বিদায় সবসময় কঠিন। কিন্তু কিছু কিছু বিদায় হৃদয়ের এত গভীরে গেঁথে থাকে যে, তা একসময় পথের শক্তি হয়ে ওঠে। সেই বিদায় হয়তো চোখে জল আনে, কিন্তু পা থামিয়ে দেয় না। বরং সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা হয়ে বুকের ভেতর ধুকপুক করে।
কালিয়াকৈরের সেই সকালের কথা। চারপাশে নিস্তব্ধতা, বাতাস থমকে আছে, যেন প্রকৃতিও কিছু বলতে চায়, কিন্তু পারছে না। ইকরামুল হাসান শাকিল দাঁড়িয়ে আছেন মায়ের সামনে। মা চুপচাপ তাকিয়ে আছেন তার দিকে, গভীর, অনুচ্চারিত এক ভাষায়। তার চোখে ভয় আছে, কিন্তু সে ভয় ছাপিয়ে আরও কিছু আছে—অভিমান, ভালোবাসা, আশীর্বাদ আর সীমাহীন দুশ্চিন্তা।
তিনি জানেন, তার ছেলে এমন এক অভিযানে যাচ্ছে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে মৃত্যুর হাতছানি লেগে থাকে। জানেন, ঠান্ডা, তুষার, অক্সিজেনের অভাব, প্রবল বাতাস—সব মিলিয়ে এ এক অসম যুদ্ধ। তবু তিনি কিছু বলেন না। শুধু হাত বাড়িয়ে শাকিলের মাথায় হাত রাখেন, তার কাঁধে হাত বুলিয়ে দেন। যেন বলে দেন, "তুই পারবি। ভয় পাবি না।"
শাকিলের বুকের ভেতর কী যেন ভেঙে যায়। চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে আসে চারপাশ। মা জানেন, এ বিদায় চিরবিদায় নয়, তবু বিদায় বলে মনে হচ্ছে। তিনি জানেন, তার ছেলেকে থামানো যাবে না। জানেন, শাকিলের হৃদয়ে যে আগুন জ্বলছে, তা তাকে পেছনে ফিরতে দেবে না।
এভারেস্টের পথে পা বাড়ানো মানে শুধু একটি পাহাড় জয় করা নয়, এটি এক আত্মিক পরীক্ষা। এটি একটি লড়াই, যেখানে শারীরিক শক্তির পাশাপাশি মানসিক দৃঢ়তাও লাগে। শাকিল জানেন, তার সামনে কেবল বরফের দেয়ালই দাঁড়িয়ে নেই, দাঁড়িয়ে আছে সীমাহীন প্রতিকূলতা। কিন্তু তার সঙ্গে আছে এক অনির্বচনীয় শক্তি—তার মায়ের আশীর্বাদ।
এই অভিযান শুধু শীর্ষ স্পর্শের নয়, এটি একটি বার্তা বহন করছে। প্লাস্টিক দূষণ রোধ, কার্বন নিঃসরণ কমানো—এসবের বার্তা নিয়েই তিনি পাড়ি জমাচ্ছেন পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গে। UNDP Bangladesh তাকে Youth Ambassador হিসেবে মনোনীত করেছে, যাতে তার কণ্ঠস্বর কেবল বাতাসে মিলিয়ে না যায়, বরং বিশ্বব্যাপী প্রতিধ্বনিত হয়।
এবারের অভিযানে প্রধান পৃষ্ঠপোষক PRAN, গিয়ার পার্টনার Makalu e Traders, রেডিও পার্টনার Jago FM, নিউজ পার্টনার Jagonews.com, এবং ওরাল হেলথ পার্টনার Systema Toothbrush। তবে এসব পৃষ্ঠপোষকতার ঊর্ধ্বে রয়েছে এক আবেগের শক্তি।
বাংলাদেশে পর্বতারোহণ একসময় অলীক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু শাকিলের মতো তরুণেরা সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছেন। Bangla Mountaineering and Trekking Club (BMTC) সহ বিভিন্ন সংগঠন তাকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে, বিশ্বাস নিয়ে যে, বাংলাদেশের পতাকা একদিন এভারেস্টের চূড়ায় উড়বে আরও গর্বের সঙ্গে।
বিদায়ের মুহূর্তটি এক অনির্বচনীয় যন্ত্রণা হয়ে বুকের ভেতর দলা পাকিয়ে ছিল। কিন্তু সেই যন্ত্রণাই তার শক্তি। তিনি জানেন, তার মা এখনও তাকিয়ে আছেন, তার প্রতিটি পদক্ষেপে মায়ের দৃষ্টির ছায়া লেগে থাকবে।
পথ যতই কঠিন হোক, যত বিপদই আসুক, থামা যাবে না। কারণ এই পথে শুধু এক অভিযাত্রীর স্বপ্ন জড়িত নেই, জড়িয়ে আছে এক মায়ের ভালোবাসা, এক দেশের গর্ব, এক জাতির প্রত্যাশা।
সংবাদ লাইভ/অনান্য/শাকিল
নিউজের জন্য: news.sangbadlive24@gmail.com