একজন নারীর স্বাভাবিক জীবনচক্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হচ্ছে মাসিক বা পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব। এর সঙ্গে একদিকে যেমন প্রজনন সক্ষমতার সম্পর্ক রয়েছে অন্যদিকে রয়েছে সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার বিষয়টি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, খুব স্বাভাবিক এ বিষয়টি বাংলাদেশে এখনো অস্বাভাবিক একটি বিষয়। দেশে এখনও এসব বিষয়গুলোকে গোপনীয় এবং একান্ত মেয়েলি বলে গণ্য করা হচ্ছে। তাছাড়া মাসিক নিয়ে রয়েছে সমাজের নানা প্রচলিত কুসংস্কার ও ভীতি।
প্রচলিত এসব কুসংস্কার ও ভীতি দূর করার পাশাপাশি মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে বৃহস্পতিবার (২২ জুন) ‘অ্যাওয়ারনেস ৩৬০’ নামক তরুণদের আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংগঠনের ফেলোশিপ প্রোগ্রামের আওতায় স্কুল ক্যাম্পেইন পরিচালনা করেছেন লাইলী আক্তার এবং তার স্বেচ্ছাসেবী দল। লাইলী নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ স্টাডিজ বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অধ্যয়ন করছেন।
আন্তর্জাতিক সংগঠনের ফেলোশিপ প্রোগ্রামের আওতায় ওই ক্যাম্পেইনটি পরিচালিত হয় খুলনা সদরে অবস্থিত নিরালা আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। এতে অংশগ্রহণ করে ওই বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ থেকে ১০ শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা।
ক্যাম্পেইন শেষে দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সুমাইয়া তার অভিব্যক্তি প্রকাশ করে বলেন, 'মাসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে আমাদের মধ্যে নানা ধরনের ভুল ধারনা ও ভয়ভীতি ছিল। এই ক্যাম্পেইন আমাদের সেসব দূরীকরণে সাহায্য করেছে। আমরা স্কুলের বাহিরে অন্যদের সাথেও এই বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করব।'
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সম্পাদক মো. রেজাউল করিম ক্যাম্পেইনটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী উল্লেখ করে বলেন, 'এ ধরনের কার্যক্রম আমাদের ছাত্রীদের স্কুলে উপস্থিতি বাড়াতে সাহায্য করবে। পাশাপশি তিনি এধরনের স্বেচ্ছাসেবী কাজে সমাজের তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।'
বাংলাদেশ ন্যাশনাল হাইজিন ফলোআপ সার্ভে ২০১৮ (প্রকাশিত ডিসেম্বর, ২০২০) এর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে মাত্র ৫৩ শতাংশ স্কুলছাত্রী মাসিকের ব্যাপারে অবগত। ৩০ শতাংশ ছাত্রী মাসিক চলাকালে স্কুলে অনুপস্থিত থাকে। এছাড়া ৩৪ শতাংশ কিশোরী স্কুলে মাসিকের সময় পুরোনো কাপড় ব্যবহার করে। মাত্র ৬২ শতাংশ কিশোরী স্যানিটারি ন্যাপকিন বা প্যাড ব্যবহার করে। স্কুল না থাকলে কিংবা বাসায় থাকলে পুরোনো কাপড়ের ব্যবহার বেড়ে যায়। সেক্ষেত্রে ৩৯ শতাংশ কিশোরী পুরোনো কাপড় এবং ৫৬ শতাংশ কিশোরী স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করে বলে জরিপে জানা যায়। এর মধ্যে ৭৯ শতাংশ কিশোরী ভালো পানি ও সাবান দিয়ে পরিষ্কার করে কাপড়গুলো পুনরায় ব্যবহার করে। মাত্র ২১ শতাংশ কিশোরী এ কাপড়গুলো বাড়ির বাইরে রোদে শুকাতে পারে। মূলত স্কুলগামী মেয়েদের মধ্যে মাসিক নিয়ে ভয়ভীতি, সংশয় দূর করে সঠিক উপায়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দৃঢ়চিত্তে স্কুলে উপস্থিতি নিশ্চিত করাটাই ছিল ক্যাম্পেইনটির মূল উদ্দেশ্য। এ সময় ক্যাম্পেইনটিকে প্রাণবন্ত করতে নানা ধরনের পোস্টার উপস্থাপনসহ ছাত্রীদের মধ্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ করা হয়।
ক্যাম্পেইনটির আয়োজক লাইলী আক্তার বলেন, 'টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ৬ এর লক্ষ্যমাত্রার ৬.২, যেখানে নারী ও মেয়েসহ অরক্ষিত পরিস্থিতিতে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর চাহিদার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রেখে ২০৩০ সালের মধ্যে সকলের জন্য পর্যাপ্ত ও সমতাভিত্তিক পয়ঃনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যবিধিসম্মত জীবন রীতিতে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের মেয়েদের একটা বড় অংশ এখনো নানা কুসংস্কারে আচ্ছাদিত। এ সমস্যা দূরীকরণের জন্য একদিকে যেমন নানা ট্যাবু ভাঙতে হবে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হবে লক্ষ্য পূরণের জন্য।'
নিউজের জন্য: news.sangbadlive24@gmail.com