খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, ধান উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকদের মাঝে আধুনিক ও উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে এলএসটিডি প্রকল্পের উদ্যোগে ও অর্থায়নে দিনাজপুরে প্রথমবারের মতো ব্যতিক্রমধর্মী ‘রাইস গার্ডেন’ স্থাপন করা হয়েছে।
এলএসটিডি প্রকল্পের অর্থায়নে পরিচালিত বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এর আঞ্চলিক কার্যালয়, দিনাজপুরের তত্ত্বাবধানে বোরো ২০২৫–২৬ মৌসুমে দিনাজপুর সদরের প্রযুক্তি গ্রাম কাউগাঁয় ব্রি উদ্ভাবিত মোট ৫৪টি ধানের জাত নিয়ে এই রাইস গার্ডেন স্থাপন করা হয়। দিনাজপুরে এ ধরনের উদ্যোগ এই প্রথম, যা কৃষি গবেষণা ও প্রযুক্তি জনপ্রিয়করণে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
এলএসটিডি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. আনোয়ার হোসেনের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন জেলার প্রায় ১৫টি প্রযুক্তি গ্রামে একই ধরনের রাইস গার্ডেন স্থাপন করা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো কৃষকদের কাছে উন্নত ও উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সহজভাবে পৌঁছে দেওয়া, মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন জাত সম্পর্কে বাস্তব ধারণা তৈরি করা এবং কৃষকদের উন্নত ধান চাষে উৎসাহিত করা।
রাইস গার্ডেনে বোরো মৌসুম উপযোগী ব্রি উদ্ভাবিত ৫৪টি ধানের জাত পাশাপাশি রোপণ করা হয়েছে, যাতে কৃষকরা সহজেই বিভিন্ন জাতের গাছের বৃদ্ধি, উচ্চতা, শীষের গঠন, রোগ-বালাই সহনশীলতা, ফলন ক্ষমতা ও গুণগত বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। এর ফলে স্থানীয় পরিবেশ উপযোগী উন্নত ধানের জাত নির্বাচন করা কৃষকদের জন্য সহজ হচ্ছে।
দিনাজপুর অঞ্চলে এ ধরনের উদ্যোগ এই প্রথম হওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিদিনই অনেক কৃষক, কৃষি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও আগ্রহী দর্শনার্থী রাইস গার্ডেন পরিদর্শন করে বিভিন্ন জাত সম্পর্কে সরাসরি ধারণা নিচ্ছেন।
কৃষক দিনাজপুর সদরের কাউগাঁর কৃষক মো: আব্দুল আলিম বলেন, ‘এ ধরনের রাইস গার্ডেন আগে কখনো দেখিনি। এর মাধ্যমে বিভিন্ন জাত সম্পর্কে চাক্ষুস ধারণা পাচ্ছি। রাইস গার্ডেন পরিদর্শন করে আগামি বছর বোরোতে আমি কোন ধান চাষ করব সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
ব্রি আঞ্চলিক কার্যালয়, দিনাজপুরের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সৈয়দ জাহিদ হাসান বলেন, “এলএসটিডি প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত এই প্রদর্শনী কার্যক্রমের মাধ্যমে কৃষকদের আধুনিক ধান চাষ প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় ঘটছে। পরবর্তী আউশ ও আমন মৌসুমেও প্রযুক্তি গ্রামে রাইস গার্ডেন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।”
ব্রি দিনাজপুর আঞ্চলিক কার্যালয় প্রধান (অ.দা.) ও ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সেলিমা জাহান বলেন, “এই রাইস গার্ডেনের মাধ্যমে কৃষকরা এক জায়গায় বিভিন্ন ধানের জাত সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন। এতে তারা নিজেদের এলাকার জন্য উপযোগী জাত নির্বাচন করতে পারছেন এবং আগামী মৌসুমে চাষাবাদের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হচ্ছে।”
এলএসটিডি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, “রাইস গার্ডেন মূলত একটি জীবন্ত গবেষণা ক্ষেত্র, যেখানে একইসাথে বহু জাতের ধান পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করা সম্ভব। বোরো মৌসুমে চাষাবাদের উপযোগী এখন পর্যন্ত ব্রি কর্তৃক ৬১টি ধানের জাত অবমুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্য থেকে দিনাজপুরে ৫৪টি জাত প্রদর্শন করা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “ফলন, জীবনকাল, গাছের উচ্চতা, চালের গুণাগুণ ও বাজারমূল্যসহ বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকার জন্য সবচেয়ে উপযোগী জাত নির্বাচন করা সম্ভব হবে, যা ভবিষ্যতে গবেষণা ও কৃষি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
সংশ্লিষ্টরা জানান, এলএসটিডি প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত এই রাইস গার্ডেন দিনাজপুর অঞ্চলে উচ্চফলনশীল ও উপযোগী ধানের জাত সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই জমিতে একাধিক জাতের তুলনামূলক প্রদর্শনের মাধ্যমে কৃষকরা বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন, যা মাঠ পর্যায়ে প্রযুক্তি বিস্তারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
উল্লেখ্য, এলএসটিডি প্রকল্পের প্রযুক্তি গ্রামে স্থাপিত এই রাইস গার্ডেন আগ্রহী কৃষক, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। সার্বিকভাবে, এই রাইস গার্ডেন কৃষকদের জন্য একটি কার্যকর প্রদর্শনী ও শিক্ষণীয় ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি মাঠ পর্যায়ে গবেষণা, প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং কৃষকের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এর মাধ্যমে কৃষকরা আধুনিক ধান চাষে আরও উৎসাহিত হবেন এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে।
নিউজের জন্য: news.sangbadlive24@gmail.com