৪৪তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই সারাদেশে আলোচনা, সমালোচনা এবং ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে আচমকা ফল প্রকাশ এবং পরদিন সকাল থেকেই বিপিএসসি ভবনের চারপাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন—সব কিছু মিলে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়, যেন কোনো অপকর্ম ঢাকতে আগেভাগেই সতর্ক ছিল কর্তৃপক্ষ। তবে মূল বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিসিএসের ইতিহাসে নজিরবিহীন এক ঘটনা—এই বিসিএসে প্রায় ৮০০ জন প্রার্থীকে পুনরায় সুপারিশ করা হয়েছে, যাঁরা পূর্বেই বিভিন্ন ক্যাডারে কর্মরত ছিলেন।
এই পুনরায় সুপারিশপ্রাপ্তদের কেউ আগেই একই ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত ছিলেন, কেউবা পূর্বের থেকে নিচের পছন্দক্রমে এবার আবারও সুপারিশ পেয়েছেন। এই বাস্তবতা বিসিএস কাঠামোর মূল উদ্দেশ্য এবং ন্যায়ের চেতনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। কারণ, বিসিএস একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, যেখানে প্রত্যেকটি পদই একজন যোগ্য, নতুন প্রার্থীর ভাগ্য বদলে দিতে পারে। অথচ এই নিয়োগপ্রক্রিয়ায় এমনভাবে আগেই ক্যাডারপ্রাপ্তদের আবার সুযোগ দেওয়ার ফলে বাস্তবে নতুনদের জন্য ৮০০টির বেশি পদ অকেজো হয়ে গেছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কৃষি ক্যাডারে ৪২টি পদের মধ্যে ৩৮ জনই আগে থেকেই সুপারিশপ্রাপ্ত। লাইভস্টক ক্যাডারে ১৬৮ জনের মধ্যে ৮০ জনের বেশি, মৎস্য ক্যাডারে ১৫ জনের মধ্যে ১০ জন, ডেন্টাল ক্যাডারে ২৫ জনের মধ্যে ১৫ জন আগে থেকেই একই বা সংশ্লিষ্ট ক্যাডারে কর্মরত ছিলেন। এমনকি প্রশাসন ক্যাডারের মত গুরুত্বপূর্ণ শাখাতেও এমন ঘটনা ঘটেছে। একজন ট্যাক্স ক্যাডারে কর্মরত প্রার্থীকে আবারও সুপারিশ করা হয়েছে তার নিচের পছন্দ ‘ফ্যামিলি প্ল্যানিং’ ক্যাডারে। প্রশ্ন হলো—কেন?
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (বিপিএসসি) প্রার্থীদের পূর্ববর্তী ক্যাডার ও পছন্দক্রম সম্পর্কিত তথ্য ভাইভার আগেই সংগ্রহ করে। তাহলে কেন এমনভাবে আগেই চাকরিতে থাকা ব্যক্তিদের আবারও সুপারিশ করা হলো? যদি এই তথ্য গোপন করা হয় বা মূল্যায়নে প্রাধান্য না পায়, তবে তার দায় কে নেবে? আর যদি জানা সত্ত্বেও তা করা হয়, তবে বিষয়টি আরও ভয়াবহ—সেটি হবে দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও নীতিবিরুদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
এটি কেবল একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং দেশের সবচেয়ে সম্মানজনক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এমন সিদ্ধান্ত শুধু ৮০০ জন যোগ্য নতুন প্রার্থীকে বঞ্চিত করেনি, বরং ৮০০টি পরিবারকে হতাশার অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে। বহু তরুণ-তরুণী বিসিএসকে কেন্দ্র করে জীবন গুছিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্ন ভেঙে পড়লে শুধু একজন প্রার্থীর মনোবল নয়, ভেঙে পড়ে একটি পরিবার, একটি সমাজের আশা।
বিসিএস আয়োজনের পেছনে সরকারের বিপুল ব্যয় এবং সময় ব্যয় হয়। একবার পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে একজন প্রার্থীকে কয়েক বছর পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়। আর এই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসে যখন তিনি শুনতে পান যে যিনি ইতোমধ্যে চাকরি করছেন, তাকেই আবার সুপারিশ করা হয়েছে—তখন এই প্রক্রিয়া আর ন্যায়ের বলে মনে হয় না, মনে হয় এক নির্মম তামাশা।
অথচ এই ৮০০ জনের জায়গায় যদি অপেক্ষমাণ মেধাবীদের সুযোগ দেওয়া হতো, তাহলে ৮০০টি নতুন পরিবারে হাসি ফোটানো যেতো। বহু মেধাবী তরুণ-তরুণীর ভাগ্য পরিবর্তনের সুযোগ ছিল সেখানে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—এই অন্যায়ের দায় কে নেবে? কে দেবে এতো কষ্টের ফলাফল থেকে বঞ্চিত হওয়া প্রার্থীদের ন্যায্যতা?
বিপিএসসি চাইলে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। তারা যদি নতুন করে পছন্দক্রম যাচাই করে রিপিট প্রার্থীদের বাদ দিয়ে নতুন প্রার্থীদের সুপারিশ করে, তাহলে আবারও বিসিএস নিয়ে মানুষের বিশ্বাস ফিরে আসতে পারে। এটাই হবে সত্যিকার অর্থে বেকারবান্ধব ও ন্যায়নিষ্ঠ সংস্কার।
অন্যথায়, এই ঘটনার দাগ থাকবে ইতিহাসে। হয়তো আজ নয়, ১৫-২০ বছর পর কেউ না কেউ এই ফলাফলকে অবৈধ ঘোষণা করবে, কিন্তু ততদিনে হারিয়ে যাবে অনেক তরুণের প্রাপ্য, অনেক পরিবারের স্বপ্ন, আর বিসিএসের প্রতি মানুষের আস্থা। প্রশ্ন থেকে যাবে—এটাই কি নতুন পিএসসির নতুন সংস্কার?
-সম্পাদক, সংবাদ লাইভ টুয়েন্টিফোর ডটকম
নিউজের জন্য: news.sangbadlive24@gmail.com