মো. মানছুর রহমান: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী নাম। তিনি শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন; তিনি এক দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতীক, যাঁর জীবন ব্যক্তিগত শোক, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা এবং অটল দৃঢ়তার এক অনন্য সংমিশ্রণ। সময় ও পরিস্থিতির চাপে রাজনীতিতে এলেও তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সাহসী নেতৃত্ব, ধৈর্য এবং আপসহীন অবস্থানের মাধ্যমে। একজন গৃহিণী থেকে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষে উঠে আসা তাঁর জীবনকাহিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর অনেকেই ভেবেছিলেন, তিনি হয়তো নীরবে রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াবেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। গভীর ব্যক্তিগত শোককে শক্তিতে রূপ দিয়ে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে নতুন করে সংগঠিত করেন। সেই সময় সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে তাঁর দৃঢ় ভূমিকা তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে প্রতিবাদ, সাহস এবং নেতৃত্বের প্রতীকে পরিণত করে। রাজপথের আন্দোলন থেকে সংসদের লড়াই—সব জায়গাতেই তিনি নিজেকে একজন দৃঢ় কণ্ঠস্বর হিসেবে তুলে ধরেন।
১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি ইতিহাসে স্থায়ীভাবে স্থান করে নেন। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সেই সময়টি ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। একজন নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব সহজ ছিল না, তবুও তিনি আত্মবিশ্বাস ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর শাসনামলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় কার্যকর হয়, শিক্ষা খাতে সম্প্রসারণ ঘটে এবং অবকাঠামো উন্নয়নের নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাঁকে তীব্র রাজনৈতিক বিরোধিতা ও কঠোর সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে, যা তিনি রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবেই গ্রহণ করেছেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি আরও একাধিকবার সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিবারই ক্ষমতার পালাবদলের মধ্য দিয়ে তাঁকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে এবং বিরোধী রাজনীতির তীব্র চাপ মোকাবিলা করতে হয়েছে। তবুও তিনি কখনো আপসের পথে না গিয়ে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রেখেছেন। এই দৃঢ়তাই তাঁকে তাঁর সমর্থকদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস করে তুলেছে, আবার সমালোচকদের কাছেও তাঁকে একটি শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
রাজনীতির নিষ্ঠুর বাস্তবতায় বেগম খালেদা জিয়ার জীবনে এসেছে কারাবরণ, দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতা এবং মানসিক চাপ। এসব অভিজ্ঞতা একজন সাধারণ মানুষকে ভেঙে দিতে পারত, কিন্তু তিনি ভেঙে পড়েননি। বরং প্রতিটি সংকট তাঁকে আরও সংযত ও দৃঢ় করেছে। তাঁর অনুসারীদের কাছে তিনি তখন শুধু রাজনৈতিক নেত্রী নন, বরং নৈতিক শক্তি ও ধৈর্যের প্রতীক হয়ে ওঠেন। অসুস্থতা ও বন্দিত্বের মধ্যেও তাঁর নাম রাজনীতির কেন্দ্র থেকে সরে যায়নি।
আজও বেগম খালেদা জিয়ার নাম উচ্চারিত হয় আবেগ, শ্রদ্ধা এবং গভীর অনুভূতির সঙ্গে। তিনি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের প্রতীক নন; তিনি বহু মানুষের কাছে ত্যাগ, ধৈর্য এবং অটল বিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। তাঁর জীবন দেখায় কীভাবে প্রতিকূলতার মাঝেও দৃঢ় অবস্থান ধরে রাখা যায় এবং কীভাবে ব্যক্তিগত বেদনা জাতীয় দায়িত্বে রূপ নিতে পারে।
সময়ের কঠিন পরীক্ষায়ও তিনি মাথা নত করেননি। ক্ষমতায় থাকুন বা না থাকুন, তিনি তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস ও আদর্শ থেকে সরে আসেননি। এই অদম্য মানসিকতা, দীর্ঘ সংগ্রাম এবং নেতৃত্বের ধারাবাহিকতাই বেগম খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর নাম ইতিহাসে লেখা থাকবে একজন সংগ্রামী নারী নেতা হিসেবে, যিনি প্রতিকূলতার মাঝেও নিজের অবস্থান অটুট রেখেছেন এবং দেশের রাজনীতিতে গভীর ছাপ রেখে গেছেন।
লেখক: কৃষি গবেষক,যুগ্ম-আহবায়ক বাকৃবি ছাত্রদল, সাবেক সদস্য এ্যাব, বগুড়া চ্যাপ্টার।
সংবাদ লাইভ/মতামত
নিউজের জন্য: news.sangbadlive24@gmail.com