মৎস্যচাষের জন্য রাজশাহীতে তিন ফসলি উর্বর জমি কেটে পুকুর খননের মহোৎসব চলছে। এর ফলে তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। এছাড়া সামগ্রিকভাবে এ অঞ্চলের কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে মাটির উর্বরা শক্তিও। কৃষকরা জানান, দুর্গাপুর, পুঠিয়া, বাগমারা, মোহনপুর, পবা, তানোর ও গোদাগাড়ী এলাকার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে উর্বর ফসলি জমি কেটে পুকুর খনন চলছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভূমিদস্যুরা এ কাজ করছে স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে। প্রশাসন থেকে মাঝেমধ্যে অভিযান হলেও বন্ধ হচ্ছে না পুকুর খনন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আট বছরে জেলায় ১৬ হাজার ১৫৯ হেক্টর ফসলি জমির ক্ষতি হয়েছে নির্বিচারে পুকুর কাটার কারণে। এ সময়ে জেলায় বেড়েছে পুকুরের সংখ্যাও। পাশাপাশি ফসলি জমিতে গড়ে উঠছে আবাসিক ভবন, অবৈধ ইটভাটা, রাস্তাঘাট ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। ফলে দেশের অন্যতম শস্যভান্ডার রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চল হয়ে পড়ছে কৃষিশূন্য। এ সংকট তীব্র হচ্ছে দিনদিন। বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি নষ্ট হওয়ায় গত এক দশকে অভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদন ও চাহিদায় ফারাক তৈরি হয়েছে।
ব্যুরোর তথ্যমতে, রাজশাহীতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ জলাভূমি বা পুকুরের আয়তন বেড়ে ২৪ হাজার ৪৯৮ হেক্টর হয়েছে। অথচ ২০১৫ সালে জলাভূমি ও পুকুরের আয়তন ছিল ১৫ হাজার ৪৪ হেক্টর। আগে রাজশাহীতে প্রাকৃতিক জলাধার ছিল মাত্র ৬ হাজার ৩৫৬ হেক্টর। শুধু পুকুর খননের কারণে গত আট বছরে রাজশাহীর ৯ হাজার ৪৫৪ হেক্টর ফসলি জমি নষ্ট হয়েছে। এর বাইরে ফসলি জমিতে গড়ে ওঠা অবৈধ ইটভাটা, জমি নষ্ট করে আবাসন, শিল্পকারখানা এবং সড়ক অবকাঠামো তৈরিতে এ সময়ে আরও ৬ হাজার ৭০৫ হেক্টর কৃষিজমি কমেছে।
জেলা মৎস্য অফিসের তথ্যানুযায়ী, ২০১৫ সালে রাজশাহীতে পুকুরের সংখ্যা ছিল ৪০ হাজার ৭৮৮টি। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ২৭৫টিতে। অর্থাৎ এক দশকে প্রায় ২৮ শতাংশ পুকুর জলাশয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
মৎস্য অফিসের হিসাবমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজশাহীতে ৮৪ হাজার ৮০৩ টন চাষের মাছ উৎপাদন হয়। স্থানীয় চাহিদা ছিল ৫২ হাজার ৬৩ টন। বাকি মাছ দেশের বিভিন্ন জেলায় চালান করা হয়। দুর্গাপুর এলাকার কয়েকজন কৃষক জানান, পুকুর খননের বিরুদ্ধে এলাকায় এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে উঠছে। মাঝেমধ্যে তা সহিংস হয়ে ওঠে। অবৈধ পুকুর খননের প্রতিবাদ করায় গত ১৭ ডিসেম্বর মোহনপুর উপজেলার বারো পালশা গ্রামের কৃষক জুবায়ের আহমেদ (২৭) ভূমিদস্যুদের হাতে নিহত হন। এ ঘটনায় মামলা হলেও প্রকৃত অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। এছাড়া রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলায় পুকুর খনন করার জন্য এক্সকেভেটর জব্দ ও পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। কৃষকদের প্রতিবাদ দেখে স্থানীয় প্রশাসন মাঝেমধ্যে লোকদেখানো অভিযান চালায়। কিন্তু পুকুর খনন বন্ধ হচ্ছে না।
জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং মাঠের কয়েকজন কৃষক জানান, রাজশাহীজুড়ে হারিয়ে যাওয়া উচ্চফলনশীল আবাদযোগ্য জমির বেশির ভাগই বাণিজ্যিক মাছের পুকুরে রূপান্তরিত হয়েছে, যা মাটি সংরক্ষণ নির্দেশিকা এবং কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন ২০১৮-এর লঙ্ঘন। তবে কৃষক ও বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তাদের অভিযোগ, পুকুরের পেটে যাওয়া জমির প্রকৃত পরিমাণ অনেক বেশি।
পবা উপজেলার একাধিক কৃষক ও জমির মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধিক মুনাফার লোভে রাজশাহীজুড়ে ফসলি জমিতে পুকুর খনন করা হচ্ছে। বাণিজ্যিকভাবে মৎস্যচাষ ধানসহ অন্যান্য ফসল আবাদের তুলনায় লাভজনক। কয়েক লাখ টাকা খরচ করে একবার পুকুর খনন করা হলে ১০ থেকে ১২ বছর মাছ চাষ করা যায়। ফসল ফলানোর চেয়ে মাছ চাষের খরচ কম, আবার লাভও বেশি। প্রভাবশালীরা পুকুর খননে সহায়তা করছে। এই সিন্ডিকেটে যেমন উপজেলা প্রশাসন আছে, তেমনই আছে থানা পুলিশও। আর রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাদের কাছে পুকুর কাটার দালালি একটি অতি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। গোদাগাড়ী উপজেলার ফুলবাড়ি গ্রামের কৃষক সৈয়দ হোসেন জানান, তিন বিঘা জমিতে ধানচাষ করে বছরে ৪০ হাজার টাকা আয় হয়। কিন্তু একই পরিমাণ জমি বাণিজ্যিক পুকুরের জন্য লিজ দিলে বছরে ৮০ হাজার টাকা আয় হয়। চাষাবাদ করে দাম না পেলে পুরো টাকা ক্ষতি হয়ে যায়। কিন্তু পুকুর হিসাবে লিজ দিলে তা আর ক্ষতি থাকে না। এভাবেই অনেক কৃষক আবার পুকুর কাটতে ভূমিদস্যুদের কাছে জমি লিজ দিয়ে দিচ্ছে।
জানা যায়, ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুযায়ী কোথাও পুকুর বা জলাশয় খনন করতে হলে উপজেলা প্রশাসনের অনুমতি নিতে হয়। তবে এটা অনুসরণ না করে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুকুর খনন হচ্ছে রাতের আঁধারে।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান জানান, রাজশাহী অঞ্চলে প্রান্তিক কৃষকের সংখ্যা বেশি। যদি বিলের মাঝখানে পুকুর খনন করা হয়, তাহলে আশপাশের খেত জলমগ্ন হয়ে যায়। চাষাবাদও অসম্ভব হয়ে পড়ে। এগুলো প্রতিরোধ করতে হবে স্থানীয় প্রশাসনকে। কৃষি বিভাগের হাতে প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেই।
এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতার বলেন, কৃষি ও মৎস্য কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত উপজেলা পর্যায়ের কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পুকুর খননের অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকে। তবে অনেক ক্ষেত্রে অনুমতি ছাড়াই পুকুর খনন হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। অবৈধ পুকুর খননকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: দৈনিক সংবাদ
নিউজের জন্য: news.sangbadlive24@gmail.com