আর্শিনা ফেরদৌস: মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী (১২ ডিসেম্বর ১৮৮০ – ১৭ নভেম্বর ১৯৭৬ – যিনি মওলানা ভাসানী নামেই সমধিক পরিচিত) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম তৃণমূল রাজনীতিবিদ ও গণআন্দোলনের নায়ক, যিনি জীবদ্দশায় ১৯৪৭-এ সৃষ্ট পাকিস্তান ও ১৯৭১-এ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
মওলানা ভাসানী নিজে একজন মাদ্রাসায় শিক্ষিত ধার্মিক মানুষ ছিলেন কিন্তু স্বাধীন স্বত্বা বিশ্বাস করতেন। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, রাজনীতিতে মওলানার রাজনৈতিক অবস্থান পেটি বুর্জোয়াদের পক্ষে ছিল অসহ্য, কারণ তিনি যেটা চাইছিলেন, সেটি হলো সামাজিক বিপ্লব, যদিও ওই বিপ্লবের কথা পরিষ্কারভাবে তিনি বলতে পারেননি। বিপ্লবের অত্যাবশ্যকতার ধারণায় পৌঁছাতেও তাঁর সময় লেগেছে। স্থিরভাবে রাজনৈতিক সাহিত্য অধ্যয়ন করার ও লেখার কাজে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ তিনি পাননি। তদুপরি তিনি ছিলেন মাদ্রাসায় শিক্ষিত এবং প্রথম জীবনে লোকে তাঁকে মানত একজন পীর হিসেবে, তিনি তাদের বিশ্বাসকে আঘাত করতেন না, যদিও জানতেন যে তাঁর পানিপড়া ও ঝাড়ফুঁকে কোনো কাজ হবে না। পরামর্শ দিতেন ডাক্তারের পরামর্শ নিতে, টাকা গুঁজে দিতেন হাতে, প্রয়োজন দেখলে। সে জন্য তাঁর পক্ষে ও সঙ্গে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের কাছেও মনে হয়েছে সমাজ পরিবর্তনের বিষয়ে তাঁর চিন্তা ছিল অত্যন্ত অস্পষ্ট। যেমনটা তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বদরুদ্দীন উমর বলেছেন,” তাঁর ‘পলিটিকস অ্যান্ড সোসাইটি ইন ইস্ট পাকিস্তান অ্যান্ড বাংলাদেশ’ বইয়ে। তা ছাড়া, তাঁর বক্তব্য প্রচারের জন্য পত্রপত্রিকাও ছিল না। ইত্তেফাকের মালিকানা বদল হয়েছিল। অন্য পত্রিকার সবগুলোই ছিল হয় সরকার-সমর্থক, নয়তো টাকাওয়ালাদের মালিকানার; তারা সবই মওলানার প্রতি বিরূপ ছিল।
মওলানা ভাসানী ছিলেন মাজলুম জনতার নেতা। মজদুর কৃষক বিড়িশ্রমিক, কুলি, শ্রমিক সকলের সঙ্গে তার সখ্য, আলাপ তাদের আস্থাশীল নেতা। আমাদের কজন রাজনীতিবিদ দাবি করা মানুষ তার মত হতে পেরেছেন।
১৯৪৭ সালের পরপরই পাকিস্তান রাষ্ট্রের অগণতান্ত্রিক চেহারা প্রকাশ পেতে দেরি হয়নি। ধর্মীয় পরিচয়ে রাষ্ট্রের জন্ম হলেও পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমান জনগোষ্ঠীর প্রতি কোনো সুবিচার করেনি পাকিস্তানি শাসকশ্রেণি। জনগণের ভাষা, স্বায়ত্তশাসন, ভোটাধিকার ও অর্থনৈতিক প্রগতির প্রশ্নে শুরু থেকেই শাসকরা উদাসীন ছিল। রাষ্ট্রের নীতি প্রণয়নের সময় তারা গণতান্ত্রিক আচরণের কোনো পরোয়া করেনি। মুসলিম লীগকে জনগণের কাতারে নিয়ে যাওয়ার জন্য পূর্ব বাংলার নেতা-কর্মীরা উদ্যোগ নিয়ে কায়েমি স্বার্থের কারণে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
হামিদ খান ভাসানীকে নিয়ে লেখক তারাশঙ্কর বন্ধ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘আসলে তিনি সোজা-সরল ধরনের মানুষ। রেখেঢেকে মেপেবুঝে কথা বলতে জানেন না। মনে যা ভাবেন, মুখে তা-ই বলেন। খোলামেলা মানুষ। তাতে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। তাছাড়া তিনি মাটির মানুষের একেবারে কাছে আছেন। তাদের সুখ-দুঃখ-অনুভূতি তিনি ভালো বোঝেন, যা উপমহাদেশের আর কোনো নেতা অনুভব করতে পারেন না। ভাসানীর রাজনীতি সম্পূর্ণ অন্য ধরনের রাজনীতি- প্রথাগত রাজনীতির সঙ্গে যার মিল নেই।’
ভাসানী সংস্কারমুকত ছিলেন। ভাষার সংগে তার কোন রাজনৈতিক বিবাদ ছিল না যেমন তখন উর্দুকে অসম্মান করেন নি। সহিংসতা পরিহার করতে বলতেন, হিন্দুদের রক্ষা করতে গিয়ে বলতেন, এই অঞ্চলের মানুষ আগে হিন্দু ছিল। কজন আরব ইরানের থেকে এসেছে। আর রাজনীতি করতে হলে অহংকার পরিহার করে সাধারনের কাতারে থেকে রাজনীতি শুরু করে যেতে হবে। শিক্ষা নিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন –”ধর্মীয় শিক্ষার নামে জীবনের সাথে সম্পর্করহিত তথাকথিত মাদ্রাসা শিক্ষা প্রবর্তন করিয়া সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় সুকৌশলে আমাদের ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মানো হইয়াছে । ”
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আরও বলেন – “পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে তিনি মুসলিম লীগে ছিলেন, কিন্তু পাকিস্তান যখন প্রতিষ্ঠা পেল, তখন প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তিনি টের পেলেন যে এই পাকিস্তান মানুষকে মুক্তি দেবে না; এখানে পুরোনো শাসন-শোষণই আবার নতুন চেহারায় বহাল থাকবে; তাই দ্রুতই তিনি মুসলিম লীগ ছেড়ে দিয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগের গঠন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হলেন এবং তাঁর প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে তো বটেই, প্রধানত তাঁর চেষ্টাতেই আওয়ামী মুসলিম লীগ একটি শক্তিশালী গণসংগঠন হয়ে উঠল। সংগঠনের অসাম্প্রদায়িকীকরণও তাঁর আগ্রহেই ঘটল। কিন্তু আওয়ামী লীগ যখন সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে সক্ষম হলো, তখন স্বায়ত্তশাসন ও পররাষ্ট্রনীতি—এই দুই মৌলিক প্রশ্নে দলের প্রতিক্রিয়াশীল অংশ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাকালীন অবস্থানের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে চলে যেতে চাইল। ফলে দল দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। এরপর প্রগতিশীল অংশটি পশ্চিম পাকিস্তানের প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের সঙ্গে একত্র হয়ে ন্যাপ গঠন করে।”
আজকের দিনে অসীম ধিশক্তি সম্পন্ন ভাসানী কে আমাদের প্রয়োজন।সেইসময় টাকা অলা কিছু রাজনীতিবিদ তাঁকে অবহেলা করতেন। অন্য দের চেয়ে তার সাধারণ মানুষের সাথে বেশি সামনজস্য ছিল । সারা পৃথিবীতে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি কখনো ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছে। নিজের স্বার্থে তারা ধর্মকে নানাভাবে চাপিয়ে দিয়েছে, বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা নিজের জন্য নিয়েছে। সাধারণ মানুষের স্বাধীনতার জন্য হুমকি ছিল তারা।
আবার রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত কিছু ব্যক্তি বিশ্বজুড়ে নানা সময়ে বিরাজমান ছিলেন যারা তাদের রাজনৈতিক কর্মকান্ডকে শুধু মানুষের কল্যাণে, মজলুমের পরিত্রাণের প্রয়োজনে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তারা সাম্ব্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, নিপীড়ন, শোষণের প্রতিবাদে নিজেকে নিযুক্ত রেখেছেন সব ধরনের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও চাহিদাকে গুরুত্ব না দিয়েই। আমরা সৌভাগ্যবান যে আমাদের দেশে এমন একজন নেতা ছিলেন। তিনি মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ধর্মের মতো একটা মৌলকে যিনি শুধু একটি ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও পালনের বিষয় করে রেখেছেন। তার ভক্ত অনুসারী কারও ওপর তার ধর্ম বিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি। জামাত ই ইসলাম যদিও আগের ফর্মে নেই। সেই জামাত সম্পর্কে ভাসানী বলেছিলেন – নীল নদের পানি যেমন নীল নয় জামাত ই ইসলাম মানেই মুসলমান নয় ।” এই জামাত ই ইসলাম মুক্তিযুদ্ধের আগের তৈরী অথচ নীরব থাকে কিন্তু ভয়ংকর এমনটা জানি, এখন দেখি সবাই তাদের সাহায্য নেয়। তারা অনেকে আয়নাঘরে বন্দি ছিল বছরের পর বছর। নির্যাতন সহ্য করেছে বিগত বছরগুলোতে। কিন্তু আড়ালে নিজস্বতায় আলোকিত হয়েছে অনেক বেশি। প্রভাবিত করেছে জনপদ। শিক্ষাক্ষেত্র ও আইন বিচার প্রশাসন। জামাত কোটা আন্দোলনে বিরাট ভুমিকা রেখেছে পোশাক পরিবর্তন করে।
সম্ভবতঃ তখন পাকিস্তানকেন্দ্রীক জামাত ই ইসলাম খুব অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করত। ভাসানী ছিলেন সুফি ভাবাদর্শের। কখনো তিনি বিতর্কিত, তিনি একই সাথে মাওলানা ছিলেন আবার বামপন্থী ছিলেন। নির্দিষ্ট কোন রাজনৈতিক মতাদর্শে তিনি স্থির থাকতে পারেন নি। কখনো সাম্প্রদায়িক আবার কখনো অসাম্প্রদায়িক। কখনো পাকিস্তানপন্থী আবার কখনো ভারতপন্থী। কখনো মুজিবের সাথে আর কখনো মোস্তাকের সাথে। এই ক্ষণে ক্ষণে মত বদলানোর কারনে এতবড় নেতা হয়েও তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে কিছু করতে পারেননি। মুজিব হত্যার পর তিনিই হতে পারতেন দেশের কান্ডারি কিন্তু তা হয়নি।
যুদ্ধের পুরো সময় মওলানা ভাসানী ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। এ সময় তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সহায়ক ভূমিকা রাখতে জাতিসংঘ, চীন, রাশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে তারবার্তা প্রেরণের পাশাপাশি তাঁর আন্তর্জাতিক প্রভাবের সর্বাত্মক ব্যবহার করেছিলেন। সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশের মহানায়ক যদি ভাসানী হন তবে স্বার্থহানী হবে ভারতের। কারণ ভাসানী হক কথা বলতে দ্বিধাবোধ করতেন না এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ব্যাপারে তিনি ছিলেন আপোষহীন। সেজন্যই ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়া স্বত্বেও মওলানা ভাসানী স্বাধীন দেশে পা রাখেন পাকিস্তানে কারাবন্দী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেশে ফেরার ১২ দিন পর। ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি ঢাকায় ফিরে তিনি সর্বপ্রথম যে দাবিটি তোলেন তা হলো, বাংলাদেশ ভূখণ্ড থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অপসারণ। ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর ঢাকার পিজিতে মওলানা ভাসানীর সংগ্রামী জীবনের অবসান ঘটিয়ে মৃত্যু হয়।
সংবাদ লাইভ/মতামত


