এম. এ. মোমেন: আমাদের পরিবারের (বড় কাকা, বাবা আর ছোট কাকার পরিবার মিলে) বড় ভাইয়ের ছেলে/মেয়ের আকিকার দাওয়াত খেতে ছোট ভাইয়ের বিয়ের পর একদিন বাপের গ্রামের বাড়ি বরকে নিয়ে বেড়াতে এসেছি, আসলে ঠিক বেড়াতে নয়, বাবা ফোন করে জানালেন যে দাওয়াত খাওয়া শেষে পরের দিন গিয়ে আমার সোনারগাঁও এর নতুন বাড়িতে তোমাদের সকলকে নিয়ে একটি পারিবারিক মিটিং করবো সেইখানেও খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। সুতরাং তোমরা সবাই সময় মতো চলে এসো। আজ এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটেছে যে বাবা ঘটা করে আমাদের সব ভাইবোনকে এক সাথে ডেকেছেন। আগে থেকে বলে রাখা ভাল আমরা আমাদের পরিবারে দুই ভাই আর আমি একমাত্র বোন। অর্থাৎ দুই ভাই আর এক বোন মিলে বাবা-মায়ের তিন সন্তান। দুই ভাই, ভাই এর বৌ এবং তাদের বাচ্চারা বাবা- মায়ের সাথেই একই বাড়িতে থাকে।
দুপুরে সবাই একসাথে খাওয়া-দাওয়া করে বিকেলে বাবার গ্রামের বাড়ীর কাছে বা দূরের পরিচিতদের সাথে সাক্ষাৎ করা, তাদের সাথে কুশল বিনিময় করাসহ গ্রামের পরিবেশ এবং প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা শেষে রাতের খাবার খেয়ে যার যার মত করে ঘুমিয়ে পরি কারণ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে নতুন বাড়ীতে যেতে হবে। ঘুম থেকে উঠে সকালের নাস্তা করা শেষে সোনারগাঁও এর নতুন বাড়ীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করে দুপুর ১২:০০ টার সময় নতুন বাড়ীতে পৌঁছে যার যার মত ফ্রেশ হয়ে দুপুর ০১:০০ টার সময় দুপুরের খাবার গ্রহণ করার জন্য সকলে খাবার টেবিলে বসে যাই। এখানে একটি কথা বলে রাখা ভাল আমরা গ্রামের বাড়ী থেকে সকাল ০৮:০০ টা নাগাদ রওনা দিলেও পূর্ব পরিকল্পনা মাফিক বাবা-মা ভোর ০৬:০০ ঘটিকায় রওনা দিয়ে আনুমানিক সকাল ০৯:০০ ঘটিকায় সোনারগাঁও এর নতুন বাড়ীতে পৌঁছে সকলের জন্য যথাসাধ্য খাবার তৈরি শুরু করে দেন। আমরা যথাসময়ে দুপুরের খাওয়া-দাওয়া করে বিকেলে বাবার কথা মতো সবাই ড্রইংরুমে এসে বসলাম। বাবা কিছুক্ষণ পর আসলেন এবং মাকে পাশে নিয়ে বসলেন। খুব টেনশন হচ্ছে বাবা ঠিক কি করতে চলেছেন বা বলতে চাইছেন।
হঠাৎ বাবা বলতে শুরু করলেন। শোন, তোমরা আমার সন্তান, জ্ঞান হবার পর থেকে হয়তো আমাকে ভাল মানুষ হিসেবেই জেনে এসেছো। আমিও চেষ্টা করেছি একজন আদর্শ বাবা হওয়ার তা হয়তো কিছুটা হলেও পেরেছি, যার ফলাফল আজ আমার প্রতিটি সন্তান সুসন্তান, উচ্চশিক্ষিত এবং যে যার মতো প্রতিষ্ঠিত। তোমাদের একমাত্র বোন সোনালী-কে বিয়ে দিয়ে দিলাম ঘর, বর সব ভালো দেখে, তোমাদের ছোট ভাই মারুফের বৌ এলো তাও প্রায় ৯ বছর পার হয়ে গেছে। সন্তানদের প্রতি এই টুকু দায়িত্ব অন্ততঃ পালন করেছি। তবে আমি স্বামী হিসেবে মোটেও সফল নই বরং বিপরীতটাই বলতে পারো। বাকীটা তোমাদের মা বলতে পারবে আমি কোন ক্ষেত্রে কতটা সফল বা ব্যর্থ।
বাবার কথা শুনে বাবাকে এবার থামানোর চেষ্টা করছেন মা কিন্তু বাবা মাকে বাঁধা দিয়ে বললেন, আজ আমাকে থামাতে চেয়ে কোনও লাভ হবে না মমতা। অবহেলায়, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় এতদিন আমি যে দায়িত্ব পালন করা থেকে বিরত ছিলাম, স্বামী হিসেবে বেলা শেষে হলেও অন্ততঃ এখন আমি আমার দায়িত্ব কিছুটা পালন করতে চাই, আমি আমার সন্তানদের কাছে নিজের অন্যায় স্বীকার করতে চাই। আমরা ঠিক বুঝতে পারছি না, বাবা ঠিক কি বলতে চাইছেন। আমরা বারে বারে সবাই একে অপরের মুখের দিকে চাইছি আর ভাবছি এবার কি হবে? বাবা আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় দু’হাত ভরে অনেক বেশীই দিয়েছেন কিন্তু কখনও তার প্রতিদান চাননি আমাদের কাছে, তাহলে আজ!
বাবা আবারও বলতে শুরু করলেন, আমি ছিলাম আমাদের মানে তোমাদের দাদা-দাদীর পরিবারে ভাই বোনের মধ্যে পঞ্চম আর লেখা পড়ায় মধ্যম পর্যায়ের ছাত্র। আমি যখন তেজগাঁও কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি গেলাম তখন আমার বাবা তাঁর এক বন্ধুর মেয়ের (রূপক নাম বিউটি) সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেন। বাবার সেই বন্ধু- আমরা মামা বলে ডাকতাম। বিউটিও বেশ সুন্দরী ৫ ফুট ৫/৬ ইঞ্চি লম্বা এবং দেহের গঠন প্রায় বোম্বের নায়িকাদের মত ছিল। তাকে দেখলে যে কেউ পছ্ন্দ করবে এবং স্ত্রী হিসেবে পেতে চাইবে তাতে কোনো ভুল নাই। তাছাড়া ঐ সময়ে তাকে স্ত্রী হিসেবে পেতে চায় না এমন যুবক খুঁজে পাওয়া মুশকিল ছিল কিন্তু আমি বাবার বন্ধুর পরিবারটি সামাজিকভাবে উগ্রপন্থী, পরিবারের ছেলেরা প্রায় সময়ই রাজনৈতিক, গোত্র বা গোষ্ঠী কেন্দ্রিক নানান ধরণের ঝগড়া-ফেসাদে লিপ্ত থাকাসহ নৈতিকতা বিবর্জিত হওয়ায় ঐ পরিবারে বিবাহ করতে রাজি হইনি। তাছাড়া বিউটি-কে বিয়ে না করার আরও একটি কারণ ছিল সবে মাত্র অষ্টম শ্রেণীতে পড়ুয়া তোমার ছোট কাকা বিউটি’র রুপে আকৃষ্ট হয়ে এবং বিউটি’র বাবার আমাদের পরিবারের প্রতি দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে বিউটি-কে বিবাহ করবে বলে পরিবারে তুরপার আরম্ভ করে দেয়। সে এই বলে হুমকি দেয় যে, আমি যদি বিউটিকে বিয়ে করে বৌ হিসেবে আমাদের পরিবারে নিয়ে আসি সে বিউটিকে ভাবী হিসেবে গ্রহণ করবে না বরং আমাকে এবং বিউটিকে হত্যা করবে। অগত্যা তার এইরূপ উৎপাত থেকে পরিবারকে রক্ষা করার জন্য আমার এক বন্ধুর বোনকে বিয়ে করিয়ে দেওয়া হলেও তার হুমকি বেশ কিছুদিন অব্যাহত থাকে। ঐসময় আমার নিজের যদিও কোনও পছন্দ ছিলনা কিন্তু মনে মনে ভাবতাম, আমি যাকে বিয়ে করবো সে খুব সুন্দরী হবে আর গায়ের রংটা ফর্সা হতেই হবে বিউটি’র মতো না হলেও তার কাছাকাছি হতে হবে কারণ পরিবার পছন্দ না হলেও বিউটিতো তার সৌন্দর্য্য দিয়ে আমার মনের অনেকটা স্থান দখল করতে পেরেছিল। তাছাড়াও আমার আরও একটি চিন্তা ছিল যাঁর মেয়ে আমার স্ত্রী তিনি মধ্যবিত্ত এবং আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হবেন কিন্তু আমাকে কোন প্রকার যৌতুক দিতে হবে না। শুধুমাত্র আমি যদি পরিবারের উন্নতির জন্য আর্থিক কোন কাজ শুরু করি তখন প্রয়োজন হলে ফেরতযোগ্য কিছু অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করতে পারেন। তাতে আমিও কোন কাজ করতে গেলে সাহস পাব পাশাপাশি আমার স্ত্রীও মনে প্রাণে সাহসী হবেন এবং সাহস করে আমাকে কাজ করার উৎসাহ যোগাবেন। আমার দুর্ভাগ্য বিবাহ করার পূর্বেই আমার বাবা মানে তোমার দাদা না-ফেরার দেশে চলে যান এবং তাঁর এই মৃত্যুর শোকে তিন মাসের মধ্যে মমতাময়ী মাও মহান আল্লাহ্ র মেহমান হয়ে তাঁর ডাকে সারা দিয়ে পরপারে চলে যাওয়ায় আমি একা এবং চূড়ান্তভাবে অভিভাবকহীন হয়ে পড়ি।
তার পর থেকে মা-বাবা হারানোর ব্যথা বুকে ধারণ করে বেশ কিছুদিন কান্ডারী বিহীন নৌকার মতো এলোমেলোভাবে চলতে থাকি। এই অবস্থার পরিত্রাণ বা অবসান ঘটিয়ে আমার একাকিত্ব ঘোচানোর জন্য অভিভাবকের দায়িত্ব নিয়ে আমার বড় ভাই তোমাদের বড় কাকা এগিয়ে আসেন তাঁর সাথে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় আমার বড় দুলাভাই মানে তোমাদের বড় ফুফা। তাঁরা পরস্পর পরামর্শ করে তোমাদের বড় কাকার পূর্ব পরিচিত পরিবার যা নারায়ণগঞ্জ জেলার অন্তর্গত সোনারগাঁও বসবাস করে সেখানে আমাকে নিয়ে যায় মেয়ে মানে তোমাদের মাকে দেখানোর জন্য। আমি মোটেও তাঁদের পরিকল্পনা আগে থেকে টের পাইনি যে আমার শ্রদ্ধেয় দুলাভাই পকেটে করে আংটি নিয়ে গেছেন যে মাত্র আমি রাজি না হলেও সরাসরি যদি কিছু না বলি তবে তিনি আংটি পড়িয়ে দিয়ে তার মান-সম্মানের ভয় দেখিয়ে আমাকে বিয়ে করতে বাধ্য করবেন। কিন্তু পাত্রী দেখতে গিয়ে দেখলাম পাত্রী মোটেও ফর্সা কিংবা আমার স্বপ্নের রানী নয় বরং তার উল্টো। আমি কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে গেলাম, এই মূহুর্তে আমার কি করা উচিত তা ভেবে পাচ্ছিলাম না। তাছাড়া আমি যে কারো সাথে আলাপ করব সেই সম্পর্কের কেউ আমাদের সাথে ছিল না শুধু ছিলেন বড় বুবু, দুলাভাই আর বড় ভাই।
আমার মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায় আর প্রচন্ড রাগ হয় আমার ভাই এবং দুলাভাইয়ের প্রতি কিন্তু দুলভাই অত্যন্ত রাগী ছিলেন তাই খুব ভয় পেতাম দুলাভাইকে আর সেই ভয়ে শেষ পর্যন্ত কিছু বলতে পারিনি। এক সপ্তাহ বাদে আমাদের বিয়ে হয়ে যায়। তবে বিয়ে হলেও আমি সেই স্ত্রীকে মন থেকে মেনে নিতে পারিনি অনেকটা সময় বা বছর কিন্তু একই সাথে থাকতে হয়েছে নানান প্রতিকুলতার কারণে। সে বিভিন্ন ভাবে আমাকে খুশি করার চেষ্টা করতো কিন্তু আমি তাঁকে আমার সামনে দেখলেই বিরক্ত হতাম। অবশেষে শ্বশুর বাড়ী সোনারগাঁও থেকে আবার ঢাকায় ফিরে এলাম আর সরকারি চাকরিতে জয়েন করলাম। বলে রাখা ভালো আমার থাকার বাসাও ঢাকায় অফিসের কাছাকাছি এবং বাসায় আমার ছোট ভাইয়ের পরিবার বা তোমাদের ছোট কাকার পরিবার পূর্ব থেকেই বসবাস করত। একেইতো ছোট ভাইয়ের পরিবারের সাথে থাকতাম তারমধ্যে পছন্দ না হওয়ার কারণে হয়তো ভুল করেও স্ত্রীর কথা মনে হতোনা আমার।
আর এবার যেটা বলবো সেটা চরম লজ্জার তবুও আমি বলবো, নিজের পাপ স্বীকার আমি নিজের সন্তানদের কাছেও করবো, এই বলে বাবা আবার বলা শুরু করলো, ঢাকায় অবস্থিত সরকারি সংস্থায় চাকরি করার কারণে ঢাকায় অফিসের কাছাকাছি থাকতাম। একাএকা থাকার কারণে অফিস ছুটির পর আশে-পাশের বিভিন্ন পার্ক বা উম্মুক্ত স্থানে হাটা-হাটি করার সময় অনেক কপোত-কপোতিকে বিভিন্নভাবে অবস্থান, ভালবাসা বিনিময়, নানান ভংগিতে আলিঙ্গন করতে দেখে নিজের মনে আকাঙ্খা সৃষ্টি হতো। কিন্তু কোন উপায় ছিল না। তাছাড়া আমি ছোট সময় থেকেই অন্যান্যদের চেয়ে একটু বেশী ধর্মের প্রতি দূর্বল ছিলাম, তাই বিপথে গিয়ে মনের চাহিদা মিটাতেও বিবেক বাধা হয়ে দাড়ানোর কারণে তা সম্ভব হয়ে উঠেনি বিধায় হয়তো অনেকটা পাপ মুক্ত থাকতে পেরেছি আমার মনে হয়। তারপরও মনের অজান্তে সয়তানের প্ররোলচনায় উত্তর বঙ্গের সায়মা (রূপক নাম) নামের এক মেয়ের সাথে পত্রমিতালীর মাধ্যমে সখ্যতা তৈরী হয়। বলে রাখা ভালো পত্রমিতালীতে আমার ছবি থাকলেও তার কোন ছবি ছিল না। ফলে তাকে স্বশরীরে না দেখে ভালবাসলেও কোন দিন তার সাথে আমার সামনা সামনি দেখা সাক্ষাৎ হয়নি। তার পত্রের ভাষায় কখনও মনে হয়নি যে সে স্বল্প শিক্ষিত এবং অসুন্দরী অজো পাড়া গায়ের মেয়ে।
এইভাবে প্রায় বছর খানেক চলার পর একদিন হঠাৎ করে আমার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য সুদূর উত্তর বঙ্গ থেকে সাময়া ঢাকায় আমার অফিসে হাজির হয়ে এক কলিগের কাছে আমার কথা (পরিচয়) জানতে চায়। প্রতি উত্তরে কলিগ কিছু বলার পূ্র্বেই আমি সায়মাকে দেখে ফেলি। তাদের কথা-বার্তায় আমার বুঝতে তেমন অসুবিধা হয়নি যে সে পত্রমিতালীর সায়মা, ফলে তার সামনে না এসে তাৎক্ষণিক ঐ স্থান থেকে পলায়ন করি। দূর থেকে যা দেখলাম সে একজন সুঠাম দেহী নারী, আমার চেয়েও নারী বলে হয়তো কিছুটা লম্বা দেখাচ্ছে। যেমন লম্বা তেমনি মোটা এবং গায়ের বর্ণ কালো কুচকুচে দেখতে প্রায় শিম্পাজি বা বন মানুষের মতো। তাৎক্ষণিক আমার মনে হয়েছে পথ ভুলে হয়তো দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আমার অফিসে চলে এসেছে এবং তার প্রেমিকের নাম ভুলে যাওয়ার কারণে আমার নাম বলছে। সেই সময় তার থাবায় পড়লে হয়তো আমার আর রক্ষা ছিল না তাই জীবন রক্ষার্থে এবং মান-সম্মানের ভয়ে সেইদিন আর অফিসে প্রবেশ করি নাই। তখনকার সময় কাউকে খুঁজে পাওয়াও মুশকিল ছিল কারণ আমার নিকট ছাড়া অফিসে কোন ষ্টাফের কাছে তখন মোবাইল ছিল না। পরের দিন জানতে পারলাম কয়েক ঘন্টা অপেক্ষা করে আমার দেখা না পেয়ে রাতের গাড়ীতে পুনরায় উত্তর বঙ্গে চলে গেছে। আমি সেই দিনকার মত বড় বাঁচা বেঁচে গেলাম আর ভাবতে লাগলাম আমার বিবাহিত স্ত্রী মানে তোমাদের মা তার চেয়ে অনেক সুন্দরী বটে কিন্তু আমার স্বপ্নে দেখা রানীর মত নয়। যার কারণে বিবাহের প্রায় ২/৩ মাস হয়ে গেলেও তোমাদের মাকে বাসায় আনার কোন উৎসাহ আমার মধ্যে পরিলক্ষিত হয়নি বিধায় তোমাদের খালা এবং ছোট কাকিমা আমার অনাগ্রহের বিষয়টি নিয়ে প্রায় ফোনে কথা বলত এবং আমাকে চোখের দৃষ্টির মাধ্যমে তাড়া দিত কারণ তোমাদের কাকি হলো আমার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী তাই লজ্জায় আমাকে সরাসরি তেমন কিছুই বলতে পারত না।
অগত্যা প্রচন্ড মানসিক কষ্ট নিয়ে আবার নারায়ণগঞ্জ গেলাম কিন্তু নিজ স্ত্রীকে কোনো সম্মান তো দিইনি বরং সামনে এলে মাঝেমাঝে দূরদূর করতাম আর সেই সুযোগটা ঢাকায় একসাথে থাকা তোমাদের কাকি, গ্রামের বাড়িতে থাকা তোমাদের বড় কাকিমাসহ অন্যরা নিতো। একটি কথা না বললেই নয় প্রাকৃতিকভাবে পুরুষের সুন্দরী নারীর প্রতি এবং নারীদেরও সুদর্শন পুরুষের প্রতি আকর্ষণ থাকে, আমারও ব্যতিক্রম ছিল না কিন্তু আমার আকর্ষণ বা দৃষ্টি অন্যদের মত নয়। সুন্দরী নারীর প্রতি আমার আকর্ষণটা ছিল একটু ভিন্ন টাইপের। কারণ আমি বুঝ হওয়ার পর হইতে মনে মনে চিন্তা করতাম একটি মানব দেহে দু’টি সত্ত্বা থাকে একটা মনুষ্য সত্ত্বা আর একটি বিবেক। তাদের আবার দু’টি ভাগ আছে যেমন- মনুষ্য সত্ত্বার মধ্যে একটি মনুষ্যসত্ত্বা আর একটি পশুত্যসত্ত্বা। যাদের মনুষ্য সত্ত্বা জাগ্রত থাকে তারা ভদ্র, বিনয়ী এবং চরিত্রবান হয়ে থাকে। আর যাদের মধ্যে পশুত্যসত্ত্বা জাগ্রত থাকে তারা চরিত্রহীন, লম্পট, অভদ্র কিসিমের মানুষ হয়ে থাকে এবং তারা পুরুষ হয়ে পরনারী আর নারী হলে পরপুরুষের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলার মাধ্যমে লোকলজ্জার ভয়কে তোয়াক্কা না করে পরকীয়ায় লিপ্ত থাকে। বিবেকেরও দু’টি ভাগ আছে যেমন- একটা ভাল দিক আর একটা খারাপ দিক।
আমি ছোট সময় থেকেই ধর্মভীরু থাকার কারণে আমার মধ্যে মনুষ্য সত্ত্বা জাগরত থাকত এবং সকল সময় ভালো বিবেক কাজ করত। বিধায় অন্যদের মতো তেমন কোন খারাপ কাজ বা সমাজের চোখে দৃষ্টি কটু এমন কাজ বিবেকের বাঁধায় করতে পারি নাই। তাছাড়া সখের বসে বিভিন্ন নাট্য দলের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে বিভিন্ন সময় মঞ্চ নাটকে অভিনয় করি, বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রেও ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করার সুবাদে দেশের অসংখ্য সুন্দরী নারীদের কাছে যাওয়ার বা সান্নিধ্য পাওয়ার সুযোগ হলেও বিবেক কর্তৃক সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতায় সর্বক্ষণ নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলতে চেষ্টা করেছি বা চলেছি। তাদের বিভিন্ন ধরনের দৈহিক বা মানুষিক আহবানেও আমাকে তেমন কাবু করতে পারেনি।
ঢাকার বাসায় তোমাদের ছোট ফুফু, ছোট কাকা, কাকি, কাকার ছেলে-মেয়েসহ ৮/৯ জনের জন্য কাঠের (ভূসির) উনুনে রান্না, সাথে বাসার যাবতীয় কাজ প্রায়সব মমতাকে দিয়েই করানো হতো তারপরও পাশা-পাশি বাসায় বসবাসকারী আমার বড় বোন বা তোমাদের বড় ফুফুর ছেলে-মেয়েদের উপদ্রব তো নিত্যদিনের সাথী। তাছাড়া সকলের নিকট তোমাদের মা ব্যতীত আমাদের পরিবারের উটকু ঝামেলা হিসাবে পরিগণিত চিরদিনের রোগী আমার ছোট বোন বা তোমাদের ছোট ফুফুর নিত্যনৈতিক চাহিদা, সেবা তো আছেই। এতো এতো ঝামেলার কাজগুলি তোমাদের মা বিনা বাক্য ব্যয়ে করে যেত। আমি সারাদিন অফিস করে অফিস ছুটির পর হোমিও কলেজের ক্লাস শেষে বাসায় আসতে প্রায় প্রতিদিনই রাত ১০:০০ টা বেজে যেত এবং অধিক শারিরীক ক্লান্তির কারণে বাসায় এসে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম বলে বাসায় ঘটে যাওয়া সারাদিনকার ঘটনার বিষয়ে তেমন কিছুই জানতে পারতাম না। তাছাড়া তোমাদের মাকে অবহেলা করতাম বলে সে সারাদিন কিছু খেয়েছে কিনা, তার শরীর ভালো আছে কিনা বা সারাদিন কি করেছে বা তার কোন ব্যক্তিগত চাহিদা আছে কিনা তা জানার আগ্রহও আমার কাছে ছিল না। মনের অজান্তে আমি দু একবার আড় চোখে খেয়াল করতাম ওর হাতে ফোস্কা পড়ে থাকতো পাটায় মশলা পেষার কারণে। সেই কাক ডাকা ভোরে উঠে বাসা, আঙ্গিনা ঝাড়ু দেয়া থেকে সবার জন্য জীবন উৎসর্গ করে দেওয়া যেন ওর নিত্যদিনকার রুটিন ছিল। তাতেও শান্তি ছিলনা, পান থেকে চুন খসলেই ওকে সবাই বিভিন্নভাবে হেনস্তা করতো কিন্তু আমার ভালবাসা পাওয়ার আশায় নিমেষেই সবকিছু ভুলে গিয়ে হাসি মুখে আমার কাছে আসত।
আমাদের পরিবারে ওকে কেবল আমার বড় ভাই ছোট বোনের মতো ভালোবাসতেন কারণ তাদের পরিবারের সাথে উনার পূর্ব থেকে জানা-শোনা ছিল এবং উনার আগ্রহেই বিয়েটি হয়েছিল। এইভাবে কিছুদিন লুকোচুরি চলার পর তাকে তার মেঝু বোন আমার সম্পর্কে জেটাস (জেটাতো ভাইয়ের বউ হিসেবে) বড় ভাবী এসে আমাকেসহ তাকে সোনারগাঁও নিয়ে যান। আমি সোনারগাঁও গিয়ে খুব মন কষ্টে দুইদিন থেকে ঢাকায় ফিরে আসি তারপর আর সোনারগাঁও যাবার নাম পর্যন্ত করি না, এমনকি এই বিয়ের কারণে বড় ভাইয়ের সাথে রাগ করে গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় যাওয়া প্রায় ছেড়ে দিয়েছি। বিয়ে করার পূর্বে প্রায় প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার অফিস শেষে গ্রামের বাড়ী যেতাম। বড় ভাই ফোন করলেও কোনো রকম জবাব দিই।
এভাবে চলতে থাকে বেশ কিছুদিন এরই মাঝে হঠাৎ একদিন তোমাদের মেঝু খালা আমার ভাবীর ফোনের মাধ্যমে জানতে পারলাম তোমাদের মা গর্ভবতী এবং বাচ্চা প্রসবের সময় অতি নিকটে। বলে রাখা ভালো আমি বিয়ে করতে বিলম্ব করার কারণ হিসেবে আমাকে আশে-পাশের লোকজন নানান অপবাদ দিত। তোমাদের মা প্রথম সন্তান সম্ভবা হওয়ার পর আমার মাথা থেকে লোকজনের অপবাদ সরে গেল। এই খুশিতে আমার বড় দুলাভাই মানে তোমাদের বড় ফুফা হাসতে হাসতে বলে ফেললো তিনি যদি আগে থেকে আমার শারীরিক সমস্যা নাই জানতো তবে হয়তো এই বিয়ে করাতেন না। পরিশেষে এই খুশির খবর শোনার পর আমার বড় বোন তোমাদের বড় ফুফু সেইদিনই তাকে মানে তোমাদের মাকে ঢাকায় নিয়ে আসার জন্য প্রায় জোড় করে আমাকে সোনারগাঁও পাঠিয়ে দেয়। এই খবর শোনার পর ইতোমধ্যে আমার মাঝেও তার প্রতি কিছুটা ভালবাসা সৃষ্টি হয়েছে কারণ শত হলেও তার গর্ভে আমার পরিবারের বংশধর বড় হচ্ছে আর আমি সকল অপবাদ থেকে মুক্তি পেয়ে বাবা হতে চলেছি।
অগত্যা তাকে বা তোমাদের মাকে ঢাকায় নিয়ে আসার পর প্রায় ২/৩ মাস পর সেই সময়টি চলে আসে এবং সকলের পরামর্শে যথা সময়ে তাকে ঢাকা মেটারনিটি-তে ভর্তি করা হয়। তাকে মানে তোমাদের মাকে দেখা-শুনা করার জন্য তার সাথে তোমাদের বড় ফুফু এবং মেঝু খালা সর্বক্ষণ থাকতেন আর মাঝে মাঝে তোমাদের ছোট খালা খবরা-খবর রাখেন। আমিও অফিস ছুটি পর মেটারনিটি হয়ে হোমিও কলেজে যাই এবং কলেজ শেষে পুনরায় মেটারনিটি হয়ে বাসায় আসি। মেটারনিটিতে ভর্তি করার ৪/৫ দিন অতিবাহিত হয়। সেইদিন অফিস এবং কলেজ বন্ধ থাকায় পরন্ত বিকালে আমি মেটারনিটির বাহিরে দাড়িয়ে আছি হঠাৎ তোমাদের ফুফু আনন্দের সাথে আমাকে খুশির খবর দেয় যে আমাদের একটা ছেলে জন্ম হয়েছে (তোমাদের বড় ভাই) আর ছেলেটি দেখতে নাকি আমার মতোই। মুসলিম হিসেবে নবজাতক শিশুর কানে জরুরী ভিত্তিতে আযান দেয়া দরকার। তখন আমি নাকি অন্য কেউ আযান দিয়েছিল তা মনে করতে পারছি না। যাক আমার সন্তান অন্তত তার মায়ের মতো কালো তো হয় নি! আমি মেটারনিটির সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ২/৩ দিন পর প্রথম সন্তানসহ তোমাদের মাকে বাসায় নিয়ে আসি। এভাবে একে একে আমাদের আরও দুটি সন্তান (তুমি এবং তোমার ছোট ভাই) ভূমিষ্ঠ হল। আমাদের তৃতীয় সন্তান মানে তোমার ছোট ভাই-কে ভূমিষ্ট করার সময় তোমাদের মায়ের শারীরিক জটিলতা দেখা দেওয়াসহ গর্ভজাত সন্তানের স্বাস্থ্যঝুকি থাকায় ডাক্তার এর পরামর্শে বাচ্চাদানি কেটে ফেলতে হয়। যার ফলশ্রুতিতে তোমাদের মা আরও বাচ্চা নেয়ার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এই অপারেশন করার সময় তোমাদের মা অনেক কান্না-কাটি করেছিল কিন্তু বিকল্প আর কোন উপায় না থাকায় একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করা হয়েছিল।
একেতো স্বল্প সময়ের ব্যবধানে পর পর সিজারের মাধ্যমে তোমাদের তিনজনের জন্ম তারপর সর্বশেষ (তৃতীয় সন্তান জন্মের সময়) বাচ্চাদানি কেটে ফেলার কারণে তোমাদের মা অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে তারপরও সংসারের কাজ কমেনি বরং দিন দিন বৃদ্ধি পেয়েছে। সংসারের যাবতীয় কাজ তাকে এতদিন একা হাতেই সামাল দিতে হয়েছে। ততদিনে তোমাদের জন্মের পর অবশ্য আগের মতো মমতাকে অপমান না করলেও খুব যে ভালোবাসতাম সেটাও নয়। তারও একটি কারণ ছিল অল্প বেতনে চাকুরী করে এতবড় সংসারের ব্যয় মিটানো আমার পক্ষে খুবই কঠিন ছিল কিন্তু বরাবর সৎ পথে ছিলাম বিধায় আল্লাহ্র অশেষ মেহেরবানীতে সম্ভব হয়েছে। একটি কথা আছে না পকেটে টাকা না থাকার কারণে প্রিয়জনের চাহিদা মিটাতে না পারলে ভালবাসা জানালা দিয়ে পালিয়ে যায়, আমার বেলায় হয়তো তাই হয়েছে। এরই মধ্যে তোমাদের ছোট কাকা দেশের বাহিরে চলে যায় এবং সামান্যতম ভুল বোঝা-বুঝির কারণে তোমাদের কাকীও তার ছেলে-মেয়ে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যায়
হোমিও ডাক্তারী পড়ার সুবাদে নিয়ম করে প্রতি বৃহস্পতিবার গ্রামের বাড়িতে যেতাম এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি এবং সমাজে বসবাসকারীদের মাঝে নিজের খ্যাতি এবং সম্মান বৃদ্ধির জন্য ফ্রি চিকিৎসার ব্যবস্থা করতাম। এমনকি আমার সাধ্য বা অভিজ্ঞতার বাহিরে কোন প্রকার জটিল রোগীর সাক্ষাত হলে তাকে ঢাকায় এসে আমাদের বাসায় থেকে ভালো মেডিক্যালে বড় বড় ডাক্তার দেখিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিতাম এবং আরও বলতাম যতদিন প্রয়োজন হয় আমাদের বাসায় থাকবে বিনা পয়সায় খাওয়া দাওয়ারও ব্যবস্থা করতাম। যার ফলশ্রুতিতে প্রায় প্রতিমাসেই দূরের বা কাছের আত্মীয়-স্বজন এমনকি আমাদের গ্রামের আশে-পাশের রোগীও তার স্বজনদের নিয়ে বাসায় আসত এবং কমপক্ষে ২/৩ দিন অবস্থান করে রোগীর চিকিৎসা শেষে চলে যেত। আগত অতিথিদের সেবা করতে তোমাদের মায়ের যে কি কষ্ট হতো তা আমি এখন বুঝতে পারলেও নিজের খ্যাতি বা সম্মান অর্জনের কথা চিন্তা করে তখন বুঝতে চাইতাম না। আমার অজ্ঞতা বা সরলতার কারণে সৃষ্ট উটকো ঝামেলা প্রায় প্রতিদিনই তোমাদের মাকে সামাল দিতে হতো, তারই ধারাবাহিকতা বর্তমান পর্যন্ত বিরামহীন গতিতে চলছে। বর্তমানের দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ততার কারণে আমি পূর্বের ন্যায় গ্রামে যেতে পারিনি বলে অতিথি আগমনে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে, এখন শুধুমাত্র কাছের আত্মীয় স্বজন আসে তাতেও প্রতিমাসে কমপক্ষে ২/৩ দিনের জন্য ৫/৬ জন আসে।
ঢাকার বাসায় একসাথে থাকা তোমাদের ছোট কাকার পরিবার গ্রামের বাড়িতে চলে যাওয়ায় পরিবারে কাজ করার মতো তোমাদের মা একাই থাকে। তোমাদের তিনজনের মধ্যে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ে, একজন কলেজে আর একজন উচ্চবিদ্যালয়ে লেখা-পড়া করছো। তোমাদের সকলের খাবার তৈরি, কাপড় ধোয়া এবং অন্যান্য কাজ তোমাদের মা একা হাতেই করেছে। তাছাড়া বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত তোমাদের ছোট ফুফুর সেবাও তোমার মাকেই করতে হচ্ছে। দুর্ভাগ্যক্রমে এর মধ্যে হঠাৎ একবার আমি মহামারি করোনায় আক্রান্ত হয়ে পড়ি। প্রায় একমাস বিছানায় জ্বর এবং করোনার যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকি তখন তোমাদের মা আমাকে সারিয়ে তোলার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে আমাকে সারিয়ে তোললেও আমার বাম কানটি অকেজো হয়ে যায়। এই কানের চিকিৎসা করানোর জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করলেও কানটি অদ্যাবধি ভাল হয়নি। শত চেষ্টায় পুরাপুরি সারিয়ে উঠার পূর্বেই হঠাৎ করে পায়ে ইট পরে আমার ডান পায়ের বৃদ্ধা আঙ্গুল ভেঙে যায়। অনেকদিন ট্রিটমেন্ট করার পর আমাকে সারিয়ে তুলতে সে কি কষ্ট সইতে হয়েছে তাকে তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। তার উপর ভয়ও ছিল না জানি আঙ্গুলে সেপ্টিক হয়ে তোমাদের বড় কাকার মতো আমার আঙ্গুল কেটে ফেলতে হয় কিন্তু তোমাদের মায়ের অক্লান্ত সেবা এবং দোয়ায় এই যাত্রায় মহান আল্লাহ্ আমাকে রক্ষা করেছেন।
অসুস্থতার সময় মমতা আমাকে যেভাবে সেবা করে, ডাক্তার দেখানো, নিয়ম করে ব্যায়াম করানো, টাইম মতো ওষুধ দেওয়া এবং সেবার মাধ্যমে আমাকে সুস্থ করে তোলে। এতকিছু করার পরও পুরো সংসারের দায়িত্ব পালন করার ক্ষেত্রে কোন প্রকার অবহেলা বা বিরক্তি প্রকাশ করেনি। তাছাড়া চির রোগা বা রোগের মাতৃবৃক্ষ তোমাদের ছোট ফুফুতো আমাদের বাসায় চিরস্থায়ী বন্দবস্ত নিয়ে বাস করছেন। তার শরীরে ডায়াবেটিস রোগ চিরস্থায়ী বাসা বেধেছে, যার ফলে প্রায় প্রতিমাসেই বারডেম হাসপাতাল, শাহবাগ যেতে হয়। তার ডান সাইড প্যারালাইস থাকার কারণে একা একা চলতে পারে না। গাড়ীতে উঠাতো দূরের কথা কখনও কখনও হুইল চেয়ারে বসিয়েও এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেয়া কষ্টসাধ্য ব্যপার তাই তার সাথে সেবাদাসী হয়ে প্রায় প্রতিমাসেই তোমাদের মাকে কমপক্ষে একবার ডায়াবেটিস হাসপাতালে যেতে হয়। তাছাড়া তোমাদের মা বিনা বাক্য ব্যয়ে তার সেবাও যথাসাধ্য সঠিকভাবে পালন করে যাচ্ছে বিধায় স্বামী হিসেবে স্ত্রীর নিকট থেকে প্রাপ্য সেবায় কিছুটা কমতি থাকলেও কোনো দিন আপসোস বা অভিযোগ করিনি। এছাড়াও প্রতিদিনই কোনো না কোনো আত্মীয়-স্বজন আমাদের বাসায় আসা-যাওয়া অব্যাহত আছে। আমি প্রায় সময়ই অফিস থেকে বাসায় আশার সময় প্রয়োজনীয় বাজার করে নিয়ে আসার দায়িত্বটুকু পালন করি কিন্তু নিজের পরিবারের সদস্যসহ আগন্তকদের সেবা তোমাদের মায়ের একা হাতেই করতে হয়। তারপরও অনিচ্ছা সত্ত্বেও যদি কারো সেবা পেতে সামান্যতম কম হয়ে যায় তবে নানান কথা শুনতে হয় তোমাদের মাকে।
আমি অনেক সময় যখন হাতে দাপ্তরিক কাজ কম থাকে অবাক হয়ে ভাবি এ আমি কাকে জীবন সঙ্গী হিসেবে পেলাম! সুন্দর চেহারাই কি সব! রত্ন চিনতে এতো সময় লাগলো আমার! একটা সুন্দর মন পারে পুরো পৃথিবী আনন্দে ভরিয়ে দিতে। সেই প্রথম বিয়ের ২২ বছর পর আমার চোখে ধরা পরল পৃথিবীর সবথেকে সুন্দরী রমণী তোমাদের মা। তোমাদের কাকাতো (বড় কাকার মেয়ে) বোনের বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার জন্য গ্রামের বাড়িতে যাই। তোমাদের বড় কাকা এবং ছোট কাকা প্রবাসে থাকার কারণে তাদের আপন ভাই হিসেবে বিয়ের সকল দায়িত্ব আমার উপর পড়ে। অগত্যা কাছের এবং দূরের আত্মীয়-স্বজনসহ সকলের দাওয়াত এবং বিবাহের বাজার করাসহ অতিথিদের সেবা করার কাজ আমাকে একা হাতে করতে হয়েছে। এই কাজে পরিবারের অন্যান্যদের মত তোমাদের মা সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করার পরও আমার অন্য ভাইয়ের বৌ’রা মমতাকে কাজের হুকুম করে, তখন আমি বাঁধা দিয়ে চিৎকার করে বাড়ির সবাইকে বলি, কেন আমার স্ত্রী সব কাজ করবে! অন্যদের মতো ও এই বাড়ির বৌ। ওকে ওর প্রাপ্যতা অনুযায়ী যোগ্য সম্মান সবাইকে দিতে হবে যা তার ন্যায্য অধিকার।
আমাদের দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে বা প্রচলিত নিয়ম মোতাবেক নারীদের কোন স্থায়ী ঠিকানা নাই বা থাকে না। জন্মের পর বাবা বা ভাইয়ের পরিবারে থাকে। বিয়ে হওয়ার পর শ্বশুর বা স্বামীর পরিবারে থাকে। জীবনের পরন্ত বিকালে এসে স্বামীর অবর্তমানে ছেলে/মেয়ের সংসারে থাকে। যার ফলশ্রুতিতে প্রত্যেকটা নারীই তার স্থায়ী ঠিকানা এবং যখন যে পরিবারে থাকে সেই পরিবারে নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য সর্বক্ষণ অসম প্রতিযোগীতায় মেতে থাকে। সে কখনও তার পরাজয় সহজে মেনে নিতে অভ্যস্ত নয়। যার কারণে জীবনের শেষ বেলায় এসে অনেকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করে অথবা বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। তোমাদের মাও অন্যদের থেকে ব্যতিক্রম নয়, তথাপি আমি আমার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের প্রতি দুর্বল ছিলাম বিধায় সংসার জীবনের প্রথম দিকে আমার সাপোর্ট পুরাপুরি না পাওয়ার কারণে জীবনের বেশিরভাগ সময় পরিবারে প্রাপ্য অধিকার পাওয়ার অসম প্রতিযোগিতা সুপ্ত থেকে যায়।
কোনো নারীর যে পরিবারে বিয়ে হয় সে পরিবার যদি তার বাপের পরিবার থেকে আর্থিক, শিক্ষা, সামাজিক সম্মানের দিক থেকে উচুঁ স্তরের হয়। তবে তাকে তার শ্বশুরের পরিবারে কাজের মেয়ে বা বেটি পরিচয়ে থাকতে হয়। আর যদি স্বামীর কাছে শিক্ষা, দেহ কাঠামো বা সৌর্য্যের কারণে অবহেলিত হয়। তবে আর কথা নেই তখন শ্বশুর বা স্বামীর পরিবারের অন্য সদস্যরা তাকে পেয়ে বসে। ছোট বড় সকলেই বিভিন্ন ধরণের অর্ডার দিতে কন্ঠা বোধ করে না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও যদি কোন কাজে বা আচরণে সামান্যতম ভুল পরিলক্ষিত হয় তবে আর রক্ষা নাই। মুখ বুঝে অন্যের কটু কথা শুনে হজম করতে হয়। মনে অসহ্য কষ্ট পেলেও চিৎকার করে কান্না করা যাবে না। নিরবে নিভৃতে চোখের জল ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। যদি কোনো নারীর বিয়ের স্বল্প সময় পর বাবা-মা মারা যাওয়ার ফলে ভাই-বোনরা যার যার পরিবার নিয়ে ভিন্ন বা আলাদা হয়ে যায় তবে আরও বিপদ, অশান্তির স্বামীর পরিবার থেকে বাপ/ভাইয়ের পরিবারে গিয়ে কয়েকটা দিন শান্তিতে কাটিয়ে আসার সুযোগও ক্ষীন হয়ে আসে। তখন সেই নারীর কাছে স্বামীর ভালবাসা পাওয়ার আশা ছাড়া আর কোন পথ খোলা থাকে না। তাই সেই নারীকে তার স্বামীর পরিবারে কাজের মেয়ে বা বেটি থেকে স্ত্রীর মর্যাদা এবং স্বামীর ভালবাসা পাওয়ার জন্য আমরণ চেষ্টা বা সংগ্রাম চালিয়ে অপেক্ষা করতে হয়। তোমাদের মায়ের ক্ষেত্রেও ইতোপূর্বে তাই হয়েছিল।
তোমাদের আরও একটি কথা মনে রাখতে হবে, স্বামী স্ত্রী যদি সকল দিক যেমন, শিক্ষা, আর্থিক, সম্পদ, পারিবারিক মর্যাদা, সামাজিক সম্মান, দৈহিকভাবে সমানে সমান হয় তবে পরস্পরের মাঝে নিজের সামর্থ অনুযায়ী নিজ নিজ কর্তৃত্ব জাহির করার জন্য স্বামী স্ত্রীর মাঝে অসম প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। যার ফলে অনেক সময় এ পরিবার বা সংসার স্থায়ী হয় না। পরিবার বা সংসার জীবনে স্থায়ীত্ব দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে সক্ষমতা বা সামর্থের ক্ষেত্রে কিছুটা পার্থক্য থাকা আবশ্যক। স্বামীর সামর্থ বেশী হলে স্ত্রী তার প্রতি দুর্বল বা স্বামীর প্রতি স্ত্রীর শ্রদ্ধা-ভক্তি, ভালবাসা বেশী থাকবে অথবা স্ত্রীর সক্ষমতা বা সামর্থ স্বামীর চেয়ে বেশী থাকলে স্বামী স্ত্রীর প্রতি দুর্বল বা ভালবাসা বেশী থাকবে। ফলশ্রুতিতে একজন অন্যজনের মন যুগিয়ে চলতে সার্বক্ষণিক চেষ্টা করবে। তাতে উভয়ের সমন্বিত প্রয়াসে পরিবার বা সংসার জীবন দীর্ঘস্থায়ী হতে বাধ্য। তোমাদের মায়ের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তোমাদের নানার পরিবারের লোকজন আমাকে বেশী সম্মান করত বিধায় নানান চড়াও উৎরাও পার করে আমরা উভয়ে এই দীর্ঘ সময় ধরে হাতে হাত রেখে এক সাথে পথ চলছি। আমাদের জানার সাধ্য নেই মহান আল্লাহ্ জানেন আর কতদিন এইভাবে চলতে পারব!
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ওকে আমি ২২টি বছর ধরে এতো অপমান করেছি, কষ্ট দিয়েছি অথচ আমার সামনে তাকে কাঁদতে দেখিনি কখনও, হয়তো ভয়ে, হয়তো লোক লজ্জায়, হয়তো লুকিয়ে কেঁদেছে। কিন্তু সেদিন মমতা চিৎকার করে কেঁদেছে আর বলেছে, তাঁর জীবনে যা চাওয়ার ছিল তা সে পেয়ে গেছে কারণ তাঁর স্বামী তাঁকে সকলের সামনে নিজের স্ত্রী বলে সন্মান দিয়েছে। সেদিন আমিও খুব কেঁদেছি। এমন একটা মেয়েকে আমি এতগুলো বছর এতো কষ্ট দিয়েছি।
না পাওয়ার বেদনা নিয়ে তোমাদের মায়ের এভাবে কেটে গেল আরও কয়েকটি বছর, তবে পূর্বের চেয়ে আমার আচার আচরণে কিছুটা পরিবর্তন চলে আসে। তখন নিয়ম করে অফিস ছুটির পর বাসায় আসতাম আমার পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দরী রমণীকে এক নজর দেখার তাগিদে। তিন সন্তানের লেখাপড়া, সংসার খরচ, ছোট বোনের চিকিৎসার টাকা, প্রতিমাসে নির্ধারিত কিছু টাকা ব্যাংকে গচ্ছিত রাখার পর হাতে বা পকেটে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকত না। তাই যৌবনকালে তোমাদের মাকে কোনো দিন ভাল একটা শাড়ী পর্যন্ত দিতে পারি নি। তারপরও মাঝে মাঝে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার সময় অন্যান্যদের দেখে অলংকার বা ভাল কাপড় পাওয়ার জন্য কিছুটা আপসোস করলেও কোনোদিন কোনো অভিযোগ করেনি তোমাদের মা।
বাবার মুখে মায়ের কষ্টের কথাগুলো শুনে আমরা সবাই কাঁদছি। এতবছরে একটি বারের জন্যও মা কোনোদিন এসব কথা আমাদের বলেননি। বাবা আবার বলা শুরু করলেন, বড় বৌমা, ছোট বৌমা, আমি তোমাদের দোষ দিচ্ছিনা। নারীদের স্থায়ী কোন ঠিকানা নাই। জন্মের পর বিয়ে হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত থাকে বাপের বাড়ী, বাপের অবর্তমানে থাকে ভাইয়ের বাড়ী। তারপর বিবাহ হয়ে গেলে থাকে শ্বশুর/স্বামীর বাড়ী। স্বামীর অবর্তমানে থাকে ছেলে/মেয়ের বাড়ী। তাই নারীর জন্মের পর থেকেই পরাধীন জীবন যাপন করতে হয়। তাই প্রতিটা নারীকেই জন্মের পর হইতে মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত আমরণ বিভিন্ন ধরণের পরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করিতে হয় স্বাধীন জীবন পাওয়ার দাগিতে। তাই সকল নারীই সুযোগ পেলে সুযোগের সঠিক ব্যবহার করতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করে না।
তাই বলছি তোমাদের অধিকার আছে স্বাধীনভাবে বাঁচার, তেমনি তোমাদের শাশুড়ি মায়েরও। তাঁর বর্তমান যে বয়স তাতে এখনই সংসার জীবন থেকে তার অবসর নেয়া দরকার অথচ এখনও বাড়ীর সবার রান্না-বান্নাসহ যাবতীয় কাজ করে তোমাদের শাশুড়ি আর তোমরা সবাই যে যার ক্যারিয়ার গড়া নিয়ে ব্যস্ত। ছুটির দিনেও তোমরা নিজেরা যার যার ইচ্ছা মতো ঘুরে বেড়াও, যার যা ইচ্ছা তা নামিদামী হোটেল/রেষ্টুরেন্টে বসে খাও। পূর্বের ন্যায় তোমাদের শাশুড়ি নিয়ম করে সেই ছোট রান্না ঘরের কোণে বসে থাকে এবং তোমাদের পছন্দমত খাবার তৈরি করে কিন্তু তারপরও তোমাদের আচার আচরণে বুঝতে পারি তোমরা বিরক্ত হও বৃদ্ধ/বৃদ্ধা শ্বশুর, শ্বাশুড়ি-কে নিয়ে একসাথে থাকতে বা সংসার করতে। অনেক সময় মনে হয় তোমাদের স্বাধীনতায় আমরা একটি প্রতিন্ধক হিসাবে আছ। তাই আমি চাই তোমরা আলাদা আলাদা বাসা/বাড়ি নাও যার যার মতো করে স্বাধীনভাবে সংসার কর। বর্তমানে সেই এবিলিটি তোমাদের আছে আর সেটার চাইতেও বড় কথা, এই বয়সে এসে আবার মমতাকে প্রভু ভক্ত সারবভেন্টের মতো তোমাদের হুকুম মানতে এবং তালিম করতে হবে, সেটা তো আমি মেনে নিবো না কিছুতেই। ভাইয়ের বৌদের প্রতি দৃষ্টি দিয়ে বাবা বলেন যে কয়টা দিনে বেঁচে আছি এ বাড়ীতে আমি আর তোমাদের শাশুড়ি মা থাকবো।
শ্বশুর বাড়ীর এলাকায় জমি কিনের বাড়ী করার ইচ্ছা বা আগ্রহ আমার কখনও ছিল না কিন্তু কেউ বিপদে পরলে সাধ্যমত সহযোগিতা করার মন-মানষিকতা ছোট সময় থেকেই আমার ছিল। সেই কারণেই তোমাদের মায়ের এক মামাতো ভাই মানে তোমাদের মামা হঠাৎ করে বিপদে পরায় তাকে উদ্ধার করার মানষে জমির কাগজপত্রে অনেক ঝামেলা থাকার পরও আমি সরকারি কর্মচারী হওয়ার সুবাদে সাহস করে খুব অল্প টাকায় জমিটা কিনে ছিলাম আর সেই টাকাটা ছিল তোমাদের মায়ের তাঁর বাবার বাড়ী থেকে দেয়া বিয়ের গয়না এবং বাবার বাড়ী হতে প্রাপ্য অংশ বিক্রয়ের টাকা এমন কি বিয়ের সময় আমাকে দেয়া উপহারের আংটি বিক্রয়ের টাকাও ছিল এর মধ্যে আরও ছিল অনেক কষ্টে আমার প্রতিমাসে অল্প অল্প করে জমানো সামান্য কিছু টাকা। তাছাড়াও আমার বাবার এক খন্ড জমি বিক্রির টাকাও ছিল এর মধ্যে। অবসর নেওয়ার পর যে টাকাটা পেয়েছিলাম সেটা দিয়ে তিনতলা পর্যন্ত করেছি। অর্থ আয়ের স্থায়ী সম্পদ হিসেবে এটাই এই মূহুর্তে আমার স্থায়ী সম্পদ। তাই বলে তোমাদেরকে আমার এই সম্পতির পাওনা হইতে বঞ্চিত করেছি তা মনে করার কিছু নেই। এই স্থায়ী সম্পদও তোমরা আমাদের উরুশজাত সন্তান হিসেবে আমাদের অবর্তমানে ইসলামিক ফারায়েজ আইন অনুযায়ী যার যার অংশ পাবে এবং তোমরা বন্টন করে নিতে পারবে সেই অধিকারটুকু তোমাদের থাকবে। তবে আর একটি কথা কে কখন মহান আল্লাহ্ র ডাকে সারা দিয়ে তাঁর মেহমান হয়ে এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চলে যাই, তা সঠিকভাবে কেউ বলতে পারে না। তাই আমি ঠিক করেছি এমন একটি উইল করে রাখব যাতে করে আমি যদি আগে না-ফেরার দেশে চলে যাই তখন তোমাদের মা এই সম্পত্তির একক মালিক থাকবে এবং আমাদের উভয়ের অবর্তমানে তোমরা মালিক হবে এবং তার ইচ্ছানুযায়ী এই সম্পত্তি ব্যবহার হবে।
বর্তমানে বাড়ি ভাড়া বাবদ যে টাকাটা আসবে সেটা আমাদের দুজনের জন্য ঢের। তোমাদের মাকে নিয়ে আমি তেমন ভাবেই থাকবো যেমনটা এ যুগের হাজবেন্ড ওয়াইফরা থাকে। উভয়ের স্বাস্থ্য মহান আল্লাহ্ ভালো রাখলে তাকে নিয়ে রোজ ঘুরতে যাবো। শহর ঘুরাবো, সম্ভব হলে দেশের বাইরে ঘুরতে নিয়ে যাবো আমার যতটুকু সামর্থ আছে তার মধ্যেই। আমাদেরকে যে কোনো অবস্থায় তোমাদের ফিন্যান্সিয়াল (আর্থিক) কোনও সাপোর্ট দিতে হবে না, শুধু মাসে অন্তত একটা শুক্রবার এ বাড়ীতে সবাই মিলে এসে আমাদের সাথে কাটিয়ে যাবে। ইট-পাথরে গড়া যান্ত্রিক শহরে এখনকার মানুষগুলি নিজ নিজ স্বার্থের কারণে এক একটা যন্ত্রে পরিণত হয়ে গেছে। আমাদের যুগের ন্যায় কারো প্রতি তেমন মায়া, মহবত, ভালাবাসা নেই। নিজ নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য খালি দৌড়াচ্ছে আর দৌড়াচ্ছে কিন্তু পথের আর শেষ পাচ্ছে না। আমি মনে করি আমাদের ছেলে-মেয়ে তাদের মধ্যে নয়। আমি যে তাদের মানুষের মত মানুষ বানাতে চেষ্টা করেছি তা হয়তো পুরোটা ব্যর্থ হয়নি তাদের মধ্যে কিছুটা হলেও মনুষ্যত্ব বোধ এখনো আছে আমার বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসের উপর ভরসা করে বলছি আমাদের অতি আদরের দাদু-দিদাদের নিয়ে কমপক্ষে সপ্তাহে একদিন এই বাসায় বা শান্তির নীড়ে আসার আবদারটা রক্ষা করার চেষ্টা করবে, আমরা আর কয়দিনইবা আছি। সেটাও যদি না পারো তাতেও আক্ষেপ বা মনে কষ্ট থাকবে না। ভেবে নিবো আমাদের সন্তানরা দূরে বা প্রবাসে থাকে, তাই চাইলেই তাদের পক্ষে আমাদের সাথে দেখা করা সম্ভব নয়। তবে তোমাদের নিকট এইটাও আশা করি না যে, তোমাদের আচার আচরণে, অত্যাচারে বা অভদ্র ব্যবহারে ক্ষিপ্ত হয়ে তোমাদের বিরুদ্ধে আমাদের নিকট সমাজের কেউ অভিযোগ নিয়ে আসে বা আমরা কারো নিকট মাথা নিচু করে আমাদের ক্ষমা ভিক্ষা করতে হয়।
আরও একটি কথা আমাদের বিপদের সময় তোমাদের কোন আর্থিক সহায়তা কামনা করি না কিন্তু এমন কোন আচরণ আমাদের সাথে বা অন্যদের সাথে করিও না যাতে করে রাস্তা-ঘাটে বা বাড়ী বয়ে এসে আমাদেরকে কেউ অপমান করার সাহস পায় বা দেখায়। এটা হলো তোমাদের প্রতি আমার অনুরোধ। দোয়া করি তোমরা তোমাদের এমন পৃথিবী গড়ে তোলো যাতে করে বাবার পরিচয়ে নয় তোমাদের পরিচয়ে সমাজের সকল মানুষ তোমাদেরকে চিনে এবং তোমাদের আশে-পাশের লোকজন গর্ব বোধ করে। মনে রাখবে তোমার চেয়ে যখন তোমার ছায়া বড় হয়ে যাবে তখন বুঝবে সূর্য অস্ত যাচ্ছে মানে জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছ। আর যখন তোমার ছায়া তোমার পায়ের নিচে থাকবে তখন বুঝবে তুমি ঠিক আছ। আর যদি তোমার ছায়া পিছনে পরে যায় তখন বুঝবে তুমি সঠিক পথে এগিয়ে চলেছো।
আমি এখন থেকে ঘরের কোনও কাজ মমতাকে করতে দেবনা। তোমাদেরকে বড় করে মানুষের মত মানুষ করতে অনেক খেটেছে আর নয়। এখন থেকে বাসায় কাজের মেয়ে থাকবে সেই সব কাজ করবে। আমরা দু’জনে জীবনের এই শেষ বেলাতে অন্তত একটু ভাল সময় কাটাবো নিজেদের মতো করে। সব শুনে মা বাঁধা দেয়ার চেষ্টা করলেন। ভাইরাও বাঁধা দিতে চাইলো। কিন্তু বাবা যেন এবার স্বার্থপর হয়ে গেলেন নিজের স্ত্রী মানে আমাদের মাকে নিয়ে আলাদা নিজের মতো থাকার জন্য। আর মা বাঁধা দিলেও তাঁর চোখ, মুখে কেমন স্বচ্ছ আলো যেন ছুঁয়ে যাচ্ছিল। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল অনেক বছরের না পাওয়া বেদনা ভুলে গিয়ে যেন এক নিমিষেই সব কিছু পেয়ে গেলেন।
বাবা আবার বললে শুরু করলেন পারিবারিক অনুসাশন সামাজিক প্রতিবন্ধকতা থাকার কারণে তোমাদের মাকে ইউসুফ-জোলেখার মত করে ভালবাসতে পারিনি কিন্তু সারা জীবনে ইচ্ছা করে কোনো সময় তাকে আঘাতও দেইনি। তাছাড়া আমার সাধ্য না থাকার কারণে হয়তো তোমাদের মাকে মুকুট ওয়ালা মহাপরাক্রমশালী সম্রাট শাহজাহানের মত করে অগনিত পরিমাণ অর্থ ব্যয়ে ২০ হাজার শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রমের বিনিময়ে ২২ বৎসর সময় দিয়ে মহামূল্যবান শ্বেত পাথরের তাজমহল বানিয়ে তার প্রিয়তমা নুরজাহানকে ভিতরে স্বর্ণের পালংকে শুয়ে রেখে তাজমহলের বাহিরে বসে প্রিয়তমার স্মৃতি বুকে ধারণ করতে না পারলেও মুকুটহীন সম্রাট (প্রিয়তম স্বামী) হিসেবে চাকুরি জীবনের ৪২ বছরের তিলে তিলে জমিয়ে রাখা অর্থ ব্যয় করে নির্মিত ছোট এই কুঠিরে নিম কাঠের তৈরি খাটে শুয়ে রেখে শেষ বয়সে এসে পরন্ত বিকালে তোমাদের মাকে মনের মত করে বুকের পাজরের ভিতরে জমিয়ে রাখা একটু ভালবাসা দিয়ে যেতে পারলেও মৃত্যুর পর কিছুটা অধিকার দিতে পেরেছি বলে মহান আল্লাহ্ র নিকট বলতে পারব তা কম কিসে!
একটু দম নিয়ে বাবা আবার বলতে শুরু করলেন, তোমাদের মাকে আমি যেদিন দেখতে যাই এবং আংটি পড়িয়ে দেয়া তাতেই এক অর্থে বিয়ে হয়ে যায় শুধুমাত্র আনুষ্ঠিকতা বাকী ছিল। আজ হলো সেই বিশেষ দিন, আর তাই আমি তোমাদের মাকে নিয়ে আজ রেস্টুরেন্টে ডিনার করবো সাথে তোমরা যেতে চাইলে যেতে পারো। এই কথা শুনে মা যেন লজ্জায় তাকাতে পারছেন না আমাদের কারও দিকে। শুধু মাথা নীচু করে বলছেন, দোহাই তোমায় এই বয়সে এসব কিছু করতে যেওনা, মানুষ হাসবে, টিটকারি দেবে। কেউ কেউ বলবে বৃদ্ধ বয়সে এসে ভীমরতি ধরেছে।
বাবা বললেন, যে হাসার সে হাসবে। আমি বা আমরাতো কারো মুখ চেপে ধরতে পারবো না। তাছাড়া হাসলে হার্ট ভালো থাকে। তাদের দৃষ্টিতে তোমার আমার একটু ছেলেমানুষির কারণে হাসতে হাসতে না হয় কিছু মানুষের হার্ট একটু পাকাপোক্ত হলো। বাবার কথায় এবার আমরাও কেউ হাসি আটকে রাখতে পারলাম না হু হু করে হেসে দিলাম কিন্তু বাবা দায়িত্ববান ব্যক্তির মতো চুপ করে রইলেন।
বাবা আবার বললেন, ঠিক এক সপ্তাহ পর আমাদের ম্যারেজ এনিভার্সারী আর জীবনে এই প্রথমবার আমি আমাদের ম্যারেজ এনিভার্সারী (বিবাহ বার্ষিকী) পালন করবো তাও খুব ঘটা করে। তোমাদের কিছুই করতে হবেনা শুধু সেচ্ছা সেবকের দায়িত্ব পালন করাসহ ঐদিন প্রত্যেকে খুব ছোট্ট করে হলেও তোমাদের সাধ্যমত আমার মমতার জন্য ম্যারেজ এনিভার্সারী (বিবাহ বার্ষিকী) গিফ্ট নিয়ে এসো। বলেই বাবা বাচ্চাদের মতো কাঁদতে শুরু করলেন সাথে মা ও! তবে এই কান্না আনন্দের, এই কান্না সুখ প্রাপ্তির, এই কান্না বহুদিনের না পাওয়ার কান্না। প্রায় ৫৫ বছর বয়সে এসে শুধু বলতে পারি জীবনের গল্প আছে বাকী অল্প কারণ জীবন আর মৃত্যু আমাদের কারো হাতে নেই তাই হয়তো ......!
(গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক এবং রূপক কিন্তু হাজারো হতাশা, দুঃখ আর সমস্যার অন্ধকারে ডুবে গিয়ে আশা নামের আলোটি কে কখনোই নিভতে দেওয়া উচিৎ নয়। কারন আশা না থাকলে আমাদের জীবন থেকে শান্তি, বিশ্বাস এবং ভালোবাসাও অন্ধকারে হারিয়ে যাবে। সম্মানীত পাঠকদের প্রতি আমার করজোরে আবেদন আমি আগেই বলেছি গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক এবং মনের নিজস্ব আবেগ থেকে লেখা। যদি কাকতালীয়ভাবে কারো জীবনের সাথে কোনো অংশ বিশেষ বা পুরা কাহিনী মিলে যায় তবে নিজ গুণে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে গ্রহণ করবেন। আমার লেখার মাধ্যমে কাউকে দুঃখ বা কষ্ট দেয়া আমার ইচ্ছা নয়, শুধুই আনন্দ দেয়া এবং নিজ নিজ দায়িত্বটুকু সময় থাকতে পালন করার উদ্দেশ্যে আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র। আর একটি অনুরোধ আমার এই লেখনিতে কোনো বানান, শব্দ চয়নে বা কাহিনী বিন্যাসে আপনার দৃষ্টিতে ভুল প্রতীয়মান হয় তবে কমেন্টস করে জানিয়ে দিলে আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব। পরিশেষে আপনাদের মুল্যবান সময় ব্যয় করে আমার এই লেখাটি পাঠ করে গঠনমুলক মন্তব্য করায় সকলকে ধন্যবাদ।)
নিউজের জন্য: news.sangbadlive24@gmail.com