গত এক দশকে আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া নিজেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়, তুলনামূলক সাশ্রয়ী শিক্ষাব্যয়, আধুনিক অবকাঠামো এবং বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশের কারণে এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রতিবছর মালয়েশিয়ায় উচ্চশিক্ষার জন্য আসছেন।
বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বর্তমানে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ে অধ্যয়ন করছেন। শিক্ষা খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, আগামী বছরগুলোতে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
তবে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের প্রত্যাশা হল আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য গ্রাজুয়েট পাস (পড়াশোনা শেষে নিদিষ্ট সময়ের জন্য চাকুরী খোঁজার ভিসা) এবং পড়াশোনার সময়ে পার্ট টাইম চাকুরীর অনুমতি সংক্রান্ত নীতিমালা আরও যুগোপযোগী করা।বিশ্বের অনেক দেশ এখন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের শুধু শিক্ষার্থী হিসেবে নয়, সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ হিসেবেও বিবেচনা করছে। এ কারণেই যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে পড়াশোনা শেষে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট সময় কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়। এই সময়ে শিক্ষার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করে, কর প্রদান করে, স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখে এবং দক্ষ কর্মী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ পায়।
মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী স্নাতক হয়ে বের হন। তাদের একটি অংশকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বৈধভাবে কাজের সুযোগ দেওয়া হলে দেশটি দক্ষ, শিক্ষিত এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানবসম্পদ পেতে পারে। একই সঙ্গে এটি মালয়েশিয়াকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে। পার্ট টাইম চাকুরী শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান বিশ্বে পার্ট-টাইম কাজকে কেবল আয়ের উৎস হিসেবে দেখা হয় না। এটি শিক্ষার্থীদের পেশাগত দক্ষতা, যোগাযোগ সক্ষমতা, কর্মসংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
মালয়েশিয়ার অনেক মাস্টার্স ও পিএইচডি শিক্ষার্থীর সপ্তাহে সীমিত ক্লাস থাকে। বিশেষ করে গবেষণাভিত্তিক প্রোগ্রামগুলোতে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় গবেষণা ও থিসিস লেখার কাজে নিয়োজিত থাকেন। এই সময়ে নিয়ন্ত্রিত ও বৈধ পার্ট-টাইম কাজের সুযোগ থাকলে তারা নিজেদের দক্ষতা আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারবেন। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত পার্ট-টাইম কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের আর্থিক চাপ কমবে, অন্যদিকে বিভিন্ন খাত দক্ষ ও বহুভাষিক মানবসম্পদের সুবিধা পাবে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আকর্ষণে বিভিন্ন দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে। শিক্ষার মানের পাশাপাশি গ্রাজুয়েট পাস, পার্ট-টাইম কাজের সুযোগ, কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা এবং শিক্ষার্থীবান্ধব নীতিমালাও এখন শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মালয়েশিয়া ইতোমধ্যেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। গ্রাজুয়েট পাস এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য আরও কার্যকর পার্ট টাইম জব নীতিমালা চালু বা সম্প্রসারণ করা গেলে দেশটির উচ্চশিক্ষা খাত নতুন মাত্রা পেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সবশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের অংশ নয়; তারা ভবিষ্যতের গবেষক, উদ্যোক্তা, প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ এবং দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের সেতুবন্ধন। তাদের দক্ষতা ও সম্ভাবনাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেলে উপকৃত হবে শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয় এবং মালয়েশিয়ার অর্থনীতি সকলেই।
লেখক: পিএইচডি গবেষক, মাল্টিমিডিয়া ইউনিভার্সিটি (এমএমইউ), মালয়েশিয়া এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটর, গো উইথ আশরাফুল আলম
নিউজের জন্য: news.sangbadlive24@gmail.com