সুমাইয়া বিনতে সামজাদ: মানুষের চোখের আড়ালে কেউ কেউ রযে যান যারা ছবি তুলতে ভালোবাসেন। এই ভালোবাসাটা ক্ষণিকের মোহ নয় বরং নিজের জীবনের সাথে এর অস্তিত্ব জড়ানো। তারা ছবির কবি হয়ে ওঠেন। ছবি তুলতে পারাটাই তাদের শেষ কথা না। চোখের সুনিপুণ পর্যবেক্ষণে ক্যামেরায় বন্দি করেন সুন্দর কিছু মুহূর্ত। অনিন্দ্য সুন্দর মুহূর্তটি ক্যামেরায় বন্দি করতে কখনো কখনো নিজের জীবনের ঝুঁকিও নিতে হয়। যা দেখে দর্শক মহল নির্বাক হয়ে যায়। একজন আলোকচিত্রশিল্পীর কাছে ছবি হয়ে ওঠে তাদের প্রতিবাদের ভাষা, আলোড়ন সৃষ্টি করার শক্তি আর সবশেষে নিজেকে ব্যক্ত করার সর্বাপেক্ষা নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। কারো কারো জন্য ছবি তোলাটাই হচ্ছে মুখের ভাষা। এমন একজন আলোকচিত্র শিল্পী, বাংলাদেশের কৃতি সন্তান জিএমবি আকাশ। নামটা অপরিচিত লাগলেও তার কাজের সুনাম দেশের গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ছড়িয়ে পড়েছে।
ঢাকা থেকে ৩০ কি.মি. দূরত্বে অবস্থিত নারায়ণগঞ্জ শহরে ১৯৭৭ সালে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জিএমবি আকাশ। বাবা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার ও সরকারি চাকুরীজীবি। স্কুল জীবনে সবসময় তার মনে হত অন্যান্য শিশুদের মতো কোনো মেধা নেই কিন্তু আলোকচিত্র তার জীবনে নতুন আলোর সন্ধান দেয়। নবম শ্রেণি থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন ময়মনসিংহে এবং এর পর চলে আসেন নারায়ণগঞ্জে। বাবার সরকারি চাকরির বদলির সুবাদে আর ভ্রমণের প্রতি বাবার নেশা থাকায় সন্তান হিসেবে বাবার সাথে তিনিও অনেক জায়গায় ঘুরেছেন। শুরুর দিকে ফটোগ্রাফির মতো অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটা পেশা ও শিল্পে জড়িয়ে পড়ার মতো ক্ষমতা বা আর্থিক সঙ্গতি কোনোটাই ছিল না আকাশের। কেবল ফটোগ্রাফির প্রতি নিগূঢ় ভালোবাসাই তাকে এই কাজে নেমে পড়তে সাহস জুগিয়েছিল।
ফটোগ্রাফির শুরুটা হয়েছিল ইয়াসিকা এপেক্স-৩ ক্যামেরা দিয়ে। এটি ছিল তার মুক্তিযোদ্ধা বাবার অত্যন্ত শখের একটি ক্যামেরা। পারিবারিক নানা ধরনের ছবি ও বিভিন্ন মুহূর্ত ধরে রাখতে বাবার আগ্রহ ছিল সীমাহীন। বাবার সেই ক্যামেরা দিয়েই ছবি তোলার কাজে নেমে পড়েন আকাশ। তবে শুরুর দিকে অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর ছিলনা তার জন্য। ক্যামেরার রিল কিনতে ও নিজের ছবিগুলো ধোলাই করার খরচ যোগাতে প্রায়ই তিনি অতিরিক্ত টিউশন করে টাকা যোগাড় করতেন। ফটোগ্রাফিকে ক্যারিয়ার হিসেবে নেওয়ার আগ্রহ জন্মে ১৯৯৬ সালে। তিনি রাজধানী ঢাকার ওয়াল্ড প্রেস ফটোগ্রাফির তিন বছরের এক সেমিনারে অংশ নেন এবং ঢাকার সাউথ এশিয়ান ফটোগ্রাফি ইনস্টিটিউট, পাঠশালা থেকে আলোকচিত্র সাংবাদিকতায় ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জন করেন।
তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ এই পৃথিবীতে আলোকচিত্র এখন যথেষ্ট গতিশীল। তাই তিনি মনে করেন শিল্পের এ অঙ্গনে টিকে থাকতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অবশ্যই প্রয়োজন তবে সৃজনশীল ভুবনে নিজের স্থান করে নেয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি জিনিস হচ্ছে প্রচণ্ড উৎসাহ এবং নিবেদিতপ্রাণ ভালোবাসা।।মধ্যম আয়ের উন্নয়নশীল দেশের খেটে খাওয়া মানুষদের জিএমবি আকাশ তার ক্যামেরার ভেতর দিয়ে অত্যন্ত নিগূঢ়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। মূলত দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোই তার কাজের মূল ক্ষেত্র। পরিশ্রমী এই মানুষদের সংগ্রাম, হেরে না যাওয়ার গল্প, ক্রমাগত প্রচেষ্টা, সীমাহীন দূর্দশার ভেতরেও তাদের জীবনে সুখী হওয়ার প্রচেষ্টাই আকাশের আলোকচিত্রের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমাজের নিম্নবর্ণের মানুষ যারা কথা বলতে গিয়েও বলতে পারেননি তাদের কণ্ঠস্বর হয়েছেন তিনি। সমাজের প্রান্তিক মানুষদের চেহারার গভীর হতাশা, সংগ্রাম করার নিষ্ঠা এবং কষ্টের জীবন তার কাছে আগ্রহের বিষয় ছিল। তিনি দিনের পর দিন সেই সব প্রান্তিক অবহেলিত মানুষের সাথে তাদের লোকালয়ে দিন কাটিয়েছেন, তাদের জীবনকে তাদের মতো করেই অনুভব করতে চেয়েছেন, পৌঁছাতে চেয়েছেন তাদের মনের কাছাকাছি এবং হতে চেয়েছেন আপন মানুষ। তার কাজের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তিনি শুধু ছবি তুলেই ক্ষান্ত হন না সাথে সাথে ছবির পেছনের গল্পও ফুটিয়ে তুলেন গভীর আবেগে যেটা দর্শক হৃদয় ছুঁয়ে যায়। এলাম, গেলাম, জয় করলাম এমনটা তার জীবন ছিল না। আজকের এই অবস্থানে পৌঁছাতে তার অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। গত ২০ বছরেরও অধিক সময় ধরে ভিন্নধর্মী কাজ করে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। যখন বেশিরভাগ মানুষই যৌনকর্মী, সমকামী মানুষদের পক্ষে আওয়াজ উঠানো তো দূর তাদের ব্যাপারে কথা বলতেও দ্বিধাবোধ করে সেখানে আকাশ দিনের পর দিন তাদের সাথে তাদের জীবনকে ধারণ করে তাদের সম্পর্কে গভীর ভাবে জেনেছেন। তার কাজের উল্লেখযোগ্য দিক হলো তিনি একটা প্রজেক্টে অনেক সময় ধরে কাজ করেন। তিনি তার ছবির মুখগুলোর আস্থা অর্জন না করা পর্যন্ত তিনি ছবি তোলেন না এবং তাদের গল্প প্রকাশ করেন না। কারখানার শিশুশ্রমিক, যৌনকর্মী, সমকামী মানুষদের গল্প শুনতে তিনি ক্যামেরা ছাড়া তাদের কাছে ছুটে যান এবং আস্থা অর্জন করেই তিনি তাদের গল্প প্রকাশ করেন। তিনি তার এক সাক্ষাৎকারে বলন,
“ফটোগ্রাফি আমার নিঃশ্বাস।
ফটোগ্রাফি ছাড়া আমার কোন অস্তিত্ব নেই”
তিনি বিশ্বাস করেন আলোকচিত্র এই সমাজে যথেষ্ট ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম। আকাশের তোলা ছবিগুলো হলো তার নিজের ভাষা, যে ভাষায় তিনি বলতে চান সমাজের কোন বিষয় সংশোধন করা দরকার অথবা কোন বিষয়কে সাধুবাদ জানানো দরকার। সমাজের অবহেলিত মানুষের বারবার হোঁচট খাওয়ার পরও আবারও নতুন উদ্যমে উঠে দাঁড়ানোর চিত্র তিনি তার ক্যামেরার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার মাধ্যমে মানুষের মাঝে তীব্র জীবনবোধ, বেঁচে থাকার তাগিদ যোগান দিতে চেয়েছেন।
তিনি এক সাক্ষাৎকারে তার ছবি সম্পর্কে বলেন-
“এই সমস্ত ছবিগুলো আমার নিজের অভিজ্ঞতার প্রতিচ্ছবি। আমার জীবনে আমি যা দেখেছি আমি তার এক সংক্ষিপ্ত চিত্র। জীবন্ত অনেক চরিত্র এই সমস্ত যাত্রায় মিশে গেছে। কখনো আমি দৌড়েছি, কখনো আমি ট্রেনের ছাদে চড়েছি, আমি বন্যায় ভেসে যাওয়া মেঝেতে ঘুমিয়েছি, আমি সাঁতার কেটেছি, আমি ঝুলে থেকেছি, আমি লম্বা সময় বস্তিতে কাটিয়েছি এবং এভাবেই আমি এই সমস্ত আত্মার সাথে সাক্ষাৎ করেছি। কিছু সময়ের জন্য তাদের একজনে পরিণত হয়েছি। এই সমস্ত অভিযান ছিল বিপদসংকুল। কিন্তু ওই সমস্ত ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছার পর, তাদের দরজায় প্রবেশের সুযোগ লাভের পর এবং যখন তারা আমাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে, তখন আমার সকল কঠিন পরিশ্রম এবং ঝুঁকি গ্রহণ স্বার্থক হয়ে উঠে। আমি এভাবে চলতেই থাকব, আমি আমার লেন্সে যে সমস্ত মুখ ধরা পড়বে তাদের ছুঁয়ে যাব। আমি বিশ্বকে যন্ত্রণার এই সব অজানা কাহিনী প্রদর্শন করব। আর যদি এতে কোন একটি হাতও তাদের উপর ছায়া প্রদান করতে এগিয়ে আসে, তাহলে আমার ঘাম ঝরানো স্বার্থক হবে”
কোনো হাত এগিয়ে আসুক বা না আসুক তিনি কিন্তু ছবি তুলেই তার দায়িত্বের অবশান ঘটাননি বরং তাদের আর্থিকভাবেও সাহায্য করেছেন। গত ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি শিশুশ্রম নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। শ্রমজীবী শিশুদের নিয়মিত খোঁজ রাখার পাশাপাশি তাদের এবং তাদের পরিবারকে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছেন যাতে তারা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিজেদের শৈশব কৈশোরকে নষ্ট না করে। তিনি ৫০ টিরও বেশি পরিবারের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
মুন্না, রুদ্র, সজিবদেে মতো অনেক শিশুকে লোহা বা অ্যালুমিনিয়াম ফ্যাক্টরির চাকরি ছাড়িয়ে তিনি তাদের পরিবারের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছেন। কাউকে গাভী দিয়ে কাউকে বা সবজি ব্যবসার যোগাড় করে দিয়েছেন। শুধু শিশুদের না তিনি সালেহা বেগম, শামসুদ্দিন চাচা, সাহেরা বেগম এর মতো বয়োবৃদ্ধদেরও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
২০১৩ সালের আগস্ট মাসে ঢাকার নারায়ণগঞ্জে প্রতিষ্ঠা করেন ফার্স্ট লাইট ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফি। এই প্রতিষ্ঠান হতে প্রাপ্ত অর্থ তিনি প্রান্তিক মানুষদের পেছনে ব্যয করেন। তার ১০ বছরের পরিশ্রমের ফল ” Survivors” বইটি ২০১২ সালে প্রকাশিত হয়। এই বই বিক্রির টাকা হতে প্রাপ্ত প্রতিটি অর্থ দিয়ে তিনি এসব পরিবারের শিশুদের শিক্ষা ও পরিবারের কাজের ব্যবস্থা করে যাচ্ছেন।
তার এই মহতী কাজে ব্যক্তিগত অর্জনের পাল্লাও অনেক ভারী। ফটো জার্নালিজমে কাজ করতে বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন। ফটো সাংবাদিক হিসেবে ইংল্যান্ডের পেনোস পিকচারে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন ধরে। ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক অনলাইন জরিপে পৃথিবীর শীর্ষ ২০ জন প্রভাবশালী স্ট্রিট ফটোগ্রাফারের অন্যতম একজন ছিলেন। শতাধিক আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ড নিজের ঝুলিতে পুরেছেন গত দশ বছরে। নেদারল্যান্ডের ওয়াল্ড প্রেস ফটো জুপ সোয়ার্ট মাস্টার ক্লাস প্রতিষ্ঠানে ২০০২ সালে শ্রেষ্ঠ আলোকচিত্র শিল্পী ক্যাটাগরিতে ১ম বাংলাদেশী আলোকচিত্র শিল্পী হিসেবে তিনি নির্বাচিত হন। ২০০৪ সালে তিনি প্যারিসের স্কুপ ফটো ফেস্টিভ্যালে সেরা তরুণ আলোকচিত্রীর পুরস্কার অর্জন করেন। ২০০৫ সালে ইউএসের কলোরাডোয় সেন্টার ফর ফাইন আর্ট ফটোগ্রাফির ইন্টারন্যাশনাল কম্পিটিশনে বেস্ট অব শো নির্বাচিত হন। ২০০৭ সালে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফটো ডিস্ট্রক্ট নিউজ ম্যাগাজিনের জরিপে সেরা ৩০ আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী তরুণ আলোকচিত্র শিল্পী হিসেবে মনোনীত হন। ২০০৯ সালে আকাশ ১ম বাংলাদেশী হিসেবে ইংল্যান্ডের ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেল ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার কম্পিটিশনে শ্রেষ্ঠ ট্রাভেল ফটোগ্রাফার নির্বাচিত হন। ২০১১ সালে নিকন এশিয়ার সেরা আট প্রভাবশালী ফটোগ্রাফারের তালিকায় আকাশকে মনোনীত করা হয়।
বিশ্বের প্রায় সব মহাদেশেই ফটোগ্রাফি নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে আকাশের। বিশ্বের ৯০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থায় তার আলোকচিত্র কর্ম প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ন্যাশনাল জিওগ্রাফি, টাইম ম্যাগাজিন, ভোগ, সানডে টাইমস, নিউজউইক, জিও ম্যাগাজিন, দ্য গার্ডিয়ান, কালারস, দ্য ইকোনমিস্ট, দ্য ইন্টারন্যাশনালিস্ট, সানডে টেলিগ্রাফ অব লন্ডন, ডেইস জাপান, অ্যামনেস্টি জার্নাল উল্লেখযোগ্য। আকাশ TEDx এর মতো আন্তর্জাতিক ইভেন্টের নিয়মিত বক্তা।
বৈভবের মাঝে আকাশ চাইলেই গা ভাসাতে পারতেন অথচ কী সাধারণভাবেই তিনি তার গল্পের চরিত্রের কাছে ফিরে এসেছেন। ছবির মাধ্যমে তিনি শেষ অবধি এটাই বলতে চেয়েছেন-” আমার তোলা ছবির মাঝেই আমি মানুষ এবং তাদের প্রাণচাঞ্চল্য খুঁজে পাই”
জনসাধারণের হয়ে কথা বলতে গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে অনেকটা একা হয়ে গেলেও তিনি দৃঢ়চিত্তে নিজের প্রতিই উচ্চারণ করেছেন হেলেন কেলারের সেই বিখ্যাত বাণী-
” I am only one, but I am still one. I can not do everything, but still I can do something. And because I can not do everything I will not refuse to do the something that I can do”
লেখক: শিক্ষার্থী, টেক্সটাইল ফ্যাশন অ্যান্ড ডিজাইন বিভাগ,
বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স)


