জীবনের পথ কখনো মসৃণ হয় না। কখনো কখনো কঠিন বাস্তবতা মানুষকে ভিন্ন এক পরিক্রমায় নিয়ে যায়, যেখানে সংগ্রামই হয়ে ওঠে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। কৃষিবিদ জাহিদ হাসানের জীবনগল্প তেমনই এক অনুপ্রেরণার নাম। বাবার মৃত্যুর পর জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে তিনি যে পথ বেছে নিয়েছিলেন, তা আজ তাঁকে সফল উদ্যোক্তায় পরিণত করেছে। শুধু নিজের জন্য নয়, দেশের কৃষিক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতেও কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
২০১৫ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) ভর্তি হন জাহিদ হাসান। ছোটবেলা থেকেই কৃষির প্রতি ছিল তাঁর প্রবল আগ্রহ। কিন্তু ২০১৬ সালে বাবার মৃত্যু তাঁর জীবনকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। সংসারের হাল ধরতে তাঁকে নেমে পড়তে হয় কর্মক্ষেত্রে। পড়াশোনার পাশাপাশি অর্থ উপার্জনের উপায় খুঁজতে থাকেন তিনি। প্রথমদিকে ক্যাম্পাসের শিক্ষকদের ও বড় ভাইদের কাছে নিজ গ্রামের আম ও খেজুর গুড় বিক্রি করা শুরু করেন। তখন কেউ হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি, এই ছোট উদ্যোগ একদিন বড় ব্যবসায়ে রূপ নেবে। তবে জাহিদ হাসান জানতেন, আত্মনির্ভরশীল হওয়ার জন্য পরিশ্রমের বিকল্প নেই। তাই ধাপে ধাপে তিনি নিজের উদ্যোগকে বড় করার সিদ্ধান্ত নেন।
২০২০ সালে যখন তাঁর অনার্স শেষের পথে, তখনই শুরু হয় মহামারি করোনা। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা টালমাটাল হয়ে পড়ে, বহু মানুষ কর্মহীন হয়ে যায়। অনেকেই হতাশ হয়ে গুটিয়ে যান, কিন্তু জাহিদ হাসান এই সময়টিকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি বুঝতে পারেন, খাদ্যপণ্য এবং কৃষিপণ্যের চাহিদা সবসময়ই থাকবে, বিশেষ করে স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ কৃষিপণ্যের। তাই তিনি অনলাইনে আম বিক্রি শুরু করেন। প্রথমদিকে সীমিত পরিসরে বিক্রি করলেও ধীরে ধীরে তাঁর ব্যবসার পরিধি বাড়তে থাকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিশ্বস্ততার কারণে ক্রেতাদের মধ্যে জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। গত আমের মৌসুমে তিনি অনলাইনে প্রায় ৪০ হাজার কেজি আম বিক্রি করেছেন, যা নিঃসন্দেহে এক বিশাল সাফল্য।
শুধু আমই নয়, তিনি খেজুর গুড় উৎপাদনেও মনোযোগী হন। বর্তমানে তাঁর খেজুর গুড়ের উৎপাদন প্রতিদিন ৭০-৮০ কেজি, যা বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপকভাবে বিক্রি হচ্ছে। এই পণ্যগুলোর গুণগত মান বজায় রাখার কারণে ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করতে পেরেছেন তিনি। শুধু অর্থ উপার্জনই নয়, দেশের কৃষিক্ষেত্রে অবদান রাখাই তাঁর মূল লক্ষ্য। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি পরিকল্পনা করেছেন অর্গানিক পণ্য নিয়ে আরও গভীরভাবে কাজ করবেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, সুস্থ জীবনযাপনের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা জরুরি।
বর্তমানে তিনি বৃহৎ পরিসরে আমের বাগান এবং খেজুর গাছের বাগান গড়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। এই উদ্যোগ শুধু তাঁকে আর্থিকভাবে লাভবান করবে না, বরং দেশের কৃষিক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। পাশাপাশি তিনি গাছের চারা বিক্রির উদ্যোগও নিয়েছেন, যা দেশের সবুজায়ন এবং পরিবেশ রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
জাহিদ হাসানের জীবনগল্প শুধুই একজন ব্যক্তির সাফল্যের গল্প নয়, এটি বাংলাদেশের হাজারো তরুণের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, কঠিন পরিস্থিতি আসলেও যদি সাহস, পরিশ্রম ও সঠিক পরিকল্পনা থাকে, তাহলে সফল হওয়া সম্ভব। আজকের তরুণরা যদি তাঁর মতো কৃষিপণ্যের দিকে নজর দেন, তাহলে একদিকে যেমন নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারবেন, অন্যদিকে দেশের কৃষি খাতও আরও সমৃদ্ধ হবে। ভবিষ্যতে তিনি কৃষি খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনাও করছেন, যাতে কৃষকেরা আরও লাভবান হতে পারেন।
নিউজের জন্য: news.sangbadlive24@gmail.com