কৃষিবিদ আব্দুল্লাহ আল মাসুম: বাংলাদেশের প্রথম নাগরিক হিসেবে যাঁদের সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া উচিত, তাঁরা হলেন আমাদের দেশের কৃষক। দেশের প্রধান সম্পদ প্রকৃত অর্থে কৃষকেরাই। কৃষকের ঘাম, পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের ফসলেই আজ আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, এই সত্যটি অস্বীকার করার উপায় নেই। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের এই শ্রেষ্ঠ পেশাজীবীদের আজও আমরা অবজ্ঞা, অবহেলা আর অবমূল্যায়নের চোখে দেখি।
প্রযুক্তির অগ্রগতির এই যুগে যেখানে শহরের একটি চাকরিজীবীর প্রতি মাসে বেতন বৃদ্ধির আলোচনা হয়, সেখানে মাঠে ফসল ফলিয়ে জীবন কাটানো একজন কৃষক মৌসুমি ফসলের মূল্য ঠিকমতো পায় না। তাদের উৎপাদিত ফসল বাজারে গিয়ে সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রাজশাহীর আম বাগানে প্রতি কেজি আম বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকায়, অথচ ঢাকায় সেই একই আম বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। এর মাঝখানের বিরাট লাভ চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে, আর কৃষক পাচ্ছে না তার ঘামঝরা শ্রমের প্রকৃত মূল্য।
এইভাবে বছরের পর বছর বিনিয়োগ করেও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষকরা এক সময় কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। কৃষক কৃষিবিমুখ হলে তার পরিণতি ভয়াবহ। তখন খাদ্য উৎপাদন হ্রাস পাবে, দেশে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। তাই কৃষকদের আর্থিকভাবে লাভবান করতে না পারলে কৃষির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের কৃষি খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের কৃষককে টিকিয়ে রাখতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সরকার, কৃষিবিদ, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং সামাজিক উদ্যোগের সমন্বিত প্রচেষ্টা। কৃষককে শুধুই উপদেশ না দিয়ে, তার মাঠ পর্যায়ের সমস্যাগুলো শুনে সেই অনুযায়ী বাস্তবভিত্তিক সমাধান দিতে হবে।
একজন কৃষিবিদ হিসেবে আমি মনে করি, কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো শুধু পেশাগত দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের নৈতিক কর্তব্যও। উন্নত মানের প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও উৎপাদন উপকরণ সরবরাহের পাশাপাশি তাদের সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে।
আজ সময় এসেছে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের। কৃষককে করুণা নয়, প্রাপ্য সম্মান দিন। কারণ একজন কৃষক না থাকলে, কোনো পেশাজীবীও বেঁচে থাকতে পারবে না। এই দেশের খাদ্য, এই দেশের প্রাণ—সবকিছুর মূলেই কৃষক।
লেখক: জুনিয়র সেক্টর স্পেশালিষ্ট, ব্রাক সিড এন্ড এগ্রো এন্টারপ্রাইজ।


