ads
ঢাকাবৃহস্পতিবার , ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪
  1. কৃষি ও পরিবেশ
  2. খেলা
  3. জাতীয়
  4. ধর্ম
  5. বিনোদন
  6. বিশ্ব
  7. ভ্রমণ
  8. মতামত
  9. রাজনীতি
  10. শিক্ষাঙ্গন
  11. সাক্ষাৎকার
  12. সারাদেশ
  13. সাহিত্য
আজকের সর্বশেষ খবর

কোটা সংস্কার আন্দোলন শেষ পর্যন্ত শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না

সংবাদ লাইভ
সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৪ ৮:২৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

­ডাঃ এম, এ, মোমেন: অনেক নাবিক সাগরে ভাসমান বরফের পাহাড়ের চূড়াকে দূর থেকে সামান্য একখণ্ড বরফ ভেবে ভুল করেন। সেটি যে পানিতে নিমজ্জিত অবস্থায় থাকা বরফের বিশাল পাহাড়ের একটি অতি ক্ষুদ্র অংশমাত্র (যেটিকে বলা হয় ‘টিপ অব আইসবার্গ), তা নাবিকেরা অনেক সময় বুঝতে পারেন না। আর সেটি সময়মতো বুঝতে না পারলে নিমজ্জিত থাকা বরফের পাহাড়ে জাহাজের সংঘর্ষ লাগে এবং জাহাজসহ নাবিকদের মহাবিপদে পড়তে হয়। কোন কোন সময় বা ক্ষেত্রে যাত্রী, মালামালসহ নাবিকদের জীবন বাঁচানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

অনেক দিনের অনেক কিছুর বৈষম্যতার স্বীকার হয়ে চলমান কোটা আন্দোলন এর পরিস্থিতিকে শাসকগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে নাবিকের টিপ অব আইসবার্গ চিনতে না পেরে বিপদে পড়ার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। যেমন সরকার বা নীতিনির্ধারণী মহল ছাত্রদের দাবীর মধ্যে লুকিয়ে থাকা অনেক অন্তর জ্বালা বা ক্ষোভ যেকোনো প্রতিবাদ বা বিক্ষোভের শুরু হতে পারে সামান্য এক ঘটনা থেকে। উদীয়মান মধ্যবিত্তের স্বার্থরক্ষার আপাত বিচারে মনে হওয়া নিতান্ত মামুলি দাবিও অনেক সময় আমজনতার দাবিতে পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ হলো ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে সংঘটিত একটি বিপ্লব ও সশস্ত্র সংগ্রাম। পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান ও স্বাধিকার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এবং বাঙালি গণহত্যার প্রেক্ষিতে এই জনযুদ্ধ সংঘটিত হয়।

আদর্শ গ্রহ আমাদের এই সাধের পৃথিবী। অপরূপ রূপে বৈচিত্র্য আর হাসি গানে ভরা এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব হচ্ছে মানুষ। মা মাটি আর মাতৃভূমি হচ্ছে মানুষের অত্যন্ত আরাধ্য। মানুষের যত অনুভূতি আছে তার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর আর অনুপম অনুভূতি হচ্ছে ভালোবাসা। সে ভালোবাসার সর্বোত্তম বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে দেশ মাতৃকার প্রতি ভালোবাসা। আমাদের যে স্বাধীনতা যুদ্ধ তা হচ্ছে মাতৃভূমির জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের ইতিহাস। এটি অকুতোভয় সাহসের ইতিহাস। এ ইতিহাস  মহান ত্যাগের ইতিহাস। বাঙালি, বাংলা ভাষা যতদিন থাকবে ততদিন অক্ষয় হয়ে থাকবে এ ইতিহাস। এ যুদ্ধের পেছনে রয়েছে অনেক ইতিহাস। এ যুদ্ধের রয়েছে একটা প্রেক্ষাপট, রয়েছে বঞ্চনার ইতিহাস, শোষণের ইতিহাস। দাবিয়ে রাখার জঘন্য ইতিহাস। আমাদের জাতীয় জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায় হচ্ছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ যার মধ্য দিয়ে আমরা পাই একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ, একটি নতুন মানচিত্র আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। এর জন্য ত্রিশ লাখ (মতান্তরে কম/বেশি) মানুষ জীবন দিয়েছিল, সম্ভ্রম হারিয়েছিল অগণিত মা বোন। রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল সবুজ  শ্যামল প্রান্তর। এ স্বাধীনতার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল এ দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধারা।

১৯৮২ সালে সরকারি ভাবে প্রকাশিত পুস্তক থেকে জানা যায় যে শেখ মুজিবুর রহমান একটা ঘোষণা পত্র লিখেন ২৫ মার্চ মাঝরাতে বা ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে যা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়। কিন্তু সীমিত সংখ্যক মানুষ সে ঘোষণা পত্র শুনেছিল। তাই ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র, চট্টগ্রাম থেকে ঘোষণা পাঠ করেন যা গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়। ফলে বিশ্ববাসী বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে জানতে পারে।

ততকালীন সামরিক বাহিনীর একজন মেজর এর মুখ থেকে এই ঘোষণা আসার ফলে সামরিক বাহিনীতে কর্মরত, পুলিশে কর্মরত এবং অন্যান্য বাহিনীতে কর্মরত সকল পূর্ব পাকিস্তানীসহ (বর্তমান বাংলাদেশ) আবাল-বৃদ্ধ বনিতা, কৃষক, কামার-কুমার, জেলে-মুজুর, শিক্ষিত, আধাশিক্ষিত বা অশিক্ষিত জনগণ মৃত্যুকে তুচ্ছ ভেবে কাঁধে তুলেছিল অস্ত্র দেশ মাতৃকার জন্য। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল তা শেষ হয়েছিল ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ এ যার পরিসমাপ্তির মাধ্যমে আমরা লাভ করি স্বাধীন বাংলাদেশ। আমাদের এই মুক্তিযুদ্ধে ছিল নানাবিধ ঘটনা, বিরূপ পরিস্থিতি, অসম অর্থনৈতিক বণ্টন, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে  বৈষম্য আচরণ, শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রেও নানানবিধ সমস্যা আর প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের বঞ্চনার স্বীকার হতে মুক্তি পাওয়ার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ মুক্তিযুদ্ধ। কোনো বিষয় সম্পর্কে জানতে গেলে ইতিহাস জানতে হয়।

কোটা আন্দোলনের ঘটনা প্রবাহে মনে পড়ছে তিউনিসিয়ার ঘটনা। রোজকার মতো সেদিনও রাজধানী তিউনিসে রুটির দোকানে একটি রুটি কিনতে এসেছিলেন দিন আনা দিন খাওয়া এক মানুষ। হঠাৎ বেড়ে যাওয়া দাম তাঁর পক্ষে দেওয়া সম্ভব ছিল না। দোকানির সঙ্গে এ নিয়ে শুরু হয় বচসা, তারপর চেঁচামেচি, হইচই। মেজাজ হারিয়ে দুই ঘা বসিয়ে দেন দোকানি।

রুটি কিনতে আসা অভুক্ত সেই গরিব ক্রেতা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে যান। সারাদিন না খাওয়া ঐ দরিদ্র লোকটি নিজের শক্তিতে আর উঠতে পারেননি। সারা দিনের ক্ষুধা আর শারীরিক দুর্বলতার কারণে জনসম্মূখে সেখানেই জান হারান তিনি। তাৎক্ষণিক ঘটে যাওয়া এ রকম পরিণতির জন্য কেউই হয়তো তখন প্রস্তুত ছিল না। ঐ পথে যাতায়াতকারী উপস্থিত পথচারী, মজা দেখতে দাঁড়িয়ে যাওয়ায় অনেক ভিড়। সেই দেশের সার্বিক পরিস্থিতির ঘটনা প্রবাহে সবাই নিজেদের মধ্যে সেই অতিরিক্ত দাম দিতে অক্ষম গরিব ক্রেতার প্রতিছবি খুঁজে পান বা আবিস্কার করেন। তাঁরা প্রায় সকলেই নিজেকে গরীব ক্রেতার আসনে বসিয়ে মনে করতে থাকেন, রাস্তায় লুটিয়ে পড়া ক্রেতার লাশটা যেন তাঁদেরই লাশ বা মুর্ত প্রতিমা।

অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মানবতার বিবেচনায় তাৎক্ষণিক গরীব ক্রেতার কাছে বাড়তি দাম চাওয়া রুটির দোকানটা জনতার কাছে হয়ে ওঠে স্বৈরাচার সরকারের প্রতিভূ বা স্বৈরাচার সরকার প্রধানের বাসস্থান গণভবন। যেমন করে উপস্থিত জনতার রোষানল থেকে দোকানদার পালিয়ে বাঁচলেও, জনতার দেওয়া আগুনে পুড়ে যায় রুটির দোকান। তেমন করে আন্দোলনে যোগদানকারী জনতার রোষানল থেকে সামরিক বাহিনীর সহায়তায় হেলিকাপ্টার যোগে স্বৈরাচারী প্রধান মন্ত্রী তার বোনকে নিয়ে পালিয়ে বাঁচলেও জনতার দেওয়া আঘাতের হাত থেকে বাঁচলেও জনতার দেয়া আঘাতে আঘাতে ধ্বংস প্রাপ্ত হয় অতি স্বযত্নে গড়ে তোলা স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রীর বাস ভবন (গণভবন)। সেই সময় যেমন রুটি কিনতে আসা লোকটির লাশ নিয়ে বের হওয়া মিছিলে নারী-পুরুষের ঢল নামে। তেমনি স্বৈরাচারী সরকারের মদদপুষ্ট ‍পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়া লাশ নিয়ে রাজপথে বের হওয়া মিছিলে ছাত্র-জনতাসহ সকল স্তরের নারী-পুরুষ লাখ জনতার ঢল নামে। জানাজা, গায়েবী জানাজায় শরিক হয় লাখ লাখ মানুষ। জানাজা হয়, দাফন হয়, কিন্তু ক্ষোভের আর দাফন হয় না, বরং তা বাড়তে থাকে। সহিংস থেকে সহিংসতর হতে থাকে সেই জনরোষ।

সেই দেশের ক্ষমতাসীনরা ভাবলেন, রুটির দাম নিয়েই যখন সূত্রপাত, তখন রুটির দাম কমিয়ে দাও। তদরূপ আমাদের দেশের স্বৈরাচার ক্ষমতাসীন ফ্যাসিস সরকার ভাবলেন চাকরী ক্ষেত্রে কোটা বৈষম্য নিয়ে যখন আন্দোলনের সূত্রপাত, কোটা প্রথা উঠিয়ে দাও। কিন্তু যেমন সেই দেশে দেখা গেল, রুটির দাম কমিয়ে মানুষের ক্ষোভের আগুন নেভানো গেল না। তেমনি কুট কৌশল অবলম্বন করে কোটা প্রথা উঠিয়ে দিয়েও ছাত্র-জনতার আন্দোলনের আগুন নেভানো গেল না কারণ এই সরকারকে বাংলার জনগণ বিশ্বাস করতে পারেনি তাৎক্ষনিক কোটা প্রথা বাতিলের সিদ্ধান্ত দিলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভার দিয়েছে কোটের উপর। তাছাড়া নানান গড়িমসি করে সিদ্ধান্ত দিতে দেরী হওয়ার কারণে বরং তা আরও জ্বলে উঠল। জনবিচ্ছিন্ন শাসকেরা তাদের কালো চশমায় শুধু রুটিটাই বা কোটা প্রথাটাই দেখেছিল কিন্তু মানুষের প্লাস বুঝতে পারে নি; আর সাধারণ মানুষ রুটির বা কোটার মধ্যে দেখেছিল ঝলসানো দেশ। তারা দেখেছিল, দুর্নীতি, সরকারী অর্থ আত্মসাধের প্রতিযোগিতা আর দেশের অর্থসম্পদ পাচারের সুবিধাভোগী ও মদদ দাতাদের হাতে দেশ নামের রুটিটি ঝলসে গেছে।

সেই দেশে যেমন অবাঞ্চিত ঘটনার সৃষ্টিকারী রুটিওয়ালার ফাঁসি বা সব রুটির দোকানির লাইসেন্স বাতিল ক্ষিপ্ত মিছিলের প্রাথমিক দাবি থাকলেও তা আর সেখানে আটকে থাকেনি। ক্রমান্বয়ে বিরতিহীন সেই আন্দোলনের স্রোতধারা দেশের সীমারেখা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আমাদের দেশেও অবাঞ্চিত ঘটনার সৃষ্টিকারী পুলিশ বা পুলিশে কর্মরত কিছু অফিসার-কে সাময়িক বরখাস্ত বা চাকুরি থেকে বরখাস্ত এবং কোটা প্রথা বাতিল ক্ষিপ্ত আন্দোলন বা মিছিলের প্রাথমিক দাবি থাকলেও তা আর সেখানে আটকে থাকেনি। পুলিশ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ কর্তৃক সংঘটিত নির্বিচারে ছাত্র-জনতার হত্যা, রক্তপাত ক্রমান্বয়ে বিরতিহীন সেই আন্দোলনের স্রোতধারা কোটা প্রথা বাতিলের সীমারেখা ছাড়িয়ে স্বৈরাচার সরকার পতনের এক দফার আন্দোলনের রুপ নেয়।

ছাত্রদের সর্বশেষ কোটা আন্দোলন যে শুধু চাকরির জন্য, সেটি মনে করার কোনো কারণ নেই। কোটা আন্দোলনের আড়ালে অনেক বঞ্চনার চাপা দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে আছে। অনেক কষ্টে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরও শাসক গোষ্ঠীর মদদপুষ্ট ছাত্র গ্রুপের অনৈতিক আচরণের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীরা থাকার জায়গা পান না, মানসম্মত খাবার পান না, লাইব্রেরিতে বই পান না, বসে পড়ার জন্য একটা টুল পান না। না খেয়ে সাতসকালে লাইন দিতে হয় লাইব্রেরিতে ঢোকার জন্য। সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনের কর্মীর দ্বারা পদে পদে বঞ্চনা আর বৈষম্যের শিকার হতে হয় সাধারণ ছাত্রদের। শাসক গোষ্ঠীর মদদপুষ্ট শিক্ষার্থীদের মর্জির উপর নির্ভর করতে হয় ন্যায্য অধিকার পাওয়া বা না পাওয়ার বিষয়টি, এমনকি অনেক সময় বরাদ্দ পাওয়া পর্যাপ্ত কক্ষ থাকা সত্ত্বেও সরকার দলীয় ছাত্রদের মর্জিমাফিক শিক্ষানবিস কাল হিসেবে গ্রাম থেকে আসা সাধারণ ছাত্র/ছাত্রীদের থাকতে হয় গণরুমে। সে কি অভাবনীয় কষ্ট সরেজমীনে না দেখা বা ভুক্তভোগি ছাড়া তা কেউ আচ করতে পারবে না। তারপরও নিজের স্বাধীন মনের চেতনায় যদি ঐ সকল ছাত্র/ছাত্রীদের কেউ (গ্রাম থেকে আসা) সামান্যতম অবাধ্য হয় তবে আর রক্ষা নাই। হলে হলে গড়ে তোলা টর্চার শেলে গিয়ে নানান মুখি অত্যাচারের স্বীকার হতে হয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের।

অতি কষ্টে প্রয়োজনীয় অর্থ যোগানদাতা গ্রাম থেকে আসা দরিদ্র পিতার ছেলে-মেয়ে এসব মেনে নিয়েও তাঁরা যে লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখা-পড়ার জন্য ভর্তি হয়েছে সেই লক্ষ্যে দিকে এগোতে চান। নানান প্রতিকুলতা, সহপাঠীদের অত্যাচার পিছনে ফেলে আশায় বুক বাঁধেন। কিন্তু যে সোনার হরিণ ধরা নিয়ে তাঁদের আশা, সেটি যখন কোটা প্রথা বাস্তবায়নের নামে বা অজুহাতে আরও দূরের বস্তুতে পরিণত করা হয়, তখন তাঁরা ক্ষোভ, অসন্তোষ, না পাওয়ার বেদনা নিয়ে আর বসে থাকতে পারেননি। বিগত ২০২২ সালের কোন একদিনে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব কাছেই এক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের চার শিক্ষার্থী আমাদের সহযাত্রী ছিলেন। একসঙ্গে চট্টগ্রামে যাচ্ছিলাম আমার বড় ছেলে সিহাব মোঃ আকাশ-কে নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ভর্তি পরীক্ষা দেয়াতে। আমাদের সফর সঙ্গী ঐ চারজন ছাত্রের  তাদের নিজ নিজ ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম যাচ্ছিল।

আপাতত দৃষ্টিতে তাদেরকে হাসিখুশি প্রাণচাঞ্চল দেখা গেলেও চেহারার একটু গভীরে দৃষ্টি দিতেই দেখা যায় স্বাধীন দেশের নাগরিক হওয়া সত্বেও প্রাপ্ত অধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে নানান বৈষম্যের প্রতিছবি, কি যেন না পাওয়ার বেদনায় তাদের কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে দীর্ঘদিন যাবৎ। আমাদের সফর সঙ্গী চার শিক্ষার্থীর সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর মনে হচ্ছিল এত নিপীড়ন–নির্যাতন সহ্য করে কীভাবে এই অল্প বয়সী মানুষগুলো টিকে থাকেন, হাসেন, কথা বলেন। শাসকগোষ্ঠীর মদদপুষ্ট ছাত্র সংগঠনের কর্মীর দ্বারা নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাঁরা উপেক্ষিত, বঞ্চিত, যেন তাঁরা আমাদের এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক।

‘আপনারা যাঁরা ভাবছেন আন্দোলনটা স্রেফ একটা চাকরির জন্য, তাঁরা বোকার স্বর্গে আছেন বা বাস করছেন। আপনারা কোটা বৈষম্য বিরুধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্র/জনতার মুখে উচ্চারিত সবকটি স্লোগান মনযোগ দিয়ে খেয়াল করেন। দেখবেন, এই আন্দোলন নাগরিকের সমমর্যাদা বা সমঅধিকার পাওয়ার জন্য। এই আন্দোলন মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য। এই আন্দোলন সমহারে মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তার জন্য। এই আন্দোলন নিজের দেশে তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে না বাঁচার জন্য। এই আন্দোলন দেশের প্রচলিত আইনে সকল নাগরিকের ন্যায় বিচার পাওয়ার। এই আন্দোলন রাষ্ট্রক্ষমতায় যাঁরা আছেন, তাঁদের মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য যে, দেশের মালিক তাঁরা নন, আসল মালিক জনগণ। মালিক হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্র ক্ষমতায় চাওয়ার জন্য যে ভোটের প্রয়োজন তা অপশক্তির মাধ্যমে দখলে নিয়ে ভোট বিহীন ক্ষমতায় যাওয়ার কারণে সেই জনগণকে রাষ্ট্র বা শাসকগোষ্ঠী যে পাত্তা দেয় না, এই আন্দোলন সেটার বিরুদ্ধেও একটা বার্তা। রাষ্ট্র জনগণকে কেন পাত্তা দেয় না, এই আন্দোলনকারীরা সেটাও বোঝে। যে কারণে ভোটের বিষয়টাও স্লোগান আকারে শুনেছি। আমি এটাকে মনযোগ সহকারে এইভাবেই শ্রবণ করেছি।’

আমাদের সেই সহযাত্রীরা জানিয়েছিলেন, স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পৌঁছানোর পরও ন্যায্য পথে হলে থাকার জায়গা পাননি। হল কর্তৃপক্ষ বরাদ্দ দেওয়ার পরও তাঁদের একজনকে হলে উঠতে দেওয়া হয়নি। সাফ সাফ তাকে জানিয়ে দেয়া হয় পার্টির বসকে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা এককালীন ‘পাওনা’ না দিলে তিনি জীবনেও উঠতে পারবেন না তাঁর নামে বরাদ্দ করা বিশ্ববিদ্যালয়ের কক্ষে। এ কথা হল বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অজানা নয়। তাহলে তাঁরা, বিশেষ করে মেয়ে শিক্ষার্থীরা থাকবে কোথায়? নিরুপায় হয়ে শিক্ষা চালিয়ে নিতে তাঁরা হলে সিট না পেয়ে  আশেপাশের সরকারি কোয়ার্টারে একটা ঘর ভাড়া করে কয়েকজন মিলে থাকেন। সেখানেও অনেক ‘প্যারা’। কারণ সব বাড়িওয়ালা ব্যাটার ‘নজর’ ভালো নয়। অনেক প্রতিকুলতার মাঝেও নিজেকে সেইফ করে এরপরও নানান কৌশল অবলম্বন করে তাঁদের থাকতে হয় ঢাকায়। ভাগ্যগুণে সাধ্যমত এককালীন টাকা দিয়ে হলে থাকার একটা হিল্লে হলেও তাদের ‘মাসিক’ (মাসভিত্তিক চাঁদা) দিতে হয় সরকার দলীয় হলের নেত্রীকে। তাছাড়া উৎসবভিত্তিক চাঁদাও আছে। অনেক সময় সরকার দলীয় কোন প্রোগ্রামের জন্য চাঁদা দেয়াসহ একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও এমন কি সামনে পরীক্ষা থাকার পরও হলের নেতা-নেত্রীকে খুশি রাখার জন্য স্বশরীরে অংশগ্রহণ করতে হয় নতুবা জীবনে নেমে আসে অকল্পনীয় অত্যাচার বা শাস্তি। আর যারা অপেক্ষাকৃত গরীব পরিবারের সন্তান অথচ দেখতে সুশ্রী তারা যদি চাহিদামত টাকা দিতে না পারেন তবে বিভিন্ন হলে থাকা ছাত্র নামের কলংক সরকার দলীয় পান্ডাদের কু-প্রস্তাব আসে যা অধিকাংশ সময়ে লঙ্গন করা ঐসব ছাত্রীদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পরে। যাদের পরিবার আর্থিক দিক থেকে গরীব অথচ ধর্মের প্রতি বা পরকালের পরিণতির প্রতি অঘাত বিশ্বাস তাদের পক্ষে সভ্য দেশে এই ধরণের অসভ্য প্রস্তাব মেনে নেয়া খুবই কঠিন হলেও কোন কোন ক্ষেত্রে মেনে নিতে হয় নতুবা লেখা-পড়ার পাঠ চুকিয়ে গ্রামের বাড়ীতে ফিরে যেতে হয়। গ্রামে ফিরে গিয়েও হতে হয় নানান প্রশ্নে সম্মুখীন কোনো কোনো মেয়ে-কে অপরাধ না করেও অপরাধী বা চরিত্রহীনের তকমা লাগিয়ে দেয় সমাজের অবিচারক ব্যক্তিরা।

প্রখ্যাত লেখক মহিউদ্দিন আহমদের ভাষায় ‘গণরুম নামক জেলখানা’ বা “টর্চার সেল” সেখানেও আছে। অতি সম্প্রতি কোটা সংস্কার আন্দোলনে নিহত আবু সাঈদের বয়সী আমার পরিচিত একজন পড়ে ঢাকার বাইরে এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিন বছরেও সে হলে একটা বরাদ্দ পায়নি। সে ভাড়া নিয়ে থাকে মেসবাড়িতে। প্রভোস্টের কাছে গিয়ে বহুবার আবেদন–নিবেদন করেছে। তাঁর একই কথা, ‘নেতাদের ধরো। তাঁরা চাইলেই তোমার একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’ হল প্রভোস্টের পরামর্শ মত সে নেতাদের কাছেও ধরনা দিয়েছে। ভক্তির সাথেই তাঁরা বলেছে, ‘আপনার জন্য তো দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা সিস্টেম ভাঙা যাবে না। আপনি সিনিয়র হয়েছেন তো কী হয়েছে? আগে গণরুমে ওঠেন। মিটিং–মিছিলে যোগদেন বা শামিল হন, আপনার দলীয় আনুগত্য ভাবমূর্তি দেখি তারপর দেখা যাবে আপনার ব্যপারে কি করা যায়।’

এসব অনিয়ম আর বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা বিলোপের কথা বিগত কোটা (২০১৮) আন্দোলনের সময়ও ছিল। সেই সময় সদ্যগত হওয়া প্রধানমন্ত্রীর একঝটকায় সব কোটা বাতিলের সিদ্ধান্তে ভবিষ্যতের চিন্তা না করে আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী নেতারা এমনই মাতোয়ারা হয়ে ওঠেন যে শিক্ষাজীবনের চলমান বঞ্চনা ও বৈষম্যের ফাঁক-ফোকরগুলো নিয়ে তাঁরা আর কোনো উচ্চবাচ্য করেননি। সেবারের কোটা আন্দোলনে যারা সমন্বয়কের ভুমিকা পালন করেছেন তারা নিজের যোগ্যতা বিবেচনায় না নিয়ে পরবর্তীতে নুরুল হক নুরের মত বড় মাপের নেতা হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে ওঠেন। তাঁরা কোটা আন্দোলনের মূল্যহীন সাফল্যকে পুজি করে ক্রমান্বয়ে বড় মাপের নেতা হওয়ার জন্য নতুন পথ ধরে অন্য বন্দরের ঠিকানা খুঁজতে থাকেন। পরিশেষে মহামান্য কোর্টের রায় সরকারি কুট-কৌশলে অন্য পথে ধাবিত হয়।

২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী নেতা বা সমন্বয়কদের আশায় গুরেবালি পরে, আশাহত হয়ে তখন তাদের ঘুম ভাঙ্গে। অত:পর কোর্টের রায়ের বিপরীতে গিয়ে পূর্বের ন্যায় আবার নতুন করে নব-শক্তিতে কোটা আন্দোলন ২০২৪ শুরু হয়। ২০২৪ কোটা আন্দোলন পূর্বের (কোটা আন্দোলন ২০১৮) চেয়ে বেশি গতিময় করার জন্য নেতৃত্বে আসেন অনেক মেধাবী, অকুতভয় সমন্বয়ক যাদের ডাকে সারা দিয়ে কোটা আন্দোলনে সমর্থন যোগান দেশের আপামর জনসাধারণ। যার ফলশ্রতিতে তা আর ছাত্র আন্দোলন থাকেনি তা ক্রমান্বয় রূপ নেয় ছাত্র জনতার আন্দোলনে। শাসকগোষ্ঠী নতুন এই কোটা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্র/জনতার প্লাস প্রথম প্রথম বুঝতে পারেনি, তারা মনে করেছিল শাসকগোষ্ঠীর মদদপুষ্ট ছাত্র/যুব সংগঠন ছাত্রলীগ/যুবলীগ এবং দলীয় পরিচয়ে বা বিবেচনায় তাদের নিয়োগকৃত পুলিশ, আর্মি, বিজিবি, র‌্যাব ও অন্যান্য বাহিনী কঠোর হস্তে দমন করে ফেলবে। এই আন্দোলন বেশীদুর যেতে পারবে না।

কোটা আন্দোলনকে রুখে দেয়ার জন্য শাসকগোষ্ঠীর উৎসাহে উজ্জীবিত হয়ে ছাত্রলীগ/যুবলীগ এবং পুলিশ, আর্মি, বিজিবি, র‌্যাব ও অন্যান্য বাহিনী মারমুখি অবস্থান নিয়ে নির্বিচারে ‍গুলি চালিয়ে যখন আন্দোলনরত অবস্থায় বেশ কিছু মেধাবী ছাত্র/ছাত্রী, জনতাকে হত্যা, বন্দি করল, রাস্তায় রক্ত ঝড়ালো তখন আন্দোলন বন্ধ হওয়ার পরিবর্তে আন্দোলনের শক্তি এবং গতি আরও বৃদ্ধি পেতে থাকলে শাসকগোষ্ঠীর মাঝে ব্রীতির সঞ্চার হওয়ার ফলে ছাত্র/ছাত্রীদের কোটা সংস্কারের ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে সমন্বয়কদের আলোচনার জন্য সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী আহবান জানায় কিন্তু তা অনেক বিলম্ব হয়ে যায় এবং এরই মধ্যে অনেক অমূল্য প্রাণ জড়ে যায় তাদের রক্তে রাজপথ, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস রঞ্জিত হয়ে যায়। তাদের রক্তের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা না করে আন্দোলন চালিয়ে নেয়।

এরই ধারাবাহিকতায় গৃহীত ছাত্রদের সর্বশেষ আট দফা দাবির মূলেও আছে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা একাডেমিক জীবনের বঞ্চনা ও বৈষম্য দূর করার কথা। যেমন (ক) হলে হলে প্রশাসনিকভাবে সিট বরাদ্দের ব্যবস্থা, (খ) ছাত্র সংসদ চালু করা, (গ) একাডেমিক হয়রানি বন্ধ করা (ঘ) প্রত্যেক ছাত্র/ছাত্রীদের জন্য শিক্ষাক্ষেত্রে সমান সুযোগ সৃষ্টি করা, (ঙ) ইচ্ছাকৃত পরীক্ষা দেয়া বা পরীক্ষায় অকৃতকার্য্য হয়ে সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনের নেতা/নেত্রীর পরিচয়ে হল দখল করে থাকা ছাত্র/ছাত্রীদের নির্ধারিত সময়ের পর তাদের ছাত্রত্ব বাতিল করাসহ হল ত্যাগে বাধ্য করা, (চ) ক্যান্টিনে খাওয়ার মান এবং লাইব্রেরীতে পড়ার ক্ষেত্রে সকলের সমান অধিকার নিশ্চিত করা ইত্যাদি। উপরোক্ত সমস্যাগুলির সমাধান না হলে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবি শতভাগ পূরণ হলেও চলমান শিক্ষাজীবনের বঞ্চনা ও বৈষম্য দূর হবে না। শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ থেকেই যাবে। এমন খণ্ড খণ্ড অসন্তোষ আবার কোনো দিন অন্য কোনো ইস্যুকে কেন্দ্র করে জ্বলে উঠতে পারে বলে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে বলা হলেও শাসকগোষ্ঠী আন্দোলনকে তেমনটা গুরুত্ব দেয় নি।

পরবর্তীতে অবস্থা যখন নিয়ন্ত্রনের বাহির চলে যায় তখন ছাত্রদের যৌক্তিক দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে কারফিউর মধ্যেও আদালত বসিয়ে কোটা সংস্কারের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, শান্তিপূর্ণ কোটা আন্দোলন করতে গিয়ে যারা শহীদ হয়েছেন, যারা আহত হয়েছেন তাদের বিষয়ে অনতিবিলম্বে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন পূর্বক নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ন্যায্য বিচার করাসহ ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থা করা, সেই একই রকম গুরুত্ব দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটগুলো ছাত্রদের অন্য দাবিগুলো সত্ত্বর/দ্রুত পূরণের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিলেও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব হওয়ায় তা আর কাজে আসেনি। অত:পর সঠিক সময়ে সুযোগের সৎব্যবহার করে আওয়ামীলীগের শরিক ১৪ দল ব্যতীত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীরা ছাত্র জনতার আন্দোলনের সাথে একাত্বতা ঘোষণা করাসহ স্বক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে সরকার পতনের এক দফা আন্দোলন শুরু করে। সকল শক্তি প্রয়োগ করেও শাসকগোষ্ঠী এই আন্দোলন নৎসাত করতে ব্যর্থ হয়ে সদ্য গত হওয়া স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী ৫ আগস্ট, ২০২৪ তারিখ পদত্যাগ পত্র জমা দিয়ে দেশ থেকে পলায়নের মধ্য দিয়ে ছাত্র জনতার আন্দোলনে নতুন করে দেশ স্বাধীন হয় এবং স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর অপশাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে।

স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর অপশাসনের পরিসমাপ্তি ঘটার মাধ্যমে নতুন করে স্বাধীন হওয়া দেশে সর্বজন শ্রব্ধেয় নোবেল লরিয়েট ড. মোঃ ইউনুছ স্যারের নেতৃত্বে গত ৮ আগস্ট, ২০২৪ তারিখে যার যার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ এবং সকলের গ্রহনযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে দেশ পরিচালনার জন্য একটি অন্তর্ভুতিকালীন সরকার গঠিত হয়। দেশ পরিচালনার জন্য নব-গঠিত অন্তবর্তীকালীন সরকার প্রথম দিন থেকেই বিগত ১৬ বৎসরে জনগণের মনে পুঞ্জিভুত ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তদপরি পূর্বে উত্থাপিত ছাত্রদের দাবীগুলি যদি সীমিত সময়ের মধ্যে পুরণ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা যায় তাহলেই ছাত্র–অসন্তোষ ক্রমে প্রশমিত হতে পারে আমার বিশ্বাস। অন্যথায় হয়তো আবার কোন এক সময় তুষের আগুনের মত জ্বলে উঠতে পারে এবং তা নিয়ন্ত্রনে আনা কঠিন থেকে কঠিনতর হতে পারে।

পরিশেষে সূতিকাগার থেকে শুরু হওয়া বৈষম্য দূর করার বিষয়ে একটি পরামর্শ দিয়া আমার এই সংক্ষিপ্ত বৈষম্য বিরুধী কোটা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট শেষ করব। আমাদের দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় ছাত্র/ছাত্রীরা নবম শ্রেণী অধ্যায়ন করার সময় মেধা, পারিবারিক আর্থিক সুযোগ সুবিধা তথাপি, ছাত্র/ছাত্রীদের বাসস্থান থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দূরত্ব বা অবস্থান এবং অনতি দুরত্বে অবস্থিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা অনুযায়ী নিজের ইচ্ছায় না হলেও সক্ষম বা অক্ষম যাহাই হউক পরিবারের আকাঙ্খাকা বা উচ্চাভিলাষ চরিত্রার্থ করার জন্য বুঝে হউক আর না বুঝেই হউক তিনটি গ্রুপে (বিজ্ঞান, হিসাব (কমার্স) এবং মানবিক) বিভক্ত হয়ে যায়। এই বিভক্তির কারণে ছাত্র/ছাত্রীদের মধ্যে সামাজিক, পারিবারিকভাবে বিভিন্ন ধরণের বৈষম্য আচরণ শুরু হয়ে যায়। আমাদের সমাজে বসবাসকারী বা নিজ পরিবারের অভিভাবকের মাঝে বদ্ধমূল ধারণা জন্মে যে, পরিবারের যে ছেলে বা মেয়ে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ে সে তুলনামুলকভাবে অন্যদের চেয়ে বেশী মেধাসম্পন্ন এবং সে পরবর্তীতে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা বৈমানিক হবে নিশ্চয়। তাই তার যত্ন বেশী নিতে হবে এবং তার সকল চাহিদা যথাসময়ে মিটানোর চেষ্টা করা হয়। আর যে ছেলে বা মেয়ে হিসাব বিজ্ঞান বিভাগে পড়ে তার যত্ন বা চাহিদা পূরণ বিজ্ঞান বিভাগে পড়ুয়া ছেলে-মেয়ের চেয়ে কিছু কম হয় আর যে ছেলে বা মেয়ে মানবিক বিভাগ নিয়ে লেখা পড়া করে কার্যত তার তেমন যত্ন বা চাহিদা যথাসময়ে পূরণ করা হয় না বা অপেক্ষাকৃত অবহেলার মধ্য দিয়ে তার লেখা পড়া চালিয়ে যেতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই পরিবারে জন্ম নেয়া সন্তান হলেও খাবারের মানের বেলাও বৈষম্যের স্বীকার হতে হয়, যে সন্তান বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পড়া-শুনা করে তার খাবার পরিবারের সাধ্যতম একটু হলেও উন্নত হয়ে থাকে। এই পারিবারিক বা সামাজিক বৈষম্য আচরণ শিশু মনে অনেক সময় অবাঞ্চিত অবস্থার সৃষ্টি করে এবং নিজেকে অসহায় মনে করে। লেখা-পড়ায় গ্রুপিং এর কারণে শিশু মনে পারিবারিক, সামাজিক এবং সহপাঠীদের কাছ থেকেও আচার আচরণে অনেক ক্ষেত্রে বৈষম্যের স্বীকার হয়ে লেখা-পড়া ছেড়ে দিয়ে বিভিন্ন অপকর্মের সাথে জড়িয়ে (খুন, নেশা, রাজনৈতিক দলে ক্যাডার) অকালে জীবন নষ্ট করে ফেলার পর পরিবার বুঝতে পারলেও ঐ সময় তাদের আর করার কিছুই থাকে না। এইরূপ বৈষম্যও দুর করা জরুরী এবং তা দূর করতে হলে একাদশ শ্রেণী পর্যন্ত গ্রুপিং করা বাদ দিতে হবে এবং সকলে স্বল্পপরিসরে হলেও সব বিষয়ে লেখা-পড়া করবে। যখন তাদের জ্ঞান/বুদ্ধি এবং নিজের ভবিষ্যত সম্পর্কে বুঝে সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রয়োজনীয় বয়স হবে তখন তারা যার যার বিষয় বুঝে নিয়ে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করলে তাদের মনে কোনো ক্ষোভ বা হাতাশা থাকবে না এবং সকলের অজান্তে সৃষ্ট বৈষম্য আপনা আপনিই দূর হবে। তার পাশাপাশি দেশে একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে উঠবে এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করবে।

www.sangbadlive24.com এ প্রকাশিত সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও সবকিছুই আমাদের নিজস্ব। বিনা অনুমতিতে এই নিউজ পোর্টালের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি। যে কোন বিষয়ে নিউজ/ফিচার/ছবি/ভিডিও পাঠান news.sangbadlive24@gmail.com এই ইমেইলে।