কৃষিবিদ ডাঃ শাহাদাত হোসেন পারভেজ: ১০ ডিসেম্বর-আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস। জাতিসংঘ ঘোষিত এ বছরের প্রতিপাদ্য “Human Rights: Essential for Our Everyday” শুধু একটি বার্তা নয়, বরং গণতান্ত্রিক সমাজের প্রতিদিনের দায়িত্বের প্রতি কঠোর স্মারক। বাংলাদেশ আজ যে অবস্থায় দাঁড়িয়ে, সেই বার্তা আরও প্রাসঙ্গিক, আরও জরুরি।
গত দেড় দশকের বাস্তবতা স্বীকার করা ছাড়া ভবিষ্যতের পথ নির্মাণ সম্ভব নয়। ২০০৯ থেকে ২০২৪-হাসিনার রেজিমের এই সময়টুকু বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ থাকবে। রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার, বিরোধী মতকে নিশ্চিহ্ন করার প্রচেষ্টা, এবং আইনের শাসনের জায়গায় ইচ্ছামতো শক্তি প্রয়োগ-সব মিলিয়ে এ সময়টি নাগরিক স্বাধীনতার মৃত্যুপর্বে পরিণত হয়েছিল।
এক দশকেরও বেশি সময় গুম-খুন-মিথ্যা মামলা-নিপীড়নের নির্মম পরিসংখ্যানঃ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার তথ্য থেকে উঠে আসে ভয়াবহ এক চিত্র- ১৬০০+ মানুষ গুম, যাদের অধিকাংশের খোঁজ আজও অজানা। ৩,৫০০+ বিচারবহির্ভূত হত্যা, অধিকাংশই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের নামে সংঘটিত। দশ হাজারের বেশি রাজনৈতিক হামলা ও হত্যার ঘটনা। এক লক্ষেরও বেশি মিথ্যা মামলা, যার ভুক্তভোগী প্রায় ৫০ লক্ষ বিএনপির নেতাকর্মী। বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের উপর অব্যাহত গ্রেফতার, রিমান্ড নির্যাতন ও কারাবন্দিত্ব। এত বিপুল সংখ্যক সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা কোনো গণতন্ত্রে কল্পনাও করা যায় না। কিন্তু বাংলাদেশে এটি ছিল প্রতিদিনের বাস্তবতা।
তারেক রহমানের বার্তা: মানবাধিকার এক দিনের নয়-প্রতিদিনের দায়িত্ব
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে বার্তা দিয়েছেন, তা শুধু রাজনৈতিক বিবৃতি নয়-এটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র-দর্শনেরও রূপরেখা। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন- দেড় দশক ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনে মানবাধিকার সমাধিস্থ হয়েছিল। যেকোনো প্রতিবাদী কণ্ঠ-রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, ছাত্র, শ্রমিক-মিথ্যা মামলা, কারাবাস, নির্যাতন, গুম ও হত্যার শিকার হয়েছেন। মানবাধিকার কোনো “উৎসবের দিবস” নয়; এটি প্রতিদিনের নজরদারি ও প্রতিকারের দায়িত্ব। দারিদ্র্যকে তিনি মানবাধিকারের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে পরিচালিত নির্যাতন রাষ্ট্রীয় মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে থাকবে।
তার বক্তব্যের সারমর্ম-গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার সুরক্ষাই আগামী বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রথম শর্ত। রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করতে হলে মানবাধিকারকে কেন্দ্রীয় নীতি করতে হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় মানবাধিকারকে এখন নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা জরুরি। কেবল রাজনৈতিক অধিকার নয়-অর্থনৈতিক, সামাজিক, ডিজিটাল, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা-সবই মানবাধিকার কাঠামোর অংশ।
আসন্ন সময়ের জন্য তাই রাষ্ট্রকে কয়েকটি মৌলিক সংস্কারে এগোতে হবে-
১. গুম-খুনের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও বিচারের নিশ্চয়তা দিতে হবে। প্রত্যেকটি পরিবার জানবে তাদের প্রিয়জনের কী হয়েছিল। গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যা-কোনোটাই ক্ষমাযোগ্য নয়।
২. রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কখনোই কোনো দলের ইচ্ছার উপকরণ হতে পারে না।
৩. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ সকল দমনমূলক এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা সৃষ্টিকারী আইনগুলোর সংস্কার অত্যন্ত জরুরি।
৪. মিডিয়া স্বাধীন হলে রাষ্ট্র জবাবদিহিতার মধ্যে থাকে; আর নাগরিক থাকে নিরাপদ। গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার পূর্ণ স্বাধীনতা থাকতে হবে।
৫. দারিদ্র্য হ্রাসকে মানবাধিকার বাস্তবায়নের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আশ্রয়-এসবকে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, মানবাধিকারের অধিকার হিসেবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব দিতে হবে।
৬. কোনো রাষ্ট্র বিচারহীনতার ধারাবাহিকতা নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। সুশাসন, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রকে ভূমিকা নিতে হবে।
উপসংহার: মানবাধিকার রক্ষা না করলে ভবিষ্যৎও রক্ষা পাবে না. এই দেশের মানুষের প্রধান অর্জন-একাত্তরের স্বাধীনতার চেতনা মানবাধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের মূল্যবোধের উপর দাঁড়ানো। সেই চেতনাই গত দেড় দশকে পদদলিত হয়েছে; আক্রান্ত হয়েছে নাগরিকের নিরাপত্তা, বাকস্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অস্তিত্ব।
অতএব, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা আজ কেবল একটি আদর্শ নয়-এটি রাষ্ট্রের বেঁচে থাকার শর্ত। এই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক-বাংলাদেশে আর কখনো গুম হবে না, খুন হবে না, মিথ্যা মামলা হবে না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আর কখনো নাগরিকের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে না। আর আগামী বাংলাদেশ হবে মানবাধিকারের ভিত্তিতে দাঁড়ানো এক গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, সমান মর্যাদার রাষ্ট্র। এটাই সময়ের দাবি। এটাই জাতির ভবিষ্যতের পথ।
লেখক: কৃষি উন্নয়ন কর্মী।


