বাংলাদেশ গবেষণা ও উন্নয়নে (আরঅ্যান্ডডি) জিডিপির মাত্র প্রায় ০.৩% ব্যয় করে, অথচ বিশ্বের গড় এখন প্রায় ২%। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর বাণিজ্য-সুবিধা হারালে শুধু কম মজুরি দিয়ে আর চলবে না; তাই এই ব্যবধানের সামান্য অংশ কমানোও দেশের জন্য সবচেয়ে সাশ্রয়ী বিমা।
কেন এখনই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ
সরকারি পরিসংখ্যানই উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রথম আরঅ্যান্ডডি জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, মোট গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয় (জিইআরডি) ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জিডিপির ০.৩৫% থেকে কমে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ০.৩১% এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ০.৩০%-এ নেমেছে। টাকার অঙ্কে তা বছরে প্রায় ৯,৯০০–১০,৫০০ কোটি টাকায় স্থির ছিল, মাথাপিছু প্রায় ৬২০ টাকা।
সরকারও এখন একই কথা বলছে। ২০২৬ সালে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী একটি শিল্প গবেষণা অনুদান অনুষ্ঠানে বলেন, ০.৩% হার সমপর্যায়ের মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্নগুলোর একটি, এবং কেবল কম মজুরির ওপর ভর করে প্রতিযোগিতা আর টেকসই নয়।
প্রশ্নটা এই নয় যে বাংলাদেশের আরঅ্যান্ডডিতে বেশি ব্যয় করা উচিত কি না। প্রশ্ন হলো, যেসব দেশ এই উল্লম্ফন ঘটিয়েছে তারা আসলে কী করেছে, আর তার কোনগুলো বাংলাদেশের বাজেট ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে খাপ খায়।
বিশ্বের চিত্র
বিশ্ব মেধাসম্পদ সংস্থার (WIPO) গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স দলের হিসাবে, ২০২৪ সালে বিশ্বে আরঅ্যান্ডডিতে আনুমানিক ২.৮৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার (২০১৫ সালের স্থির পিপিপি) ব্যয় হয়েছে, যা ২০০০ সালের প্রকৃত মাত্রার প্রায় তিন গুণ। বিশ্বে আরঅ্যান্ডডি-তীব্রতা ২০০০ সালের জিডিপির ১.৪৮% থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে প্রায় ২% হয়েছে।
ধরনটা পরিষ্কার: যেসব দেশ আয়ের সিঁড়ি বেয়ে উঠেছে, তারা দশকের পর দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে আরঅ্যান্ডডি-তীব্রতা বাড়িয়েছে, এবং এর বেশির ভাগ খরচ শুধু রাষ্ট্র নয়, প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বহন করতে বাধ্য করেছে।
যারা এগিয়ে গেছে, তারা কী করেছে
নিম্ন থেকে উচ্চ আরঅ্যান্ডডি-তীব্রতায় পৌঁছানো প্রতিটি দেশ শুরু করেছিল আজকের বাংলাদেশের মতো, রাষ্ট্রের অর্থে; পরে ধীরে ধীরে খরচের দায় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সরিয়ে দিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়া: আগে প্রতিষ্ঠান গড়ো, তারপর শিল্পকে খরচ বহন করাও। ১৯৬২ সালে কোরিয়া আরঅ্যান্ডডিতে জিডিপির ০.২৮% ব্যয় করত, যা আজকের বাংলাদেশের কাছাকাছি। দেশটি ১৯৬৬ সালে কেআইএসটি (KIST) প্রতিষ্ঠা করে এবং ১৯৭০-এর দশকে এর থেকে প্রায় ১০টি বিশেষায়িত শিল্প গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। আরঅ্যান্ডডি ব্যয় ১৯৮১ সালের জিডিপির ০.৮১% থেকে ১৯৯৬ সালে ২.৬%-এ পৌঁছায়; একই সময়ে কর-প্রণোদনা ও বড় শিল্পগোষ্ঠীর (চেবল) গবেষণাগার দায়িত্ব নেওয়ায় অর্থায়নে সরকারের অংশ ৫৩.৫% থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে ১৯.৪%-এ নেমে আসে। ২০২৪ সালে এটি দাঁড়ায় জিডিপির ৫.১৩%-এ, গবেষক ৬,১৫,০৬৩ জন।
চীন: টানা বড় পরিসরের বিনিয়োগ। চীনের আরঅ্যান্ডডি ব্যয় ২০০০ সালের ৪০.৭ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৪ সালে ৭৮৫.৯ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে, যার প্রায় ৭৮% এখন অর্থায়ন করে প্রতিষ্ঠানগুলো (WIPO)। শিক্ষাটা ধারাবাহিকতার: অর্থনীতির উত্থান-পতন সত্ত্বেও দুই দশক ধরে প্রতিবছর তীব্রতা বেড়েছে।
ইসরায়েল: ঝুঁকি নেয় রাষ্ট্র, বড় করে বেসরকারি পুঁজি। ইসরায়েল জিডিপির ৬.৩৩% ব্যয় করে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ, এবং এর ৯৩% বেসরকারি অর্থায়ন। সরকারি অর্থ মূলত যায় প্রাথমিক পর্যায়ের অনুদান ও ইনকিউবেটরে, যা ভেঞ্চার ক্যাপিটালকে টেনে আনে।
ভিয়েতনাম: বাজেটে কঠোর নিয়ম। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পলিটব্যুরো রেজল্যুশন ৫৭ গ্রহণ করে: ২০৩০ সালের মধ্যে আরঅ্যান্ডডি জিডিপির ২%-এ নেওয়া, যার ৬০%-এর বেশি আসবে অরাষ্ট্রীয় উৎস থেকে, এবং বার্ষিক রাষ্ট্রীয় বাজেটের অন্তত ৩% বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল রূপান্তরে বরাদ্দ। ২০২৬ সালের রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ ৬৫.০২ ট্রিলিয়ন ডং (২.৪৭ বিলিয়ন ডলার), এবং অর্থায়ন সরাসরি বরাদ্দ থেকে ফলাফলভিত্তিক ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে। তবে প্রকৃত আরঅ্যান্ডডি ব্যয় এখনো জিডিপির ০.৪%-এর সামান্য বেশি, অর্থাৎ লক্ষ্যটি এখনো অঙ্গীকার, অর্জন নয়।
ভারত: নিবেদিত সংস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি। ভারতের জিইআরডি জিডিপির প্রায় ০.৬৪%-এ আটকে আছে। দেশটি প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুসন্ধান ন্যাশনাল রিসার্চ ফাউন্ডেশন (ANRF) গঠন করেছে, এবং ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ১ লাখ কোটি রুপির রিসার্চ, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ইনোভেশন তহবিল অনুমোদন করেছে, যা দ্বিতীয় স্তরের তহবিল ব্যবস্থাপকদের মাধ্যমে বেসরকারি ডিপ-টেক প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি স্বল্পসুদে ঋণ দেয়।
মিসর: নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশও যে এগোতে পারে, তার প্রমাণ। মিসর বিশ্ব আরঅ্যান্ডডিতে তার অংশ ২০০০ সালের ০.১% থেকে ২০২৪ সালে ০.৬%-এ তুলেছে এবং এখন বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলারের (২০১৫ পিপিপি) বেশি ব্যয় করে, যা আফ্রিকায় সর্বোচ্চ (WIPO)।
বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে
বাংলাদেশের আরঅ্যান্ডডি প্রচেষ্টা ছোট, রাষ্ট্রনির্ভর এবং মৌলিক বিজ্ঞান ও শিল্প—দুদিক থেকেই দূরে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কী করছে
বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট, ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকা (জিডিপির ১৩.৭%), উদ্ভাবনে কিছু অর্থ যোগ করেছে, কিন্তু পুরো অর্থনীতির জন্য কোনো আরঅ্যান্ডডি লক্ষ্য ঠিক করেনি।
উপকরণগুলো সঠিক ধরনের। সমস্যা হলো আকার: সব মিলিয়েও এগুলো বিশ্ব গড় থেকে বাংলাদেশকে আলাদা করা জিডিপির প্রায় ১.৫–২ শতাংশ পয়েন্টের তুলনায় নগণ্য।
সমকক্ষ দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ
বাংলাদেশ ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে এশিয়ার একেবারে নিচের সারিতে, ভিয়েতনাম ও ভারতেরও নিচে; অথচ ওই দুই দেশের সরকারই নিজেদের হারকে কম বলে মনে করে। ভারতের ০.৬৪%-এ পৌঁছাতে বর্তমান প্রচেষ্টা প্রায় দ্বিগুণ করতে হবে; থাইল্যান্ডের ১.১৬%-এ পৌঁছাতে প্রায় চার গুণ।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা
তথ্যপ্রমাণ সাতটি পদক্ষেপের দিকে ইঙ্গিত করে; এখানে সবচেয়ে সহজ থেকে সবচেয়ে কঠিন ক্রমে সাজানো হলো।
এর কোনোটির জন্যই কোরিয়ার ৫% প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন হলো ০.৩%-এ থাকাকালে কোরিয়া যা করেছিল তা করা: অঙ্গীকার করা, মাপা, এবং ধীরে ধীরে খরচের দায় শিল্পের ওপর সরিয়ে দেওয়া।
উপসংহার
বিশ্ব এখন গবেষণায় আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ব্যয় করছে, এবং সবচেয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধি ঘটছে এশিয়ার মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু আরঅ্যান্ডডি প্রচেষ্টা বছরের পর বছর জিডিপির প্রায় ০.৩%-এ স্থির; ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কিছু কার্যকর উপকরণ যোগ করলেও সেই সংখ্যা বদলায়নি। বাংলাদেশ যেসব দেশের মতো হতে চায়, তারা ধনী হয়ে তারপর গবেষণা করেনি; গবেষণা করেই ধনী হয়েছে। একটি মাপযোগ্য লক্ষ্য, প্রতিষ্ঠানগুলোকে খরচ বহনে উৎসাহিত করার কর-প্রণোদনা, এবং একটি সুপরিচালিত গবেষণা অর্থায়ন সংস্থা—এই তিনটি এই দশকের মধ্যেই বাংলাদেশকে সেই পথে তুলে দিতে পারে।
অধ্যাপক ড. মো. আবুল হাশেম
পরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেম (বাউরেস),
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
নিউজের জন্য: news.sangbadlive24@gmail.com