ড. এ. বি. এম আরিফ হাসান খান রবিন: এগ্রোমেটিওরোলজি কৃষির সাথে সম্পর্কিত আবহাওয়া বিজ্ঞানের বিশেষ শাখা যা বায়ুমন্ডল, আবহাওয়া, জলবায়ু, বাস্তুতন্ত্রের প্রধান চক্র- পানিচক্র, কার্বনচক্র ও নাইট্রোজেনচক্র এসবের সাথে কৃষিজ উপাদান- মাঠফসল, উদ্যানতত্ত্ব, প্রাণীসম্পদ ও মৎস্যসম্পদ সম্পর্কিত জ্ঞান, গবেষণা, নতুনের প্রবর্তন ও উদ্ভাবিত জ্ঞানের প্রয়োগ। কৃষির উৎপাদন বাড়ানোর জন্য আবহাওয়া ও বায়ুমন্ডলের উপাদান তাৎক্ষণিক অবস্থা, বিকিরণ, তাপমাত্রা, বায়ুচাপ, বায়ুপ্রবাহ, আর্দ্রতা, মেঘাচ্ছন্নতা, বৃষ্টিপাত, বাষ্পীভবন, শিশির ও দৃষ্টিগোচরতা এবং জলবায়ুর পরিবর্তনশীলতা অধ্যয়নের মাধ্যমে কৃষকদেরকে প্রাকৃতিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত না করে পরিমিত কৃষি উপকরণ ব্যবহার করে অধিক উৎপাদন অর্জন ও প্রাকৃতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় আবহাওয়ার সঠিক ও বিভিন্ন পর্যায়ের পূর্বাভাস প্রদানই এগ্রোমেটিওরোলজির প্রধান উদ্দেশ্য
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত। খাদ্য উৎপাদনে ধারাবাহিক অগ্রগতি ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানের অন্যতম উৎস হওয়ার কারণে অর্থনীতিতে কৃষির ভূমিকা অপরিহার্য। ২০২০-২১ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ। অপরদিকে জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকির মধ্যে থাকা দেশগুলোর মধ্যে কৃষিপ্রধান দেশ বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম সারিতে। একবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে মানবজাতি যখন সভ্যতার শিখরে তখন পরিবেশ আমাদের ঠেলে দিচ্ছে মহাবিপর্যয়ের দিকে, গ্রিনহাউজ গ্যাসের পরিমাণ মারাত্মকভাবে বাড়ছে, নষ্ট হচ্ছে ওজোন স্তর, পৃথিবী দিন দিন উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হচ্ছে। সেইসাথে বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ, নদীভাঙন ও ভূমিক্ষয়ের মতো নানারকম হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে কৃষি।
এগ্রোমেটিওরোলজি ফসল উৎপাদন, পশুপালন, বনজ ও মৎস্য চাষের উপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রশমনে কৃষি ব্যবস্থার পরিবর্তন ও নির্দিষ্ট কৌশল উদ্ভাবন করে চলেছে। তন্মধ্যে- উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে আবহাওয়ার পূর্বাভাসের সাহায্যে পরিমিত সেচ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ; উদ্ভিদ বৃদ্ধির বিভিন্ন ধাপের আবহাওয়া পরিমিতিগুলোর পর্যায় বিশ্লেষণপূর্বক ক্ষতি এড়াতে ফসলের জাত উদ্ভাবন ও তাপদাহ, খরা ও লবণাক্ততা অপসারনে সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনের জন্য ব্রিডারদের পরামর্শ দেয়া; আবহাওয়ার সাথে কীটপতঙ্গ ও রোগবালাই এর জীবনচক্রের সম্পর্ক নিরুপনের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব উপায়ে ফসলকে রক্ষা করার পদ্ধতি উদ্ভাবন ও প্রয়োজনে পরিমিত বালাইনাশক সঠিক সময়ে ব্যবহার নিশ্চিতকরণ। খরিফ ও রবি মৌসুমে প্রতিকূল বাছাইকরন।
আবহাওয়ায় ফসল উৎপাদনে বিভিন্ন ধরনের শসা পর্যায়ক্রম ও উত্তম চামাবাদ ধরন; প্রচলিত চাষ পদ্ধতির বিপরীতে উন্নত চাষ পদ্ধতি- ভাসমান সবজি চাষ, সর্জন চাষাবাদ ও ফসলের আবর্তনের মাধ্যমে আবহাওয়ার বৈরীতাকে এড়িয়ে উপযুক্ত চাষাবাদের পরামর্শ দেয়া। স্যাটেলাইট ইমেজিং এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঞ্চলে শস্য আবহাওয়া ক্যালেন্ডার তৈরি; কৃষিতে ফসলের মডেলিংয়ের মাধ্যমে পরিবেশগত অবস্থা ও শস্য ব্যবস্থাপনা যোগানের উপর ভিত্তি করে উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও বিকাশের পূর্বাভাস দিয়ে ইকোফিজিওলজিকাল প্রক্রিয়াগুলির পরিমাণগত ব্যবহার নিশ্চিতকরণ; জলবায়ুর সুসামঞ্জস্য কৃষি ব্যবস্থাপনার জ্ঞানের মাধ্যমে হাঁস-মুরগী ও গবাদিপশুর জন্য উন্নত ঘর নির্মাণ ও খাবার খাওয়ানোর মাধ্যমে পর্যাপ্ত মাংস ও ডিম উৎপাদন বৃদ্ধি; নদ-নদীর পানির প্রবাহ ও আবহাওয়ার সম্পর্ক নিরুপনের মাধ্যমে মৎস্য চাষের উন্নত পদ্ধতি উদ্ভাবন; বৃষ্টির পানির দক্ষ ব্যবস্থাপনা, শুদ্ধ অঞ্চলে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ, মাটির আর্দ্রতা ও গুণাগুণ ধরে রাখা, বাতাসের আর্দ্রতা থেকে পানির যোগান দেয়ার প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা ও প্রয়োগ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য; বাংলাদেশের মতো দুর্যোগপ্রবণ দেশে ক্রমবর্ধমান কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে কৃষির অগ্রগতি নিশ্চিত করতে এগ্রোমেটিওরোলজির উপর গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগ আরও জোরালো হওয়া উচিত। কৃষকদের মধ্যে এগ্রোমেটিওরোলজির জ্ঞানকে সঠিকভাবে ছড়িয়ে দিয়ে অনুশীলনের মাধ্যমে কৃষকদের পারদর্শী করে তুললে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে ফসল উৎপাদন ও দুর্যোগ মোকাবিলা করা সম্ভব হয়ে উঠবে।
সর্বোপরি এগ্রোমেটিওরোলজির প্রসার দেশের অর্থনীতিতে কৃষির অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
লেখক: প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান, এগ্রোমেটিওরোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।


