যতটুকু সময় জামিল বাসায় থাকে সে সংসার নিয়ে চিন্তিত থাকে।তার ধারণা স্ত্রী নিলু শুধু শুয়ে-বসে খায়। কাজেই যতক্ষণ বাইরে থাকে ততক্ষণ হাসিখুশি থাকলেও বাসায় ফিরতেই নীলুর বিভিন্ন ধরনের খুত কষ্টিপাথর দিয়ে খুঁজে খুঁজে বের করে সে।
নিলু রান্নাঘরে যাবে ঠিক তখনই বিরক্ত মুখে জামিল বলল,
– কী এমন কাজ করো শুনি,যে আমার কাপড়গুলো পর্যন্ত ইস্ত্রি করে রাখতে পার না? বাসার আনাচে-কানাচে ময়লার ছড়াছড়ি! বাসাটা তো একটু গুছিয়ে রাখলেও পার।
অনেক কষ্টে আমাকে টাকা কামাই করতে হয়। এখন যদি তোমার মনে হয় বাসার কাজ অফিরের কাজ সব আমি করবো তাহলে তো আমার আবার নতুন মানুষ ঘরে আনতে হবে।
জামিলের সব কথা মুখ বুঝে নিলু সহ্য করলেও এই কথাটা সহ্য করতে পারেনা। তাই সেও ঝাঁজালো কন্ঠে বলে,
– তোমার তো বাসার কাজ চোখে পড়েনা। রান্নাবান্না এগুলো কী এমনি এমনি হয়? কাপড় ধোয়া ঘর মোছা এগুলো কে করে? নিজের লুঙ্গিটাও কখনো ভাজ করে দেখেছ?বলো? উত্তর দাও?ঘরের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যেগুলো সেগুলোও তো তুমি নিজেই ফেলেছো। বাসায় কী কোনো ছোট বাচ্চা আছে যে তারা নোংরা করবে?
– মুখে মুখে কথা বলবেনা নিলু। এগুলো আমার বংশে নাই।
মুখেমুখে কথা বলে যাদের রাস্তায় জন্ম তারা।
– মুখে মুখে কথা বললাম কই?
যা সত্যি তাই বললাম। আর তোমার কাপড় তুমি নিজেই ইস্ত্ৰি করে নাও না কেন?
– কী বললা তুমি! আবার বলতো ?
আমি কাপড় ইস্ত্রি করলে রুটি রোজগারের ব্যবস্থা কে করবে শুনি? খাওয়া কী আর এমনি এমনি আসে?
– খাওয়া নিয়ে খোটা দিবানা।চার পিস মাছ রান্না করলে তিন পিসই তুমি খাও। কোনদিন জিজ্ঞেস করেছো আমি খেয়েছি কিনা? একজন বুয়াও অর্থের বিনিময়ে কাজ করে। আর আমি সারাদিন নিজের সব বিসর্জন দিয়েও তোমার এত এত কথা শুনতে হয়।
– এহ্ কী একেবারে কাজ করে উল্টায় ফেলতেছে।
আমার মা চাচীদের মত কাজ করলে না জানি কি করতা।
সকালে ঘুম থেকে উঠে উঠানে গবর দেয়া থেকে শুরু করে ধান সিদ্ধ রান্না-বান্না সব করতে হতো তাদের।কই তাদের তো কখনও মুখে মুখে কথা বলতে শুনিনি। আমাকে কাজ শিখাইতে আসবা না বুঝছো নিলু। বাসার এই সামান্য কাজ নিয়ে এত ফাটা বাঁশের মতো চিল্লানের কিছু নাই। এইগুলা আমার বাম হাতের ব্যাপার।বুঝছো বাম হাতের ব্যাপার।
– ও তাই নাকি? তাহলে বেশ তুমি করো তোমার কাজ। আজকে আর রান্না করবো না। আর তোমার মত কাউকে পেলে নিয়ে আসো। এই সংসারে থাকার আমার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই। সময় শক্তি ব্যায় করে শেষ মুহূর্তে আমার কপালে যে দুর্ভোগ আছে সেটা আমি তোমার কথায় ভালোই অনুমান করতে পারি। এর চেয়ে ভাল আমি এখন থেকেই কিছু একটা করব। যাতে করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারি।
– কে দেবে তোমাকে কাজ? কাজ অত সহজ না।
– তোমার মত বলদের কাছে কঠিন। আর তুমি নিশ্চয়ই ভুলে গেছো তোমার চেয়ে আমার রেজাল্ট ভাল। একটা ভালো চাকরি জোগাড় করা আমার জন্য কোন ব্যাপার না। অতটুকু কনফিডেন্স আমার আছে।
-এত্ত সাহস কে দেয় শুনি?আমাকে বলদ বলতে একবারও লজ্জা করল না।আর
কি আমার রেজাল্ট রে।তাই নিয়ে কত্ত গর্ব। হেহ্।
– তুমি যাই বলো না কেন জামিল।তোমার আর কোন কথা আমি শুনবো না। আমি চাকরি করবোই।
– চাকরি করবা মানে? চাকরিজীবী মেয়ে বিয়ে করার ইচ্ছা থাকলে তোমাকে বিয়ে করব কেন তাহলে? কত ভাল পজিশনের মেয়ে ছিল তাদের বিয়ে করতাম।
– তাহলে আমাকে কিসের জন্য বিয়ে করেছ সত্যি করে বলোত?
– তুমি ঘর সামলাবে। আমি রোজগার করব।আল্লাহ দিলে আমাদের ঘরে যখন বাচ্চাকাচ্চা হবে তখন তাদের দেখাশোনা করতে পারবা তুমি। আসলে কি জানো যাদের বাবা মা দুজনেই চাকরি করে তাদের বাচ্চাগুলো অমানুষ হয়।
– ওহ।এরমানে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ঘর,বাচ্চা সামলানোর দায়িত্ব আমার একার?
– তুমি মেয়ে মানুষ। ঘর সামলানোর দায়িত্ব তোমারই তো থাকবে।
আমিতো উপার্জন করি।
– ধরো আমিও তোমার মতো উপার্জন করলাম তখন কী তুমি সংসারের দায়িত্ব সমান ভাবে পালন করবে? আমার জামা কাপড় ইস্ত্রি করা দূরে থাক নিজেরটাও কী কখনো করবে?
উত্তর দাও?
উত্তর হল তুমি করবে না।
আমি যদি তোমার কোন সাহায্য ছাড়াই ঘর এবং বাহির দুটোই সামলাতে পারি তাহলে তোমার এত কথা শুনে আমি এখানে পড়ে থাকবো কেন?
তোমার সবচেয়ে বড় সমস্যা কি জামিল জানো, তুমি ছেলেবেলায় যে জিনিসগুলো দেখে বড় হয়েছে সেগুলো থেকে বের হয়ে আসতে পারো না। কিংবা চাও না। যে মা এত পরিশ্রম করতেন তোমাদের জন্য। নিজে খেয়ে না খেয়ে তোমাদের খাওয়াতেন তার মুখে কখনো তার কোনো ইচ্ছার কথা বলতে শুনেছো? শুননি।
তার জীবনটাও তো একটা জীবন ছিল। শেষ বয়সে বড় ধরনের অসুখে মারা গেলেন।তোমাদের জন্য এত করেও তিনি কী পেয়েছেন জীবনে?
– এসব ফাজলামি কথাবার্তা বাদ দাও নিলু। তোমাদের মত শিক্ষিত মেয়েদের নিয়ে এই এক সমস্যা। মুখে মুখে কথা বলো।
আমার মা এত কষ্ট করার পরেও আমাদের সংসারটাকে ধরে রেখেছেন। এটাই তো তার বড় পাওয়া। সন্তান সংসার ভাল থাকলে একজন মেয়ে মানুষের আর কি লাগে?
– ও তাহলে নিজের সব ভালোলাগা বিসর্জন দিয়ে সবাইকে ভালো রাখার দায়িত্ব একা মেয়ে মানুষের?
– আমি বাইরের সব দায়িত্ব নিতে পারলে তুমি সংসারের দায়িত্ব নিতে পারবানা কেন? – পারবোনা এই কারণেই ,তুমি বাইরে কাজের বিনিময়ে মাস শেষে মোটা অংকের টাকা হাতে পাও। যার কারণে তোমার অর্থনৈতিক সাপোর্ট আছে। এত বড় বড় কথা বলতে পারো।কিন্তু আমি তোমার চেয়ে দ্বিগুণ পরিশ্রম করেও এই জায়গাটায় দুর্বল। তুমি আমাকে একটা টাকা না দিলে আমার নিজের প্রয়োজনীয় কোন জিনিস কেনার ক্ষমতা নেই।
কাজেই আগে আমি চাকরি করব। এবং যখন আমি বুঝব ভবিষ্যতে আমার কারো মুখাপেক্ষী হতে হবে না ,তখন আমার ইচ্ছে হলে চাকরি করব না হলে করব না। এটাই আমার ফাইনাল ডিসিশন।
নিলুর কথায় জামিল টেবিল থেকে একটা গ্লাস নিয়ে জোরে আছাড় দিল ফ্লোরে। ঝনাৎ শব্দে ভেঙে গেল গ্লাসটা। ফ্লোরের চারিদিকে কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল।
অন্য সময় হলে নিলু দ্রুত পরিষ্কার করে নিত। কিন্তু সে এই মুহূর্তে ঐদিকে কোন দৃষ্টিপাত করল না।সে সরাসরি বেডরুমে চলে গেল। জামিলও গজগজ করতে করতে দরজা খুলে বাইরে বের হয়ে গেল। জামিল বাইরে বের হয়ে গেলে, নিলু আলমারি খুলে তার সব সার্টিফিকেটের উপর হাত বুলালো আলতোভাবে। সব অর্জনগুলো হাতে নিয়ে অনেকদিন পরে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিল সে। চোখের তারায় ভেসে উঠতে লাগল লাল নীল স্বপ্নের অগণিত তারা। নিলু সার্টিফিকেটগুলো একটা ট্রান্সপারেন্ট ফাইলে রাখল। মন ভাল না থাকায় অবসাদ নেমে এলো শরীরেও। কিছুক্ষণ সে চুপচাপ বসে থেকে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই একসময় ঘুমিয়ে গেল । তার ঘুম ভাঙলো কলিংবেলের ক্রমাগত শব্দে। একাধিকবার কলিংবেল চাপলেই নিলু বুঝতে পারে এটা জামিল।
নিলু চোখ ডলতে ডলতে কলিংবেলের দরজা খুলে দিল। জামিল বাসায় ঢুকে, মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কাঁচের টুকরো দেখে, খুবই বিরক্ত ও রাগান্বিত হলো। ঝাঁঝালো কন্ঠে নিলুকে বলল, কী ব্যাপার কই গিয়েছিলে?
– কোথাও যাইনি তো। কেন?
– বাসায় যেহেতু ছিলে তুমি। তাহলে এখনো ফ্লোরের এই অবস্থা কেন?
– আজতো শুক্রবার। তুমিও বাসায় আছ। এছাড়া তুমি যেহেতু গ্লাস ভেঙেছো তুমি উঠাবে। আমি এতদিন অনেক করেছি আর করতে পারবোনা।
জামিল রাগে আরেকটা ক্লাস ছুড়ে ফেলল ফ্লোরে। নিলুও রাগ সামলাতে না পেরে আরেকটা গ্লাস নিয়ে ছুড়ে ফেলল।
জামিল হিংস্র বাঘের মত গর্জন করতে করতে তাকাল নিলুর দিকে। তারপর চোখ মুখ শক্ত করে বললো,
– গ্লাস ভাঙলে কেনো?গ্লাস কী তোমার বাপের টাকায় কেনা?
– বাপ তুলে কথা বলবে না। এছাড়া তুমিও তো ভেঙ্গেছো।তাও একাধিক বার।
-আমি আমার রোজগারের টাকায় কেনা গ্লাস ভেঙেছি।
– তোমার সাথে আর কথা বলতে ইচ্ছে করছেনা আমার।
বলেই দ্রুত পায়ে ভেতরে গিয়ে একাডেমিক ফাইলটা হাতে নিয়ে, নিলু এক কাপড়ে বের হয়ে গেলো দরজা ঠেলে। জামিল কোন বাধা দিল না।শুধু মনেমনে বলল,টাকা নাই পয়সা নাই পায়ে হেটে কতদূর যাবা তুমি, আমার জানা আছে।আবার ঠিকই ফিরে আসতে হবে।
গ্লাস ভাঙ্গার পর, বাসা থেকে বের হয়ে গিয়ে, এতক্ষন পায়ে হেঁটে ঘুরেছে জামিল। তাই নিলু বাসা থেকে বের হয়ে যাবার পরপরই পেটে ক্ষুধা অনুভব করতে লাগলো সে। খাবারের টেবিল,ফ্রিজ,সব চেক করে দেখল। কিন্তু কোন খাবার নেই।নিলু আজ রান্না করেনি।
জামিল রাগে দ্রুত হাঁটতে গিয়ে অসতর্কতাবশত একটা কাঁচের টুকরো তার পায়ে ফুটল। খুব সতর্কতার সাথে সেটাকে বের করল জামিল। একটা ঝাড়ু খুঁজতে লাগল।কিন্তু কোথাও পাচ্ছে না। অনেক খোঁজার পর একটা ঝাড়ু খুঁজে পেল কিচেনের চিপায়। এদিক ওদিক ছিটিয়ে থাকা কাঁচের দিকে তাকাতেই চোখে মুখে অবসাদ নেমে এলো তার।
বারবার নিলুর কথা মনে হতে লাগল।
ইচ্ছা না করলেও কাঁচের টুকরোগুলো যত্নসহকারে পরিষ্কার করল সে।সে নিলুকে সবসময় দেখতো, কাঁচ ঝাড়ু দিয়ে উঠানোর পর, একটা সুতি কাপড় দিয়ে বারবার পানি চেঞ্জ করে ঘর মুছতে।
মনে হতেই জামিল ও বালতি ভরে পানি নিয়ে এলো ঘর মোছার জন্য। একেতো ক্ষুধা পেট তার উপর এত কষ্ট।চোখে মুখে সামান্য সরিষা ফুল দেখতে লাগলো।কিন্তু পাত্তা দিলোনা।
ঘর মুছতে গিয়ে তার মনে হলো একদিন ঘর মুছতেই তার এত কষ্ট লাগছে। আর নিলু প্রতিদিন ঘর মুছে। ভেতরে স্বীকার করলেও উপরে কিছুই হয়নি এমন একটা ভাব করে ঘর মোছা শেষ করে জামিল গোসলে ঢুকে গেলো। গোসল সেরে ফিরতেই পেটে ক্ষুধা নামক দৈত্যটা আবার মাথায় ঝাঁকুনি দেয়া শুরু করল তার। রান্না করার মতো শক্তিটুকু পেলনা সে। জোরে জোরে ডাকতে লাগল নীলু নীলু কই তুমি? আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি তোমাকে আর বকবো না ।তোমার ইচ্ছে হলে তুমি চাকরি করবে। এখন থেকে তোমাকে আর একা কোন কিছুই করতে হবে না। সংসারটা যেহেতু আমাদের আমরা দুজন মিলেই সব করব। জামিলের চিৎকারের শব্দে নিলু অপর পাশ থেকে জোড়ে একটা ধাক্কা দিলো জামিলকে। তারপর বলল, কী হয়েছে তোমার? কোন দুঃস্বপ্ন দেখেছো?
– আমার হাতে একটা চিমটি কাটো নিলু। থাক একটা কাটতে হবেনা দুইটা কাটো। আর বল আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না তুমি?
– মানে কী? তোমার কথা আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা। তবুও বললাম যাব না এবার হল।এবার আসল ঘটনা বলো?
– আসলে কী আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারলেও ঘর মোছা রান্না করা এগুলো করতে পারব না।
এবার সত্যি সত্যিই নিলু রেগে গেলো।চোখ গোলগোল করে তাকিয়ে রইল জামিলের দিকে।জামিল ও ভড়কে গিয়ে নিলুর দিকে তাকালো।
যে দৃষ্টি প্রকান্ড ঝড়ের আগাম বার্তাকে জানান দিচ্ছে।


