এক যুগ আগে বলিউডের হেইট স্টোরি নামের একটি সিনেমা দেখেছিলাম, যেখানে মন্ত্রী রাজদেব সিং নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করা পাওলিকে বলেছিল— ‘পলিটিক্স কা বিজনেস অর বিজনেস কি পলিটিক্স, দোনো আজিব হ্যায়; কাভ পালাট যায়, পাতা হি নেহি চালতা।’ সংলাপটি নিছক সিনেমার অংশ হলেও আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি যেন নির্মম সত্যে পরিণত হয়েছে। রাজনীতি এখন আর জনসেবার ক্ষেত্র নয়; এটি ক্রমশ একটি লাভজনক বিনিয়োগে রূপ নিচ্ছে, যেখানে ক্ষমতা অর্জনই চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং জনগণ কেবলমাত্র একটি ব্যবহারযোগ্য উপাদান।
মহান স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের মাত্র ১৮ শতাংশ ছিলেন ব্যবসায়ী। তখন রাজনীতি পরিচালিত হতো মূলত আদর্শনিষ্ঠ ও পেশাদার রাজনীতিবিদদের দ্বারা। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এই ভারসাম্য সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে। ২০২৪ সালের অংশগ্রহণহীন ও প্রশ্নবিদ্ধ ডামি নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদে প্রায় ৬৭ শতাংশ সদস্যের পেশা ছিল ব্যবসা। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি প্রবণতার নয়, বরং রাষ্ট্রীয় রাজনীতির গভীর কাঠামোগত বিকৃতির প্রতিচ্ছবি।
এই প্রেক্ষাপটে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করেও আমি ভীষণভাবে হতাশ হয়েছি। পরিবর্তনের বুলি আওড়ানো রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে ভিন্ন কিছু প্রত্যাশা করা হলেও বাস্তবতা বলছে- অতীতের ধারাই বহাল। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী বৈধ প্রার্থীদের প্রায় ৫৪ শতাংশই ব্যবসায়ী। প্রায় সব রাজনৈতিক দলের প্রার্থী তালিকায় ব্যবসায়ীরাই যেন মুখ্য নায়ক, আর রাজনীতি যেন তাদের পার্শ্বচর।
সংখ্যাগুলো আরও নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে। বিএনপির ১৯৪ জন প্রার্থী ব্যবসায়ী—যা তাদের মোট প্রার্থীর প্রায় ৭২ শতাংশ। অথচ ‘রাজনীতিবিদ’ হিসেবে আত্মপরিচয় দিয়েছেন মাত্র চারজন। জামায়াতে ইসলামীর তালিকায় ৭৭ জন ব্যবসায়ী (প্রায় ২৭ শতাংশ; মাত্র তিনজনের পেশা রাজনীতি), ইসলামী আন্দোলনের ৯৬ জন (প্রায় ৩৬ শতাংশ), এনসিপিতে ১৬ জন এবং অন্যান্য দলেও একই প্রবণতা লক্ষণীয়। প্রশ্ন ওঠে—কোথায় শিক্ষক, গবেষক, কৃষিবিদ, শ্রমিক প্রতিনিধি, পেশাজীবী বা সমাজকর্মীরা? পেশাজীবীদের সংখ্যা ভীষণ নগণ্য; তবে এই দিক থেকে জামায়াত তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক। সার্বিকভাবে আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে—রাজনীতি কি কেবল টাকাওয়ালাদের একচেটিয়া মাঠে পরিণত হয়েছে, যেখানে বড় দলের প্রার্থীদের প্রায় ৮৩ শতাংশই কোটিপতি এবং তাদের প্রধান পেশা ব্যবসা?
এই প্রশ্নের উত্তর আদর্শে নয়, বরং স্বার্থের নগ্ন বিনিময়ে। রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন বিপুল অর্থ—নির্বাচন, সংগঠন ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য। আর ব্যবসায়ীদের প্রয়োজন ক্ষমতার ছায়া—যাতে ব্যাংকঋণ, নীতি-সুবিধা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রশ্রয় এবং দায়মুক্তি নিশ্চিত করা যায়। এই পারস্পরিক নির্ভরতার সম্পর্কই রাজনীতিকে জনস্বার্থ থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক ধরনের কর্পোরেট প্রকল্পে পরিণত করেছে।
আমার এক অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা আংকেল প্রায়শই আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসনের কথা বলতেন, যিনি মন্তব্য করেছিলেন—ব্যবসায়ীদের কোনো দেশ নেই; তাদের আনুগত্য কেবল মুনাফার প্রতি। এই বক্তব্য ব্যবসার স্বাভাবিক চরিত্রকেই নির্দেশ করে। কিন্তু সংকট শুরু হয় তখনই, যখন এই মুনাফাকেন্দ্রিক মানসিকতা রাষ্ট্রক্ষমতা ও নীতিনির্ধারণের নিয়ন্ত্রকে পরিণত হয়। তখন রাষ্ট্র আর নাগরিকের কল্যাণের জন্য কাজ করে না; বরং রাষ্ট্র নিজেই পরিণত হয় একটি দখলকৃত প্রতিষ্ঠানে (captured state) ।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) কোনো তাত্ত্বিক ধারণা নয়; বরং প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা। সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোতে দেখা যায়—শিল্প মালিক শিল্প মন্ত্রণালয় দেখছেন, ব্যাংকঋণগ্রহীতা ব্যাংক খাত তদারক করছেন, আমদানিকারক শুল্কনীতি নির্ধারণে প্রভাব রাখছেন। এর পরিণতিতে আইন ও নীতিমালা প্রণীত হয় জনস্বার্থের বিরুদ্ধে, আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো রূপ নেয় নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর লাভ নিশ্চিত করার যন্ত্রে।
ব্যবসায়ী এমপিদের ভূমিকা সবচেয়ে ভয়াবহভাবে প্রকাশ পায় ব্যাংকিং খাতে। ক্ষমতা ব্যবহার করে বিপুল ঋণ গ্রহণ, সেই ঋণ পরিশোধ না করা, ঋণখেলাপি হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় অর্থ লুট—এই চক্র নতুন নয়। সাম্প্রতিক হলফনামা অনুযায়ী বিএনপির প্রার্থীদের সম্মিলিত ব্যাংকঋণের পরিমাণ পাঁচ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যেখানে জামায়াতের প্রার্থীদের ঋণের পরিমাণ প্রায় ৮০ কোটি টাকা—যা তুলনামূলকভাবে সীমিত। এই পরিসংখ্যানই দেখিয়ে দেয় ক্ষমতাকে ব্যবসার হাতিয়ার বানাতে কেন বেশি আগ্রহী রাজনৈতিক দলগুলো!
অতীত অভিজ্ঞতা আরও ভয়াবহ। বড় শিল্পগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার মিলনে ব্যাংক লুট, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, অর্থপাচার এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধস—সবকিছুই ঘটেছে ক্ষমতার আশীর্বাদে। নির্দিষ্ট কিছু কর্পোরেট গোষ্ঠী রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে ফাঁপা করে দিয়েছে, আর তাদের অনেকেই ছিল সংসদ ও নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রের ঘনিষ্ঠ অংশ। আমরা দেখেছি ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী আমলে হাসিনার উপদেষ্টা ও মন্ত্রী পদমর্যাদার এমপি বেক্সিমকোর সালমান এফ রহমান, এস আলম গ্রুপের দুর্বৃত্তরা কীভাবে দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করে, লুটপাট চালিয়ে, অর্থ বিদেশে পাচার করে এবং ব্যাংকিং খাত ধ্বংস করে রাষ্ট্রকে ফাঁপা করে দিয়েছে। সেই এস আলম গ্রুপের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সংশ্লিষ্ট অন্তত ৮০ জনেরও বেশি একটি নির্দিষ্ট দলের এমপি প্রার্থীই শুধু নন, তাঁদের অনেকেই দলের প্রধান নীতিনির্ধারক হিসেবেও পরিচিত। তারা এসব ব্যবসায়িক গ্রুপ দখল করে নিয়ে নিজেদের লোক ও আত্মীয়স্বজনদের দিয়ে পরিচালনা করছে—এই ব্যক্তিরাই যদি ক্ষমতায় যান, তবে দেশ কী পাবে?
আমরা দেখেছি সামিট গ্রুপ, হামিম গ্রুপসহ আরও কত শিল্পগোষ্ঠী কীভাবে দেশকে লুটেপুটে খেয়েছে, এবং তাদের সবাই কার সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত ছিল, তা আমাদের অজানা নয়। এই ধারা অতীতে ক্ষমতায় থাকা অন্যদের মধ্যেও কম ছিল না। কত বড় বড় ব্যবসায়ী অতীতে সংসদ সদস্য হয়েছেন, বড় বড় তথাকথিত মুশকিল আসান কেন্দ্র বানিয়ে দেশকে খাদের কিনারায় নিয়ে গেছেন—তা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি করে বারবার রাষ্ট্রের অর্থনীতি ধ্বংস করার কারিগররাও সবসময় ক্ষমতার খুব কাছাকাছি ছিল—এই বাস্তবতাও আমাদের জানা।
রাজনীতি যখন ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তখন রাষ্ট্র তার নৈতিক ও সাংবিধানিক ভিত্তি হারাতে শুরু করে। গণতন্ত্র তখন আর জনগণের শাসন থাকে না; তা রূপ নেয় অলিগার্কদের সমঝোতার কাঠামোয়। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শিকার কোনো রাজনৈতিক দল নয়, কোনো ব্যবসায়িক গোষ্ঠীও নয়—শিকার হয় সাধারণ মানুষ, যাদের স্বার্থ প্রতিটি সিদ্ধান্তে উপেক্ষিত হয়। প্রশ্ন এখন অত্যন্ত সরল কিন্তু গভীর—রাজনীতি কি আবার দেশসেবকদের হাতে ফিরবে, নাকি তা চিরকাল কর্পোরেট ও অলিগার্ক নেক্সাসের বন্দি হয়ে থাকবে? টেকসই গণতন্ত্র ও কার্যকর রাষ্ট্র গড়তে হলে রাজনীতি ও ব্যবসার মধ্যে কঠোর সীমারেখা টানা এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন।
২০২৪ সালের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি সরকারবিরোধী আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, বঞ্চনা ও রাজনৈতিক দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে মানুষের সম্মিলিত আর্তনাদ। মানুষ রাজপথে নেমেছিল এই প্রত্যাশায় যে রাজনীতি আবার জনগণের হাতে ফিরবে, রাষ্ট্র মুক্ত হবে অলিগার্ক ও কর্পোরেট নেক্সাসের কবল থেকে, এবং ক্ষমতা আর ব্যবসার সম্প্রসারণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হবে না। সেই অভ্যুত্থানের মূল দাবি ছিল—একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র, নৈতিক রাজনীতি এবং জনগণের স্বার্থকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শাসনব্যবস্থা।
কিন্তু আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা ও সামগ্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রশ্ন তোলে—এই প্রত্যাশা কি আদৌ প্রতিফলিত হচ্ছে? নাকি গণঅভ্যুত্থানের শক্তিকে ব্যবহার করে আবারও পুরোনো দুর্বৃত্তায়িত কাঠামোকেই নতুন মোড়কে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে? যদি রাজনীতি আবারও অর্থ ও প্রভাবশালীদের দখলে চলে যায়, তবে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ইতিহাসে কেবল আরেকটি অসমাপ্ত প্রতিরোধ হিসেবেই থেকে যাবে।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি আর তাত্ত্বিক নয়, একেবারেই অস্তিত্বগত—গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তনের স্বপ্ন মানুষ দেখেছিল, তা কি বাস্তব রাজনৈতিক সংস্কারে রূপ নেবে, নাকি সেই স্বপ্ন আবারও ক্ষমতার হিসাব-নিকাশে গলা টিপে মারা হবে? এর উত্তর নির্ভর করছে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা, নাগরিক সমাজের চাপ এবং জনগণের অব্যাহত সচেতন প্রতিরোধের ওপর। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে আপস নয়—প্রয়োজন স্পষ্ট অবস্থান: রাষ্ট্র কার, রাজনীতি কাদের জন্য।
লেখক:
ড. এম এল রায়হান
সহকারী অধ্যাপক, কৃষি সম্প্রসারণ শিক্ষা বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
পোস্টডক্টরাল গবেষক, সোকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান
নিউজের জন্য: news.sangbadlive24@gmail.com