ডাঃ শাহাদাত হোসেন পারভেজ: প্রতি বছর ১৮-২৪ নভেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধ সচেতনতা সপ্তাহ (World Antimicrobial Resistance Awareness Week-WAAW)। এ বছরের প্রতিপাদ্য-“এখনই পদক্ষেপ নিন: আমাদের বর্তমানকে রক্ষা করুন, আমাদের ভবিষ্যতকে সুরক্ষিত করুন।”
প্রতিপাদ্যের মূল বার্তা হলো-অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) আর বিজ্ঞানীদের গবেষণাগারের পরিসংখ্যান নয়; এটি আজ বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য, খাদ্যব্যবস্থা ও পরিবেশের জন্য এক যৌথ হুমকি।
বিশ্বে রেজিস্ট্যান্সের বিস্তার উদ্বেগজনক:
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে AMR সরাসরি ১.২৭ মিলিয়ন মৃত্যুর কারণ হয় এবং ৪.৯৫ মিলিয়ন মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা-২০৫০ সালের মধ্যে প্রতিবছর ১০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ অ্যান্টিবায়োটিক-অকার্যকর সংক্রমণে প্রাণ হারাতে পারে।
ব্যাকটেরিয়ার প্রাকৃতিক বিবর্তন প্রক্রিয়া রেজিস্ট্যান্স তৈরি করে, তবে মানুষের অসচেতন আচরণ-ভাইরাল সংক্রমণে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার, নিজের মতো করে এন্টিবায়োটিক কোর্স বন্ধ করে দেওয়া, পশুপালন, মাছ চাষ ও কৃষিতে নির্বিচার ব্যাবহার,হাসপাতাল, খামার ও পরিবেশে দুর্বল স্যানিটেশন-এই বিবর্তনকে আজ এক ভয়াবহ গতিতে এগিয়ে নিচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়া ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি আরও চিন্তারঃ
বিশ্বের প্রায় সব দেশই AMR-এর ঝুঁকিতে, তবে ভারত, চীন, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়ার মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে বিপদ আরও তীব্র। ভারতে নবজাতকের সেপসিস ব্যবস্থাপনায় প্রথম সারির অনেক অ্যান্টিবায়োটিক এখন কাজে আসছে না। ইউরোপের গ্রিস ও ইতালিতে Klebsiella pneumonia-এর কার্বাপেনেম রেজিস্ট্যান্স জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে বড় চ্যালেঞ্জে ফেলেছে।
বাংলাদেশে রেজিস্ট্যান্স: বিস্তার দ্রুত, নিয়ন্ত্রণ দুর্বল
বাংলাদেশে সমন্বিত জাতীয় ডেটাবেইস না থাকলেও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়-তৃতীয় প্রজন্মের সেফালোস্পোরিন E. coli ও Klebsiella–এর বিরুদ্ধে কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে কমেছে। কার্বাপেনেম, যা ‘লাস্ট রিসোর্ট’ অ্যান্টিবায়োটিক, এর বিরুদ্ধেও রেজিস্ট্যান্স বাড়ছে। টাইফয়েডে ব্যবহৃত ফ্লুরোকুইনোলোনে রেজিস্ট্যান্স ৭০%-এর বেশি এলাকাভেদে। মানুষের চিকিৎসা, পশুপালন, মৎস্য ও কৃষি উৎপাদনব্যবস্থা এবং পরিবেশ-সব ক্ষেত্রেই রেজিস্ট্যান্সের চক্র বিস্তার লাভ করছে।
আইন আছে, বাস্তবায়ন কোথায়?
বাংলাদেশে ‘ওষুধ আইন ২০২২’ অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন-সাধারণ জনগণের অজ্ঞতা, ফার্মেসির সীমিত দক্ষতা, ডাক্তার এড়িয়ে সরাসরি ওষুধ কেনার প্রবণতা, এবং নিয়মিত তদারকির অভাব-আইনকে কার্যত অকার্যকর করে রেখেছে। ফলে প্রায় প্রতিটি এলাকায় প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি আজও অব্যাহত।
One Health: রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলায় টেকসই সমাধান
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স কেবল মানুষের সমস্যা নয়; এটি মানুষের সঙ্গে প্রাণী, খাদ্যব্যবস্থা ও পরিবেশের একটি আন্তঃসম্পর্কিত সংকট। তাই One Health ছাড়া AMR মোকাবিলা সম্ভব নয়। জরুরি প্রয়োজন-হাসপাতাল ও ক্লিনিকে অ্যান্টিবায়োটিক স্টুয়ার্ডশিপ বাধ্যতামূলক করা, চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োগ্রাম-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত, পশুপালন ও মাছ চাষে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে শূন্য-সহনশীলতা, বায়োসিকিউরিটি, টিকা ও উন্নত খামার ব্যবস্থাপনা, ওষুধ শিল্প ও হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি, এবং তিন সেক্টরের (মানুষ–প্রাণী–পরিবেশ) একীভূত ডেটা ও নীতি সমন্বয়।
এখনই পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
AMR একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকট-এটি থামবে না, বরং বাড়বে। গবেষণা, নীতিনির্ধারণ, আইন প্রয়োগ এবং ব্যক্তিগত-সমষ্টিগত সচেতনতার মধ্য দিয়ে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ চিকিৎসা, খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য-সবকিছুর ভবিষ্যতই এখন অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলার ওপর নির্ভরশীল।
লেখক: সিনিয়র ম্যানেজার, ভেটেরিনারি- ফ্রেন্ডশিপ এবং নির্বাহী সদস্য, বাংলাদেশ ভেটেরিনারি এসোসিয়েশন।


