পাপ্পু রায়, অতিথি লেখক (ভারত): জীবনানন্দ দাশ রিকশা চালায়। সে কুষ্টিয়া শহরের ছোট্ট একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকে। জীবনানন্দ উচ্চ শিক্ষিত। সে একজন ইতিহাসের স্নাতক। কুষ্টিয়া শহরের সমস্ত লুপ্ত এবং শেষ হয়ে যাওয়া ইতিহাস তার নখ দর্পনে।
পেশার কথা জিজ্ঞেস করলে জীবনানন্দ গর্বের সাথে বলে যে আমি রিক্সা চালাই। আমি খেটে খাই। রিক্সা চালাতে আমার কোন লজ্জা নাই।
জীবনানন্দ রিক্সায় বসিয়ে আমাকে কুষ্টিয়া শহর ঘুরে দেখিয়েছে। আমাকে কুষ্টিয়া শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সমস্ত ঐতিহাসিক নিদর্শন বর্ণনা সহ ঘুরিয়ে দেখিয়েছে। দিন শেষে সে ভাড়া বাড়িতে ফিরে নিজের হাতে রান্না করে আমাকে গরম ভাত মাছ ভাজা, ডিম ভাজা সহ ডিনার করিয়েছে। জীবনানন্দের সঙ্গে আমার কোন রক্তের সম্পর্ক নেই। নেই কোন দুঃসম্পর্কের আত্মীয়তা।
জীবনানন্দের আদি বাড়ি কুষ্টিয়া শহর থেকে অনেক দূরের কোন এক গ্রামে। ছেলেটি শিক্ষিত জ্ঞানী বুদ্ধিমান পরিশ্রমী। কিন্তু গরিব তাই পেটের টানে রিক্সা চালায়। জীবনানন্দ বাংলাদেশী ওর দেশ বাংলাদেশ। আর আমি ভারতীয়। ওদের সাথে ফেসবুক সূত্রে পরিচয়।
গত ২০ ডিসেম্বর সকালে বারুইপুরের বাড়ি থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে সাইকেল অভিযানে বেরিয়ে পড়েছিলাম। তারপর কলকাতা, হাবরা, বেনাপোল যশোর হয়ে ২১ তারিখে বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায় পৌছে গিয়েছিলাম। কুষ্টিয়ার এক আইএসআই পুলিশকর্মী আশরাফুজ্জামান দাদার বাড়িতে রাত কাটিয়ে সকালে জগতি রেলওয়ে স্টেশন দেখতে গিয়েছি। কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করতেই হঠাৎ দেখি দুজন ছেলে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে। ভারত থেকে সাইকেল নিয়ে বাংলাদেশে ঘুরতে এসেছি শুনে সে আমার সঙ্গে দেখা করে এবং আমাকে তার রিকশায় বসিয়ে ঘুড়ে বেড়ায়। নাহয় একদিন কাজ বন্ধ হবে, তাতে কি ভারত থেকে মেহমান এসেছে তাই আজ আর তার রিকশা চলবে না।
সারাদিন ধরে সে আমাকে নিয়ে কুষ্টিয়ায় ঘুরে দেখানোর প্রচুর ঐতিহাসিক নিদর্শন বর্ননা সহ ঘুরে দেখালো। দেশভাগ এবং দাঙ্গার কারনে ফেলে যাওয়া জমিদার বাড়ি, পরিত্যক্ত মন্দির, বন্ধ হয়ে যাওয়া মোহিনী মিল, লালন ফকিরের মাজার, অন্নদাশঙ্করের বসত বাড়ি, শিলাইদহ রবিন্দ্র কুঠি ইত্যাদি। বাংলাদেশ এসে আমি অনেক সাইকেল প্রেমী বন্ধুর সাথে দেখা করেছি। তাছাড়া ডাক্তার, উকিল, পুলিশ, মুক্তিযোদ্ধা, রাজনিতীবিদ, সমাজসেবী সহ সমাজের অনেক গন্যমান্য মানুষের সানিধ্য পেয়েছি। কিন্তু একজন রিকশা চালকের সাথে মিশে তার সাথে ঘুরে যে জ্ঞান এবং তথ্য পেয়েছি সেটা চিরকাল মনে থাকবে। ভালো থেকো জীবনানন্দ দাদা। তোমার জীবন আনন্দময় হয়ে উঠুক।
♥️ বাংলাদেশ
নিউজের জন্য: news.sangbadlive24@gmail.com