ। যেখানে স্পেসিফিক্যালি সামুদ্রিক মাৎস্য সম্পদ আহরণ উপযোগী প্রযুক্তি পণ্যও তৈরি করা যাবে।
-বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের “কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদ” কে মাৎস্য সম্পদে উচ্চতর জ্ঞানে পরিপূর্ণ “ফিশারিজ অনুষদ”, মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট, শিপ ইন্ডাস্ট্রি এর জয়েন্ট কোলাবোরেশনে “ইন্ডাস্ট্রি ফ্রেন্ডলি” প্র্যাক্টিকেল কাজের সুযোগ করে দেয়া উচিৎ। যাতে করে সামুদ্রিক মাৎস্য সম্পদে আহরণে উপযুক্ত প্রযুক্তি উদ্ভাবন কিংবা ডেভেলপ করে পরবর্তীতে “প্র্যাক্টিকেলি ব্যবহার ও বিক্রয় উপযোগী পণ্য” তৈরি, ফিশিং সার্ভিস, ফিশ প্রসেসিং-স্টোরেজ প্রভৃতি ভ্যালু চেইনে নিযুক্ত হতে পারে শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি যেন তাদের জব, গ্র্যান্ট ও রিকগনিশনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার দিকেও নজর দেয়া হয়।
-ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্সটিটিউশনগুলোর কার্যক্রমে স্পষ্টতা ও জবাবদিহিতা আনা প্রয়োজন। যাতে করে মানুষ আস্থা করে ব্যাংকে পয়সা জমা করতে পারে। এটা দুশ্চিন্তা করতে না হয় যে, নামসর্বস্ব কোম্পানিকে পরিচালকগণ ১০ কোটি টাকার অধিক (শ কোটি, হাজার কোটি) ঋণ না দিয়ে দেয়!
সবশেষে বলবো সুচিন্তিত ও পরিকল্পিত ভাবে এগুলে আমাদের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট, বিশাল সমুদ্রের সম্ভাবনাময় সুনীল অর্থনীতির মতো সম্পদ-সম্ভাবনাগুলোর মাধ্যমে বেকারত্ব, ইকোনোমিক ক্রাইসিসের মতো সংকটগুলো কাটিয়ে উঠতে পারবে। যাতে অবশ্যই আমার বিশ্ববিদ্যালয় অগ্রনী ভুমিকা রাখতে সক্ষম বলে বিশ্বাস করি।
লেখক: শিক্ষার্থী, কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।


