ড. সৈয়দ মোঃ এহসানুর রহমান: বাংলাদেশের উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্য দেশের মানুষকে ব্যক্তি, গোষ্ঠী, আঞ্চলিক ও দলীয় স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থকে প্রধান্য দিতে হবে। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে যে বৈষম্য এবং দুর্নীতি প্রভাব বিস্তার করেছে, তার মূলোৎপাটন না করলে আমাদের স্বাধীনতার লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব হবে না। ১৯৭১ সালে আমরা যে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল একটি বৈষম্যহীন, স্বাধীন ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ে তোলা। কিন্তু আজ, ২০২৪ সালে এসে আমরা দেখছি, সেই স্বপ্ন এখনো অনেকাংশে অপূর্ণ রয়ে গেছে।
একটি জাতির উন্নতির জন্য আগে ব্যক্তি সংস্কার প্রয়োজন। একজন মানুষের মনোভাব, চিন্তাধারা এবং কর্মই নির্ধারণ করে তার চারপাশের সমাজ ও রাষ্ট্রের অবস্থা। তাই ব্যক্তি নিজেকে সৎ, দায়িত্বশীল এবং ন্যায়নিষ্ঠ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আত্মশুদ্ধি না হলে রাষ্ট্র সংস্কার সম্ভব নয়। আমাদের আচরণই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে বৈষম্যহীন এবং দুর্নীতিমুক্ত করতে পারে। আমাদের নীতিগত শিক্ষা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি করতে হবে। ন্যায়, সততা, এবং মানবিকতার চর্চা না করলে কোনো দেশই শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে না।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে নানা ধরনের অপরাধ সংগঠিত হয়েছে। রাজনৈতিক কারণে, গোষ্ঠীগত স্বার্থে বা ব্যক্তিগত লাভের জন্য অনেকেই দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছেন। দুর্নীতি, খুন, ধর্ষণ, দাঙ্গা, এবং সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানো থেকে শুরু করে আরও বহু অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এসব অপরাধের যথাযথ বিচার না হলে একটি স্থিতিশীল সমাজ গড়ে তোলা কঠিন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সকল অপরাধের বিচার হওয়া উচিত। এ বিচার প্রক্রিয়ায় কোন ধরনের পক্ষপাতিত্ব বা রাজনৈতিক প্রভাব যেন না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধী যে দলেরই হোক বা যত বড় ক্ষমতাধরই হোক, তার শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
অপরাধীদের শাস্তি না হলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে এবং সমাজে অন্যায়ের প্রচলন বাড়বে। সঠিক বিচার প্রক্রিয়া একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে। এছাড়া, অপরাধের বিচার হলে সাধারণ জনগণের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা বাড়বে এবং তারা নিজেদের নিরাপদ ভাবতে পারবে। দেশের মানুষকে শান্তিতে থাকতে হলে তাদের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে। একটি দেশকে উন্নত করতে হলে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি অপরিহার্য। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে যুগোপযোগী ও মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, নৈতিকতা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। শিক্ষকদেরও যথাযথ মূল্যায়ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা শিক্ষা ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি। তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, সম্মান, এবং আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ ছাড়া, গবেষণা ও উদ্ভাবনের সুযোগ বাড়ানো হলে উচ্চশিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে। শিক্ষকদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস এবং দায়িত্বশীলতা বাড়াতে সরকারকে তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। সমৃদ্ধ এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে শিক্ষাখাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ অপরিহার্য। এর মাধ্যমেই একটি উন্নত, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
বাংলাদেশে সরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন ক্যাডারে কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আন্তঃক্যাডার বৈষম্য বিরাজমান। এই বৈষম্য সাধারণত পদোন্নতি, বেতন কাঠামো, সুবিধা এবং ক্ষমতার দিক থেকে স্পষ্ট হয়। এ ধরনের বৈষম্য কর্মক্ষেত্রে অসন্তোষ তৈরি করে এবং প্রশাসনিক দক্ষতা কমিয়ে দেয়। সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য ক্যাডারগুলোর মধ্যে সমান সুযোগ, পদোন্নতি এবং দায়িত্ব বণ্টনের প্রয়োজন রয়েছে। এটি প্রশাসনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে এবং জাতীয় উন্নয়নের পথে সহায়ক হবে। সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও ঐক্য প্রতিষ্ঠায় আন্তঃক্যাডার বৈষম্য দূর করা অত্যন্ত জরুরি।
বর্তমানে আমাদের সমাজে যে বৈষম্য ও অন্যায় চলছে, তা দূর করা না গেলে স্বাধীনতার লক্ষ্য পূরণ হবে না। এই বৈষম্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও বিরাজমান। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরি ও অন্যান্য মৌলিক সেবার ক্ষেত্রে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে বিশাল ফারাক দেখা যায়। এই বৈষম্য দূর করতে হলে সমাজের প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বাংলাদেশকে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ এবং শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে আমাদের সকলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ব্যক্তি থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্র—সবখানেই সংস্কার প্রয়োজন। আমাদের আচরণই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রূপ নির্ধারণ করবে। আমরা যদি সততা, ন্যায়বিচার এবং মানবিকতার চর্চা করি, তাহলে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ হতে পারে বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত এবং শান্তিপূর্ণ।
লেখক: আমন্ত্রিত বিজ্ঞানী, জাতীয় গবেষণা ফাউন্ডেশন, দক্ষিণ কোরিয়া ও প্রফেসর, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ


