পল্লী অঞ্চলের দারিদ্র্য দূরীকরণে গড়ে ওঠা পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশনের (পিডিবিএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মউদুদ উর রশীদ সফদারের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সংস্থার টাকা ব্যাংকের বদলে নিজেদের পছন্দের প্রতিষ্ঠানে জমা করে লুটেছেন কোটি টাকা। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রতিবাদ করলেই কপালে জুটেছে শাস্তিমূলক বদলি, শোকজ ও লাঞ্ছনা। অবৈধভাবে চুক্তিভিত্তিক দ্বিতীয়বার নিয়োগপ্রাপ্ত পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশনের (পিডিবিএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মউদুদ উর রশীদ সফদারের সীমাহীন দুর্নীতি, দুঃশাসন, স্বেচ্ছাচারিতা, আর্থিক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষায় পদত্যাগের দাবি জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানেরই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। গতকাল শনিবার পরিচালকের পদত্যাগের দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের আকরাম খাঁ মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করেছেন তারা। এতে উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানের দেড় শতাধিক বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, বিগত চার বছরে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পৃষ্ঠপোষকতায় অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি, একাধিক কর্মচারী ইউনিয়নের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব, অনৈতিক কর্মকা- পরিচালনায় দুবার চাকরিচ্যুত বজলুর রশীদ নামক এক অর্থলোভী কর্মকর্তাকে ব্যবহার এবং সহকর্মীদের সঙ্গে দ্বৈতনীতির চর্চা ও শঠতার কারণে প্রতিষ্ঠানটির আজ বন্দিদশা। বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা, প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক দুর্নীতি, ব্যাপক বদলি বাণিজ্য, অনৈতিক উপায়ে উচ্চতর পদে পদায়ন ও নানাবিধ অনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য প্রতিষ্ঠানটির ঋণ কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে। স্থবির হয়ে পড়েছে মাঠ কার্যক্রম মনিটরিং ও তদারকি। বিগত চার বছরে মাঠ পর্যায়ে কোনো তদারকি না থাকায় একদিকে খেলাপির পাহাড় জমেছে, অন্যদিকে অর্থ আত্মসাৎ বেড়েছে ব্যাপক হারে। ফলে তিন শতাধিকেরও অধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। এদিকে গত তিন বছরে অবসরে যাওয়া প্রায় ১৫০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দেওয়া হয়নি তাদের অবসরোত্তর পাওনাদি। অবসরপ্রাপ্তদের পাওনা আটকে তাদের কষ্টে রেখে উক্ত অর্থ ব্যাংকে এফডিআর করে প্রতিষ্ঠানের স্বয়ম্ভরতা বেশি দেখানো হয়েছে। অপেশাদারি মনোভাবাপন্ন ও মাইক্রোফাইন্যান্স কার্যক্রম বাস্তবায়নে অনভিজ্ঞ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মউদুদ উর রশীদ সফদারের ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিষ্ঠানটিকে গ্রাস করে ফেলেছে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় প্রায় ৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিনা দোষে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
বক্তারা আরো বলেন, সফদার দায়িত্ব গ্রহণের পর গত চার বছরে প্রায় দুই হাজারেরও বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অর্থের বিনিময়ে উচ্চতর পদে পদায়ন ও বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে অনৈতিক উপায়ে ২০-২৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। পিডিবিএফের প্রধান কার্যালয় বর্তমানে মিরপুর-২-এর হাজী রোডে কমার্স কলেজ সংলগ্ন জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের একটি পাঁচ কাঠা জমির ওপর ২০০৪ সালে নির্মিত লিফট বিহীন একটি ছয়তলা জড়াজীর্ণ ভবনে অবস্থিত। ভবনটি একটি বেসরকারি ব্যাংকে মর্গেজ থাকায় তা টেন্ডারের মাধ্যমে বিক্রি করে। পিডিবিএফ উক্ত টেন্ডারের অংশগ্রহণ করে ব্যাংকের সঙ্গে পারস্পরিক যোগসাজশে বাড়িটি ১৬ কোটি টাকায় ক্রয়ের যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। জমিসহ ভবনটির প্রকৃত সর্বোচ্চ মূল্য ৫ কোটি টাকা, যা ১৬ কোটি টাকায় ক্রয় করে ১১ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সফদার। সুফলভোগী সদস্যদের জমা সঞ্চয়ের টাকা পি কে হালদারের ইন্টারন্যাশনাল লিজিংসহ একাধিক লিজিং কোম্পানিতে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা রেখে কমিশন গ্রহণের অপরাধসহ ৬৫০ কোটি টাকা তছরুপের ঘটনায় মন্ত্রণালয়ের তদন্ত রিপোর্টে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পিডিবিএফ বোর্ডের সিদ্ধান্তে করা সিআর মামলা (নং-৪৩৯/২০২০) থেকে অব্যাহতি দেওয়ার অপচেষ্টায় মামলাটি তিন বছর নিষ্ক্রিয় করে রাখা। অবশেষে সবাইকে মুক্ত করেন তিনি।
এ ছাড়া রিসিডিউলের মাধ্যমে খেলাপি কমিয়ে বোর্ড সভায় অসত্য তথ্য উপস্থাপন করেন, যা বিগত ২০ বছরে কোনো এমডি করেননি। প্রকৃত ঋণ আদায় হার ৫০-৬০% এবং আর্থিক স্বয়ম্ভরতা (এসএসআর) সর্বোচ্চ ৬০-৭০%। অথচ বিগত বোর্ড সভায় ঋণ আদায় হার ৯৮-৯৯% এবং আর্থিক স্বয়ম্ভরতা (এসএসআর) ১২৭% দেখানো হয়। ক্ষুদ্র ঋণ ৫২ সপ্তাহ এবং নারী উদ্যোক্তা ও স্মল এন্টারপ্রাইজ ঋণ ১২ মাসের জন্য দেওয়া হলেও খেলাপি কম দেখানোর উদ্দেশ্যে তা যথাক্রমে ১০৪ সপ্তাহ এবং ২৪ মাসে পরিশোধ দেখানো হয়। বোর্ডের অনুমোদন ব্যতিরেকে এবং ঋণ পরিচালন নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্রায় ৪ লাখ সুফলভোগী সদস্যের সঞ্চয়ের প্রায় ২০০ কোটি টাকা তাদের অজ্ঞাতে খেলাপি ঋণের সঙ্গে সমন্বয়ের নামে তছরুপ। মৃত সুফলভোগী সদস্যদের সঞ্চয়ের টাকাও সমন্বয় করা হয়েছে বলে দাবি তাদের। এ ছাড়া এডিপি ভুক্ত ‘আলোকিত পল্লী সড়কবাতি’- প্রকল্পের প্রথম ও দ্বিতীয় দরদাতাকে বাদ দিয়ে টেন্ডারে কারসাজি করে কোটি কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে তৃতীয় দরদাতাকে কার্যাদেশ প্রদান করে সরকারি অর্থ তছরুপ করে পরিচালক। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়ম সংঘঠিত হয়েছে। তদন্ত করলে সব অনিয়ম বেরিয়ে আসবে।
উল্লেখ্য, প্রকল্প সমাপ্তির পরে প্রকল্প পরিচালক কর্তৃক বিধি মোতাবেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ৪ কোটি টাকার চেক প্রদান করা হলেও এমডি তার কাক্সিক্ষত উৎকোচ না পাওয়ায় প্রদানকৃত চেক অনৈতিকভাবে বাতিল করে সম্পূর্ণ অর্থ নিয়মবহির্ভূতভাবে অদ্যাবধি আটকে রেখেছেন। জনতা ব্যাংক, চেক নং-৪২০৬৫৪৮। মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টে ৬৫০ কোটি টাকার আর্থিক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে পিডিবিএফ বোর্ড অব গভর্নসের ৭৬ ও ৭৮তম সভার সিদ্ধান্তে সিআর মামলা থেকে অভিযুক্তদের সুকৌশলে মুক্তির ব্যবস্থা করেন তিনি। ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রকৃতপক্ষে মোট খেলাপি বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ১ হাজার কোটি যা বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া একাধিকবার পুনঃতফশিলীকরণসহ নানা অপকৌশলের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য গোপন করে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে কম দেখানো হচ্ছে। ফলে প্রতিষ্ঠানের মূলধন ক্ষয় হয়ে এখন সুফলভোগীদের কাছ থেকে আহরিত সঞ্চয়, সরকার প্রদত্ত প্রণোদনার অর্থ আর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জমা সিপিএফ-গ্রাচ্যুইটির অর্থে পরিচালিত হচ্ছে পিডিবিএফ। এমডি পদে থেকে অনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশে নিজস্ব কোম্পানি রূপান্তর অ্যাডভার্টাইজিংয়ের নামে নিজস্ব ঠিকাদার সমরের মাধ্যমে নিয়মবহির্ভূতভাবে কোটি কোটি টাকার অত্যন্ত নিম্নমানের মুদ্রণসামগ্রী ও প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন মালামাল ক্রয়। রূপান্তর অ্যাডভার্টাইজিং একটি কাগুজে কোম্পানি যার কোনো অস্তিত্ব নেই। আইন খরচের নামে বাজেট বহির্ভূতভাবে কোটি কোটি টাকা লোপাটসহ প্রণোদনার ঋণ নিয়ে নয়ছয়ের মাধ্যমে সরকার প্রদত্ত ৩০০ কোটি টাকা তছরুপ। তদারকির অভাবে ব্যাপকভাবে খেলাপি হচ্ছে প্রণোদনা ঋণ। আদায়ের হার ৬০ শতাংশেরও নিচে। কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত বন্ধুর নিকট হতে কমিশন গ্রহণের মাধ্যমে প্রণোদনার অর্থসহ পিডিবিএফের ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা লোকসানি কৃষি ব্যাংকে এফডিআর। দেশের দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে সরকারের অনুদান এবং প্রতিষ্ঠানের অর্থ এফডিআর করে স্বয়ম্ভরতা বেশি দেখানো পিডিবিএফ আইন সম্মত নয়। দেশের দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে গঠিত প্রতিষ্ঠানের টাক দারিদ্র্য মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য সরকারের এডিপভুক্ত প্রকল্প, সরকার কর্তৃক প্রদানকৃত প্রণোদনার ৩০০ কোটি এবং পিডিবিএফ নিজস্ব তহবিল ঋণ বিতরণ ব্যাপকভাবে হ্রাস করে বিভিন্ন ব্যাংকে বিপুল অঙ্কের টাকা এফডিআর করেন, যা পিডিবিএফ আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংবাদ সম্মেলনে গত সরকারের মদদপুষ্ট মউদুদকে প্রথমবার তিন বছরের জন্য অবৈধভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রদান এবং মেয়াদ পূর্তির পূর্বেই দ্বিতীয়বার পুনরায় পরবর্তী তিন বছরের জন্য অবৈধভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে প্রতিষ্ঠানকে বাঁচানোর দাবি জানান তারা।
নিউজের জন্য: news.sangbadlive24@gmail.com