জুলাইয়ের ভয়াবহ অভ্যুত্থান বাংলাদেশে হাজারো মানুষের জীবনকে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে। আহত মানুষগুলোর মধ্যে অনেকেই হারিয়েছে তাদের হাত, পা, চোখ—তারা হারিয়েছে স্বাভাবিক জীবনের আশ্বাস। তাদের দেহের ক্ষত হয়তো কিছুদিনে সেরে উঠবে, কিন্তু হৃদয়ের ক্ষত? যে স্বপ্নগুলো মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল, তার দায় কে নেবে?
যারা তাদের শরীরের অমূল্য অঙ্গ হারিয়েছে, তাদের জন্য জীবন এখন এক নতুন যুদ্ধক্ষেত্র।
তাদের শারীরিক চিকিৎসা চলছে, কিন্তু কেউ কি ভেবেছে, যারা তাদের শরীরের একেকটি অংশ হারিয়েছে, তারা বাকি জীবন কীভাবে কাটাবে? যারা দিনরাত ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে, যারা অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছে জীবনের নতুন অর্থ খুঁজতে, তাদের এই মানসিক যন্ত্রণার খবর কেউ কি রাখে?
একজন যুবক, যার সামনে ছিল এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, আজ তার একটি পা নেই। তার বাবার একটাই প্রশ্ন, ‘আমার ছেলে বাঁচবে, কিন্তু এইভাবে বাঁচা কি জীবন?’ এক মা, যিনি মেয়ের চোখের আলো হারিয়ে ফেলেছেন, কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, ‘আমার মেয়ে আকাশ দেখতে চায়, কিন্তু এখন তার আকাশ কেবল অন্ধকার।’
গবেষণা বলছে, এই মানুষগুলো শুধু শারীরিক যন্ত্রণায় ভুগছেন না, তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন। রাতে তারা ঘুমাতে পারেন না। তারা বারবার ভাবছেন, “কেন আমার সঙ্গে এমন হলো?” তাদের পরিবারও এই মানসিক চাপের ভার বহন করছে। এক পরিবারের এক সদস্য যখন নিজের জীবন নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন পুরো পরিবারই এক অসীম যন্ত্রণায় পড়ে যায়।
কিন্তু আমরা? আমরা কি সত্যিই তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছি? কেবল শারীরিক ক্ষতির চিকিৎসা দিয়ে কি সব শেষ হয়ে যায়? একজন মানুষ যখন নিজের ভেতরের শক্তি হারায়, তখন তার বেঁচে থাকাটাই এক অভিশাপ হয়ে ওঠে। আমাদের এই মানুষগুলোর মানসিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের মনোবল ফেরাতে হবে।
এই মানুষগুলো কেবল দান বা সহানুভূতি চায় না, তারা চায় সম্মান, চায় জীবনের নতুন সুযোগ। তাদের জন্য বিশেষ কাউন্সেলিং, মানসিক সহায়তা গোষ্ঠী, এমনকি চাকরির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কারণ, তারা আমাদেরই অংশ। তাদের স্বপ্ন ভাঙার দায় কেবল তাদের একার নয়, আমাদেরও।
আসুন, তাদের যন্ত্রণা বোঝার চেষ্টা করি। তাদের জীবনের গল্পে আমাদের মানবিকতার গল্প লিখি। কারণ, মানবিকতা শুধু সহানুভূতিতে নয়, দায়িত্ব নেওয়ার মধ্যেই প্রকৃত অর্থ খুঁজে পায়।
লেখক:
শিক্ষার্থী
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।


