অথই নুরুল আমিন: ১৯৮৫-৮৬-৮৭ সালের কথা। আমার মামার বাড়ি ভাটি অঞ্চলে হাওড় এলাকায়। সেখানে শীত মৌসুমে সেই সব হাওড়ে তখন কয়েকশ জাতের হাজার হাজার অতিথি পাখির আগমন ঘটতো। তখনকার সময় এই পাখি শিকার, আজকের মতো এতো জোরালো ভাবে নিষিদ্ধ ছিলনা। তাই সেই সময় কেউ বন্দুক দিয়ে, কেউ ফাঁদ দিয়ে, কেউ জাল দিয়ে বিভিন্ন জন, বিভিন্ন ভাবে, এই অতিথি পাখি হাওড়গুলোতে শিকার করতো। আমার বড় মামার ছিল দুনলা একটি বন্দুক। দুনলা বন্দুক দিয়ে অতিথি পাখি শিকার করার মজাই আলাদা। একদিন বড় মামাকে অনেক কয়ে বলে, দুটিগুলিসহ বন্দুক নিয়ে হাওড়ে গেলাম। দুটি গুলী খরচ করে মাত্র তিনটি পাখি শিকার করলাম। সেদিনের তুলনায় তিনটি পাখির দামের চেয়ে, গুলি দুটির দাম অনেক বেশি। আর কষ্ট তো বৃথা। বাড়ির দিকে আসার পথে, মাঝে আছে বাজার। মামা তখন বাজারেই কোন এক দোকানে বসা ছিলেন। পাখি তিনটি দেখে অখুশি হননি। আর পাখির মধ্যে দুটি বালিহাঁস। একটি পানকৌরে।
তারপর বাড়িতে এলাম। বন্দুক তার নিজস্ব জায়গায় রাখলাম। তারপর ভাবতে লাগলাম। দুটি গুলীতে তিনটি পাখি ধরা পড়ল কেন? পাখিতো আরো বেশি ধরা পরার কথা ছিল। তাহলে গুলি করার ভুলটা কোথায় ছিল? দুটি গুলিতে তিনটি পাখি আহত হলো, তার বেশি হলোনা কেন? এধরনের জল্পনা কল্পনা করতে করতে সারা রাত আমার ঘুম নেই দুচোখে। এপাশ ওপাশ করতে করতে সকালে ঘুমালাম। দুপুর বারোটায় ঘুম থেকে উঠলাম। গোসল করলাম। তারপর যে হাওড়ে গতকাল পাখি শিকার করেছিলাম। মামাদের বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলো দূরে। আমি একা একা আবার সেখানে গিয়ে প্রায় দু-ঘন্টার মতো হাটলাম। পাখিগুলো কোথায় বসে কেমন করে। কোন কোন সরু পথ ধরে পাখিদের কাছে গিয়ে, গুলী করা যায়। ইত্যাদি বিষয়ের উপর বেশ গবেষণা করতে লাগলাম। এরকম অনেক নিশানা করে করে আবার ঘুরে ফিরে বাড়ি চলে এলাম। হাওড়ে পাখি শিকার করার উত্তম সময় সকালে। এ সময় জনগণ বিভিন্ন কাজে যায়। কেউ হালচাষ করে, কেউ গরু নিয়ে, কেউ ঘাস কাটে। তার একটু আগে। অন্য সময়টি হলো সন্ধ্যা লাগার পূর্ব মুহূর্তে। অন্য সময়গুলোতে পাখিগুলো খুব সর্তক থাকে।
তারপরের দিন রবিবার সকালে মামাকে না বলেই, আরো দুটি গুলী ও বন্দুক নিয়ে হাওড়ে চলে গেলাম। এই একই জায়গায় প্রায়সময় আরো গোটা দশেক বন্দুক ধারীরা পাখি শিকার করতে আসেন। আশে পাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে। যেহেতু এটা আমার মামার বাড়ির এলাকা, প্রায় সবাইকে মামা বলেই ডাকি। অনেকে আমাকেও চিনেননা। তখন আমার মামাদের পরিচয় দেই। তখন অনেকেই আমাকেও ভাগনা বলে ডাকেন। ঐ দিন সকালে আমার আগের দিনের চিহ্ন দেওয়া জায়গায় ঠিক মতো বসে। ধীরে ধীরে পাখির আড্ডার খুব কাছে গিয়ে, ঠাণ্ডা মাথায় একটি গুলি করলাম। তিনজাতের পাখি মিলে সতেরোটি পাখি শিকার করতে সক্ষম হলাম। গুলীর শব্দ শুনে অন্য শিকারীগণ ও পথচারী কয়েকজন এসে পাখি গুনতে লাগলেন। কেউ বলছেন ষোল, কেউ বলছেন সতেরো। অনেকেই বলছেন, বাহ্ যেমন মামা তেমন ভাগনা। কেউ কেউ মামাদের নাম উল্লেখ করে, আমার কৃতিত্ব জাহির করছেন। আমার পাঁচ মামাদের নাম যথাক্রমে দারোগা মিয়া, জমাদার মিয়া, নয়ন মিয়া, হুক্কু মিয়া, ও ছদ্দু মিয়া। আজকের এই পাখি শিকারের পর, পাশে থাকা একজন বন্দুকের মালিক আমাকে বলছেন, ভাগনা এক কাজ করো, আমি গুলী দেই। এই গুলী দিয়ে তুমি শিকার করো। তোমার অর্ধেক আমার অর্ধেক। আমি রাজি হলাম। তারপর আমার সেই পূর্ব পরিকল্পনা মতে, বড় হিজল গাছের তলে গিয়ে, প্রায় তিনমিনিট পর আমার ডান পাশে থাকা পাখির একটি ঝাঁকের উপর গুলী করলাম। এখানে এখন সাদা বকসহ বেশ কয়েক ধরনের পাখি। এই গুলিতে পাখি শিকার করেছি পঁচিশটি। তারপর সেখান থেকে বাছাই করে একজন সৌখিন বৃদ্ধ, পাখি শিকারীকে তিনটি পাখি সৌজন্য দিলাম। দেখলাম তিনি দুদিনে চারটি গুলী খরচ করে, একটি পাখি ও ধরতে পারেননি। তাঁর বাড়ি গজারিয়া গ্রামে। বাকিগুলো আমরা ভাগ করে নিলাম। তারপর পাখিগুলো মামাদের বাড়ির একজন কামলা, রতন ভাইকে দিয়ে বাড়িতে নিয়ে এলাম। পাখি সবগুলো দেখার পর বড় মামার তো মাথায় হাত। প্রথমে ভাবছেন, মনে হয় সব গুলি আজকে শেষ করেছি। মামা বললেন, নূরুল আমিন গুলী আজকে তো সব শেষ? আমি বললাম, না মামা। আমার এক গুলীতে সতেরো আর ছোবাহান মামার এক গুলীতে পঁচিশটা। পরে ভাগে পাইলাম এগারো। মামা বললেন, বেশ ভালো করেছো।
এই কথা বলে মামা কোথায় যেন চলে গেলেন। এই ভাবে প্রায়সময় পাখি শিকার করতে, বন্দুক সাথে নিয়ে সকাল বিকেলে হাওড়ে ঘুরতাম। বন্দুক হাতে থাকলে নিজেকে খুব সাহসী মনে হয়। সেটা হোক মামার বা নিজের। তারপর থেকে অন্যের গুলী দিয়েই পাখি শিকার করে, অর্ধ নিয়ে বাড়ি চলে আসতাম। মাঝে মাঝে নিজের থেকেও খরচ করতাম। তখনকার সময় উদীয়মান জীবনে মানুষের যে কয়টি গুণাবলি ফুটে উঠে। আমার ও বেশ কয়েকটি গুণাবলির মাঝে এই পাখি শিকার কৌশল এবং গবেষণার জন্য বেশ জনপ্রিয় ছিলাম। একদিন সকাল বেলায় পাখি শিকার করে বাড়ি ফেরার পথে, ঐদিন আবহাওয়া খুব কুয়াশাচ্ছন্ন ছিল। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মতো অবস্থা। তাই পথে ঘাটে জনগণের সংখ্যা ছিল কম। ঐ দিন আমি চারটি পাখি শিকার করেছি। আমার কাছে আর অবশিষ্ট দুটি গুলি আছে। চলার পথের বাঁক ঘুরতে গিয়ে সামনে একটি বড় ক্ষেতের এক পাশে, একটি বিশাল আকৃতির সাদা বক। তবে পা চিকন টিকন ছোট আকৃতির পাখির সংখ্যা কয়েকটি। চিন্তা করলাম এই পর্যন্ত তো পরের গুলি দিয়েই বাহাদুরী করেছি। সাথে থাকা গুলী থেকে আজ এই বকটাকে মেরে ফেলবো। আসলে সব শিকারীরা খুব নির্দয় হয়ে থাকে। আমার বেলায় ও তাই। লোভ যে মানুষকে পশুতে পরিণত করে দেয়। শিকারীরা তার বড় প্রমাণ। বন্দুকের ভিতরে গুলি ভরলাম। খুব সাবধানে ক্ষেতের এক পাশে বসে বকটার পায়ে গুলি লাগালাম। সঙ্গে সঙ্গে বকটি শিশু বাচ্চার মতো কান্না করা শুরু করে দিল। বড় বড় পাকনা দিয়ে উড়ে যাবার চেষ্টা করছে। তখন ও আমি শত হাত দূরে। আমার চোখে এখনও সেই কান্নার দৃশ্য, আপন মনে ভেসে ওঠে। সেদিন এই বকটি শিকার করার পর থেকে। আজ পর্যন্ত কোন পাখি আমি আর শিকার করিনি। এমন কী আমার জীবনে আজ পর্যন্ত আর একটি হাঁস, মোরগ, কবুতরও জবাই করিনি। আমার নিজের কাছে নিজেকে আজও অপরাধী মনে হয়। সেদিন নিঃসঙ্গ এই বকটি শিকার করা ঠিক হয়নি। আমি আজও অনুতপ্ত।


