নিহাল হোসেন নাফিস: বর্তমান অন্তর্বর্তিকালীন সরকারের বাজার নিয়ন্ত্রণে মনযোগী হওয়াকে স্বাধুবাদ জানাই। এ উদ্যোগ অবশ্যই প্রসংসার যোগ্য কিন্তু প্রানিসম্পদের ক্ষেত্রে বাজার মূল্য নির্ধারণ করার পূর্বে অবশ্যই উৎপাদণ খরচের দিকে নপজর দেওয়া প্রয়োজন কারন পেরিশেবল গুডস এর উৎপাদন খরচ সবসময় একইরকম থাকেনা আবার একটি দুটি নিয়ামকের ওপর নির্ভর করে তাও নত। এক কেজি গরুর মাংস কত টাকা কেজি বিক্রি হবে তা ঠিক করার আগে আমাএর বুঝতে হবে বাজারে এক কেজি গরুর মাংসের যোগানের পেছনে কোন কোন নিয়ামক কাজ করে এবং এর উৎপাদন খরচ কত। সমগ্র সাপ্লাই চেইন না বুঝে আমরা যদি শুধু কেজি প্রতি মাংসের দাম কমাই তাহলে প্রান্তিক খামারিরা ক্ষতিগ্রস্থ হবেন এবং প্রান্তিক খামারি কমে যাওয়ার কারণে যোগান কম হবে ফলশ্রুতিতে বাড়বে মাংসের দাম। আসুন একটু বোঝার চেষ্টা করি ১ কেজি মাংসের উৎপাদন খরচ কত আর তা বাজারে পৌছাতে কোথায় কোথায় দাম বৃদ্ধি হয়।
যেভাবে চলে গরুর বাজারঃ
গরুর মাংসের দাম বৃদ্ধি বা নির্ধারণ নির্ভর করে নিচের নিয়ামক গুলোর ওপরঃ
খামারী
ফরিয়া/মিডিল ম্যান
লোকাল হাট
ঢাকার হাট
কসাই
প্রথমে আসি খামারিতেঃ
বাজারে আসা গরুগুলো সাধারণত খামারির বাসায় থাকে ৬-৮ মাস। এই ছয় মাসে খামারি গরুটি মোটাতাজাকরণ করেন। গরুর খাদ্য,পানি,চিকিৎসা, ঘর ,বিদ্যুৎ ,শ্রলিক খরচ মৃত্যু ঝুকি সবই বহন করে একজন খামারি।অর্থাৎ সবচেয়ে বেশি ঝুকি বহন করেন একজন খামারি। চলুন দেখি একটি ৪০০ কেজির গরুর পেছনে একজন খামারির ১৮০ দিনের খরচ কত হয়?
খরচের খাত দৈনিক খরচ ১৮০ দিনের মোট খরচ
দানাদার ৫ কেজি ৩৫*৫=১৭৫ ৩১৫০০
কাচা ঘাস ২৪*৩=৭২ ১২৯৬০
ভ্যাক্সিন ৫ ৯০০
মেডিসিন ৮ ১৪৪০
শ্রমিক ২০ ৩৬০০
বিদ্যুত ও অন্যান্য ৭ ১২৬০
মোট ২৮৭ ৫১৬৬০
এখন গরুটি ১ দিনে বৃদ্ধি পাবে ৭০০ গ্রাম এই ৭০০ গ্রামের মাঝে সুতরাং ১৮০ দিনে বৃদ্ধি পাবে ১২৬ কেজি।
অর্থাৎ ১২৬ কেজির উৎপাদণ খরচ দাঁড়ায় ৫১৬৬০ ,তাহলে ১ কেজির দাঁড়ায় ৪১০ টাকা অর্থাৎ এক কেজি মাংস উৎপাদনে খামারির খরচ হয় ৪১০ টাকা । তাহলে এই ৪১০ টাকার মাংস বাজারে আসতে আসতে ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা কিভাবে হয় তা একটু জানা প্রয়োজন।
প্রথমত এইযে ১২৬ কেজি ওজন বাড়ল তা আসলে পুরটাই মাংস নয়। এখানে চর্বি এবং আনইডিবল অংশ মিলে থাকে প্রায় ৩৫%। অর্থাৎ ১২৬*৬৫%=৮১.৯ কেজি প্রকৃত মাংস যা কান্সটমার কেনে। সুতরাং বাজারে মাংসের দাম হওয়ার কথা ৫১৬৬০/৮১.৯=৬৩০.৭০ টাকা।
এখন আপনারা বলতে পারেন তাহলে তো মাংসের উৎপাদণ খরচ ৬৩০ আর বিক্রি ৬৫০ টাকা ,বাজার দর ঠিকই আছে। না ঠিক নেই ।
এই যে ৬৩০ টাকা উৎপাদন খরচের গরুটি বাজারে আসে।বাজারে আসতে প্রথমে পরে ফরিয়ার হাতে ফরিয়া ৫% লাভে তা লোকাল বাজারে আনে অর্থাৎ দাম হয়ে যায় ৬৬১.৫ টাকা। এই ফরিয়া থেকে ঢাকার ব্যাপারি কেনে এবং ঢাকার বাজারে তা আরো সর্বনিম্ন ৫% বেড়ে দাম হয় ৬৯৪ টাকা। এই ৬৯৪ টাকার সাথে যুক্ত হয় পরিবহন খরচ ঘাটের সিন্ডিকেট ফি (চাদা), বাজারের হাসিল। সব মিলিয়ে কেজি প্রতি দাম বারে ১৫-২০ টাকা অর্থাৎ ঢাকায় পৌছতে পৌছাতে কেজি প্রতি দাম হয় ৭১০-৭১৫ টাকা ।এরপর তা কসাই ৫% লাভে কেনে অর্থাৎ দাম আসে ৭৪৫ টাকা।আর এই দুই থেকে তিন ধাপে হাট বদলের কারণেই কিন্তু প্রায় স পণ্যের দাম ঢাকায় তুলনামূলক বেশি। ঢাকার যে কসাই গরু কিনেছে মাংসের কেজি প্রতি ৭৪৫ টাকা দরে সে কখনই আপনাকে ৭৫০ এর নিচে দিতে পারবেনা। তাই বাজারে কসাইখানায় দাম কমানোর আগে আমাদের যে বিষয়গুলোর দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন তা হল
১। খাদ্যের দামের অস্থিতিশীলতা দূর করা।খাদ্যের বাজারে চলমান সিন্ডিকেট দূর করা।
২। মধ্যস্থতাভোগী নির্মুল কিংবা লভ্যাংস নির্ধারণ করে দেওয়া।
৩। যাত্রাপথে চাদাবাজি বন্ধ।
৪। পরিবিহন খরচ কমানো
৫ সর্বপোরি সারাদেশে লাইভ গরু ক্রয়ের একটি অভিন্ন নায্য মূল্য নির্ধারণ।
তবেই আমরা খামারিদের আগ্রহ বজায় রেখে কম মূল্যে গরুর মাংস কিনতে পারব। যা হবে টেকসই এবং আস্থাশীল।
লেখক: কৃৃষিবিদ ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, পশুপালন অনুষদ,
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।
নিউজের জন্য: news.sangbadlive24@gmail.com