কুমের আলী: উফ! আর পারি না! এতক্ষণ পর্যন্ত কেউ ঘুমিয়ে থাকে? কথাগুলো বিরক্তির স্বরে বলল পূরবের মা সালেহা বেগম। সকাল এগারটা বাজতে যাচ্ছে। পূরব এখনও ঘুমাচ্ছে। পূরবের মা সালেহা বেগম পূরবের বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে ছেলের গায়ে
আলতো ধাক্কা দিয়ে বলল-
: পূরব উঠ না বাবা, অনেক বেলা হলো যে…
: মা, প্লিজ আর একটু …
: না বাবা, এগারটা বেঁজে গেছে।
এমন সময় কলিং বেলটা বেঁজে উঠতেই সালেহা বেগম ধীরপায়ে হেঁটে দরজার
পাশে এসে বলল-
: কে?
: আন্টি আমি মৌসুম,
সালেহা বেগম দরজা খুলে দিতে দিতে বলল-
: ও আচ্ছা, কেমন আছ বাবা?
: জ্বী ভালো আছি আন্টি। আপনি কেমন আছেন?
: ভালো আছি বাবা।
: আন্টি, পূরব কোথায়? ওর ফোনে কমপক্ষে বিশবার ফোন দিয়েছি। ফোনটা রিসিভ করেনি। ভাবছি নিশ্চয় তার ফোন চুরি হয়েছে। তাই চলে এলাম। ওর সাথে কথা আছে।
: পূরব এখনও ঘুমিয়ে আছে। যাও, তার রুমে গিয়ে বস। আমি নাস্তা নিয়ে আসছি।
: আন্টি আমি নাস্তা করেই এসেছি। শুধু চা হলেই চলবে। : আচ্ছা,
এ কথা বলেই সালেহা বেগম রান্নাঘরে চলে গেল। মৌসুম পূরবের রুমে গিয়ে তার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আস্তে আস্তে পূরবের গায়ের ঢাকাটা টানতে টানতে। কোমড় পর্যন্ত নামিয়ে নিয়ে আসতেই পূরব ঢাকাটা টেনে ধরে উঠে বসে বলল-
: আরে… আরে… কর কী? এই বেটা, এতক্ষণ কেউ বিছানায় শুয়ে থাকে? রাতে কী চুরি করতে গিয়েছিলি? : আর বলিস না, রাতে অন লাইনে ছিলাম, কখন যে ভোর চারটা বেজে গেছে
: টেরই পাইনি। সত্যি দোস্ত, আজকাল অন লাইন বল, আর ফেসবুকই বল, এটা টাইম কিল করার পদ্ধতি মাত্র। লাভের মধ্যে শুধু অস্থিরতা। সারাক্ষণ টান টান উত্তেজনা। যেন আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের ফুটবল ম্যাচ। কিন্তু তুই এত সকাল সকাল চলে এলি যে?
: এখন সকাল বলিস? ঘড়িটা দেখ কয়টা বাজে? আচ্ছা বলতো, তোর ফোনটা কোথায় রেখেছিস? ফোনটা দেখতো, কতবার ফোন দিয়েছি। আমি তো ভেবেই নিয়েছি, নিশ্চয় তোর ফোন চুরি হয়েছে। তাই তো চলে এলাম। এসে যা দেখলাম, বেটা ফোন সাইলেন্ট করে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিস।
: আচ্ছা, তুই বস, আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।
: অনেক দেরি করে ফেলেছিস। আর দেরি করিস না।
: অবশ্যই দেরি করবো না। সর্বোচ্চ পাঁচ মিনিট।
: আচ্ছা, আমি বসলাম।
মিনিট পাঁচ পরেই পূরব ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এসেছে। মৌসুম আর পূরব দুজনে পাশাপাশি বসে কথা বলছে। তাদের কথা শেষ হতে না হতেই পূরবের মা সালেহ বেগম নাস্তার ট্রে হাতে পূরবের রুমে ঢুকে টেবিলের উপর রাখতে রাখতে
বলল-
: মৌসুম
: জ্বী আন্টি, কিছু বলবেন?
: শোন, ভাত বসিয়ে দিয়েছি, তুমি খেয়ে যেও। : আজ খাবো না আন্টি, আর একদিন খাবো। : না, আমি ভাত বসিয়ে দিয়েছি, খেয়ে তারপর যাবে। : আচ্ছা, ঠিক আছে আন্টি, খেয়ে যাবো।
এ কথা বলে সালেহা বেগম পূরবের ঘর থেকে বের হয়ে চলে গেল। সালেহা বেগমের স্বামী সরকারি কর্মকর্তা। সরকার থেকে গাড়ি বাড়ি সবই পেয়েছে। দারোয়ান, কুক, সবই পেয়েছে। কিন্তু সালেহা বেগম যেহেতু চাকরি করে না, সেহেতু নিজের হাতে রান্না করে স্বামী সন্তানকে যত্ন করে খাওয়ায়। সংসার নিজের মত করে সাজিয়ে নিয়েছে। আর তাদের দুজনের একমাত্র সন্তান পূরব। পূরব আর মৌসুম একই সাথে একই ভার্সিটিতে পড়া শোনা করে। পূরব আর মৌসুমের মধ্যে গভীর সম্পর্ক। প্রতিদিন একজন আর একজনকে না দেখলে যেন থাকতেই পারে না। এতই গভীর তাদের সম্পর্ক। পূরবের মা-বাবাও মৌসুমকে তার নিজের সন্তানের মতোই ভালোবাসে, আদর করে। ঈদ-পার্বনে পূরবের জন্য যখন কাপড়-চোপড় কেনে তখন মৌসুমের জন্যও কাপড়-চোপড় কিনে দেয় পূরবের বাবা-মা। অবশ্য এদিক থেকে মৌসুমও কম করে না। বাড়ির গাছের আম, নিজের পুকুরের বড় বড় মাছ, সিজিনাল যত ফল-ফলাদি আছে, সবই পূরবদের বাসায় নিয়ে আসে মৌসুম। সব মিলে দুজনার দুটি পরিবার যেন আত্মার বন্ধনে আবদ্ধ। এই কয়েক বছরে মৌসুমের বাবা বেশ কয়েকবার পূরবদের বাসায় এসে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু পূরবের বাবা সরকারি কর্মকর্তা, যে কদিন ছুটি-ছাটা পায়, সেটা অন্যভাবে কাজে লাগায়। এই অল্প সময়ে দূরে কোথাও যেতে পারে না। তাছাড়া মৌসুমদের বাড়ি তো আর আশেপাশে নয়, ঢাকা থেকে প্রায় পাঁচশ কিলোমিটার দূরে। এত দূরের রাস্তা ভ্রমণ করা তো সহজ কথা নয়। অনেক সময় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বেড়াতে যেতে পারে না।
পূরব ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে নাস্তার টেবিলে বসে একটা রুটির মধ্যে ভাজি, ডিম, ঢুকিয়ে দিয়ে রোলের মতো করে খেতে লাগল। মৌসুম শুধু চায়ের কাপটা
হাতে নিয়ে চুমুক দিতে দিতে বলল-
: এই আস্তে খা না।
: হু… খাচ্ছি তো। তুই তাড়াতাড়ি নে, জরুরি একটা কাজ আছে : কী জরুরি কাজ?
: পরে বলবো।
খাওয়া শেষ করে দুজনে বেরিয়ে যেতে যেতে পূরব তার মাকে বলল- : মা, আমাদের ফিরতে একটু দেরি হতে পারে।
এ কথা বলেই বাসা থেকে বের হয়ে চলে গেল।
: এই পূরব শোন, বিদ্যুৎ বিলের কাগজটা নিয়ে যা।
: আজ পারবো না, তাড়া আছে, গেলাম। : পূরব শোন বাবা, তোর আব্বু বকা দেবে, নিয়ে যা।
পূরব আর কোনো কথা না বলেই বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ল। রাস্তায় এসে একটা রিকশা ডেকে চেপে বসেই পূরব রিক্সাওয়ালেকে বলল-
: মামা চলেন।
: মামা কই যাইবেন?
: নিউ মার্কেটে।
রিক্সাওয়ালা কোনো কথা না বলে, পূরবের দিকে একবার দেখে রিকশা চালাতে লাগল। মৌসুম পূরবের বাহুতে একটা ঠেলা দিয়ে বলল-
: কী কিনতে যাবি?
: চল না, গেলেই দেখতে পাবি।
: কার জন্য কিনতে যাবি?
: বেটা বুঝিস না?
: শোন, আমি কিন্তু এখনও ব্যাগ গুছাইনি। : নিবি?
তাতে কী, গুছিয়ে
: কত কাজ আছে।
: তা তো থাকবেই, সে আমি জানি।
মৌসুম আর কোনো কথা বলল না। সামনের দিকে মুখ করে চেয়ে আছে।
পূরবের মুখে তৃপ্তির হাসি। সুন্দর মুখমন্ডল সুখের হাসিতে আরো সুন্দর হয়ে উঠেছে। তাকে বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে, যেন সিনেমার নায়ক। মৌসুম পূরবের সবকিছুই বোঝে, কিন্তু না বোঝার ভান করে চুপ চাপ আছে। তারা দুজনে রিকশা থেকে নেমে দ্রুত হেঁটে হেঁটে নিউ মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় উঠে একটা কাপড়ের দোকানে গিয়ে ঢুকতেই, দোকানের ছেলেটা সালাম দিয়ে বলল-
: ভাই, আইছেন? খুব যত্ন করে এই খ্রী-পিচটা রাখছি। এই লন। পূরব থ্রীপিচটা হাতে নিয়ে এপিঠ-ওপিঠ উল্টে দেখে মৌসুমের হাতে দিতে দিতে বলল-
: দেখ তো কেমন হয়েছে? আরে হাতে ধর না, আমি টাকাটা দিয়ে দেই।
মৌসুম থ্রীপিচটা হাতে নিয়ে মনে মনে ভাবল, এই কাপড়টা নিশ্চয় উর্মির জন্য কিনেছে। আগে শুনি পূরব কার কথা বলে। পূরব দোকানদারকে টাকা দেয়ার পর
মৌসুমকে উদ্দেশ্য করে বলল-
: চল এখান থেকে বেরিয়ে যাই।
: এখন কোথায় যাবি?
: আরে আগে বের হই না।
: এটা কার জন্য?
: উর্মির জন্য, কেমন হয়েছে বল না দোস্ত?
: হয়েছে তো ভালো। কিন্তু, উর্মি নিবে তো?
: আমার কথা হয়েছে, সে নিবে। যেদিন তার সাথে কথা হয়েছিল, তার পরের দিনেই আমি দোকানে এসে পছন্দ করে রেখে গিয়েছিলাম। বুঝলি দোস্ত, কাউকে ভালোবাসলে মন থেকেই বাসিস।
পূরবের এ কথা শুনে মৌসুম ভ্ররু কুচকিয়ে বলল- এতটা এগিয়ে গেছিস? তাও আমাকে জানাসনি?
: তোকে বলে কী লাভ? তুই তো সারাক্ষণ বলবি, এটা করিস না, ওটা করিস না। তাই তোর থেকে জ্ঞান না নিয়েই একা একা কাজটা করেছি।
: যা করেছিস, বেশ করেছিস। এবার চল… : দোস্ত আর একটু কাজ বাকি আছে।
: আবার কী?
: তুই জানিস, উর্মি পাশের বাড়ির ভাবির ফোন থেকে ফোন দিয়ে কথা বলে। সময়মতো কথা বলতেও পারেনা। এটা খুবেই খারাপ লাগে রে…। তাই ঠিক করেছি, এবার ওর জন্য একটা ফোন নিয়ে যাবো। ফোনের কথা অবশ্য তাকে বলিনি। এটা সারপ্রাইজ দেবো বুঝলি?
: তোর যেটা খুশি নে, যেটা খুশি কর, আমাকে তোর এসবের মধ্যে জড়াস নে, বুঝলি?
: এ বিষয় নিয়ে তুই কোনো চিন্তাই করিস না। আরে তোকে তো একটা কথা বলাই হয়নি। ওই যে গেল মাসে প্রথম দিকে তোদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। তোকে বললে তুই হয়তো আমাকে যেতে বারণ করতিস, তাই তোকে বলিনি।
সংবাদ লাইভ/সাহিত্য


