আবির রায়হান: ইউনিফর্ম ফ্যামিলি ল-এর ধারণা হলো, বিয়ে, তালাক, উত্তরাধিকার, ভরণপোষণ ও সন্তানের অভিভাবকত্বসহ পারিবারিক বিষয়গুলোতে একটি অভিন্ন আইন চালু করা, যা ধর্মীয় পরিচয় ও জাতিগত পার্থক্য নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। এতে ব্যক্তিগত ধর্মীয় আইনের পরিবর্তে সব নাগরিকের জন্য একই ধরনের নাগরিক আইন প্রয়োগ হবে, যা ব্যক্তিগত অধিকারের সমান আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশে নারীবাদী আন্দোলনকারীরা ১৯৮০ দশকের শেষ দিকে এবং ১৯৯০ দশকের গোড়ার দিকে ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠিত হয়েছিলেন। তবে তাদের ব্যাপক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, প্রস্তাবিত আইনি সংস্কার তখন বাস্তবায়িত হয়নি। সম্প্রতি নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন একটি স্ট্যান্ডার্ড পারিবারিক কোড প্রস্তাব করলে, তা দেশজুড়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। প্রস্তাবিত এই উদ্যোগ ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল এবং ধর্মীয় নেতাদের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ে, যারা এটিকে বাংলাদেশের ধর্মীয় ও প্রথাগত সমাজ কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে দাবি করেন। এই বিরোধিতা ইউনিফর্ম ফ্যামিলি ল-এর বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করেছে।
কমিশন একটি অভিন্ন পারিবারিক আইনের মাধ্যমে বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার এবং ভরণপোষণে সকল ধর্মের মহিলাদের সমান অধিকার নিশ্চিত করার জন্য একটি অধ্যাদেশ জারি করার সুপারিশ করেছে। এটি আরও পরামর্শ দিয়েছে যে অন্তত এখনই আইনটির খসড়া তৈরি করার পদক্ষেপ নেওয়া উচিত এবং সকল সম্প্রদায়ের জন্য ঐচ্ছিক ভিত্তিতে এটি বাস্তবায়ন করা উচিত। তবে সমালোচকরা অভিযোগ করেছেন, এসব প্রস্তাব ধর্মীয় সম্প্রীতি, পরিবার কাঠামো এবং সামাজিক ভারসাম্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তাদের মতে, বিশেষ করে উত্তরাধিকার বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত সংস্কারসমূহ পবিত্র কোরআনের মৌলিক আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক।
বাংলাদেশে পারিবারিক আইনের ঐতিহ্য ধর্মীয় শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশ মুসলিম ব্যক্তিগত বিষয়াবলী নিয়ন্ত্রণ করে এবং উত্তরাধিকার বণ্টনে কোরআনিক নির্দেশনার অনুসরণ করে। তবে কোরআনের উত্তরাধিকার সংক্রান্ত নির্দেশনাগুলোর বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেকে সময় ভুল ব্যাখ্যার সৃষ্টি হয়। সমালোচকদের মতে দেখিয়েছেন কিছু উত্তরাধিকারী এবং অসৎ ইসলামিক আইন বিশারদরা নারীদের ন্যায্য অংশ থেকে বঞ্চিত করতে আইনের অপব্যাখ্যা করে থাকেন।
এই সমস্যা দূর করতে সরকার একটি অনলাইন উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটর চালু করেছে, যা নারীদেরসহ সব নাগরিককে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আইনগত অধিকার জানতে সহায়তা করে। তবে প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব এবং তথ্যপ্রচারের দুর্বলতার কারণে এখনো অনেক নারী এই সুবিধা গ্রহণ করতে পারছেন না।
কয়েকজন বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছেন, ব্যাপক সামাজিক ঐকমত্য ছাড়া হঠাৎ করে বিদ্যমান ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করলে তা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ধর্মীয় আইনের পরিবর্তন মেনে নেবে না এবং এতে দেশজুড়ে সামাজিক বিশৃঙ্খলার ঝুঁকি রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে নির্বাচনমুখী তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিতর্কিত পারিবারিক আইন সংস্কারের উদ্যোগ না নিয়ে নির্বাচন পরিচালনার দিকেই বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮(২) অনুচ্ছেদ সকল নাগরিকের জন্য জনজীবনে সমতার নিশ্চয়তা দিলেও, বাস্তবে বিয়ে, তালাক ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত পারিবারিক আইনগুলো এখনো ধর্মীয় ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রথার দ্বারা প্রভাবিত। ধর্মভিত্তিক পারিবারিক আইনকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি অভিন্ন বা ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে বিদ্যমান ধর্মীয় আইনেরই অনুসরণ করা হচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের সমান উত্তরাধিকার অধিকারের পক্ষে বাংলাদেশে জনসমর্থন আশানুরূপ নয়। যেখানে পাকিস্তানে ৫৩% এবং ইন্দোনেশিয়ায় ৭৬% মানুষ নারীদের সমান উত্তরাধিকার অধিকারের পক্ষে মত দেন, সেখানে বাংলাদেশে এই হার মাত্র ৪৬%।
২০০৯ সালে নারীর সমান সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করতে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালার খসড়া প্রকাশিত হলে, হেফাজতে ইসলামসহ ধর্মীয় সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে ব্যাপক সহিংস বিরোধিতা হয়। এর ফলে সরকার সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন থেকে সরে আসে। ফলে সংবিধান বা আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি যতই সমর্থন করুক, বাস্তবে ইউনিফর্ম ফ্যামিলি ল প্রণয়নের পথে বড় ধরনের বাধা রয়েছে।
বিভিন্ন বিশ্লেষক মনে করেন, বিদ্যমান আইনের কার্যকর বাস্তবায়নই এখনকার প্রেক্ষাপটে বেশি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হবে। অনেকেই মনে করেন, ইউনিফর্ম ফ্যামিলি ল-এর মতো সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ধর্মীয় নেতা, পণ্ডিত এবং সাধারণ জনগণের সাথে বিস্তৃত আলোচনা করা জরুরি।
একক পারিবারিক আইনের ধারণাগত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও, বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা তা বাস্তবায়নের পথে বড় অন্তরায়। ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতি যথাযথ সম্মান এবং পর্যাপ্ত সংলাপের অভাব থাকলে, বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, সংস্কারের ফলে সমাজে ঐক্যের পরিবর্তে আরো বেশি বিভাজন সৃষ্টি হতে পারে।
লেখক: শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।


