ভর্তুকি সহায়তায় কৃষকের হাতে ৫১ হাজারের বেশি আধুনিক কৃষিযন্ত্র পৌঁছে দেওয়ার সরকারি পরিকল্পনা থমকে গেছে। দুর্নীতির অভিযোগে বিগত সরকারই ২০২৪ সালের জুন থেকে প্রকল্পতে ভর্তুকি দেওয়া স্থগিত করে। এবার পুরো প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার পথে হাঁটছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
তিন হাজার ২০ কোটি টাকার ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প’ অনুমোদন করা হয় ২০১৯ সালের জুলাইয়ে। তখন কৃষিমন্ত্রী ছিলেন ড. আব্দুর রাজ্জাক। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের আওতায় সরকার সমতল এলাকায় ৫০ শতাংশ এবং হাওরাঞ্চলে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দেয়। রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো ও তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগে বারবার ড. আব্দুর রাজ্জাকের নাম উঠে আসে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২৩ সালে তদন্ত শুরু করলেও অগ্রগতি না হওয়ায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে নতুন করে দেশব্যাপী ছয়টি এনফোর্সমেন্ট অভিযান শুরু করে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর প্রকল্প পরিচালক সফিউজ্জামান অবশিষ্ট অর্থের একটি অংশ কোষাগারে ফেরত দেন। পরে নতুন প্রকল্প পরিচালক হিসেবে মো. মঞ্জুর-উল-আলম নিয়োগ পান। তিনি নিয়োগ পাওয়ার পর কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী বেঁচে যাওয়া ৫০২ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি পরিকল্পনা তৈরি এবং তা আবার এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরিকল্পনা কমিশনের শর্ত ছিল– প্রকল্প সংশোধন করে অসমাপ্ত কাজ শেষ করা। সে অনুযায়ী প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে জুন ২০২৬ পর্যন্ত করা হয়। এর পরই আবার অবস্থান বদলায় কৃষি মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি মন্ত্রণালয় জানায়, প্রকল্প মেয়াদে বেতন-ভাতা ও প্রশিক্ষণ খাতে ২০ কোটি টাকা রেখে বাকি ৪৮২ কোটি টাকা ফেরত দেওয়া হবে। অর্থাৎ যন্ত্র বিতরণ কার্যক্রম আর শুরু করা হবে না।
গত ২৫ নভেম্বর সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সভায় কমিশনের সচিব এসএম শাকিল আখতার কৃষি মন্ত্রণালয়কে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘৩ হাজার ২০ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়ম ছাড়া কিছু করতে পারেননি। বাকি টাকা ফেরত না দিয়ে এবার স্বচ্ছভাবে কাজ করুন। প্রয়োজনে আরও ২০০-৩০০ কোটি টাকা নিয়ে মেয়াদ বাড়ান। কৃষকের কোনো উপকার না হলে নতুন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হবে না।’
এতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে অতিরিক্ত সচিব মির্জা আশফাকুর রহমান (পরিকল্পনা) বলেন, এ প্রকল্পতে অনেক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। আপাতত ৫০২ কোটি টাকা থেকে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখে বাকি ৪৮২ কোটি টাকা ফেরত দিয়ে প্রকল্পটি শেষ করতে চায় কৃষি মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি পরবর্তীকালে পাঁচ থেকে সাত হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্পের প্রস্তাব তৈরি করে তা ভালোভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্প বন্ধ থাকলে আসন্ন বোরো মৌসুমে বড় সংকটে পড়বে কৃষি। দেশে প্রতিবছর ৫০ লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়। মোট আবাদি জমির প্রায় ৮০ শতাংশেই ধান, যার ১৫-২০ শতাংশে যান্ত্রিকভাবে ফসল কাটা হতো। যন্ত্রের অভাবে ধান কাটতে দেরি হলে ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। হাতে ধান কাটলে শ্রমিক খরচ বেড়ে যায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত। হাওর অঞ্চলে পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ।
তথ্যসূত্র: দৈনিক সমকাল
নিউজের জন্য: news.sangbadlive24@gmail.com