নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেত্রী সাদিয়া সুলতানা নেলী। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমি আইন ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের ১৭ ব্যাচের শিক্ষার্থী। ছাত্র-জনতার অভ্যণ্থানে ৫ আগস্ট হাসিনার পতনের পূর্ব এবং পতন পরবর্তী নানা ইস্যুতে ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও আওয়ামী লীগের পক্ষে নানা বিষয়ে ন্যারেটিভ উৎপাদন করতে দেখা গেছে। তবে আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে ভবিষ্যৎ না থাকায় ধীরে ধীরে অনুপ্রবেশ করেন ছাত্রদলে। বনে যান ছাত্রদলের প্রথম সারীর নেত্রী। আসন্ন জকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের প্যানেলেই হল সংসদে আসছেন ছাত্রলীগের সেই নেত্রী নেলী। ছাত্রদলসহ হলে গড়ে তুলেছেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের শক্ত বলয়ও। জকসু নির্বাচন নিয়ে এখন নিয়মিত করছে গোপন বৈঠকও।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ছাত্রলীগ নেতার প্রেমিকা হওয়ায় ভর্তি হওয়ার পরপরই অবৈধভাবেই ওঠেন হলে। এরপর বনে যান ছাত্রীহলের ছাত্রলীগের নেত্রীদের ডানহাত। তবে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরই গা ঢাকা দিয়ে ধীরে ধীরে অনুপ্রবেশ করেন ছাত্রদলে।
ছাত্রলীগ নেতার প্রেমিকা থেকে হলের ত্রাস
সাদিয়া সুলতানা নেলী ১২ ব্যাচের এক ছাত্রলীগ নেতা মেহেদী হাসান সিফাতের প্রকাশ্যে (ময়মনসিংহ এলাকা থেকে ছাত্রলীগের ক্যান্ডিডেট) প্রেমিকা ছিলেন। সেই সময়ে ছাত্রলীগের অনেক নেতা কর্মীর ভাষ্যমতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের এডমিশন থেকেই অবৈধভাবে ছাত্রীহলে উঠানো হয় সাদিয়াকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরবর্তীতে জবি শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম আকতার হোসাইনের প্যানেলে ছাত্রীহলে সক্রিয় রাজনীতি করতেন। আক্তারের প্যানেলের ছাত্রলীগ নেত্রী মিথি-রিশাদদের ডান হাত খ্যাতো এই সাদিয়া সুলতানা হলের সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা নিয়েছেন। সাদিয়া সুলতানাসহ হল ছাত্রলীগের নেত্রীদের সঙ্গে বিভিন্ন প্রোগ্রাম ও আড্ডার ছবি সাংবাদিকদের হাতে এসেছে।
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সুজন মোল্লা চোখে গুলিবিদ্ধ হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়টির অধ্যাপক, কর্মকর্তা ও ছাত্রলীগের ৯৪ জনসহ ১৯৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ মামলার অন্যতম আসামি জবি নৃবিজ্ঞান বিভাগের ১২ ব্যাচের ছাত্র ও ছাত্রলীগের ক্যান্ডিডেট মেহেদী হাসান সিফাত।
আওয়ামীলীগ যেভাবে ছাত্রদলে সাদিয়া সুলতানা নেলী
আওয়ামীলীগ সরকার পতনের পর সম্পূরক শিক্ষা বৃত্তি, আবাসন ও দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের দাবির আন্দোলনে সাদিয়া সুলতানাসহ শিক্ষার্থীদের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়ে যায়। দল মত নির্বিশেষে সকল শিক্ষার্থীদের দাবির এ আন্দোলনের সেই ভিডিওকে পুঁজি করে ছাত্রদলে সক্রিয় রাজনীতিতে ঢুকে পড়েন সাদিয়া সুলতানা। ছাত্রদলেও ছাত্রীহলে কর্মী সংকট থাকায় তাকে সুযোগ দেয়া হয়। এরপরই ছাত্রলীগের দ্বিতীয় সারীর নেত্রী থেকে ছাত্রদলের প্রথম সারীর নেত্রী বনে যান সাদিয়া। তবে সম্প্রতি জকসু নির্বাচনে সাদিয়া দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলে ও ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার খবরে তীব্র সমালোচনাও করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও। কেউ কেউ বলেন, এটা ছাত্রলীগের একটি কৌশল।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পরিসংখ্যান বিভাগ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন আলম ফেসবুকে সাদিয়ার ছবি পোস্ট করে লেখেন,‘আমাদের ছাত্রলীগের ছোট বোন ছিল সাদিয়া। সেই সাথে বড় ভাইয়ের গার্লফ্রেন্ড ছিলো। গার্লফ্রেন্ডের কোটায় হলেও উঠছিল। এখন তাকে ছাত্রদলের মিছিলের সামনের সারিতে দেখা যায় । সে এখন জকসুর হট ক্যান্ডিডেট।’ এই পোস্টে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ছাত্রলীগের ছোট বোনের জন্য শুভ কামনা জানিয়ে কমেন্ট করতেও দেখা যায়। ইভা সরকার নামে জবি ছাত্রলীগের নেত্রী সাদিয়া সুলতানা নেলিকে নিয়ে শাহীন আলমের পোস্ট শেয়ার দিয়ে লেখেন, ‘ছাত্রলীগের রুপালী অর্জন ছোটবোনের (সাদিয়া) জন্য শুভ কামনা রইলো।’
এদিকে ছাত্রলীগের একজন নেত্রী জানান, ‘সাদিয়া সুলতানা নেলী যখন এ্যাডমিশন নেয় তখন থেকেই ছাত্রীহলে থাকতো। মেসে উঠে নাই কখনো। আগে ছাত্রলীগের ব্যানারে তৃতীয় সারিতে দাঁড়াতে হতো। এখন ১ম সারি পাইছে। অবাকই হলাম। সাদিয়া সুলতানা এখনো ছাত্রলীগের ওই নেতার প্রেমিকা বলেও নিশ্চিত করেন তিনি।’
বর্তমানেও হলের একচ্ছত্র দাপট সাদিয়ার
এদিকে ছাত্রদলে ঢুকে ফের ছাত্রীহলে দাপট দেখাচ্ছেন সাদিয়া সুলতানা নেলী। জবি ছাত্রদলের সদস্য সচিব সামসুল আরেফিনের বর্তমানে একনিষ্ঠ কর্মী সাদিয়া। তবে এর পেছনে হলে গড়ে তুলেছেন ছাত্রলীগের নেত্রীদের এক নিজস্ব বলয়। আড্ডার ছলে নিয়মিত তাদের সাথে নির্বাচন কেন্দ্রীক বৈঠক ও ভোটের রাজনীতির ম্যাকানিজম করছেন তিনি। তাদের ভিতর একজন সাদিয়ার ডানহাত খ্যাত ছাত্রলীগের আরেক নেত্রী ইসরাত জাহান লামিয়া। ভোলা জেলার মেয়ে লামিয়া জবি ছাত্রলীগের সভাপতি ইব্রাহীম ফরাজীর একনিষ্ঠ কর্মী। লামিয়াও ছাত্রলীগের হয়ে প্রথমবর্ষে ছাত্রী হলে উঠেন। ইব্রাহীম ফরাজীর সাথে বিভিন্ন প্রোগ্রাম ও ফেসবুক পোস্টও রয়েছে। ইব্রাহীম প্যানেলের নেত্রী স্বর্ণা-নিপুনদের প্যানেলে থেকে ছাত্রীহলে রাজত্ব কায়েম করেছেন। সরকার পতনের পরও সাদিয়া সুলতানা-ইসরাত লামিয়াসহ তাদের প্যানেলে ছাত্রলীগের তোলা মেয়েদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। রাতে আড্ডার নামে মিটিং করতেও দেখা যায়। তাদের প্যানেলে ছাত্রলীগে এসব মেয়েদের তালিকা করছে খোদ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাও। নির্বাচন কেন্দ্র করে হলের প্রত্যেক ফ্লোরে ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের কর্মীদের সেট করেছেন নেলী। গত বুধবার জকসুর নির্বাচন উপলক্ষ্যে ছাত্রীহলে মেয়েদের বিভিন্ন উপহার সামগ্রী দিতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সাথে সামনের কাতারেও ছিলেন নেলী।
ছাত্রলীগ নেত্রী থেকে ছাত্রদলের নেত্রী বনে যাওয়ার বিষয়ে সাদিয়া সুলতানা নেলী বলেন, ‘কোন প্যানেলে নির্বাচন করব এখনও তা সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে ছাত্রী হলে হল সংসদ নির্বাচনে দাঁড়াবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে পরবর্তীতে ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে কিভাবে যুক্ত হলেন এ প্রশ্নের।
এবিষয়ে শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব শামসুল আরেফিন বলেন, আমাদের ছাত্রদলের সাথে তার কোন সংশ্লিষ্টতা সম্পৃক্ততা নেই। কিন্তু সে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে এবং তার আন্দোলনে যথেষ্ট অবদান রয়েছে। সে জায়গা থেকে প্যানেলের ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। আর ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঘটনাটি আমি জানিনা। আমরা একটি সার্বিক প্যানেলের বিবেচনা করছি। তাই আমরা তার সাথে আলোচনা করেছি এবং আমরা সত্যতা নিশ্চিত করেছি যে সে ছাত্রলীগ থেকে বের হয়ে এসে স্ট্যাটাস দিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করছে। সেক্ষেত্রে তার কন্ট্রিবিউশনকে সম্মান জানিয়ে আমরা তার সাথে আলোচনা করেছি।
নিউজের জন্য: news.sangbadlive24@gmail.com