নাম তাঁর তাসনিয়া মীম, কিন্তু ক্যাম্পাসে সবাই আদর করে ডাকে "পিচ্চি মেয়ে থাসনি"। কেউ কেউ আবার বলে "টুকটুকি"। এই ছোট্ট নামের মেয়েটি যে একদিন নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেবে, সেটা হয়তো কেউ কল্পনাও করেনি।
ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি সৃজনশীল কাজের প্রতি তাঁর অদ্ভুত এক টান ছিল। ক্যানভাসে রঙের খেলা, ক্যালিগ্রাফির মোহময়ী রেখা, কিংবা ফোন কাভারের ডিজাইনে নতুনত্ব—সবকিছুতেই তাঁর ছিল অদম্য আগ্রহ। কিন্তু গল্পের মোড় ঘুরল ২০২৪ সালের ৫ নভেম্বর, যেদিন তাঁর প্রথম জন্মদিন কাটলো পরিবার থেকে দূরে, রংপুর টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের হলে।
একটি চুড়ি বদলে দিল স্বপ্ন:
জন্মদিনের দিন সহপাঠীরা তাঁকে সারপ্রাইজ দিলেও সবচেয়ে বড় চমক ছিল তাঁর ঘনিষ্ঠ বান্ধবী সাদিয়া আফরিন বন্নীর কাছ থেকে। সে তাঁকে উপহার দিয়েছিল দুইটি হাতে বানানো চুড়ি—একেবারে অন্যরকম, একেবারে আলাদা! সেই চুড়ি হাতে নিয়েই তাসনিয়া মিমের মনে জাগল এক নতুন স্বপ্নের আলো।
"এমন চুরি তো আমিও বানাতে পারি!"—এই ভাবনাটাই হয়ে গেল জীবনের নতুন মোড়।
তিনি বাসায় ফিরে মাত্র ৫০০ টাকা দিয়ে কিছু উপকরণ কিনে আনলেন। প্রথম চুড়িটি বানানোর পরই পরিবারের সদস্যরা মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তাঁরা সবাই তাঁকে উৎসাহ দিলেন, আর তাতেই যেন আগুনে ঘি পড়ল! প্রথম ব্যাচেই বিক্রি করলেন ২০টি চুরি! এরপর আর পেছনে তাকানোর সময় নেই।
ক্যাম্পাসে সিনিয়র-জুনিয়রদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল তাঁর চুরির জনপ্রিয়তা। এরপর তিনি ফেসবুকে খুললেন "টুকটুকি" নামে একটি পেজ। মাত্র তিন মাসের মধ্যেই ১০০টির বেশি চুড়ি বিক্রি করলেন রংপুর, নীলফামারী, রাজশাহী, দিনাজপুর, চট্টগ্রামসহ দেশের নানা প্রান্তে!
চ্যাম্পিয়নের মুকুট: তাসনিয়া মীমের সৃজনশীলতা থেমে থাকেনি। ২০২৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার্স সোসাইটি আয়োজিত "টেক্সটাইল ইয়ুথ কার্নিভাল ২.৫"-এ তিনি তাঁর চুরির কালেকশন নিয়ে হাজির হলেন। চুড়ি তো অনেকেই বানায়, কিন্তু তাঁর ডিজাইন ছিল একেবারে অনন্য!
বিচারকদের মন জয় করে নিলেন মুহূর্তেই, আর হয়ে গেলেন "ক্রিয়েটিভ এক্সিবিশন" সেগমেন্টের চ্যাম্পিয়ন!
তাসনিয়া মীমের কণ্ঠে তখন শুধুই আবেগ—
"এটা শুধু আমার জন্য নয়, আমার পেজের জন্যও বিশাল এক অর্জন!"
মেহেদির আঁকিবুঁকি থেকে ব্রাইডাল মেহেদি শিল্পী: কিন্তু এখানেই শেষ নয়। তাসনিয়া মিমের আরেকটি গোপন দক্ষতা ছিল মেহেদি ডিজাইন। ছোটবেলা থেকেই তিনি মেহেদির প্রতি ভালোবাসা অনুভব করতেন, কিন্তু পরিবার থেকে কখনো তেমন উৎসাহ পাননি।
একদিন স্কুলের এক অনুষ্ঠানে মেহেদির স্টল দিলেন, যেখানে তাঁকে সাহায্য করেছিল তাঁর বড় ভাই। সেখান থেকে তিনি পেয়েছিলেন এক অদ্ভুত অনুপ্রেরণা। এরপর করোনার সময় ঘরে বসে না থেকে, নিজের হাতে একের পর এক মেহেদির ডিজাইন প্র্যাকটিস করলেন।
এই কঠোর পরিশ্রমের ফলও পেলেন দ্রুত। একদিন এক বান্ধবীর বিয়েতে ব্রাইডাল মেহেদি পড়ানোর সুযোগ পান। সেটাই ছিল তাঁর আনুষ্ঠানিক যাত্রা।
তবে এখানেই থামেননি তাসনিয়া মীম। তিনি বাজারের কেমিক্যালযুক্ত মেহেদির পরিবর্তে নিজেই অর্গানিক মেহেদি তৈরি করা শুরু করলেন। তাঁর তৈরি মেহেদি নিয়ে প্রথম প্রোগ্রাম করলেন দিনাজপুরে—সেখান থেকে আয় করলেন দারুণ একটি পরিমাণ! এরপর একের পর এক মেহেদি প্রোগ্রাম করতে লাগলেন।
এখন তাঁর একটি ফেসবুক পেজ আছে—"Mehedi Art By Tasnia"। যেখানে তিনি নিয়মিত তাঁর কাজের আপডেট দেন। বর্তমানে তিনি ব্রাইডাল মেহেদি পড়ানোর জন্য অনেক অফার পান, আর এখান থেকেও বেশ ভালো পরিমাণ আয় করেন।
ভবিষ্যতের স্বপ্ন: কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি
তাসনিয়া মীমের চোখে এখন অনেক বড় স্বপ্ন। তিনি চান, তাঁর জুয়েলারি মেকিং ও মেহেদি ডিজাইন-এর কাজকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে। শুধু নিজের জন্য নয়, বরং তিনি এমন কিছু করতে চান, যাতে আরও অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
তাসনিয়া মীম প্রমাণ করে দিয়েছেন, একটি ছোট উদ্যোগও যদি ভালোবাসা আর পরিশ্রম দিয়ে গড়ে তোলা হয়, তবে সেটাই একদিন বিশাল কিছু হয়ে ওঠে।
তাঁর এই লড়াই, এই সাফল্য, শুধুই তাঁর একার নয়। এটি প্রমাণ যে স্বপ্নের পেছনে দৌড়ালে, তা সত্যি করাই সম্ভব।
সংবাদ লাইভ/ফিচার
নিউজের জন্য: news.sangbadlive24@gmail.com