কৃষিবিদ মোঃ আসাদুজ্জামান খান: বাংলাদেশে কৃষি উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে জিয়া পরিবারের ভূমিকা অপরিসীম। কৃষি বিপ্লবের যে ধারাবাহিক অগ্রগতি তার অন্যতম দিকপাল জিয়া পরিবার। ষাটের দশকে কৃষিতে যে সবুজ বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল তা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই শুরু হয়েছিল। শুকনো মৌসুমে কৃষক যেন নদী নালা ও খালবিলের পানি দিয়ে জমিতে প্রয়োজনে সেচের ব্যবস্থা করতে পারেন এবং ফসলের নিবিড়তা বাড়ানোর মাধ্যমে বর্ষা মৌসুমে ফসলকে বন্যার হাত থেকে রক্ষা করে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করাই ছিল খাল খনন কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান খাল কাটা খনন কর্মসূচির উদ্যোগ নেন। সেসময় সারাদেশে দেড় বছরে প্রায় ১৫০০ খাল খনন করা হয়। কখনো কখনো প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তিনি নিজ হাতে খাল খনন করেছেন। সেই খাল খননে কোদাল হাতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ছবিটি আজও মানুষের দৃশ্যপটে ভেসে আছে। ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ভূ উপরিভাগের পানি ব্যবহার করে সেচের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন কিভাবে বৃদ্ধি করা যায় সেটিই ছিলো প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য। বর্তমানে ৮১% পানি ভূগর্ভস্থ থেকে এবং ১৯% পানি নদী নালা খাল বিল ও বৃষ্টির উৎস থেকে সঞ্চিত হয়। ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে পানির স্তর অনেক নিচুতে চলে যায় যার ফলশ্রুতিতে Shallow tube well দিয়েও পানি উত্তোলন করা সম্ভব হয় না। Deep tube well ব্যবহার করতে হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে পানি ও মাটিতে আর্সেনিকের মাত্রা বেড়ে যায় যা ফসল এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এবং ভবিষ্যতের সেচের পানির অভাবে কৃষি বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি ছিল এদেশের কৃষকের ও কৃষির জন্য আশীর্বাদ। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এদেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের সর্বদাই চিন্তিত থাকতেন। বিশেষ করে তিনি চিন্তা করতেন কৃষিতে উন্নয়ন হলেই এদেশের মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন হবে। যেমন ভালো বীজে ভালো ফসল এ কথাটি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অনুধাবন করে ১৯৭৭ সালে জাতীয় বীজ অধ্যাদেশ চালু করেন। এই অধ্যাদেশের মূল লক্ষ্য ছিল কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা, খাদ্য ঘাটতি ও দারিদ্র দূর করা। জাতীয় বীজ অধ্যাদেশের মাধ্যমে কৃষকেরা বাজার থেকে বীজ কিনে যেন প্রতারিত না হয় তা নিশ্চিত করা। বীজ অধ্যাদেশের মাধ্যমে উৎপাদন থেকে শুরু করে বিপণন পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানসম্মত বীজ ঘরে ঘরে পৌঁছে যেত। এই বীজ অধ্যাদেশের মাধ্যমেই বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানও ভালো বীজ উৎপাদন সরবরাহ ও বিপণনে সমানভাবে কাজ করছে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জাতীয় বীজ অধ্যাদেশ এদেশের কৃষির উন্নয়ন, মানসম্মত বীজ উন্নয়ন ও বিকাশে মাইল ফলক হিসেবে কাজ করছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কৃষির আধুনিকায়ন এবং সমৃদ্ধির নিমিত্তে কৃষি যন্ত্রপাতি , কীটনাশক ও উন্নত প্রযুক্তি কৃষকের হাতে পৌঁছানোর মাধ্যমে কৃষিতে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেন। কৃষি সংস্কার কর্মসূচির মাধ্যমে ১৯৭৪- ৭৫ সালে বাংলাদেশে ধান উৎপাদন ১১.১ মিলিয়ন টন থেকে ১৯৮০-৮১ সালে ১৩.৬৬ মিলিয়ন টনে উন্নীত হয়(সুত্র-বিবিএস-২০১৮)। কৃষকের উৎপাদিত ফসল গুদামজাত করে প্রয়োজনের সময় বিতরণের ব্যবস্থা করে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নিমিত্তে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান খাদ্য গুদাম নির্মাণ কর্মসূচির প্রণয়ন করেন। উচ্চ প্রযুক্তির অধিক পুজি নির্ভর যন্ত্রপাতি কৃষকদের জন্য কঠিন ছিল। কৃষকরা অধিক সুদে বিভিন্ন বেসরকারি উৎস থেকে মূলধন গ্রহণ করত। এতে কৃষকদের আয়ের চেয়ে ব্যায়ের পাল্লাযভারী হতো। কৃষকদের এই অবস্থা থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য ১৯৭৭ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১০০ কোটি টাকার বিশেষ ঋণ কর্মসূচির প্রণয়ন করেন। এই কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষকেরা কোন ধরনের জামানা ছাড়াই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকগণ বিভিন্ন ঋণ সুবিধা পায় এবং দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিদ্যুৎ ব্যবহার করে জমিতে সেচ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা যায় সেই মর্মে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে অক্টোবর মাসের দিকে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠা করেন। পল্লী বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে গ্রামে সেচ সুবিধা বৃদ্ধি পায় এবং পল্লী এলাকার জনগণের জীবনমানের উন্নতিও হয়। বর্তমানে পল্লী বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে প্রায় ৯৮% গ্রাম সেচ সুবিধা ভোগ করছে। কৃষি বিপ্লবের অংশ হিসেবে ফসল উৎপাদনে ব্যবহৃত স্যারের সরবরাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালে আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে তিনি আরো কয়েকটি সার কারখানা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। এছাড়া দেশে গমের আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে কিভাবে দেশেই গমের উৎপাদন বৃদ্ধি করা যায় তার উপর গুরুত্ব দিয়ে দিনাজপুরের নসিপুরে ১৯৮০ সালে গম গবেষণা কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা করেন। কৃষি গবেষণায় গুরুত্ব দেয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালে প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডারের মাধ্যমে Bangladesh agricultural Research Instituteকে সাহিত্য শাসিত প্রতিষ্ঠানের রূপ দেন। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন জাতের ফসলের উন্নয়ন ও উদ্ভাবন, বিভিন্ন উচ্চ প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করেন। চিনি শিল্পে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সুগার এন্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ গঠন করেন যার মাধ্যমে শিল্প একটি শক্ত ভিত্তির উপর এখনো দাঁড়িয়ে আছে। সর্বোপরি এদেশের কৃষি ও কৃষকের ভাগ্য উন্নয়নে,দেশের অর্থনীতির চাকা সচল করার জন্য প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিরলস ভাবে কাজ করেছেন। বিশ্ব বিখ্যাত নোবেল জয়ী কৃষি বিজ্ঞানী নরম্যান, ভারতের সোয়ামিনা থানদের চেয়ে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছিলেন কৃষির উন্নয়নে অধিক দূরদর্শী সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। নরম্যান, সোয়ামিনাথানযেমন যেমন নিজ নিজ দেশের সবুজ বিপ্লবের জনক ছিলেন তেমন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সবুজ বিপ্লবের জনক। পরবর্তীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বেগম খালেদা জিয়া এদেশের কৃষি ও কৃষকের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য কাজ করেছেন। ১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা আসার পর বেগম খালেদা জিয়া ৫০০০ টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন ধাপে প্রায় দশ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদ মওকুফ করেছেন। ২০০১ -২০০৬ সাল পর্যন্ত কৃষকের ঋণের প্রায় ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত মওকুফ করেন যার মাধ্যমে প্রায় ১৫ লক্ষ কৃষক উপকৃত হয়। এছাড়াও মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করেন যার মাধ্যমে কৃষকেরা বেশ উপকৃত হয়। শহীদ রাষ্ট্রপতির জিয়া রহমান এবং গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী,আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার যোগ্য উত্তরসূরী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান এদেশের কৃষি ও কৃষকের ভাগ্য উন্নয়নের নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বিশ্বাস করেন কৃষির উন্নয়ন হলেই এদেশের মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন হবে এবং অর্থনীতির চাকা সচল হবে। তারই ধারাবাহিকতায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান ইতোমধ্যে কৃষি কার্ড, কৃষি যান্ত্রিকরণ, আধুনিক প্রযুক্তি নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে কৃষক কার্ড ও কৃষি যান্ত্রিকরণে প্রায় ১৪ লাখ কৃষকের ডাটাবেজ প্রস্তুত করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ২০ হাজার ৮৩২ জন কৃষকের মাঝে কৃষি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। কৃষি কার্ড এর মাধ্যমে কৃষকেরা ন্যায্য মূল্যে কৃষি উপকরণ, সেচ সুবিধা গ্রহন,সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা, ভর্তুকি ও প্রণোদনা, আবহাওয়া ও বিদ্যমান বাজার অবস্থা, কৃষি প্রশিক্ষণ এবং কৃষি বিমা সহ সুবিধা সমূহ নিশ্চিত করতে পারবেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান তার বাবার মত অনুধাবন করেন যে সেচ সুবিধার মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। এর অংশ হিসেবে তিনি গত ছয় মাসে ৪৭৫.৬১ কিলোমিটার খাল খনন করেছেন। এই খাল খনন কর্মসূচিতে তিনি নিজেও কোদাল হতে সাধারণ জনগণের সাথে খাল খনন করেছেন। এছাড়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান ফসল উৎপাদনে ব্যবহৃত স্যারের পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করুন ও কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানোর নিমিত্তে নিয়মিত ভর্তুকি অব্যাহত রাখছেন। এ পর্যন্ত প্রায় কৃষি প্রণোদনায় ৫.১২ কোটি টাকা বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন। দেশ ও জাতির ভাগ্য উন্নয়নে তথা কৃষি ও কৃষকের ভাগ্য উন্নয়নে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে গেছেন, পরবর্তীতে আপোষহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরে এদেশের কৃষি ও কৃষকের ভাগ্য উন্নয়ন হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান কৃষি ও কৃষকের ভাগ্য উন্নয়নের কাজ করে যাচ্ছেন। কৃষি ও কৃষকের উন্নতির জন্য গৃহীত নানাবিদ কার্যক্রম জিয়া পরিবারের হাত ধরেই সু প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কৃষি ক্ষেত্রে, কৃষি ও কৃষকের ভাগ্য উন্নয়নে তথা এদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে জিয়া পরিবার যে ভিত ও সোপান রচনা করেছেন তা এ দেশের আপামর জনসাধারণের মাঝে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
লেখক: সাবেক সহ-সভাপতি, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল,বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা;
সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি, এগ্রিকালচারিস্ট্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এ্যাব), ঢাকা জেলা চ্যাপ্টার; সমাজসেবা সম্পাদক (দপ্তর সম্পাদক অতিরিক্ত দায়িত্বে) জিয়া পরিষদ, সোনালী ব্যাংক পিএলসি কেন্দ্রীয় কমিটি।
নিউজের জন্য: news.sangbadlive24@gmail.com