"আর দুশোটা টাকা বেশি দেবেন সাহেব? "আঁখির কথায় বেশ রেগে গেলো গিন্নি।-"হ্যাঁ রে আঁখি আগের মাসেই তো তোর মাইনে দুশো টাকা বাড়িয়ে দিলাম আবার এ মাসেও দুশো টাকা বেশি আবদার! তোর তো দেখছি কিছুতেই দাবি মেটে না আর।" গিন্নির কথা শুনে লজ্জায় শাড়ীর আঁচলে মুখ লুকিয়ে অপরাধীর মত আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার সময় লক্ষ্য করলাম তার চোখ পানিতে ছল ছল করছে এবং আরও বুঝতে পারলাম কোনো প্রকার জরুরী প্রয়োজনেই বাড়তি টাকাটা আমার কাছে চেয়েছে। আসলে টাকাটা তার খুব দরকার হয়তো অন্যথায় সে তো আর কোনো দিন এমন আবদার করেনি।
অগত্যা গিন্নিকে বললাম-"আহা গিন্নি এতো রাগ করলে চলে?" বহুদিন যাবৎ সে আমাদের বাড়ীর সকল কাজ নিজের মনে করে, রান্না-বান্না করে ভালো-মন্দ খাবার সময়মতো ঠিক ঠিক পরিবেশন করে এমনকি আমাদের সন্তানদের নিজের সন্তানের মতো করে দেখাশুনা করে কিন্তু আমরা বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকি বিধায় তার তেমন কোন খোঁজ-খবর নিতে পারি না। এতোদিনে সে তো আমাদের পরিবারের একজন সদস্য হয়ে গেছে। তার আবদার আমাদের কাছে করবে না তো কার কাছে করবে? এই বলে আঁখিকে আরো দুশো টাকা দিয়ে দিলাম। টাকা হাতে পাওয়ার পর নিমেষেই লজ্জা নামক ঘন কালো মেঘ কেটে গিয়ে ওর মুখে দেখলাম তখন কি খুশির হাসি যা লক্ষ টাকায় ক্রয় করা হয়ত সম্ভব নয়। টাকাটা শাড়ীর আঁচলে বেঁধে নিয়ে ও ব্যস্ত হয়ে পড়লো ঘরের কাজে। তার কাজে তাড়াহুড়া এবং ব্যস্ততা দেখে তখন মনে হচ্ছিল ঘরের কাজের চেয়েও আজ তার আরও গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ আছে বা অনেক দিন প্রতীক্ষার পর আজ কোনো প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করে পুরুস্কার আনতে যাবে।
আমাদের বাসার কাজে যোগদানের প্রথম থেকেই দেখতাম আঁখি মেয়েটা বেশ চুপচাপ স্বভাবের, বিনা প্রয়োজনে তেমন কথা বলে না। যথা সময়ে আসে, একমনে নিজের কাজ করে বিদায় নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়ে অন্য বাড়ির কাজে। সব সময় সে কাজ করে চলে, দেখে মনে হয় যেনো ওর কোনো ক্লান্তি নেই। যেমনটি আধুনিক বিশ্বে রোবট করে থাকে। আঁখি আমাদের এ বাড়িতে কাজে এসেছে বছর দুই হলো। তার পূর্বে একজন মহিলা কাজ করতো সে বার্ধক্যজনিত কারণে কাজ ছাড়ার সময় আঁখিকে আমাদের বাসায় নিয়ে আসে। তাকে দেখে তখন মনে হয়নি সে ঠিকমত কাজ করতে পারবে। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল সে খুবই চালাক এবং বুদ্ধিমান নারী, তাকে কাজের লোক বলে মনেই হচ্ছিলনা তাই তাকে রাখতে গিন্নি কিছুটা আপত্তি করলেও আগের মহিলা গিন্নিকে বলে মা কিছুদিন রেখে দেন যদি ভালো না হয় তয় ছেড়ে দিবেন! দীর্ঘদিন কাজ করা মহিলার কথায় আমিও সম্মতি দিলাম ফলে পরীক্ষামূলকভাবে তাকে (আঁখি) রাখা হলো। আঁখি তাড়াতাড়ি করে কাজ করলেও আঁখির কাজ বেশ পরিস্কার আর গুছানো তাই গিন্নিও আর আপত্তি করেনি। সেই থেকেই আঁখি আমাদের বাসার কাজ করতে শুরু করে।
কিছুদিন পর বাহির থেকে এসে বসার ঘরে ঢুকতেই অবাক হলাম দেখে যে, আমাদের বাড়ির কাজের মেয়ে আঁখি আমার বাড়িতে রাখা ইংরেজি খবরের কাগজটা মন দিয়ে পড়ছে। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম-"কিরে আঁখি তুই ইংরেজি কাগজ পড়তে পারিস?" প্রতি উত্তরে আঁখি শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। তার সম্মতিসূচক বক্তব্যের পর আবার বললাম-"কতো দূর লেখাপড়া শিখেছিস তুই?" আঁখি বললো “মাধ্যমিক পাশ করে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছিলাম সাহেব। কিন্তু বস্তিতে বাস করা গরীব পরিবারের মেয়ে তো আমি তাই বস্তিতে বাস করা অন্য পরিবারের নেশাখোর ছেলের কুদৃষ্টি থেকে রক্ষা করার জন্য বাপ-মা তাড়াতাড়ি ছোট বয়সে বিয়ে দিয়ে দিল আমাকে ফলে আর লেখাপড়ায় এগোতে পারিনি বা পড়ালেখা হয়নি।
তার সাথে আলাপ হওয়ার পূর্বে আমি জানতাম না যে এই ফুটফুটে মেয়েটি বিবাহিত এবং তার স্বামী সন্তান আছে। আমি কেন তাকে স্বশরীরে কেউ দেখলে মনে করতে পারবে না যে সে বিবাহিত অথচ তার ১৫/১৬ বছরের সন্তানও আছে। তার কথা শুনে আমি সেদিন অবাক হলাম মেয়েটার দুর্দশার কথা এবং সমাজের অবস্থার কথা ভেবে। সে উপযুক্ত লেখাপড়া শেখার সুযোগ পেলে হয়তো প্রতিষ্ঠিত হতে পারতো অন্যদের মতো করে। আজ হঠাৎ রান্না ঘর থেকে শুনলাম গিন্নি আর আঁখির কথোপকথন। আঁখি বলছে--"দুটো দিন ছুটি দেবেন মেমসাহেব?" উত্তরে গিন্নি বললো-"না না এখন ছুটি দেওয়া যাবে না আমার শরীর ভালো নেই। আসতেই হবে তোকে।"
আঁখি সেদিন মুখ ফুটে বলতে পারলো না যে তার ছেলের পরীক্ষা শুরু হবে কদিন পর তাই ছুটিটা চাইছিল সে। গিন্নি রান্না ঘর থেকে বেরোতেই বললাম-"তোমার শরীর তো মোটামোটি ঠিকই আছে তাহলে আঁখিকে ছুটিটা দিলে না কেনো?" তোমার যেমন জরুরী কাজ থাকে তেমন আঁখিরও জরুরী কাজ থাকতে পারে! গরীব বলে কি তারা আমাদের মতো মানুষ নয়? তারা কি রোবট নাকি যন্ত্র? এই কথা বলার সাথে সাথে গিন্নি ঝাঁঝিয়ে উঠে বললো কাজের বেটির প্রতি তোমার মায়াটা একটু বেশি মনে হচ্ছে! কিছুক্ষণ পরে-"তুমি তো চলে যাবে তোমার স্কুলে আর সব কাজ তো আমাকেই করতে হবে। আমাকে যদি বাসার সব কাজ করতে হয় তবে মায়না দিয়ে তাকে রাখা কেন? তাই কোনো ছুটি দেওয়া যাবে না।"
আস্তে আস্তে বললাম রাগ করছো কেন?-" হঠাৎ করে ছুটি চাওয়ার কারণটাতো জানতে চাইতে পারতে।" এই কথা বলার পরও গিন্নি আমার কথায় কোনো গুরুত্ব না দিয়েই অন্য কক্ষে চলে গেলো। আঁখির এ কদিন রাতে ঘুম নেই। রাত থাকতে উঠে রান্না চাপায় ছেলের জন্য কারণ ভোর হলেই তো আমাদের বাসায় আসতে হবে কাজ করতে এবং আমাদের বাসার কাজ শেষে অন্য বাসায়ও কাজ করতে হবে। পরীক্ষার দিনগুলিতে নাহলে যে ছেলেটাকে খালি পেটে যেতে হবে। সকালে ছেলে বসে থাকে মুখ গুঁজে বইয়ে, আঁখি নিজ হাতে ছেলেকে খাইয়ে দেয় যাতে করে পড়ার কোনো ক্ষতি না হয়। তারপর ছেলেকে ভালো করে পরীক্ষা দেওয়ার কথা বুঝিয়ে দিয়ে ছুটে বাস রাস্তায়। কাজের বাড়িতে (আমাদের বাড়িতে) যেতে দেরি হলে আবার ঝামেলা। ছেলের পরীক্ষার কদিন একটু তাড়াতাড়ি ফেরার চেষ্টা করে আঁখি। পরীক্ষা দিয়ে ফিরলে ছেলেটার মুখে তরকারি ভাত তুলে দেওয়ার আশায় আর মনে মনে আল্লাহ্র নিকট দোয়া করে এবং সাহায্য চায় যাতে করে সে যা করতে পারেনি তার ছেলে যেন তা করতে পারে। কখনো কেউ কেউ তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরার অনুমতি দিলেও আমার গিন্নি দিতে চায় না। এইভাবে দেখতে দেখতে এক সময় আঁখির ছেলের পরীক্ষা শেষ হল।
অনেক স্বপ্ন থাকা সত্বেও গরীব পরিবারের মেয়ে হিসেবে অর্থাভাবে এবং পারিপার্শ্বিক প্রতিবন্ধকতা থাকার কারণে লেখাপড়া করতে না পারলেও আঁখির অনেক স্বপ্ন তার ছেলেটাকে নিয়ে। সে না পারলেও তার ছেলে অনেক লেখাপড়া করে প্রতিষ্ঠিত হবে সে। বাপ মা তো একান্ত অনিচ্ছা সত্বেও বিয়ে দিলো তার লেখাপড়া বন্ধ করে। বিয়ের দু'বছর পর ছেলেটার জন্ম হলো। বর জসিম দূরের শহরে কাজ করতে গিয়ে তো আর ফিরলো না। সবাই বলে লোক মুখে শোনা যায় সে আবার নাকি বিয়ে করে নতুন সংসার পেতেছে। এই খবর শোনার পর রাগে দুঃখে আঁখি আর তার খবরও নিতে চেষ্টা করেনি, করে না। আঁখি পড়ে রয়েছে স্বামীর আমানত হিসেবে রেখে যাওয়া তার একমাত্র ছেলেটাকে আঁকড়ে ধরে। নিজে শত কষ্ট করলেও ছেলের সব প্রয়োজন মেটায় আঁখি। যদিও উঁচু ক্লাসে ওঠার পর থেকে ছেলের টিউশনি বা প্রাইভেট পড়ার টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয়েছে বা হচ্ছে আঁখির। কিন্তু তাও আঁখি থামেনি নিজে খেটে ছেলের লেখাপড়ার টাকা জোগান দিয়ে চলেছে আঁখি।
আজ সকালে খবরের কাগজটা পেতেই শিক্ষক হিসেবে আমি তো আনন্দে আত্মহারা। আমার স্কুলের ছাত্র আরমান এবার উচ্চমাধ্যমিকের কৃতী প্রথম দশজন ছাত্র/ছাত্রীদের মধ্যে একজন। বার বার বলছি সত্যি ছেলেটা জিনিয়াস। ওই ছেলে দশজনের মধ্যে ২য় হয়ে আমাদের স্কুলের নাম উজ্জ্বল করলো। আমি খুব খুশি আরমানের এই অবিযাত্রায় একজন শিক্ষক হিসাবে। অবসর নেয়ার ঠিক এক বছর আগে এটা আমার শিক্ষকতার জীবনে অনেক বড় প্রাপ্তি। তার পিতা-মাতাকেও আমার তরফ থেকে অভিনন্দন। আরমানের মতো এমন মেধাবী সন্তান জন্ম দিয়ে আমার বিদায় বেলায় এতো বড় আনন্দ প্রাপ্তিতে সহায়তা করার জন্য। এর আগে আমাদের স্কুলের কোনো ছাত্রছাত্রীই এতো ভালো রেজাল্ট করতে পারেনি। আমার এই আনন্দ বিদ্যালয়ের সবার সাথে ভাগাভাগি করার জন্য তাড়াতাড়ি করে রেডি হলাম দামী শার্ট, প্যান্ট, বুড পরে। আজ নিশ্চয়ই সাংবাদিকরাও স্কুলে আসতে পারেন, যতোই হোক আমি একজন কৃতী ছাত্রের শিক্ষক বলে কথা। গিন্নি সমানে বলে চলেছে-"কি আক্কেল আঁখিটার! না বলে কয়ে হুট করে কাজে কামাই! আর ওকে কাজে রাখলে চলবে না তা বলে দিলাম।" তোমার আসকারা পেয়ে টাকা বেশী চাওয়া আর কাজে কামাই দেয়ার সাহস পেয়েছে।
শিক্ষকতার জীবনের শেষ বেলায় এসে আমার এখন এসব শোনার মোটেই ইচ্ছা নেই। গিন্নির কথায় কর্ণপাত না করে বেরিয়ে পড়লাম স্কুলের উদ্দেশ্যে। আজ আনন্দের কারণে আমার দৃষ্টিভ্রম ঘটায় দীর্ঘদিনের কর্মক্ষেত্র স্কুলটিকে চিনতে খুব কষ্ট হচ্ছে, স্কুলের যে দিকে তাকাই শুধু আগন্তকদের মাঝে শুধু আনন্দ হাসি। স্কুলে পৌঁছেই সর্বপ্রথম আরমানকে জড়িয়ে ধরে অনেক দোয়া করলাম। ইতোমধ্যে রেজাল্ট দেওয়া হচ্ছে, সব শিক্ষক এবং ছাত্র/ছাত্রীদের অভিভাবকগণ সেখানে উপস্থিত। একজন শিক্ষক প্রশ্ন করলেন-"আরমান তুমি তো এতো ভালো রেজাল্ট করেছ, এই স্কুলের তোমার জুনিয়র ভাই বোনদেরকেও একটু বলো তার পিছনে কার অবদান বেশী এবং তোমার কঠোর অধ্যাবসায়ের কথা।" তোমার এই সাফল্য আমাদের এই স্কুল তথা আমাদের (শিক্ষকদের) এবং সর্বপরি তোমাকে জন্মদানকারী পিতা-মাতাকে গর্বিত করেছে।
আরমান বলতে শুরু করলো- পরিবারে শত অভাব থাকা সত্বেও মা আমাকে বুঝতে দেয়নি। বলে রাখা ভালো আমি যখন আপন পর চিনতে শুরু করি তখন থেকেই আমার পিতাকে দেখতি পাইনি কিন্তু মা কষ্ট পাবে বলে তাঁকে পিতার কথা জিজ্ঞাসাও করিনি কোনো দিন। আমি সকল সময় মনে করতাম আঁখি নামের ভদ্র মহিলাই আমার মা-বাবা! লেখাপড়া করতে গিয়ে অনেক বইতে পড়েছি সন্তানদের সকল চাহিদা বাবা-মা ভাগাভাগি করে মিটায়ে থাকে কিন্তু আমার ক্ষেত্রে সকল চাহিদাই যথাসাধ্য মিটিয়েছে শুধুমাত্র আমার মা তাই তিনি আমার মা-বাবা দু’টোই। "আমি তো শুধু সকল চিন্তা বাদ দিয়ে লেখাপড়া করে গেছি মন দিয়ে, আমার শুধু একটাই লক্ষ্য ছিল মায়ের কঠোর পরিশ্রমের দাম চুকাতে হবে আমাকে। মা-কে সমাজে দাঁড় করাতে হবে গর্বিত সন্তানের মা হিসেবে, এক স্বপ্নস্রষ্টা এবং সাহসী রত্নগর্ভা নারী হিসেবে। আজ আমি সফলতা পেয়েছি তাই আপনারা আমার সাফল্য দেখছেন কিন্তু এর পিছনে আছে একটা মানুষের কঠোর পরিশ্রম। যার জন্য আজ আমি সফল আজ আমি তাকে দেখাবো আপনাদেরকে।"
আমাদের স্কুলের সেরা ছেলেটা হঠাৎ ছুটে গেল স্কুলের গেটের কাছে। দেখলাম হাত ধরে টেনে আনছে একজন মহিলাকে। আমার ছাত্র আরমানের সাফল্যের আনন্দে আমার দৃষ্টিভ্রম হওয়ায় সেই মহীয়সী নারীকে দূর থেকে চিনতে খুবই কষ্ট হচ্ছে! কিন্তু এই মুখটা তো আমার খুব চেনা, আরও একটু কাছে আসতে আমার দৃষ্টি পরিস্কার হয়ে গেলো! আরমান কাকে ধরে নিয়ে এলো এ যে আমার বাড়ির কাজের মেয়ে আঁখি! তার সাথে আমার স্কুলের সেরা ছেলেটারই বা কি সম্পর্ক? আজ আমি আর মুখ তুলে তাকাতে পারছি না আঁখি’র দিকে। ওর মুখে বিশ্ব জয়ের আর সাফল্যের হাসি আমি এ স্কুলের কৃতী ছাত্র আরমানের গর্বিত শিক্ষক আর ও যে সেই ছাত্রেরই মা। আমি সবার অজান্তে নীরবে সরে গেলাম ওখান থেকে। আঁখি’র আজ কাজে না যাওয়া আমার স্ত্রী'র অশান্তির কারণ, সে তো জানেই না আজ আঁখি’র ছেলে আরমানের রেজাল্ট। জানবেই বা কিভাবে আঁখিতো আরমান নামের এই মেধাবী ছেলেটাকে আমাদের বাসায় কোনো দিন নিয়ে আসা দূরে থাক তার নামটি পর্যন্ত কোনো দিন উচ্চারণ করেনি আমাদের বাসায়। আমরাও কোনো দিন তার পরিবারের কথা জানতে চাইনি। আমরা শুধু চেয়েছি তার শ্রম আর সে বিনাবাক্য ব্যয়ে শ্রম দিয়ে পারিশ্রমিক নিয়েছে মাত্র।
আমার স্কুলের যে ছাত্রের জন্য আমি এতো খুশি এবং তার শিক্ষক হিসেবে গর্ববোধ করছি! পরীক্ষার দিনগুলোতে তার মা আমাদের বাসা থেকে প্রয়োজনীয় ছুটি পর্যন্ত পায়নি ছেলেটাকে ঠিক করে খাবার দেওয়া বা যত্ন নেয়ার জন্য। একদিন ওই ছেলেটার একটা নতুন বই কেনার জন্য দুশো টাকা বেশি চাইতে গিয়ে কথা শুনিয়েছে আমার স্ত্রী। আসলে আমরা হয়তো ভাবতেই পারিনা যে একটা কাজের মেয়ের সন্তান এতো মেধাবী হতে পারে। অনেকাংশে বাস্তবেও কিন্তু এমন হয় অহরহ। আমরা শুধু নিজেদের সার্থ্য এবং সমস্যা গুলো দেখি কিন্তু যারা আমাদের ভালো রাখার জন্য দিনরাত অনবরত অকাতরে শ্রম দেয় ওদেরও প্রয়োজন আছে ছুটির কিম্বা টাকার, অনেক সময় আমরা অকৃতজ্ঞের মতো সেসব ভুলে যাই।
নানান আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতেই প্রতিদিনকার মতো স্ত্রী শুরু করলো-"আঁখি কাল এলে টাকাটা মিটিয়ে দিও আর ওকে আসতে হবে না।" স্ত্রীর কথায় আজ আমার জীবনের বিশেষ দিনের আনন্দটা মূহুর্তের মধ্যেই বিলীন হয়ে গেল! স্ত্রীকে কিভাবে বুঝাই নিজের সন্তানের জীবনের এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ দিনে মা কাজে আসেনি বলে তার কাজটা চলে যাচ্ছে। আজ আঁখি’র কাজ কামাই করার পুরো ঘটনাটা না জানলে হয়তো স্ত্রীর কথায় সায় দিয়ে আমি এই ভুলটাই করতাম। কিন্তু ঘটনাটি পুরাপুরি জানার কারণে আজ আর ভুল করিনি! আমি স্ত্রীকে পাশে বসিয়ে বললাম-"তোমার ছেলে যদি স্কুলের তিন/চারশত ছাত্র/ছাত্রীর মধ্যে পরীক্ষায় সেরা দশজনের একজন হতো তুমি কি ছেলের পাশে থাকতে না?" আমার প্রশ্ন শুনে গিন্নি অবাক হয়ে বললো-"তার মানে?" ঘটনার সবটা বলতেই গিন্নির চোখেমুখে ফুটে উঠলো অনুশোচনার ছাপ। আত্ন সমালোচনায় তার মুখ নিমেষেই ম্লান হয়ে গেল! আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মনে হচ্ছিলো ঘটনাটি হয়তো বিশ্বাস করতে তার কষ্ট হচ্ছে কিন্তু না আসলে আমারই ভুল। সে হয়তো চিন্তা করছে ধন-সম্পদ বা টাকা-পয়সা শুধুমাত্র ধনী পরিবারের থাকলেও মেধাবী সন্তান ধনী/গরীব সকল পরিবারেরই থাকতে পারে।
পরের দিন কাক ডাকা ভোরেই আমার মন থেকে ভুল বুঝাবুঝি দূর হলো যখন দেখলাম আমার গিন্নির অপরাধবোধ বা অনুসূচনায় সারা রাত হয়তো তার ঘুম হয়নি। পরের দিন সকালে গিন্নি আমাকে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে তুলে বাজারে পাঠালো। তার নিজ হাতে লেখা বাজারের ফর্দ দেখে মনে হচ্ছিল আমাদের বাসায় মেয়েকে দেখতে বর পক্ষের লোকজনের আগমন ঘটতে যাচ্ছে কিন্তু বিবাহযোগ্যা আমাদের তো মেয়ে নেই তবে এতো বাজার কেন? সারা রাত ঘুম না হওয়ার কারণে চেহারার যে অবস্থা হয়েছে তাতে গিন্নিকে প্রশ্ন করার সাহস হয়নি! অগত্যা কোনো প্রশ্ন না করে বাজারে গিয়ে গিন্নির দেয়া ফর্দ অনুযায়ী বাজার করে বাসার দিকে রওনা হলাম। বাজার আনতেই প্রতিদিনকার মতো আঁখির জন্য অপেক্ষা না করে প্রয়োজনীয় কাঁটাকাঁটি করে গিন্নি নিজেই রান্না চাপিয়েছে দেখলাম। কিছুক্ষণ পর আঁখি এসে হাজির হলো, তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে খুব ভয়ে আছে। আঁখি বোধ হয় আঁচ করে এসেছিল বকা শুনবে চুপ করে এসে ঘরের কাজে হাত দিতেই, গিন্নি বললো-"তোকে আজ কাজ করতে হবে না ঐ রুমে গিয়ে সোফায় বস আমি আসছি।"
আঁখির চোখেমুখে দুশ্চিন্তা। সে ভাবতে থাকে গতকাল আসেনি এবং আজও দেরি করে এসেছে হয়তো তার কাজটা চলে যাবে। আঁখির মতো এই বিষয়টি আমার মাথাও ঘুরপাক খাচ্ছিল কিন্তু না আমি দেখলাম আমার রাগী গিন্নি হাতে এক গাদা টিফিন বক্স এনে ধরিয়ে দিলো আঁখির হাতে। আঁখি কিছু বুঝতে না পেরে আমার রাগী গিন্নির মুখের পানে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কি হলো ধর এইভাবে হ্যাঁ করে তাকিয়ে আছিস কেন? আঁখি বললো “মেম সাহেব” মানে! গিন্নি বললো তোকে আর মানে মানে করতে হবে না এতো দিন বলিসনি কেনো আজ সবকিছু বল? আবার হা করে তাকিয়ে আছে! না তোকে আর বলতে হবে না ইতোমধ্যে আমি সবকিছুই জেনে গেছি এগুলো ছেলেটাকে খাওয়াস। আর বলিস তার সাফল্যে আনন্দিত হয়ে আমি আদর এবং ভালোবেসে পাঠিয়েছি। আর একদিন তাকে আনিস আমাদের বাড়ি। নিজেদের ছেলে-মেয়ে বড় হয়ে ভুলতে বসেছে আমাদের কথা, কত কষ্ট করে তাদেরকে শিক্ষিত করেছি হয়তো মানুষ করতে পারিনি ভেবে চলি তাই সব সময় মেজাজ ঠিক থাকে না রে ফলে অনেক সময় অনিচ্ছা সত্বেও তোর সাথে খারাপ আচরণ করে ফেলি। যা বোন দু‘দিন ছুটি তোর সব কাজ আমি সামলে নেবো।" আর একটি কথা তোর ছেলে যেন গোবরে পদ্মফুল হিসেবে ফুটেছে! সঠিকভাবে তার যত্ন নিতে ভুলবি না। কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে বিনা সংকোচে তোর বড় বোন হিসেবে আমাকে বলবি, আজ থেকে আমি মেমসাব নই তোর বড় বোন।
আমি বললাম আঁখি-"এই নে এটা আমার প্রিয় ছাত্র আরমান এর জন্য উপহার তার মাষ্টারমশাইয়ের তরফ থেকে।" বলে দুটো নতুন জামার প্যাকেট ধরিয়ে দিলাম আঁখির হাতে। হঠাৎ এই কথা শুনে আঁখি অবাক হয়ে তাকালো আমার দিকে। আমি বললাম-"হ্যাঁ রে আঁখি তুই হয়তো আগে থেকে জানতি না আমিই তোর ছেলের স্কুলের সেই শিক্ষক, যে কিনা তোর ছেলের সাফল্য দেখেছে অথচ তার পিছনে থাকা তোর পরিশ্রমের খোঁজ রাখেনি।" তুই অক্লান্ত পরিশ্রম করে প্রাপ্ত পারিশ্রমিকের অর্থ ব্যয় করে অসাধ্যকে সাধন করেছিস! তোর সাধনার ফসল “গোবরে পদ্মফুল” ফুটিয়েছিস! আজ তোর পরিশ্রম সার্থক হয়েছে।আজ আবার বহুদিন পর পুনরায় আঁখির মুখে আর একবার সেই হাসিটাই দেখলাম যেটা আগেরবার দুশো টাকা বেশি দিয়ে দেখেছিলাম।
সংবাদ লাইভ/সাহিত্য
নিউজের জন্য: news.sangbadlive24@gmail.com