ডা: এম. এ. মোমেন: আমায় একা রেখে বুড়া মরে গেল। বুড়িটা ভাঁজ হয়ে থাকা চামড়ার মাঝে ছোট্ট বসে যাওয়া চোখ দু’খানা দিয়ে দেখলো! কিছু পানি চোখের কোণ থেকে ঝরে পড়লো! ঝাপসা চোখে পরিবারের অন্যদের 'লোক দেখানো শোক' চললো কিছুদিন, অভিনিত হতে থাকলো লোক দেখানো শোকের মাতম বা দুঃখের নাটক। এক সময় যেন এই নাটকের পরিসমাপ্তি বা যবনিকা ঘটলো। মঞ্চায়িত লোক দেখানো দুঃখের নাটকের সমাপ্তি ঘটার পর শুরু হলো বুড়ার রেখে যাওয়া সম্পদ ভাগাভাগির পালা! তার (বুড়ার) ব্যবহৃত লুঙ্গি, পাজামা, পাঞ্জাবী, শাল/চাদর, টুপি, তবজি বা অন্যান্য ব্যবহৃত জিনিসপত্র নিয়ে মেয়েদের স্বামী এবং ছেলেদের ভাগাভাগি চললো। কেউ বাবা বা শ্বশুরের স্মৃতি হিসেবে রেখে দেয়ার অজুহাতে মূল্যবান দ্রব্যাদি নিজ কব্জায় দখলে নিতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের চেষ্টায় চাহিদা অনুযায়ী সাফল্য আনার জন্য যার যার পছন্দমত পরিবারের অন্যদের নিজের কাজে সামিল করছে। কেউ বুড়ার ব্যবহৃত দামী নামাজের বিছানা ইতোপূর্বে কোন নামাজ কায়েম না করলে মসজিদে নিয়ে যাওয়ার বায়না করছে। কেউ হাতের ঘড়ি নেবে, কেউ তবজি, কেউ মাথার টুপি/পাগড়ি আবার কেউ কেউ বুড়োর হাতে লাঠি/ছোড়া!
যার যার চাহিদা অনুযায়ী মালিক মরে যাওয়ায় তার ত্যাজ্যবৃত্ত সম্পদ নিজেদের কব্জায় নেয়ার অসম প্রতিযোগিতা শুরু করে। আর তারা মনে মনে ভাবে অনেক দিন পর নিজের সংসারের যেন একটা বোঝা নেমে গেল। খানিকটা দূরে বুড়ি একা বসে বসে দেখে তাদের (আদরের সন্তানদের) কান্ডকারখানা। এই দৃশ্য দেখে সন্তানদের ছোট বেলা এবং তাদের (স্বামী, স্ত্রীর) অতীত স্মৃতি আওরাতে থাকে এরই এক ফাঁকে মনের বাজারে স্মৃতির দর'কষাকষি করতে করতে সেটাও একসময় বিক্রি হয়ে যায় বয়স বৃদ্ধিজনিত জ্ঞান শূন্য অস্থির মস্তিকের কোন এক ফাঁক ফোকরে। অতপর: স্বাভাবিক নিয়মে যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে যায়! যার ফলশ্রুতিতে শেষ বেলার সাথীকে হাড়িয়ে বুড়ি আজ চূড়ান্তভাবে একা হয়ে পড়ে। অগত্যা বুড়োর কিনে দেয়া হাতের লাঠিখানায় ভর করে সারাক্ষন ঘরে, বাহিরে উঠানের মধ্যে এদিক সেদিক পায়চারী করে। এরই মধ্যে হঠাৎ তার ছোট নাতনী দৌড়ে এসে বলে গেল "দাদি দাদি, তুমি মরে গেলে কিন্তু এই লাঠিখানা আমার, তোমার এই লাঠি দিয়ে আমি পুতুল পুতুল খেলবো.!" এই কথা বলামাত্র বৌমা দৌড়ে আসে এবং দমকের সূরে নাতনীকে বলে "দাঁড়া, তোকে আজ মেরেই ফেলবো। কখনও এসব কথা বলতে নেই, বলেছি না? তোর দাদি মনে কষ্ট পাবে! তার (বউমার) শাসন নামীয় অভিনয় দেখে বুড়ি ফোকলা দাঁত বাহির করে হাসে, কারন নিজের মেয়েকে যে বৌমার এমন শাসন সেও গোপনে প্রতিবেশির কাছে গল্প করে বুড়িটা আমাদের-কে নানান ভাবে খালি কষ্ট দেয়, আর সামাল দিতে পারছিনা বুড়িটা তাড়াতাড়ি মরে গেলেই হাফ ছেড়ে সকলে বাঁচি।
বুড়িটার কারণে একান্ত ইচ্ছা থাকা সত্বেও বাপের/ভাইয়ে বা বোনের বাড়ি ছেলে-মেয়েদের নিয়ে বেড়াতে যেতে পারি না, এমনকি কোনো অনুষ্ঠানে গেলেও তাড়াতাড়ি চলে আসতে হয় তাছাড়া যেইটুকু সময় বাড়ির বাহিরে থাকি মনের অশান্তিতে থাকতে না জানি হঠাৎ কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যায় কিনা সেই আতংকের মধ্যেই থাকতে হয় সবসময়। “সেদিনই বিকাল বেলা কলেজ পুড়ুয়া বুড়ির নাতনি সহপাঠি বান্ধবীদের নিয়ে তার ছোট ঘরে আড্ডা দিচ্ছে আর বলছে" দাদাতো ইতোমধ্যে মরে গেছে। দাদা মরে যাওয়ার পর হতে দাদির অবস্থাও খুব একটা ভাল না সারাক্ষন মন মরা হয়ে বসে থাকে। দাদির শাররীক অবস্থা দেখে মনে হয় হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই ২য় উইকেট পড়ে যেতে পারে। বুড়ি দাদিটা মরে গেলে তখন ওই ঘর (দাদির) আমার, তখন থেকেই জমিয়ে আড্ডা হবে!" তাদের আলাপ আলোচনা শোনে বুড়ি শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। তার ওরশজাত দুই ছেলের মাঝে তো প্রায় প্রতিদিন ঝগড়া লেগেই থাকে কারণ শুধু একটাই, বুড়ি কার কাছে থাকবে এবং কার ঘরে ক'দিন খাবে! জীবনের পরন্ত বিকালে এসে বুড়িটা আজ কারো মা নয়, আজ কারো শাশড়ী নয়, কারো দাদিও নয়, সে আজ শুধুই সকলের উপর এক অবহেলিত বোঝা। বুড়ি এবং তার স্বামীর পর্যাপ্ত সম্পদ থাকা সত্বেও শেষ বয়সে এসে তাকে সবায় বোঝা মনে করে এবং তার ভার বহন করতে সন্তানদের মধ্যে কেউ তেমন আগ্রহী নয়। যার যার স্বার্থ হাসিলে সকলেই ব্যস্ত। বুড়া মারা যাওয়ার পর হতে নিজেদের স্বার্থ্য নিয়ে ভাবতে ভাবতে কারো মনেই নাই আজ বুড়ির জন্মদিন। গত বছর বুড়াটা বেঁচে ছিল বিধায়, কাঁপা কাঁপা হাতে এবং পায়ে বাতের ব্যথা থাকা সত্বেও বাজার থেকে তার জন্মদিনে কিছু মিষ্টি আর দই এনে কাছে বসে নিজের হাতে খাইয়েছিলো কিন্তু বুড়াটা মারা যাওয়ায় আজ সারাটা দিন গেল মিষ্টি বা দই খাওয়াতো দূরের কথা, কেউ তাকে কিছুই বললো না! কিইবা বলবে এই পরিবারে অনেক দিন পূর্বেই তাদের (বুড়া, বুড়ির) প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে!
তাছাড়া যার মৃত্যুর জন্য সকলে অধীর আগ্রহে মুখিয়ে আছে, কি বা দরকার তাকে সেই জন্মের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার যাতে করে খালি খালি কিছু অর্থের অপচয় হবে মাত্র! অথচ কিছুদিন আগে কত লোক খাইয়ে বাপের বাড়ি বা ভাই-বোনদের দেয় বুড়ির জমানো অর্থ ব্যয় করে নাতনীর জন্মদিন পালন করা হলো! অথচ আজ বুড়ির হিসেবটা জমা পড়ে আছে হকারের কাছে বিক্রি করে দেয়া পুরানো খাতায়, কারণ ছেলেরা সবসময় ভাবে বুড়ির যে শারীরিক অবস্থা হয়তো সে আর বেশীদিন টিকবে না সুতরাং তার মৃত্যুর পরেও তো অনেক মানুষকে খাওয়াতে হবে বইকি না হলেতো সমাজে তাদের সম্মান হানি হবে। সমাজের লোকে মন্দ বলবে। সমাজের মানুষ মন্দ বলবে! বুড়ির ওরশজাত সন্তানদের যে স্বভাব হয়তো সেখানেও দুই ভাইয়ের ঝগড়া হবে অর্থ খরচ করা নিয়ে। প্রচুর সম্পদের মালিক বুড়িটা (তার এবং স্বামীর) বেঁচে থাকা অবস্থায় তার স্বামী বুড়াটার বেলা তে তো অনেকটা তাই হয়েছিল সেই সময় বুড়িটা বেঁচে ছিল বিধায় রক্ষা। তার বেলায়তো তেমন কেউ থাকবে তাই বুড় তার বিবেকের কাছে প্রশ্ন করে কিসের এ জীবন? কাদের জন্য নানান কৌশলে অর্জন করা এতকিছু আর ভাই, ভাইদের বউ, বোন এবং তাদের স্বামীদের মনে কষ্ট দিয়ে বাপের বাড়ি থেকে প্রাপ্ত অংশ আনা! বুড়ি চশমাটা চোখ থেকে নামিয়ে একটু মুছে নেয়। কেমন যেন চোখের দৃষ্টিটা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে! আকাশের দিকে তাকিয়ে বুড়ি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো, মনে মনে হয়তো এটাই বললো "পৃথিবীর সমগ্র মা যতদিন বাঁচে যেন সন্তানের মা হয়েই বাঁচে, কারো বোঝা বা করুনার পাত্রি হয়ে নয়! পরিশেষে পৃথিবীর সকল সন্তানদের কাছে জীবনের শেষ বেলার অনুরোধ মা হওয়ার পূর্বে নিজেকে মার আসনে মা এর আসনে বসিয়ে মা এর প্রতি নিজের কর্তব্যের কথা চিন্তা করে নিও।
নিউজের জন্য: news.sangbadlive24@gmail.com