মানুষ, পরিবেশ ও সমৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে টেকসই বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ সাসটেইনেবিলিটি কনক্লেভ ২০২৫-এ অংশ নেয়া সরকার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সিভিল সোসাইটি, একাডেমিয়া ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা।
৩০ আগস্ট ডিএনসিসি অডিটরিয়ামে আয়োজিত এই কনক্লেভে একত্রিত হয়ে তারা বলেন—এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রাক্কালে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে, যা ২০৫০ সালের মধ্যে ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করতে পারে, বাংলাদেশকে জরুরি ভিত্তিতে প্রতিটি সিদ্ধান্তে—নীতি, অর্থায়ন, ব্যবসায়িক কৌশল ও কমিউনিটি অ্যাকশনে—সাসটেইনেবিলিটি সংযুক্ত করতে হবে।
দিনব্যাপী এই আয়োজনটি অনুষ্ঠিত হয় মিশন গ্রিন বাংলাদেশ ও ক্লাব জেসিআই লিমিটেডের উদ্যোগে এবং ডিএনসিসি, ডেইলি স্টার, মিশন সেভ বাংলাদেশ, আরডিআরসি, ডি কো-অর্ডিনেটর ও ক্যাচ বাংলাদেশ-এর সহযোগিতায়। অনুষ্ঠানে সহায়তা প্রদান করে হাতিল, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, আরিবা, টেকনো ড্রাগ লিমিটেড ও সিঞ্জেন্টা। এর মূল লক্ষ্য ছিল টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি জাতীয় প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা, যা পরিবেশগতভাবে দায়িত্বশীল, সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং অর্থনৈতিকভাবে সহনশীল প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “সাসটেইনেবিলিটি আর দীর্ঘমেয়াদি কল্পনা নয়—এটি বাংলাদেশের জন্য এক অনিবার্য প্রয়োজন। প্রতিটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত, প্রতিটি নীতি নির্ধারণ এখন মানুষ, পরিবেশ ও সমৃদ্ধির ওপর প্রভাবের ভিত্তিতেই বিচার করতে হবে।”
অনুষ্ঠানে যোগ দেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, যিনি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর রূপান্তরমূলক ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে সুইডেন দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি নায়োকা মার্টিনেজ বলেন, “জলবায়ু ন্যায়বিচার, জেন্ডার সমতা ও সবুজ উদ্ভাবনের সমন্বয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার টেকসই উন্নয়নের অগ্রণী রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।”
অক্সফাম ইন বাংলাদেশের হেড অব ইনফ্লুয়েন্সিং, কমিউনিকেশনস, অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড মিডিয়া মো. শরিফুল ইসলামের সাসটেইনেবিলিটি বিষয়ক উপস্থাপনা দেন অনুষ্ঠানের শুরুতে। তারপর বক্তব্য রাখেন হাতিলের সেলিম এইচ রহমান, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের ফারাহ কবির এবং ক্লাব জেসিআই-এর ইমরান কাদির। অধিবেশনটি পরিচালনা করেন ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ আজাজ এবং স্বাগত বক্তব্য দেন মিশন গ্রিন বাংলাদেশের আহসান রনি।
দিনব্যাপী নানা অধিবেশনে আলোচিত হয় সাসটেইনেবিলিটির গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো। “সাসটেইনেবল বিজনেস, ইনোভেশন অ্যান্ড ফিউচার” শীর্ষক আলোচনায় বেসরকারি খাত কীভাবে সবুজ প্রযুক্তি, পরিচ্ছন্ন জ্বালানিভিত্তিক স্টার্টআপ, ডিজিটাল উদ্ভাবন এবং সার্কুলার ইকোনমি চর্চার মাধ্যমে নিজেদের পুনর্গঠন করতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হয়। সিঞ্জেন্টা, ক্যাসেটেক্স, বিওয়াইডি বাংলাদেশ, বিটপি গ্রুপ, বার্জার পেইন্টস, ক্রিয়াটো এবং এনআরবিসি ব্যাংকের শিল্পনেতারা বৈদ্যুতিক যানবাহন, টেকসই কৃষি এবং জলবায়ু সহনশীল উৎপাদন শিল্প প্রসারের কৌশল তুলে ধরেন।
পরবর্তীতে “করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি অ্যান্ড সাসটেইনেবল বিজনেস গ্রোথ” অধিবেশনে সিএসআর-কে শুধুমাত্র দাতব্য উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং প্রতিযোগিতা ও সহনশীলতার কৌশলগত চালিকাশক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়। টেকনো ড্রাগস, ওয়ালটন, ইউসিবি, শান্তা হোল্ডিংস, এরিবা ক্যাপসুলস, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি এবং ডেইলি স্টারের নির্বাহীরা আলোচনা করেন কীভাবে সিএসআর উদ্ভাবন, শ্রমিক কল্যাণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার এবং সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরাসরি অবদান রাখতে পারে, যা জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
“ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড পলিসি ফর সাসটেইনেবিলিটি” শীর্ষক অধিবেশনে আলোচকরা অর্থায়ন ও শাসনব্যবস্থার মতো জরুরি সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করেন। ডিবিএল গ্রুপ, বাংলাদেশ ফাইন্যান্স, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি ও আঙ্কুরের প্রতিনিধিরা সবুজ বন্ড, জলবায়ু তহবিল ও ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্টের মতো উপায়গুলো বিস্তৃত করার আহ্বান জানান, যাতে এসডিজি ও জলবায়ু লক্ষ্যের বিশাল অর্থায়ন ঘাটতি পূরণ করা যায়।
প্যানেল আলোচনার বাইরে কনক্লেভে প্রদর্শিত হয় নানা টেকসই উদ্যোগ। অটেক অস্ট্রেলিয়ার পরিচ্ছন্ন রান্না প্রযুক্তি, সিটি ব্যাংকের ক্লাইমেট ফাইন্যান্স পণ্য, হাটিলের পরিবেশবান্ধব ফার্নিচার ডিজাইন এবং ও. ক্রিডসের সাসটেইনেবিলিটি-ভিত্তিক ব্যবসায়িক চর্চা দেখিয়েছে কীভাবে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন পথ খুঁজে নিচ্ছে।
অনুষ্ঠানের সমাপনী অধিবেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয় “বাংলাদেশ সাসটেইনেবিলিটি ফোরাম”—একটি মাল্টি-স্টেকহোল্ডার প্ল্যাটফর্ম, যা গবেষণা, অ্যাডভোকেসি, ক্যাম্পেইন এবং পার্টনারশিপের মাধ্যমে সাসটেইনেবিলিটি বিষয়টি বাংলাদেশে এগিয়ে নেবে। সমাপনী অধিবেশনের প্রধান অতিথি প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক দূত লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, “অসুরক্ষার পথ থেকে সহনশীলতার পথে বাংলাদেশের যাত্রা নির্ভর করছে আমরা কতটা সাহসের সঙ্গে আজ সাসটেইনেবিলিটিকে গ্রহণ করি তার ওপর। এই কনক্লেভ দেখিয়েছে—আমাদের নেতৃত্ব, ধারণা এবং শক্তি আছে একটি সবুজ ও ন্যায়সঙ্গত অর্থনীতি গড়ার, আর বিশ্ব তা লক্ষ্য করছে।”
সমাপনী অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের ফাহাদ করিম, প্রাণ গ্রুপের আহসান খান চৌধুরী এবং অক্সফাম ইন বাংলাদেশের আশীষ দামলে। বাংলাদেশ সাসটেইনেবিলিটি কনক্লেভ ২০২৫ শেষ হলো কেবল একটি সম্মেলন হিসেবে নয়, বরং টেকসই উন্নয়নের জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টার সূচনা হিসেবে।
নিউজের জন্য: news.sangbadlive24@gmail.com